ভোটে জেতার জন্য মৃতদেহের সঙ্গে ছবি তুলতে হবে!

জনতার আছে সহস্র চক্ষু

এ অবস্থায় আমার আর পালাবার কোনো পথ নেই। মৃতদেহের নাম রেজিস্ট্রি করা থেকে মড়া পোড়াবার টাকা জমা দেওয়া ও কাঠ এনে জমা করা – সব কাজই প্রায় আমাকেই করতে হল। সামনে কোনো ইলেকশন নেই, যার জন্য আমাকে এদের ভোটের জন্য সব কিছু মুখ বুজে সহ্য করে যেতে হবে। কিন্তু এ অবস্থায় আমার চলে যাবারও কোনো উপায় নেই। গোবিন্দ্‌, গনেশরা শ্রমিক। কাঁধে করে মড়া ও কাঠ বয়ে আনতে ওদের কষ্ট না হলেও আমার কাঁধে ফোস্কা পড়ার মতো অবস্থা! এবং এর মধ্যে আবার এক নতুন ঝামেলা পাকাল শববাহী এক মদ্যপ। হঠাৎ তার চোখে পড়ল শ্মশানে মৃতদেহের ছবি তোলার কারিগর মদনদার দোকানের সাইনবোর্ড। যাতে লেখা আছে, “এখানে দিবারাত্র ফটো তোলা হয়”। একটা ছবিও আছে সেই সাইনবোর্ডে – মাথা ঢেকে ঢাউস একটা ক্যামেরায় একজন ছবি তুলছে। সেই ছবি দেখে ওই মদ্যপ হঠাৎ করে উঠে দাঁড়িয়ে চিৎকার করতে শুরু করল, “বিশ্বনাথ কো একটা পিকচার খিচনা পরে গা”। তার চিৎকারে অন্য শয্যাশায়ী মাতালরাও উঠে বসে চেঁচিয়ে উঠল, “বিশ্বনাথ কো পিকচার খিচনা হোগা”। আমি বোঝাতে চেষ্টা করলাম, ঘরে নওজোয়ান বৌ আছে, সেখানে স্বামীর মড়ার ছবি ঘরে থাকাটি উচিত নয়। কিন্তু কে শোনে কার কথা! ছবি তোলার দাবিদাররা হল্লা তুলল, ছবি না তুলে মড়া পোড়ানো যাবে না।

অগত্যা আমাকে সেই মদনদার কাছে গিয়ে হা-পিত্যেশ করতে হল। মদনদা সুযোগ বুঝে আমার কাছ থেকে পঞ্চাশ টাকা খিচে নিল।

বিশ্বনাথের মরদেহ ঘিরে গোবিন্দ্‌, গণেশ আর সব মাতালরা লাইন করে দাঁড়াল। মদনদা তাঁর মুখ ঢাকা ক্যামেরা নিয়ে কতক্ষণ রংচং দেখাল। তারপর বলে উঠল, “সব কই রেডি?”

আমি মদনদার পিছে দাঁড়িয়ে ছিলাম। হঠাৎ এক মাতালের নজর পড়ল আমার দিকে। সে চিৎকার করে বলল, “কান্তিদাকে ছোড় কর কোই পিকচার নেহি চলেগা!”

আমি কোনো মড়ার সঙ্গে ছবি তুলি না। আমাদের বংশে এ ধরনের ছবি তোলা নিষিদ্ধ – এসব কথা বলেও আমি ওদের শান্ত করতে পারলাম না। মাতালটা হির হির করে আমায় বিশ্বনাথের মরদেহের মাথার কাছে বসিয়ে কানে কানে বলল, “আরে কান্তি বাবু, আ যাইয়ে, আ যাইয়ে! সামনা চুনাও সে এ পিকচার বহুত কাম দেগা!”

আমারও যেন মনে হল, মাতালটা তো সত্যি কথাই বলেছে। আমি হাত দিয়ে মাথার চুলগুলো উড়ুউড়ু আর দুঃখু দুঃখু ভাব করে বিশ্বনাথের মড়া ছুঁয়ে মদনদার দিকে তাকালাম। মদনদা বলল, “রেডি?”

আমি বললাল, “রেডি”।

সেদিন শ্মশানভূমিতে দাঁড়িয়ে আমি বুঝলাম – জনতার আছে সহস্র চক্ষু, তাদের চোখকে কিছুতেই ফাঁকি দেওয়া যায় না।

(চলবে)
 

Developed by DXDasia