
বিদ্রোহ, বিপ্লবের নতুন নাম হয়ে দাঁড়াল ‘নকশালবাড়ি’
‘নন্দন’ ছাড়াও অন্যান্য রাজনৈতিক পুস্তক-পুস্তিকা সমীরদার মাধ্যমে আমার হাতে এসে পৌঁছতে লাগল। তার মধ্যে ‘চিন্তা’ নামক একটি ছোট্ট পত্রিকা হয়ে উঠেছিল আমাদের ‘গোপন’ চিন্তার আশ্রয়। যদিও আমরা সিপিআই(এম)-এর সঙ্গে আছি, অনেকেই সেই পার্টির সভ্যও হয়েছি, কিন্তু ‘চিন্তা’ আমাদের মধ্যে সেই পার্টির চরিত্র সম্পর্কে নানা প্রশ্ন জাগিয়ে তুলল। বুর্জোয়াদের মন্ত্রীসভায় আমাদের পার্টির মন্ত্রী হওয়া মার্কসবাদী দৃষ্টিভঙ্গির দিক থেকে উচিত কিনা, এই প্রশ্ন আমাদের আলোড়িত করতে লাগল। “ভোটে মন্ত্রীবদল হয়, কিন্তু রাষ্ট্রক্ষমতার কোনো বদল হয় না” – এই রাজনৈতিক বচনটি আমাদের পার্টির মন্ত্রীত্বে অংশগ্রহণ সম্পর্কে সংশয়ী করে তুলল। আর আমাদের মধ্যে এ সময়েই অনুপ্রবেশ করল কৃষিবিপ্লবের রাজনীতি। নতুন পার্টি সম্পর্কে সংশয় দানা বাঁধতে লাগল। পার্টি যখন দুর্বার গণ-আন্দোলনের মাধ্যমে যুক্তফ্রন্ট বিরোধী যাবতীয় চক্রান্তকে পর্যুদস্ত করার ডাক দিল, পার্টির রাজনৈতিক মুখপত্র ‘গণশক্তি’ সে ডাককে সারা দেশে ছড়িয়ে দিল, ঠিক সেই সময়েই ঘটে গেল দার্জিলিং জেলার নকশালবাড়ি অঞ্চলে পুলিশের সঙ্গে স্থানীয় আদিবাসী কৃষকদের এক রক্তাক্ত সংঘর্ষ (২৪শে মে, ১৯৬৭), আরোপিত ব্যঞ্জনা নিয়ে জন্ম হল এক বৈপ্লবিক ইতিবৃত্তের। ভারতের অখ্যাত একটি স্থান রাজনৈতিক ইতিহাসের পাতায় নিজের ঠাঁই করে নিল। বিদ্রোহ, বিপ্লব, জঙ্গি সংগ্রাম-এর নতুন নাম হয়ে দাঁড়াল ‘নকশালবাড়ি’।
যে সময় আমরা মনে করতাম, এখন আমাদের সরকার, আমাদের মন্ত্রী, আমাদের পুলিশ, আইন-কানুন সব আমাদের পক্ষে। জোতদার-জমিদার, মিল-কারখানার মালিক, কালোবাজারিদের কারো পক্ষে এখন আর টু শব্দটি করা চলবে না। সেই সময় একদিন আমাদের পার্টির পত্রিকা 'গণশক্তি'তে (১৯৬৭ সালের ৩রা মে) আমাদের অবাক করে দিয়ে খবর বেরুল যে নকশালবাড়ির কৃষকরা জোতদারদের দ্বারা জমি থেকে উচ্ছেদের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করেছেন। একজন জোতদারের নাম ছিল বুদ্ধিমান তিরকি। বিগল কিষাণ ছিল তার অধীন ঠিকা প্রজা। ভাগচাষি বলে বিগলকে উচ্ছেদ করে বুদ্ধিমান। মুন্সেফ আদালতে মামলা করে জিতে যায় বিগল। ডিক্রি নিয়ে সে তার জমিতে চাষ করতে যায়। “রাজ পাল্টে গেছে” – সে কথা অনেক জোতদারের মতো বুদ্ধিমান তিরকিও কিন্তু ভাবতে পারেনি। তার লোকজন নিয়ে বিগল কিষাণের উপর আগের মতোই আক্রমণ চালায়। জোতদারের গুন্ডাদের লাঠির ঘায়ে মাঠে পড়ে যায় বিগল। মাথা ফেটে গলগল করে রক্ত বেরোতে থাকে। বিদ্যুৎ গতিতে খবরটা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। সে সময় শিলিগুড়ি মহকুমা কৃষক সমিতির প্রধান ছিলেন জঙ্গল সাঁওতাল। খবরটা তাঁর কাছে পৌঁছুতেই তাঁর নেতৃত্বে শতাধিক চাষি লাঠি হাতে হৈ হৈ করে ছুটে আসে। জোতদারের গুন্ডারা ভয়ে তখন ভোঁ ভোঁ। জঙ্গল লাঠির দাগ কেটে বিগলকে জমির দখল দিয়ে এল। ঘোষিত হয় – কোনো জোতদারকেই এখন থেকে আর গ্রামে থাকতে দেয়া হবে না। জোতদাররা ভয়ের চোটে গ্রাম ছেড়ে পালাল। কিষাণদের কণ্ঠে তখন আকাশ কাঁপানো স্লোগান – “লাঙল যার, জমি তার”।
খবরটা আমাদের কাছে পৌঁছলে আমরা আনন্দের আত্মহরা হয়ে উঠেছিলাম। এতদিন জোতদারদের হাতে কৃষক-খেতমজুররা খালি মার খেয়ে এসেছে। এবার এসেছে পাল্টা মার দেওয়ার পালা। আমাদের অঞ্চলে কোনো পার্টি ছিল না, সুতরাং পার্টি অফিসের বালাইও ছিল না। গিরিজা মুখার্জি এমএলএ হয়ে দাঁড়াবার পর কমিউনিস্টরা এলাকায় যেমন পরিচিতি পেল, তেমনি আমরা একটি পার্টি অফিস খুলবারও প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলাম। স্টেশন যাবার পথে তিন রাস্তার মোড়ে একটা ঘর পাওয়া গেল। বাড়িওয়ালার ছেলে-মেয়ে দু’টোকে পড়িয়ে দেব, ভাড়া দিতে হবে না। এই চুক্তিতে লাল পতাকা ইত্যাদিতে ঘর সাজিয়ে পার্টি অফিস খুলে বসলাম। রোজ সন্ধেবেলা পার্টি অফিসে লোকজন জমত। আসত শ্রমিকরা চাঁপদানি থেকে। শেওড়াফুলি থেকেও বন্ধুরা আসত, একটা মার্কসবাদী পাঠচক্র খুললাম – বেশ কিছু বই জোগাড় করা গেল। ‘গণশক্তি’, ‘দেশহিতৈষী’ ও অন্যান্য পত্রপত্রিকা এখান থেকেই বণ্টন করা হত, বই পড়তে নিয়ে যেত কমরেডরা। মাঝেমাঝে হত আলোচনাসভা। গোপন গুদাম ভেঙে চালের বস্তা এই অফিসে এলে আমরা জড়ো করতাম। এই অফিস থেকেই গরিব মানুষদের বিনা পয়সায় সে চাল বিলিবণ্টন করতাম।
(চলবে)
