হেমন্ত সেনগুপ্ত : স্বাধীন ভারতে তিনিই গান্ধিজির প্রথম বাঙালি দেহরক্ষী

হেমন্তবাবুর পুত্র চণ্ডী সেনগুপ্ত তখন বালক, তাঁর চোখে কেমন মানুষ ছিলেন গান্ধিজি?

৯৪৮-এর ৩০ জানুয়ারি। হাজরার কালিকা হলে পুলিশের সংবর্ধনা অনুষ্ঠান। কলকাতা পুলিশের অন্যতম কর্তা তাঁর সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন ছেলেকে। পুলিশকর্তার কিশোর ছেলেটি খেয়াল করেছিল, সময় পার হয়ে গেলেও পর্দা উঠছিল না। হঠাৎই একজন এসে ঘোষণা করলেন, জাতির জনক মহাত্মা গান্ধি আর নেই। পুলিশকর্তা সঙ্গে সঙ্গে ছুটে গেলেন কাছের ভবানীপুর থানায়। মহাত্মার হত্যার খবরে শহরে দাঙ্গা লেগে যেতে পারে, এই আশঙ্কায় ফোন ঘুরিয়ে তিনি বিভিন্ন জায়গায় পুলিশ মোতায়েনের কথা বলেছিলেন। ব্যক্তিগত আবেগ ঝেড়ে ফেলে তিনি ছুটেছিলেন দায়িত্ব সামলাতে। এ সব মনে রেখে দিয়েছিলেন সেদিনের সেই কিশোর চণ্ডী সেনগুপ্ত।

১৯৪৭ সালে আজকের বেলেঘাটা গান্ধি ভবনে থাকাকালীন গান্ধিজিকে সামনে থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছিলেন চণ্ডী সেনগুপ্ত। তাই, পরের বছর ৩০ জানুয়ারির ভয়ানক দিনেও কিশোরের মনে সেদিন আরও একবার ভেসে উঠেছিল বেলেঘাটার গান্ধি ভবনের বাপুর কথা। তাঁর বাবা যশোরের হেমন্ত সেনগুপ্ত কলকাতা পুলিশের অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার ছিলেন। সর্বক্ষণ বাপুর পাশে পাশে থাকতেন। স্বাধীন ভারতে তিনিই গান্ধিজির প্রথম বাঙালি দেহরক্ষী। সেই সুবাদে ১২ বছরের বালক চণ্ডীরও গান্ধি ক্যাম্পে যাতায়াত ছিল। ফেসবুক, টুইটারের যুগ ছিল না সেটা। তাই সবটাই ব্যক্তিগত পরিসরেই রয়ে গিয়েছিল। ১৩ আগস্ট থেকে ৭ সেপ্টেম্বর — এই ২৫ দিন কলকাতায় গান্ধিজির নিরাপত্তার ভার ছিল বালক চণ্ডীর বাবার হাতে। হায়দারি মঞ্জিল থেকে প্রার্থনাসভা, প্রাক্-স্বাধীন ও স্বাধীনত্তোর ভারতে হেমন্ত ছিলেন ক্যাম্পের ভারপ্রাপ্ত অফিসার এবং বাপুর ছায়াসঙ্গী।

২৫ দিন কলকাতায় গান্ধিজির নিরাপত্তার ভার ছিল চণ্ডীর বাবা হেমন্ত সেনগুপ্তের হাতে

১৯৪৬-এর দাঙ্গার স্মৃতি তখনও শুকোয়নি। পরের বছরই ফের কলকাতায় সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা। দিনটা ছিল ১৩ আগস্ট, ১৯৪৭। সেদিনই বেলেঘাটার হায়দারি মঞ্জিলে (আজকের গান্ধি ভবন) এসেছিলেন বাপু। গান্ধিজির আগমনের কারণও ছিল নেহাতই রাজনৈতিক। তাই দেহরক্ষী ছিল সর্বাগ্রে প্রয়োজন। হেমন্ত সেনগুপ্তের জিপ থাকত গান্ধিজির গাড়ির সামনে। সবার আগে চলত সেই ক্যালকাটা পুলিশের জিপ। নম্বর ছিল সিপি ৩৭। হুডখোলা জিপে তিনি দাঁড়িয়ে থাকতেন। বাপুকে দেখতে রাস্তার দুপাশে জনতার ঢল। তারা যাতে গাড়ির সামনে চলে না আসে, তা দেখতেন হেমন্তবাবু। সমানে হাত নেড়ে চলতেন হুডখোলা জিপে দাঁড়িয়ে। গম্ভীর কণ্ঠ ছিল তাঁর। বারবার তিনি হাঁক দিয়ে জনতাকে সরে যেতে বলতেন।

বারবার হাঁক দিয়ে জনতাকে সরে যেতে বলতেন হেমন্ত

হায়দারি মঞ্জিলেই গান্ধিজির কাছাকাছি মেঝেয় পাতা চাটাইয়ে বসে থাকতেন বালক চণ্ডী। একটা ঘরেই যাবতীয় কর্মকাণ্ড চলত। ফলে সবাইকে জায়গা দেওয়া যেত না। খেয়াল করলে দেখা যেত, জানলায় মাথা গুঁজে দাঁড়িয়ে থাকত কত মানুষ। আর বাপু খাটো ধুতি পরে বসতেন। ঘরের দেওয়ালে পিঠ দিয়ে। তাঁকে ঘিরে পারিষদরা অর্ধেক চাঁদের মতো বৃত্ত করে বসতেন। মানু ও আভা গান্ধি থাকতেন সর্বক্ষণ। থাকতেন বাপুর সচিব নির্মল বসু। রোজ তাঁর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতেন ডাক্তার মেটা। এসব হইচইয়ের মধ্যেই সামনের সারিতে এসে বসতেন তিনি।

গান্ধিজির কাছাকাছি মেঝেয় পাতা চাটাইয়ে বসে থাকতেন বালক চণ্ডী (ছবিতে আজকের চণ্ডী সেনগুপ্ত)

পাঠকের মনে নিশ্চয়ই জানতে ইচ্ছে হয়, গান্ধিজি কি সামনের সারির বালকের সঙ্গে কথা বলতেন? না, বাপু নিজে কখনও বলেননি চণ্ডী সেনগুপ্তের সঙ্গে। বারবার তাঁর দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসতেন। বালক চণ্ডী প্রার্থনাসভায় গিয়ে ভাঙা ক্যামেরা দিয়ে তাঁর ছবি তুলতেন। বাপু কথা না বললেও নির্মল বসু তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন টুকটাক, কতজন আদর করেছেন!

ব্যক্তিগত জীবনে কেমন ছিলেন বাপু? বালকের চোখেও ধরা পড়েছিল যে খুবই নিয়মানুবর্তী ছিলেন জননায়ক মহাত্মা। শেষ রাতে তিনি বিছানা ছাড়তেন। সূর্যের আলো ফোটার আগে প্রার্থনা সেরে নিতেন বাড়ির ভেতরেই। তারপর বাইরে বেরিয়ে খানিকটা পায়চারি করে কিছুক্ষণ ঘুমোতেন। উঠে ম্যাসাজ-স্নান ও প্রাতঃরাশ। এরপর হায়দারি মঞ্জিলের বাঁদিকের ঘরটায় গিয়ে বসতেন। ওখানেই হরিজন পত্রিকার কাজ হত।

আলোচনার ফাঁকে ফাঁকে গান্ধিজি নিজের পত্রিকার কাজ সেরে নিতেন। তিনি বলে যেতেন, আর পার্শ্বচররা নোট নিতেন। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভিড় বাড়ত। জনতার মধ্যে ছিল একদল অটোগ্রাফ শিকারী। হরিজন তহবিলে পাঁচ টাকা দিলে গান্ধিজির সই মিলত। সাদা কাগজে মহাত্মা শুধু লিখতেন ‘চিরঞ্জীব’, তার নিচে অনুরাগীর নাম। এমন অটোগ্রাফ চণ্ডীবাবুকেও দিয়েছেন বাপু। তাঁর জন্য অনেকেই ফল ও মিষ্টি নিয়ে আসতেন। রোজই সেসব ফল আর মিষ্টির ভাগ পেতেন চণ্ডী।

হায়দারি মঞ্জিল, বেলেঘাটা-কলকাতা

রোজ গান্ধিজি বিভিন্ন স্থানে প্রার্থনা সভা করতে যেতেন। সুরাবর্দি কয়েকদিন নিজেই গাড়ি চালিয়ে তাঁকে প্রার্থনাসভায় নিয়ে গিয়েছেন। শহরের ধনী ব্যক্তিরাও গাড়ি নিয়ে আসতেন বাপুর জন্য। স্থানীয় কোনও মাঠে বসত সেই সভা। প্রার্থনা সভা হয়েছে ময়দানের মনুমেন্টের নিচেও। কাছেই মহামেডান স্পোর্টিংয়ের মাঠ। প্রবল বৃষ্টিতে থকথকে কাদার মধ্যে দাঁড়িয়ে কত মানু্ষ বাপুর কথা শুনেছে। যূথিকা রায়, বিজনবালার মতো কণ্ঠশিল্পীরাও থাকতেন সভায়।

১৯৪৭ সালে স্টেটসম্যানে প্রকাশিত ছবি

যুগ বদলে গিয়েছে অনেক। সেলফি, গুগল আর সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে কিছুই যেন অধরা নয়। কয়েক বছর আগে বাবার কথা প্রসঙ্গে চণ্ডী সেনগুপ্ত বলেছিলেন গান্ধিজির কথা। কবেকার সেই স্মৃতি বুকে করে রেখে দিয়েছিলেন। রয়ে গিয়েছিল কত শত শত স্মৃতির কোলাজ। সেও অনেক দিন হয়ে গেল। গত নভেম্বরে চুরাশি বছর বয়সে চণ্ডীবাবুও চলে গিয়েছেন না ফেরার দেশে। এ বছরের ২ অক্টোবর সারা দেশ জুড়ে যখন গান্ধি জয়ন্তী পালিত হচ্ছে, সোশ্যাল মিডিয়া জুড়ে যখন গান্ধিজির ছবি আর জন্মদিন লেখা ভেসে উঠছে, তখন আর ১০০ নং বালিগঞ্জ গার্ডেনের বাড়িতে বসে স্মৃতিতে ডুব দিয়ে হারিয়ে যাবেন না চণ্ডী সেনগুপ্ত। হারিয়ে যাবে না তাঁর বলা কথাগুলোও। সব ইতিহাস হয়ে গিয়েছে। সেখানে থাকবেন তিনিও। ভালো থাকুন চণ্ডী সেনগুপ্ত।

ছবিঃ লেখক

Developed by DXDasia