
১৯৮৩ সাল থেকে আজো টান পড়েনি ব্যবসাতে
দার্জিলিং পাহাড় বা সিকিম বেড়াতে যাওয়া বা আসার পথে শিলিগুড়ি শহরে যত পর্যটক আসেন তাঁদের অন্যতম গন্তব্য শিলিগুড়ির হংকং মার্কেট। গন চিনের দুইটি প্রশাসনিক অঞ্চলের একটি হল হংকং। একটা সময় যখন আজকের মতো মুক্ত বাণিজ্য চালু হয়নি, তখন হংকং বা বিদেশ থেকে পণ্য এনে তা বিক্রি করা ছিল বেআইনি। শিলিগুড়ির কাছেই প্রতিবেশী দেশ হল নেপাল। সেই নেপালে একসময় চিন বা অন্য বিদেশি পণ্যের ছিল রমরমা। আর নেপাল থেকেই সব পণ্য রাতের অন্ধকারে সীমান্ত টপকে চলে আসত শিলিগুড়ি। শিলিগুড়ি বিধান মার্কেটের পাশেই আশির দশকের শুরু থেকে রমরমিয়ে হংকং মার্কেট শুরু হয়।
চিন থেকে শুরু করে অন্য অনেক দেশের সব পণ্য এখানে বিক্রি হত। ফলে সেই সব পণ্য শিলিগুড়ির এই মার্কেট থেকে কেনার আগ্রহ থাকত দেশি বিদেশি সব পর্যটকের। এখন অবশ্য সেই মার্কেট আগের দিনের মতো গুরুত্ব হারিয়েছে। তবুও এর মধ্যেই এখনও এই মার্কেটে এমন অনেক জিনিস পাওয়া যায় যা দেশের খুব কম স্থানেই পাওয়া যায় বলে সেখানকার ব্যবসায়ীদের দাবি। আর পর্যটকদের কাছে এই মার্কেটের গুরুত্ব বাড়াতে এখন নতুন নতুন ভাবনায় মেতেছেন সেখানকার ব্যবসায়ীদের মধ্যে ভবতোষ সাহা, তপন সাহা, পরিমল সাহা, প্রাণতোষ সাহা সহ অন্যরা। তাঁরা এখন তাঁদের মার্কেট নিয়ে বিভ্রান্তি কাটাতে হংকং মার্কেট গেটও চালু করেছেন।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই শিলিগুড়ি শহরে উদ্বাস্তুদের স্রোত শুরু হয়েছে। ষাটের দশকে তা অন্য মাত্রা পায়। ষাটের দশকে চিন ভারত যুদ্ধের পর শিলিগুড়ির গুরুত্ব বেশি করে বৃদ্ধি পায়। তার সঙ্গে যোগ হয় ’৬৭ সালের নকশাল আন্দোলন। এরপর বাংলাদেশের মুক্তি যুদ্ধের পর এই শহরে উদ্বাস্তু স্রোত আরও বেড়ে যায়। তার পাশাপাশি প্রতিবেশী রাজ্য অসম থেকে বাঙালি খেদাও আন্দোলনের জেরে এই শহরে জনসংখ্যা হু হু করে বাড়তে থাকে। ১৯৫১ সালে যে শহরের জনসংখ্যা ছিল ৩২,৪৮০ জন, তা ১৯৮১ সালে হয়ে দাঁড়ায় ১,৫৩,৮২৪ জন। সত্তরের দশকে শিলিগুড়ি ছিল ভয়ঙ্কর। রাতের বেলা বোমাবাজি লেগেই থাকত। তার সঙ্গে চুরি, ডাকাতি, খুন, লুঠপাট সে এক নৈরাজ্যের শহর। সেই সময়েই শিলিগুড়ি শহরের পরিধি আরও বাড়তে থাকে। বন কেটে তৈরি হতে থাকে বসতি। চোরাই কাঠের কারবারিরা মাথা চাড়া দিল শহরে। তার সঙ্গে বিপ্লবের পীঠস্থান নকশালবাড়ি হয়ে উঠল চোরাই কারবারের কেন্দ্র।

সেটা ১৯৮৩ সালের কথা। নেপাল থেকে বিদেশি পণ্য এনে শিলিগুড়ি হয়ে ভারতের বিভিন্ন স্থানে পাচার করার কাজে নেমে পড়ে বহু যুবক যুবতী। পুরনো দিনের লোকেরা অনেকেই বলেন, আইন শৃঙ্খলার স্বার্থে কোনও চুরি ছিনতাই না করে স্রেফ নেপালের পণ্য পাচার করতে কিছু যুবককে পিছন থেকে উৎসাহ দেয় পুলিশ প্রশাসনের একাংশ। শোনা যায়, নকশাল আন্দোলনে ব্যর্থ হয়ে হতাশ কিছু যুবকও নাকি শেষে নেপালের পণ্য পাচারে যুক্ত হয়ে পড়ে। সেসব নাকি ছিল তাদের পুনর্বাসন। তবে সেই হংকং মার্কেট চালু হলেও সেখানকার যুবকদের মনে প্রায়ই অশান্তি লেগে থাকত। অনেকে নেপালের অবাঙালি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে বাকিতে বিদেশি পণ্য নিয়ে আসতেন। নেপালের ধূলাবাড়ি থেকে বহু মহিলা পুরুষ শিলিগুড়ির এই মার্কেটে পণ্য পৌঁছে দিতেন। উদ্বাস্তু যন্ত্রণা কাটানোর জন্য তাঁদের অন্য লড়াই চলতে থাকে। প্রায়ই কাস্টমস তাদের সেই মার্কেটে হানা দিত। ফলে সেখানকার ব্যবসায়ীদের রাতের ঘুম উবে যেত প্রায়ই। কিন্তু বিদেশি পণ্যের আকর্ষণে তাদের মার্কেটে যা বিক্রি হত তাকে অনেকে কাঁচা পয়সা বলে বেড়াতেন।
আরও পড়ুন
পুরনো সামগ্রী হাতবদল করেই দিন কাটে তাঁর

এভাবেই শিলিগুড়ির হংকং মার্কেট দেশ বিদেশের বাজারে একটি নাম হয়ে ওঠে যা আজও মুছে যায়নি। তবে বিশ্বায়ন বা মুক্ত বাজার চালু হওয়ায় আর সেই বিদেশি পণ্যের আকর্ষণ থাকে না। ফলে সেই হংকং মার্কেটের বিক্রি অনেকটাই কমে যায়। কিন্তু শিলিগুড়ি এলে পর্যটকদের অনেকেই একবার হংকং মার্কেট ঘুরে দেখার চেষ্টা করেন একবার। সেখানকার ব্যবসায়ী সমিতির কর্মকর্তারা জানালেন, চল্লিশ-পঞ্চাশ জন মিলে শুরু হওয়া এই মার্কেটে আজ ব্যাবসায়ীর সংখ্যা ৫০০ জন। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এর সঙ্গে দশ হাজার লোকের রুটিরুজি জড়িত। সেখানে এখনো এমন কুড়ি পঁচিশটি বিদেশি সামগ্রী পাওয়া যায় যা ভারতের কোথাও পাওয়া যায় না। যেমন বেলজিয়াম, চেকোশ্লোভাকিয়ার কম্বল, আমেরিকা, কোরিয়ার ডিনার সেট। কার্পেট, কৃত্রিম জুয়েলারি, মহিলাদের বিভিন্ন প্রসাধন সামগ্রী, ছাতা, জুতো, চপ্পল, ট্রলি ব্যাগ, জ্যাকেট, মিউজিক সিস্টেম– এইসব জিনিস খুব কম লাভ রেখে তাঁরা বিক্রি করছেন, যাতে পর্যটকরা সেই মার্কেটের প্রতি আকর্ষণ না হারান। তার বাইরে মার্কেটের গুরুত্ব বাড়াতে তাঁরা সেখানকার সব ব্যবসায়ীকে নির্দেশ দিয়েছেন, কেউ যেন বিদেশি পণ্য বলে নকল সামগ্রী বিক্রি না করেন। একপ্রকার তীব্র প্রতিযোগিতার মধ্যে তাঁরা তাদের এই মার্কেটকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন। আর যে মার্কেটের ব্যবসায়ীদের একসময় দুর্নাম ছিল আজ তাঁরা সামাজিক কাজও করছেন। কোনও দুঃস্থ ও মেধাবী টাকার অভাবে পড়তে না পারলে সহযোগিতা করছেন।
এই হংকং মার্কেটের পাশেই আছে শেঠ শ্রীলাল মার্কেট, বিধান মার্কেট। পর্যটকরা শেঠ শ্রী লাল মার্কেট বা বিধান মার্কেটে পৌঁছে হংকং মার্কেটের খোঁজ করলে অনেকে বলে দিচ্ছেন, এটাই হংকং মার্কেট। পর্যটকদের বিভ্রান্ত করে হংকং মার্কেটের ক্রেতা সরানোর কাজ চলছে। তাই হংকং মার্কেটের ব্যবসায়ীরা চার লক্ষ টাকা খরচ করে তাদের মার্কেটের পরিচিতি দিতে সম্প্রতি পাঁচটি গেট তৈরি করেছেন। পর্যটক মরশুমে তাদের এই বাজারে প্রতিদিন পাঁচ হাজার লোকের ভিড় হয় কেনাকাটা করতে। ইদানীং পাহাড়েও শিলিগুড়ির এই মার্কেট থেকে পণ্য কিনে নিয়ে পাহাড়ে যাচ্ছেন অনেক পাহাড়ের ব্যবসায়ী। পর্যটকদের কথা চিন্তা করে তাঁরা এই মার্কেটকে আরো চাঙ্গা করার কিছু পরিকল্পনা করেছেন। সেখানে শৌচালয় আছে। এখন পানীয় জলের ব্যবস্থা হচ্ছে।

ভ্রমণ গবেষক রাজ বসু বলেন, পর্যটকদের কাছে কিন্তু কেনাকাটা করা একটি বড় বিষয়। হংকং মার্কেট ছাড়া আগে কিন্তু অনেক পর্যটক শিলিগুড়ি থেকে কেনাকাটা করতে নেপালের ধূলাবাড়ি চলে যেতেন। আগে এমন ছিল, দার্জিলিং, সিকিম বা ভুটান ঘুরতে যাওয়ার আগে বহু পর্যটকের কাছে হংকং মার্কেট যাওয়া ছিল নিয়মের মতোই। এখন মুক্ত বাণিজ্য হওয়াতে সেই আকর্ষণ নেই। তবুও হংকং মার্কেটের চাহিদা আজও আছে। সেই পর্যটনের আকর্ষণের কথা মাথায় রেখে তাঁরা পর্যটন মন্ত্রী ও মেয়রের কাছে অনুরোধ করেছেন, হংকং মার্কেটের আধুনিকীকরণের জন্য। সেখানে এখন যেসব পণ্য পাওয়া যায়, সেগুলির পাশাপাশি উত্তরবঙ্গের মেচ, রাভা, টোটো সহ অন্য জনজাতিদের হস্ত শিল্প যাতে সেখানে পাওয়া যায় তার জন্য উদ্যোগ নিতে। এতে সেই মার্কেটের আকর্ষণ আরো বাড়বে। যদিও সেখানকার ব্যবসায়ীরা জানালেন, তাঁরা এখন একটু একটু করে উত্তরবঙ্গের বাঁশ, বেত, পাটের কিছু হাতের কাজ রাখা শুরু করেছেন। লেখক গৌরিশঙ্কর ভট্টাচার্য বলেন, হংকং মার্কেটের পাশে শেঠ শ্রীলাল মার্কেটের আশপাশ দিয়ে ষাটের দশকেও টয় ট্রেনের ইঞ্জিন ঘুরত। আর হংকং মার্কেটের জায়গাটা অনেকটা ডাম্পিং গ্রাউন্ডের মতো ছিল। অনেকেই সেখানে ময়লা ফেলত। আজ তার ভোলবদল দেখে পুরনো দিনের লোকেরা গর্ব বোধ করেন।
