
বিদ্রোহীদের নানা গোষ্ঠী তখন গোপনে কার্যকলাপ চালিয়ে যাচ্ছিল
নকশালবাড়ির ঘটনাকে কেন্দ্র করে সারা ভারত জুড়ে সিপিএম পার্টির মধ্যে ক্ষোভ-বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়তে লাগল। সিপিএম-এর পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটির নেতৃত্ব ঘোষণা করল, পার্টি কর্মসূচির বিরোধিতা করে কিছু সংখ্যক পার্টি সদস্য উগ্র রাজনৈতিক ঝোঁক প্রদর্শন করে হটকারী লাইন ও কার্যকলাপকে আঁকড়ে ধরে পার্টির মধ্যে পার্টি-বিরোধী নানা গোষ্ঠীর সৃষ্টি করে চলেছে। সুতরাং পার্টি সিদ্ধান্ত নিল, ওই সব পার্টি-বিরোধী সদস্যদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি হয়ে উঠেছে। তাঁরা তাই দফায় দফায় ওই ‘হঠকারী’ সদস্যদের পার্টি থেকে বহিষ্কার করা শুরু করল।
পার্টি জনগণকে বোঝাতে চাইল, যুক্তফ্রন্ট শাসন কায়েম হবার পর রাজ্যের কৃষকদের মধ্যে স্বভাবতই উৎসাহ বেড়ে গেছে। নানা দিকে তাদের ক্ষোভ-বিক্ষোভ প্রবল বেগ নিয়ে ফেটে পড়ছে। পার্টি মনে করে, নকশালবাড়ির ঘটনার পেছনে রয়েছে সেই কৃষকদের ক্ষোভ-বিক্ষোভ ও বেদনার কাহিনি। নকশালবাড়ির কৃষক আন্দোলন একদিকে তাই পার্টির পক্ষে গৌরবের, অন্যদিকে দুঃখেরও। কেননা, সেখানকার হঠকারী নেতৃত্ব ওই আন্দোলনকে ভুল পথে, আত্মহত্যার পথে ঠেলে দিচ্ছে।
দফায় দফায় যারা রাজ্য পার্টির নেতৃত্ব থেকে বহিষ্কৃত হলেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন চারু মজুমদার। পার্টির কর্মসূচির বিরোধী তাঁর চিন্তাভাবনা রাজ্য নেতৃত্বের অজানা ছিল না। কিন্তু যতদিন সেটা তাত্ত্বিক চিন্তার স্তরে সীমাবদ্ধ ছিল, পার্টি সে সম্পর্কে বিশেষ লাগাবার প্রয়োজন বোধ করেনি। এবার নকশালবাড়ির ঘটনাবলীর পেছনে তাঁর সক্রিয়তাকে তাঁরা বিপদজনক লাইন বলে প্রকাশ্যে ঘোষণা করলেন। অচিরেই আরও অনেকের সঙ্গে তাই চারু মজুমদারকে পার্টি থেকে বহিষ্কার করলেন এবং চারু মজুমদার হয়ে দাঁড়ালেন বিদ্রোহী-বিপ্লবী অংশের প্রধান নেতৃত্ব। এবং তাঁরই সাথে আমরা পরিচিত হয়ে উঠলাম কানু সান্যাল, জঙ্গল সাঁওতাল ইত্যাদি নামের সঙ্গে। এঁরা প্রায় প্রত্যেকেই ছিল আমাদের কাছে তখন ‘বিপ্লবী Hero’!
দার্জিলিং শিলিগুড়ি মহকুমা কৃষক সমিতির পক্ষে নকশালবাড়ির ঘটনাকে প্রচারিত লিফলেট আমাদের কাছে তখন মূল্যবান নথি। সমীরদারা সেই লিফলেট ছাপিয়ে দিলেন ‘নন্দন’ পত্রিকায়। অচিরেই ‘নন্দন’ পত্রিকা পার্টির নেতৃত্বের বিষ নজরে পড়ে গেল। মুজফফর আহমেদ ‘নন্দন’-এর সমালোচনা করে এক চিঠি ছাপলেন। ‘নন্দন’ ইতিমধ্যে কলেজ স্কোয়ারের দক্ষিণ দিকে ন্যাশানাল বুক এজেন্সি, যা পার্টির প্রকাশনা সংস্থা, তার ওপর তলায়, পার্টি নেতাদের কব্জার মধ্যে ঠাঁই পেয়েছিল। স্বাভাবিকভাবে ‘নন্দন’কে পার্টি সরাসরি দখলে নিয়ে নিল কায়দা করে।
পার্টির বিদ্রোহীদের মধ্যেকার নানা গোষ্ঠী তখন গোপনে কাজ করছিল। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল ‘কমিউন’, ‘চিন্তা’ (পরে যারা ‘দক্ষিণদেশ’ পত্রিকা প্রকাশের মধ্য দিয়ে ‘দক্ষিণদেশ গোষ্ঠী’ নামে পরিচিতি লাভ করেছিল), ‘সূর্য সেন গোষ্ঠী’, ‘অন্তঃপার্টি সংশোধনবাদবিরোধী কমিটি’ ইত্যাদি। সমীরদার গোপন সম্পর্ক ছিল ‘চিন্তা’ ও ‘দক্ষিণদেশ’-এর সঙ্গে। স্বাভাবিকভাবে আমিও অচিরেই এই ধারার সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেলাম আমার সহযোগী বন্ধুদের প্রায় সকলকে নিয়ে।
(চলবে)
