কুড়ি বছর ধরে এমনই নেশা ও পেশার সঙ্গে ঘর করছেন বিপুল সরকার
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এমনকি নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসুর নিজে হাতে লেখা অনেক চিঠিপত্র কলকাতায় কারও কারও কাছে আছে। কিন্তু তাঁরা সেসব প্রকাশ্যে আনতে চান না। তবে তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ আবার সেই সব মনীষীদের চিঠি পঞ্চাশ টাকা থেকে দু হাজার টাকায় বিনিময় করতে চান। শিলিগুড়ি শালবাড়িতে পুরানো সামগ্রী নিয়ে কাজ করা ব্যক্তি বিপুল সরকারের কাছ থেকেই জানা গেল এমন তথ্য। তাঁর কথায়, বহুদিনের পুরানো বহু সামগ্রী কলকাতায় আছে। সেসব প্রায়ই নিলাম হয়। তবে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বা নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসুর হাতে লেখা কিছু চিঠি হাতের সামনে পেয়েও তা আর টাকা দিয়ে কিনে আনেননি বিপুলবাবু। কারণ, কাগজে লেখা সেইসব চিঠি সংরক্ষণ করে রাখা কঠিন। তাড়াতাড়ি সেইসব নষ্ট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা। ফলে তাঁর পক্ষে আবার টাকার বিনিময়ে অন্য কারও কাছে তা হস্তান্তর করা কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।
শিলিগুড়ি শালবাড়ির মেথিবাড়িতে থাকেন মধ্যবয়স্ক বিপুল সরকার। পুরনো দিনের মূল্যবান বিভিন্ন সামগ্রী সংগ্রহ করে রাখাই তাঁর দীর্ঘ দিনের নেশা। এক সময় তাঁর প্রধান পেশা ছিল সোনা ও রুপা ফেরি করে বেড়ানো। সঙ্গে ছিল পুরানো দিনের সামগ্রী সংগ্রহ করার নেশা। কিন্তু সে-কাজে বহু মানুষের কাছে তাঁকে ঠকতে হয়েছে। কেননা, রাজরাজড়া বা ব্রিটিশ আমলের জিনিস বলে অনেকেই তাঁর কাছে নকল সামগ্রী বিক্রি করে ঠকিয়ে দিয়েছে। তাই তাঁর মধ্যে না-ঠকে যাওয়ার জেদ কাজ করতে থাকে। সেই জেদ আর নেশা শেষে তাঁর কাছে পেশায় পরিণত হয়। পুরনো দিনের টাকা, মুদ্রা, কাঁচের ঝাড়বাতি, ঘড়ি, ফার্নিচার সংগ্রহ করে তা বিভিন্ন লোকের কাছে ফেরি করেন তিনি। এমন অনেক মানুষ আছেন, যাঁরা বাড়ি বা ফ্ল্যাট সাজাতে পুরনো দিনের সামগ্রী ব্যবহার করেন। কেউ আবার বাড়িতে পুরনো দিনের সামগ্রী দিয়ে বাড়িতেই ছোটখাটো মিউজিয়াম তৈরি করেন। এই চাহিদার কথা মাথায় রেখে এই আজব নেশাকে পেশায় পরিণত করেছেন বিপুলবাবু। আর তা চালাতে গিয়ে কলকাতা থেকে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত, উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থান, রাজরাজড়াদের বাড়ি সর্বত্র ঘুরতে হচ্ছে তাকে। হোয়াটসআপের মাধ্যমে তাঁকে সেই সব মূল্যবান ও দুস্প্রাপ্য সামগ্রীর বিনিময় চালাতে হচ্ছে।

ভারতীয় বিভিন্ন প্রাচীন যুগের মূর্তি কেনাবেচা ছেড়ে অন্য বিভিন্ন সামগ্রী তিনি সংগ্রহ করে তাঁর ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। ইউরোপিয়ান আর্টের সামগ্রী আছে তাঁর কাছে। আছে অনেক পুরনো দিনের টাকা। বিপুলবাবু বলেন, নোটের মধ্যে এমন অনেক দিক আছে যেগুলো খুব মূল্যবান। যেমন একশ টাকার নোট। পরাধীন ভারতে একশ টাকার নোট করাচি থেকে যেমন ছাপা হয় তেমনই বার্মা থেকেও ছাপা হয়। আবার কলকাতা থেকেও ছাপা হয়। অথচ এখন তাঁদের কাছে বেশি মূল্যবান করাচি ও বার্মার ছাপানো একশ টাকার নোট। কারণ ঐ দুটি স্থান থেকে নোট কম ছাপানো হয়েছিল। কলকাতা থেকে তা বেশি ছাপানো হয়েছিল। এভাবে অন্য নোটের নম্বর, সিরিজের ওপর বাতিল বা অচল নোটও তাঁদের কাছে মূল্যবান। দশ টাকা বা কুড়ি টাকার নোটের স্টার সিরিজের নোট তাঁদের কাছে বেশি মূল্যবান। ১৯২৩ থেকে ১৯২৬ সাল পর্যন্ত খুব কম সময় আড়াই টাকার নোট বা আনা চালু হয়েছিল। সেটার চাহিদা কিন্তু অনেকের কাছে রয়েছে। আবার দেশে ষাটের দশকে দশ হাজার টাকার নোট বা পাঁচ হাজার টাকার নোট চালু হয়েছিল। সেই নোটের চাহিদা অনেকের কাছে রয়েছে। ফলে তাঁরা সেই নোট পেলেই তা সংগ্রহ করে নেন। এখনকার দুই হাজার, পাঁচশ বা দুশ টাকার নোট তাঁদের কাছে মূল্যবান। কারন সেই সব নোটে প্রথম রিজার্ভ ব্যাঙ্কের গভর্নরের সই আছে। এই নোট বহুদিন পর অতিরিক্ত মূল্যে বিক্রি হতে পারে। কুড়ি বছরের বেশি সময় ধরে এই সব নানান পুরানো সামগ্রী নিয়ে মেতে আছেন বিপুলবাবু।

বহু অতি প্রাচীন সামগ্রী বিপুলবাবুর হাত দিয়ে চুক্তিপত্রের মাধ্যমে এদিক ওদিক হাত বদল হয়েছে টাকার মাধ্যমে। এর মধ্যে মালদার চাঁচলের রাজবাড়ির একটি জুয়েলারি বাক্স রয়েছে। সেই রাজবাড়ির শেষ বংশধর প্রয়াত ছোটন মুখার্জির কাছ থেকে তিনি তা সংগ্রহ করেছিলেন। তাতে হাতির দাঁতের কাজ করা ছিল। আবার মধ্যপ্রদেশের পাণ্ডা রাজবাড়ির একটি মুভিং ডাইনিং টেবিল সংগ্রহ করে তা ফতেপুরে হস্তান্তর করে দেন তিনি। প্রাচীন সামগ্রী যা তিনি টাকার বিনিময়ে এদিক ওদিক হস্তান্তর করেছেন সবই তাঁর কাছে মূল্যবান। তবে উল্লেখযোগ্য তালিকায় একটি বুদ্ধিস্ট থাংকারা-কেও রেখেছেন। কালিম্পং থেকে সংগ্রহ করে সেই থাংকারা তিনি নেপালে হস্তান্তর করেছেন দুই লক্ষ টাকার বিনিময়ে। এখন তাঁর বাড়িতে ব্রিটিশ আমলের জার্মান সিলভারের তৈরি বুফে ব্যবস্থার কিছু বাসনপত্র রয়েছে। ভবিষ্যতে এই সব প্রাচীন সামগ্রী দিয়ে শিলিগুড়ি শহরে একটি শো রুম খুলতে চান তিনি।
বিপুলবাবুর কথায়, প্রত্নতত্ত্ব সংগ্রহ বা ঐতিহ্য নিয়ে উত্তরবঙ্গে কোনও সচেতনতা নেই সাধারণ মানুষের মধ্যে। আর আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার কোনও শাখা অফিস নেই উত্তরবঙ্গে। ফলে একদিকে সচেতনতার অভাব অন্যদিকে অবহেলার কারণে উত্তরবঙ্গ থেকে অনেক হেরিটেজ হারিয়ে যাচ্ছে। এমনকি ব্রিটিশরা তাদের ফেলে যাওয়া সামগ্রী আর ভারতে রাখতে চাইছে না। তারা তাই তাদের ব্যবহার করা সামগ্রী গোপনে এজেন্ট মারফৎ ভারত থেকে টাকা দিয়ে নিজের দেশে নিয়ে যেতে চাইছে। সেই কাজে বাধা দেওয়া শুরু করেছেন বিপুলবাবুরা। তিনি বলেন, ব্রিটিশদের ব্যবহার করা পুরানো সামগ্রী ভারত থেকে ব্রিটেনে নিয়ে যাওয়ার গোপন প্রয়াস তাঁরা আটকে দেওয়ার কাজ করছেন। তাঁরা চাইছেন সেইসব সামগ্রী ভারতেই থাকুক। এর সঙ্গে বিপুলবাবু জানান, বহু ব্যক্তি পুরানো নকল মুদ্রা মধ্য ভারত থেকে তৈরি করে এনে মানুষকে ঠকিয়ে চলেছেন। বিপুলবাবুর এই অন্যরকম নেশা ও পেশার তারিফ করেন উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ডঃ ইচ্ছামুদ্দিন সরকার। তিনি বলেন, বিপুলবাবুর এই আজব পেশা ও নেশার তুলনা হয় না। এর মাধ্যমে অনেকে সচেতনও হচ্ছেন।
