রাইফেলের গুলি পিঠে বাঁধা বাচ্চাটি-সহ এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিল ধলেশ্বরীর বুক

পার্টির সর্বত্র বিদ্রোহ মাথাচাড়া দিয়ে উঠল

কিছুদিন পরেই খবর এল, উত্তরবঙ্গের নকশালবাড়ির কাছেই হাতিঘিষার বড়জোতে পুলিশ ঢুকেছে! আমাদের খটকা লাগল কেমন! আমাদের সরকার ও নেতারা ঘোষণা করেছেন – গণআন্দোলন দমনে পুলিশ পাঠানো হবে না, অথচ নকশালবাড়ির ওই এলাকায় পুলিশ পাঠানো হল কৃষকদের দমন করতে! কিন্তু কৃষকরাই বা চুপচাপ মেনে নেবে কেন? জোতদারের স্বার্থে পুলিশ ঢুকেছে গ্রামে! এত বড়ো আস্পর্ধা তাদের? এটা কি কংগ্রেসি রাজত্ব পেয়েছে নাকি! খবর বাতাসের বেগে ছড়িয়ে পড়ল। হাজার হাজার কৃষক পৌঁছে গেল হাতিঘিষায়। প্রত্যেকের হাতে হয় লাঠি, নয় তীর ধনুক! কাছেই ছিল টুকুরিয়া চা বাগান। চা বাগানের শ্রমিকরাও খবর পেয়ে লাঠি হাতে কৃষকদের পাশে এসে দাঁড়াল। হাজারো সশস্ত্র শ্রমিক ও চাষিদের ঘেরাওয়ের মধ্যে পড়ে বন্দুক-তন্দুক ফেলে পুলিশদের অবস্থা তখন “ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি”। কিন্তু সোনাম ওয়াংদি নামে একজন পুলিশ ইনস্পেকটরের বুক এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিল একটি তীর। তীরবিদ্ধ হলেন আরও একজন অফিসার। বিগলকে মারার বদলা নেওয়া গেল এভাবে। 

পরের দিন খবরের কাগজে সংবাদটা পড়ে আমরা আহ্লাদে একেবারে আটখানা। আমাদের মনে হতে লাগল, বিপ্লবী লড়াই শুরু হয়ে গেছে, এ লড়াই রোখে সাধ্য কার?

পরদিন খবরের কাগজে প্রকাশিত হল, নকশালবাড়িতে সমগ্র জনতার আক্রমণে ৪ জন পুলিশ অফিসার আহত। শাসক-আমলা-পুলিশরা প্রমাদ গুনল। এভাবে জনতার হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দিলে অবস্থা নিয়ন্ত্রণে রাখা অসম্ভব। গণআন্দোলনে পুলিশ কখনও যাবে না, ওটা মন ভোলানো কথা। পুলিশ মহলে তীব্র ক্ষোভ ও উত্তেজনা সৃষ্টি হল। অতএব পুলিশ সুপারিন্টেন্ডেন্ট, ডেপুটি কমিশনার, উত্তরাঞ্চলের ডিআইজি এক ঝাঁক পুলিশ নিয়ে ঘটনাস্থলে ছুটলেন। গ্রামে গ্রামে পুলিশ ক্যাম্প বসল। 

সেদিন ছিল ২৫ মে, ১৯৬৭। প্রসাদ জোতে মহিলাদের একটা সমাবেশ। আন্দোলনের কথা বলার জন্যই সে সমাবেশের আয়োজন। পুলিশ হানা দিল সেখানে। হঠাৎই পুলিশ গুলি চালাতে শুরু করল। নিহত হলেন ১১ জন, তার মধ্যে ৭ জনই কৃষক রমণী। ২টি শিশু। সমাবেশের নেতা ছিলেন প্রহ্লাদ সিং। । তাঁর স্ত্রী ধলেশ্বরী দেবীও সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন। তাঁর পিঠে বাঁধা ছিল তাঁর কচি শিশু। পুলিশের রাইফেলের গুলি ধলেশ্বরীর বুক এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিল পিঠে বাঁধা বাচ্চাটি সহ। নকশালবাড়ি এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হল প্রায় ১০০ জনকে। 

এই সংবাদে সিপিএম পার্টির ব্যাপক অংশের মধ্যে প্রবল বিক্ষোভের সৃষ্টি করল। সংসদীয় ব্যবস্থায় মোহগ্রস্ত পার্টি নেতৃত্ব শাসক শ্রেণির অনুমোদিত তথা সাংবিধানিক পরিসীমার বাইরে যাওয়ার সাহস হারিয়ে বসেছিল। শ্রেণি সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য সংসদীয় লড়াইকে তারা ব্যবহার করবে – মুখে একথা বললেও কাজের বেলায় সাম্রাজ্যবাদের পা-চাটা বৃহৎ পুঁজি ও বৃহৎ জমিদারদের শাসনের বিরুদ্ধে বিকল্প গণশাসন প্রতিষ্ঠায় তারা ভীত ছিল। সংস্কারপন্থাই ছিল এদের আশ্রয়। স্বাভাবিকভাবে ব্যাপক বামপন্থী মানুষ, শ্রমিক-কৃষক-নিপীড়িত জনেদের মধ্যে বিক্ষোভ ধূমায়িত হয়ে উঠছিল। পার্টির মধ্যে কমরেডদের যে অংশ পার্টির সরকারে অংশগ্রহনের বিরোধী ছিলেন, গোপনে গোপনে যারা কৃষিবিপ্লবের বীজ বুনে চলছিলেন, তাঁরা এবার সামনে এগিয়ে এলেন। পার্টির সর্বত্র বিদ্রোহ মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। আমাদের পার্টি নেতৃত্ব তাদের ‘উগ্রপন্থী’ হটকারী বলে চিহ্নিত করে পার্টি থেকে বহিষ্কার করলেন। চারু মজুমদার, জঙ্গল সাঁওতাল, কানু সান্যাল, ইত্যাদিদের আমরা নতুন নেতা হিসেবে চিনলাম। পার্টির কৃষক হত্যার অপরাধে সামিল হবার অপরাধে আমিও ‘হটকারী’দের দলে অন্তর্ভুক্ত হবার জন্য পার্টি থেকে বহিষ্কৃত হলাম। আমাদের পরিচিতি হল ‘কমিউনিস্টদের বিপ্লবী অংশ’ বলে। 

(চলবে)

Developed by DXDasia