
ভ্রমণসঙ্গী ও রেসের নায়ক, গান কবিতায় ঘেরা কলকাতার ঘোড়সওয়ার
ছবিঃ সুমন সাধু
“ইচ্ছে যদি ঘোড়া হত
উঠে পিঠে তার
সাত-সমুদ্র তেরো নদী
হয়ে যেতাম পার।”
সাত সমুদ্র তেরো নদী পার করার এ গল্প আজকের নয়, এ এক অন্য সময়ের কথা। যখন আকাশে উড়তে মানুষের কাছে উড়োজাহাজ ছিল না। কিন্তু মানুষের ইচ্ছে ছিল ষোলআনা। তাই ইচ্ছেপূরণের সেই ভার ছিল যার কাঁধে, সে হল আমাদের পরিচিত বন্ধু, ঘোড়া। পক্ষীরাজ ঘোড়া যেন ছিল আমাদের সাক্ষাৎ আলাদিন। আমাদের স্বপ্নের ভেলা। আর তাই একথা বলতেই হয়, রূপকথার গল্প থেকে বাস্তবের যাত্রাপথে চিরকালীন ভ্রমণসঙ্গী হয়ে থেকেছে ঘোড়ারাই। পৌরাণিক কাহিনি কিংবা গল্পের পাতা, ঘোড়ারা কখনও হয়েছে রাজপুত্রের সখা, কখনও বা যুদ্ধের সওয়ারি।
ছবিঃ অর্ণব মিত্র
পুরাণ মতে সূর্যদেব নাকি সপ্তাশ্ববাহিত রথে আকাশপথে পরিভ্রমণ করেন। শোনা যায়, তাঁর রথের ঘোড়াগুলি সাতটি পৃথক পৃথক রঙের, যা রামধনুর সাত রঙের প্রতীক। আবার, পৌরাণিক সাহিত্যে অশ্বমেধ যজ্ঞের ঘোড়াকে কেন্দ্র করে ক্ষমতা প্রদর্শন করার রেওয়াজের কথাও আমরা শুনে থাকি। অর্থাৎ, ঘোড়া মানেই যেন অকৃত্রিম এক শক্তি। তাই দাবা খেলার ছকেও ঘোড়ার দৌড় আড়াই পা, সেখানেও সে বেপরোয়া, সামনের বাধা সহজেই টপকে দান দিতে সক্ষম সে।
শহরবাসীর এহেন ঘোড়ার পিঠে চড়ার শুরু ব্রিটিশদের পৃষ্ঠপোষকতায় উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে। শোনা যায়, ১৭৭৫ সালে উইলিয়াম জনসন নামের এক ইংরেজ ব্যক্তি কলকাতার পণ্ডিতিয়া অঞ্চলে প্রথম ঘোড়ার গাড়ির কারখানা তৈরি করেন। এর আগে কলকাতার রাস্তায় সাহেবদের নিজস্ব কিছু ঘোড়ার গাড়ি ছাড়া সেভাবে আর শব্দ শোনা যেত না।
ছবিঃ সংগৃহীত
এককালে যে ঘোড়া একার কাঁধে চলাচলের দায়িত্ব সামলেছে অনেকাংশে, আজ আধুনিক যন্ত্রচালিত যানবাহনের ক্রমবিকাশের সঙ্গে সঙ্গে সেই ঘোড়ার অবসরের সময় এসেছে। এক্কা গাড়ি ছোটার শব্দ হারিয়ে গেছে পরিচিত অভ্যেস থেকে। কবি মৃদুল দাশগুপ্তের ‘রাজার ঘোড়া’-রা আজ আর অনায়াসে ধান ক্ষেতে ছুটে বেড়ায় না। বাঙালি আজকাল শখে ঘোড়ার গাড়ি চড়ে, কখনও শীতের আমেজে কলকাতার ময়দান চত্বরে কিংবা বেড়াতে গেলে টাঙায় চড়ে পুরোনো স্মৃতি খানিক ঘেঁটে নেয়। কেবল একদিনের মুর্শিদাবাদ ভ্রমণ, টাঙা ছাড়া গতি নেই! টাঙা অর্থাৎ ঘোড়ার গাড়ি। কেবল মুর্শিদাবাদ শহরেই আজও তার পুরাতনী রমরমা। অথচ আমাদের ঘরের খোকারা একদিন এই ঘোড়ার খুরে খুরে রাঙা ধুলোয় মেঘ উড়িয়ে আনত। মা-কে নিয়ে দূর দেশে পাড়ি দিয়ে ‘বীরপুরুষ’ হয়ে উঠত।
না, শুধু গাড়ি দিয়েই চেনা যায় না কলকাতার ঘোড়াদের। কলকাতার ঘোড়ার প্রসঙ্গে আরও যে নামটা মনে আসে তা হল ‘কলকাতা রেসকোর্স’। কবি অমিতাভ দাশগুপ্ত তাঁর ‘শেষ ঘোড়া’ কবিতায় যে ঘোড়ার ওপর জীবনের সর্বস্ব বাজি রাখার কথা বলেছেন, কলকাতার রেসের মাঠ যেন তারই বাস্তব ছবি। ১৮২০ সালে কলকাতার রেসকোর্স নির্মিত হয়। ১৮৪৭ সালে ‘কলকাতা টার্ফ ক্লাব’ প্রতিষ্ঠিত হয়, যা আজও রেসকোর্স এবং তার কাজকর্ম পরিচালনা করে।
কথিত আছে, রেসের মাঠ যতটা দেয় তার থেকে অনেক বেশি উসুল করে নেয়। তবুও যেন এ এক আদিম নেশা, জীবনের বাজি রাখার এই খেলায় হার জিতের হিসেব কষে একটা অন্য জগতের খোঁজ পায় শহর কলকাতা। আর রেসের ময়দানে রোজ নায়ক হয়ে ওঠে কোনো না কোনো ঘোড়ারাই।
ছবিঃ অর্ণব মিত্র
আবার বাংলায় প্রতিষ্ঠিত প্রথম স্বাধীন বাংলা রক ব্যান্ডের নামেও রাজত্ব করছে এই ঘোড়ারাই। সত্তরের দশকের সেই ‘মহীনের ঘোড়াগুলি’ আজও ছুটে চলেছে নিজের ছন্দে কলকাতার পথে। আজও তারা স্বপ্ন হয়ে বাঙালিকে যখন-তখন আঁকড়ে ধরছে।
তবে কলকাতার যাত্রাপথের এই বন্ধুরা আজ কেমন আছে, সে খবর ঘাঁটলে চোখের কোণে খানিক মেঘ জমে। জানা যায়, করোনা আবহে আর্থিক সংকটে কলকাতার ঘোড়ারাও জৌলুস হারিয়েছে। খাদ্য আর পরিচর্যার অভাবে তাদের চেহারায় ছাপ ফেলেছে বিষণ্ণতা। তবুও সময়ের সঙ্গে যুদ্ধ করে পায়ে পা ফেলে খানিকটা পথ ছুটে নিচ্ছে তারাও, সম্বল বলতে হার জিরজিরে শরীর আর স্মৃতির পিছুটান।
“প্রস্তরযুগের সব ঘোড়া যেন— এখনও ঘাসের লোভে চরে
পৃথিবীর কিমাকার ডাইনামোর ’পরে।”
হ্যাঁ আজও আছে তারা, তাই আজও ছুটির দিনে চোখে পড়ে পরিস্থিতির সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে টিকে যাওয়া কিছু ঘোড়সওয়ার। যারা সদর্পে বলতে পারে, “আমরা যাইনি ম’রে আজো”। ময়দান চত্বরে ফিরে তাকালে চেনা কিছু ঘোড়ার গাড়ির অপেক্ষা আমাদের পুরোনো স্মৃতি উস্কে দেয়। আর বাঙালিও চায় ঘোড়ার পিঠে চড়ে নস্টালজিয়ায় ফিরে যেতে, যেখানে এখনও “এই সব ঘোড়াদের নিওলিথ-স্তব্ধতার জ্যোৎস্নাকে ছুঁয়ে” কেবল নতুন দৃশ্যের জন্ম হয়।
