
নকশাল আন্দোলন নিয়ে লিখছেন সৃজন সেন, আজ ৫৪তম পর্ব
আমি প্রশ্ন তুললাম, সে জনগণের বিচারে চরম শাস্তি পাবার যোগ্য কিনা তা নির্ধারণ করার দায়িত্ব আমাদের কে দিল? আমরা গণবিচারের আয়োজন করে জনগণের রায় নিয়ে কাজটা করলে ভালো হয় না? একজন ছাড়া কেউ আমাকে সমর্থন করল না। আমি প্রস্তাব দিলাম, “ঠিক আছে, আমরা তাকে ধরে নিয়ে এসে গ্রামের একটি তেরাস্তার মোড়ে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে গলায় তার অপরাধের একটা তালিকা ঝুলিয়ে দিয়ে জনগণের কাছে আহ্বান রাখব তাঁরা যাতে উপযুক্ত শাস্তি দেন”। কিন্তু এরকম একটা অনুত্তেজক কাজ কমরেডরা করতে চাইল না। সুতরাং, অধিকাংশের মত অনুযায়ী চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত হল। শহর থেকে গ্রামে আসা সেরা কমরেড হিসেবে আমার হাতে একটা পেনসিল গান ও কয়েকটা ‘দানা’ তুলে দেওয়া হল উদ্দেশ্য সাধনের জন্য। আমরা বোমা তৈরি করতে শিখে গেলাম। কিছু গ্রাম্য হাতিয়ারও সংগ্রহ করা গেল। তখন ঘন বর্ষা কাল। চারদিকে জল। ‘তদন্ত ও অনুসন্ধান’ করে জানা গেল, ওই চৌকিদার আর তার ছেলে একটা ভাঙাচোরা মাটির বাড়িতে থাকে। ছেলে ও বাপ দু’জনেই রাতে দাওয়ায় শুয়ে ঘুমোয়। আমরা ভোররাতে তার বাড়িতে হানা দিয়ে আমাদের বিপ্লবী কর্তব্যসাধন সম্পূর্ণ করব।
সেই রাত্রিতে খগেন ডাক্তার ছিল আমাদের নেতৃত্বে। সঙ্গে বোমা, ছোরা, দা ও সেই পেনসিল গানটি নিয়ে আমরা ওই ভাঙা বেড়ার দরজা উল্টে ফেলে অন্ধকারে যাকে দেখতে পেলাম, তার পিঠে একটা ছোরা বসিয়ে দিতে গিয়ে ব্যর্থ হলাম। তার পিঠটায় একটা আঁচড় পড়ল মাত্র। কিন্তু তার চিৎকারে চারদিকের লোক জেগে ওঠায় আমরা তাদের দিকে দমাদম কয়েকটা বোমা ছুঁড়ে পালালাম। ‘খতম’ সম্পূর্ণ করার পর চারদিকে ছড়াব বলে যে লিফলেট সঙ্গে এনেছিলাম, তা আর ছড়ানো হল না। কার্যত আমরা পালিয়ে বাঁচলাম।
পরের শুক্রবার হাটের দিন আমরা হাটে যাওয়ার পথের ধারে তার প্রতীক্ষায় ওত পেতে রইলাম। কিন্তু, সেদিন হাটে ও আর এল না। ব্যর্থতার জ্বালায় একজন কমরেড একটা বড়ো মেঠো ইঁদুরের দেহে ছোরা বসিয়ে দিল। আমি একটা কলাগাছের গায়ে আমার পেনসিল গানটি ঠেকিয়ে ট্রিগার টিপলাম। কলাগাছটি তাতে ফুটোও হল না। মন খারাপ অবস্থায় আমরা যে যার ডেরায় ফিরে গেলাম। সে রাতে ওস্তাদদের ঘরে শুয়ে একটি পুরোনো ‘দক্ষিণ দেশ’ পড়তে পড়তে ঘুমোতে চেষ্টা করলাম। পত্রিকার হেডিংটা ছিল প্রায় এই রকম, “মগরাহাটের দক্ষিণ অঞ্চলে সশস্ত্র কৃষক ও কৃষক রমণীর মিছিল”। ভাবলাম আগামী কাল ওস্তাদকে নিয়ে ওই অঞ্চলে একবার ঘুরে আসব।
ছবি-প্রতীকী
(চলবে)
