
বিলাতি ট্রাম কোম্পানির পরিচালনার ভার নিজেদের হাতে নিয়েছিল সরকার
কংগ্রেসের বিরুদ্ধে ভোটে লড়েছিল দু’টো যুক্তফ্রন্ট। ভোটের ফল বেরুনোর পরে দুই যুক্তফ্রন্টের শরিক দলগুলো মিলে তৈরি করা হল প্রথম যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রীসভা। মুখ্যমন্ত্রী হলেন অজয় মুখার্জি। জ্যোতি বসুকে মন্ত্রীসভায় স্থান দেবার জন্য তৈরি করা হল উপমুখ্যমন্ত্রীত্বের পদ। অন্যদিকে ‘আমাদের সরকার’ পেয়ে আমরাও দারুণ উল্লসিত হয়ে উঠলাম। আমাদের সরকারের আঠারো দফা কর্মসূচি – ধানচালের ব্যবসা অধিগ্রহণ, উদ্বাস্তু কলোনিগুলোকে বৈধতা দান, ট্রেড ইউনিয়ন ও গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা, জনগণের খাদ্য, বস্ত্র, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের সমস্যার যথাসম্ভব সমাধান – ইত্যাদি প্রতিশ্রুতি আমাদের দারুণ উৎসাহিত করেছিল।
প্রথম যুক্তফ্রন্ট সরকারের আয়ুষ্কাল ছিল ৯ মাস মাত্র। এই ৯ মাসে সরকার ২ লক্ষ ৩৮ হাজার একর ন্যস্ত জমি ভূমিহীন কৃষকদের মধ্যে বণ্টন করেছিল। ব্যাপকভাবে বর্গাদার ও ঠিকা প্রজা উচ্ছেদ বন্ধ করতে পেরেছিল, এক লক্ষ অস্থায়ী সরকারি কর্মচারিকে স্থায়ী করেছিল, রাজনৈতিক কারণে চাকরি হারানো লোকদের চাকরি ফিরিয়ে দিয়েছিল। এছাড়া ৬০০-র মতো পদচ্যূত পরিবহনকর্মীকে কাজে পূর্ণনিয়োগ করেছিল, বিলাতি ট্রাম কোম্পানির পরিচালনার ভার নিজেদের হাতে নিয়েছিল। শিক্ষক কর্মচারীদের মহার্ঘভাতা বৃদ্ধি করেছিল। সরকার ঘোষণা করেছিল, গণতান্ত্রিক আন্দোলনের দমনে সরকার কোনোদিন পুলিশ ব্যবহার করবে না। জোতদারদের কোনোরকম সহযোগিতা করবে না পুলিশ পাঠিয়ে। ধর্মঘট ভাঙার কাজে কখনো পুলিশ পাঠানো হবে না।
ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনে নতুন জোয়ার এল, কৃষক আন্দোলন পেল ব্যাপ্তি ও গভীরতা, কলমপেশা কর্মচারীরাও সংগ্রামের ময়দানে সমান তালে পা মেলালেন। আমাদের আনন্দ তখন দেখে কে? চোরাকারবারিদের গুদামে, চালের গুদামে হানা দিয়ে তা সস্তা দরে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিলি করে দেওয়া, জোতদারদের জমি দখলে সংঘবদ্ধভাবে ঝাঁপিয়ে পড়া আমাদের নিত্য কাজ। সাধারণ মানুষ দলবেঁধে আমাদের পেছনে – তাঁদের আশা, বঞ্চনার দিন এবার শেষ, এবার পালা হিসাব নিকাশের।
সমীরদার সঙ্গে একদিন গেলাম ‘নন্দন’ অফিসে। যুক্ত কমিউনিস্ট পার্টির কালে পার্টির অঘোষিত সাহিত্য ও সংস্কৃতির পত্রিকা ছিল ‘পরিচয়’। সে সময় পরিচয় ছিল প্রগতিশীল সাহিত্য-সংস্কৃতি কর্মীদের আশ্রয়। কিন্তু পার্টি ভাগাভাগি হবার পর ‘পরিচয়’ রয়ে গেল সিপিআই অনুরাগীদের হাতে। স্বাভাবিকভাবেই, আমরা যারা তথাকথিত সংশোধনবাদ-বিরোধী ছিলাম, তাদের একটা শিল্প-সাহিত্য-আলোচনার পত্রিকার প্রয়োজন ছিল। ‘নন্দন’ সেই প্রয়োজন মেটাবার মুখপত্র হয়ে উঠেছিল, তবে ঘোষিতভাবে পার্টির মুখপত্র ছিল না। ‘পরিচয়’-এর দৌলতে যে সমস্ত কবি, সাহিত্যিক, প্রবন্ধকার সর্বজন পরিচিত ছিলেন, আমরা যাঁদের নিয়ে গর্ব করতাম, তাঁরা কিন্তু পরিচয়ের সাথেই রয়ে গেলেন, রয়ে গেলেন শোধনবাদী রাজনীতির পক্ষভুক্ত হয়েই। ‘নন্দন’-এর পরিচালকমণ্ডলীতে যাঁরা ছিলেন এবং লিখতেন, তাঁরা সবাই প্রায় নতুন ও স্বল্পপরিচিত। সমীর রায়, কমলেশ সেন, দুর্গা মজুমদার, রূপায়ন ভট্টাচার্য, দিব্যজ্যোতি মজুমদার – এমন অনেকে আমার নতুন বন্ধু হয়ে উঠলেন। আমার রাজনৈতিক ছড়া, কবিতা ইত্যাদি লেখায় হাত পাকানো শুরু হল এই ‘নন্দন’ পত্রিকাকে কেন্দ্র করেই।
(চলবে)
