
লাঙলই এক্ষণ বেঁচে থাকার হাতিয়ার তাঁদের কাছে
ষাটের দশকে কৃষক অভ্যুত্থানের জন্য বিখ্যাত নকশালবাড়ি। সেই নকশালবাড়ির নেপাল সীমান্তে আজ নতুন করে অন্যরকম এক আন্দোলন শুরু হয়েছে। আর তা হল, লাঙল ধরো চোরাচালানের বিরুদ্ধে। লাঙল ধরো নতুন প্রজন্ম বাঁচাতে। রাজ্যের কৃষি দপ্তর এই কাজে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে।
শিলিগুড়ি মহকুমার দুটি ব্লকে নেপাল সীমান্ত পড়েছে। সেই দুটি ব্লক হল নকশালবাড়ি ও খড়িবাড়ি। মেচি নদী ঐ দুটি ব্লককে আলাদা করে দিয়েছে নেপাল থেকে। সীমান্ত দিয়ে ভারত নেপাল চুক্তি অনুযায়ী দুই দেশের মানুষের কার্যত অবাধ যাতায়াত। একেবারে উন্মুক্ত সীমান্ত। ফলে তার অবস্থার সুযোগ নিয়ে দিনের পর দিন চোরাকারবার বা পাচার হয়ে আসছে। দেশের কোটি কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে চলছে চোরাচালান। আর সেই পাচার রুখতে ও দেশের নিরাপত্তার স্বার্থে বসানো হয়েছে এসএসবি জওয়ানদের। কিন্তু তারপরও পাচার বন্ধ হয়নি। এখনও এই সীমান্ত দিয়ে মানব পাচার থেকে শুরু করে অস্ত্র পাচার, সুপারি, বিভিন্ন বন্য প্রাণীর দেহাংশ সহ অন্যান্য সামগ্রী অনবরত পাচার চলছে। প্রায়ই এসএসবি সীমান্তে কিছু সামগ্রী উদ্ধার করছে। কিন্তু তারপরও পাচার একটি বড় চিন্তার বিষয়। আরও উদ্বেগের দিক হল, মোটা টাকার লোভ দেখিয়ে পাচারকারীরা ভারতীয় সীমান্তের কিশোর, যুবক এমনকি মহিলাদের পাচার কাজে নামিয়ে দিচ্ছে। নতুন প্রজন্মের অনেক ছেলেমেয়ে সীমান্তে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে পাচার কাজে জড়িয়ে পড়ছে। তারপর আবার কিছু ছেলেমেয়ে আবার লাঙল ধরে কৃষিকাজ করতে চাইছে না। আর কেউ যদি কৃষি কাজ না করে তবে জমিতে ফসল ফলাবে কে? এই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে বয়স্ক কৃষকদের মধ্যে। তাই নেপাল সীমান্তের নকশালবাড়ি ও খড়িবাড়ি এলাকায় কৃষকরা এখন আওয়াজ তুলছেন, পাচার নয়, তোমরা লাঙল ধরো। লাঙলই বেঁচে থাকার হাতিয়ার।
আরও পড়ুন
লিলিপুটদের প্রাচীন গ্রাম
নকশালবাড়ির মুনিরাম গ্রাম পঞ্চায়েতের লালজি জোত থেকে মেচি সীমান্ত আধ কিলোমিটার দূরে। সেই গ্রামের অগ্রণী ফার্মাস ক্লাবের মেচ, রাজবংশি, নেপালি, আদিবাসী সদস্যরা এখন তাই পাচারের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলে গোটা এলাকায় কৃষি কাজের ওপর প্রচার শুরু করেছেন। এসএসবি-ও তাদের সহযোগিতা করছে। সেই ফার্মাস ক্লাবের সভাপতি ভানু বর্মণবসুনিয়া জানালেন, বিভিন্ন ভাবে পাচার হচ্ছে। এমনকি টাকার লোভ দিয়ে অল্প বয়সী মেয়েদের পাচারও হচ্ছে। তাঁরা তাই সকলকে কৃষি কাজ থেকে স্বনির্ভরতার কথা বলছেন। কৃষির পাশাপাশি পশু পালনের কথা তাঁরা বলছেন। সেই ক্লাবে ২৮ জন সদস্য। তার সম্পাদক হলেন মেচ সম্প্রদায়ের বুলাল শৈব। আর কোষাধ্যক্ষ লক্ষণ শৈব। তাঁরা জানালেন, কৃষি বলতে ধান ছাড়া অন্য শাক সবজি করতে বলছেন তাঁরা। তার সঙ্গে গরু ছাগল, হাঁস মুরগি, শুকর প্রতিপালনের ওপর তাঁরা জোর দিচ্ছেন। তাদের কথামতো কর্ণ বর্মণ, জয়ন্ত সিংহ, মানবি বর্মণরা তাদের স্কুল কলেজের পড়াশুনার পাশাপাশি কৃষিকাজে হাত দিয়েছে। তারা নিয়ম করে জমিতে লাঙল দিচ্ছে। তারাও তাদের বয়সীদের বোঝাতে শুরু করেছে, পড়ার পাশাপাশি লাঙলই বড় অস্ত্র, ওটাই বড় হাতিয়ার। কৃষি কাজ করলে হয়ত ফাটকা বা কাঁচা পয়সা আসবে না। কিন্তু সুস্থ ভাবে ও শান্তিতে বাঁচা যাবে।
ভানু বর্মণ আরো জানালেন, নতুনদের মধ্যে তাঁরা প্রচার করে কম করে পঞ্চাশ জনের ওপর ছেলেমেয়েকে নিয়মিতভাবে লাঙল দেওয়াতে পারছেন। তারা পড়াশুনা করে এই কৃষিকাজ করছে। জৈব কৃষিতে চাসবাসের ওপর তাদের মধ্যে প্রচার অনবরত চলছে। অথচ তাদের কাছে পাচারকারীদের মোটা টাকার হাতছানির টোপ ছিল। একইভাবে বহু মহিলাকে পশু পালন ও হাতের কাজে যুক্ত করা গেছে। তারা অনেকে এভাবে আজ স্বনির্ভর। এভাবেই এক অন্যরকম বিপ্লব এই নকশালবাড়ি থেকে শুরু হয়েছে বলে তারা জানালেন। স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার তরফে তরুণ মাইতি ঐ এলাকায় গিয়ে জৈব কৃষির প্রচার ছাড়া বাল্য বিবাহ ও নারী পাচারের বিরুদ্ধে প্রচার সভা করেছেন বৃহস্পতিবার। তরুণবাবু বলেন, পাচার ঠেকাতে সীমান্তের গ্রামে যেভাবে কৃষি ও পশু পালনের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে তা সত্যি একটি উল্লেখ করার মতো দিক। কৃষি দপ্তরের আধিকারিক পার্থ রায় জানালেন, তারা গোটা নেপাল সীমান্ত জুড়ে গ্রামগুলোতে ফার্মার্স ক্লাব তৈরিতে উৎসাহ দিচ্ছেন। অনেকগুলো ফার্মার্স ক্লাব তৈরি হয়েছে। তারা জৈব কৃষিতে চাসবাস করছেন। আবার অনেকে ক্যাপসিকাম প্রভৃতি চাষ করছেন। এই সব ক্যাপসিকামের খুব চাহিদা নেপালে। নেপালে সেই সব ক্যাপসিকাম পাঠিয়ে অনেক কৃষক পরিবার স্বনির্ভর হচ্ছেন। এভাবেই সীমান্তে চাষবাসের মাধ্যমে পাচার ঠেকিয়ে এক অন্য পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে বলে পার্থবাবু জানালেন।
