গ্রামের এক চৌকিদারকে ‘খতম’ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হল সভায়

নকশাল আন্দোলন নিয়ে লিখছেন সৃজন সেন, আজ ৫৩তম পর্ব

যাহোক, আবার গ্রামের কথায় ফিরে আসা যাক। আমাদের নেতৃত্ব অভিযোগ করলেন, চারু মজুমদারের নেতৃত্বে পার্টি যেখানে সারা ভারতে অতিদ্রুত বিস্তার ঘটাতে পারছে, সেখানে আমাদের রাজনীতি তুলনাগতভাবে সঠিক হলেও আমরা তা করতে ব্যর্থ। আমার জবাব ছিল, ওরা সংগঠনের বিস্তার বলতে বোঝাচ্ছে ‘অ্যাকশান’ বা ব্যক্তিহত্যার রাজনীতিকে কার্যকর করা। যেখানে তা করতে পারছে, সেখানেই তাদের সংগঠন সক্রিয় বলে প্রচার করছে। কিন্তু আমরা তো ওইভাবে রাজনীতি করতে চাই না। দু’একদিনের পরিকল্পনায় একটা ‘অ্যাকশান’ বা তথাকথিত গণশত্রুকে হত্যা কার্যকর করা সম্ভব। কিন্তু আমাদের কাজের ধরন সম্পূর্ণ আলাদা বলেই আমরা মনে করে আসছি।  

গ্রামাঞ্চলে আমার প্রথম কাজ হল কৃষকদের সঙ্গে একাত্ম হওয়া, তাঁদের সমস্যাকে বোঝা, সেই সমস্যার সমাধানে কৃষক কমিটি গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে তাঁদের মধ্যে সম্যক বোধ গড়ে তোলা। সেই সংগঠনকে তাঁরা যাতে নিজেদের সংগঠন বলে মনে করেন ও কৃষিক্ষেত্রে তাঁদের এই মুহূর্তের সমস্যাকে চিহ্নিত করতে পারেন, সেই সমস্যার সমাধানে কৃষক কমিটির পতাকা নিয়ে নিজেদের শক্তি ও সংগঠনকে ক্রমপ্রসারিত করা। এই কাজ ‘ধর তক্তা মার পেরেক’-এর মতো সহজসাধ্য নয়। বরং দীর্ঘ সময়সাপেক্ষ বা protracted। আমি এখানে এসেছি মাত্র সাত-আট মাস হল। এই সময়ের মধ্যে সিপিআই(এমএল)-এর মতো সাড়া জাগানো কাজের মাধ্যমে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাওয়াটা অবিমৃষ্যকারিতা হয়ে যাবে বলে আমার ধারণা। 

উচ্চতর কমিটির প্রতিনিধি ঘোষণা করে গেলেন – সংগঠনের বিস্তৃতির জন্য প্রয়োজনে শ্রেণিশত্রু নিধনের কর্তব্যসাধনে আমাদের অগ্রসর হতে হবে। সিপিআই(এমএল) বা চারু মজুমদারের রাজনৈতিক কার্যকলাপের যা কিছু ভালো দিক, তা আমাদের গ্রহণ করতে দোষ কোথায়?

সুতরাং অবিলম্বে আমরা ‘দোষ’ কাটানোর কাজে নেমে পড়লাম। ‘অ্যাকশান’-এর মাধ্যমে আমাদের সংগঠনের বিস্তৃতির জন্য নেমে পড়লাম ‘গণশত্রু’-র খোঁজে। অবশেষে একজনের খোঁজ পাওয়া গেল। সে একজন গ্রাম্য চৌকিদার। তার দোষ হল, সে চোরকে যেমন চুরি করতে বলে চোরের থেকে কামায়, তেমনই গৃহস্থকে চোর ধরতে সহায়তা করে দু’পয়সা কামিয়ে নেয়। লোকে তাকে খুব একটা পছন্দ করে না। প্রতিটি গ্রাম্য হাটের দিন সে হাটে ঘুরে বেড়ায়। থানার পেটি কেসে জড়িয়ে যারা লুকিয়ে-চুরিয়ে থাকে, হাটে তাদের খুঁজে দেওয়ার জন্য পুলিশের হয়ে ফাঁদ পাতে সে। এরকম একটা ‘বদ’ লোককে আমাদের ‘খতম’ তালিকায় প্রথম শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করার সিদ্ধান্ত নিলাম এক সভায়, সাত-আট জন মিলে। 

(চলবে) 
ছবি – প্রতীকী 
 

Developed by DXDasia