কলকাতার ট্রামওয়েজের হাল দেখে মনে হয় তার মৃত্যুঘন্টা বাজিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কেন যে এমনটা হল তার সঠিক কারণ বুঝে ওঠা কঠিন।

বছরের শুরুতেই কথাটা মনে করানো বোধহয় ভালো। কারণ এই সময়ে আমরা অনেক রকম প্রতিজ্ঞা শপথ ইত্যাদি গ্রহণ করে থাকি। সত্তরের দশকে কলকাতায় যখন পাতাল রেলের জন্য সুড়ঙ্গ খোড়া শুরু হয়, সেই সময় মেট্রো রেল  নিয়ে সংবাদপত্রে নিয়মিত একটি বিজ্ঞাপন প্রকাশিত হত- “আমরা কলকাতার বুকে জুড়ে দিতে চাই সেই ডানা যার নাম গতি।” ওই বিজ্ঞাপনের লে-আউট তৈরি করতেন কবি-শিল্পী পূর্ণেন্দু পত্রী। প্রতিটি বিজ্ঞাপনে পুরোনো কলকাতা বা কালীঘাট পট চিত্রের কোন না কোন ছবি থাকত। তাতে হয় তো এই কথাই বলার চেষ্টা হত যে আদি কলকাতাকে ভুলে না গিয়েও আমরা শহরে নতুন গতি আনতে পারি।

তার ঠিক শতবর্ষ আগে ১৮৭৩ সালে ২৪ ফেব্রুয়ারি শিয়ালদহ থেকে আরমেনিয়ান ঘাট পর্যন্ত প্রথম ঘোড়ায় টানা ট্রাম চালু হয় কলকাতায়। তখন বিজ্ঞাপনের ঘনঘটা ছিল না। কিন্তু তেমন উদ্দ্যোগের পিছনেও প্রধান উদ্দেশ্য ছিল শহরের বুকে গতি আনা। তার প্রায় সাতাশ বছর পরে কলকাতায় ট্রামের বিদ্যুতায়ন শুরু হয়। শতবর্ষ অতিক্রম করে ট্রাম আজও কলকাতার বুকে বেঁচে আছে। আর সেটা সারা দেশে এক মাত্র কলকাতাতেই।

উনিশ শতক থেকে বিশ শতকের মধ্য ভাগ পর্যন্ত অবিভক্ত ভারতে ট্রামের মানচিত্র ক্রমশ প্রসারিত হয়েছে। সেই তালিকায় ছিল মুম্বাই, চেন্নাই, দিল্লী, করাচি, পাটনা, কানপুর এবং নাসিকের মত ছোট বড় শহর। কিন্তু ষাটের দশকে এসে শাসকবর্গের কাছে ট্রাম একটি মন্দগতি যান হিসেবে চিহ্নিত হয়। যার ফলে কলকাতা ছাড়া সারা দেশ থেকেই ট্রাম উঠে যায়।

প্রসঙ্গটা আজ আলোচনায় তুলে আনার কারণ একটাই। এখন কলকাতার ট্রামওয়েজের হাল দেখে মনে হয় তার মৃত্যুঘন্টা বাজিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কেন যে এমনটা হল তার সঠিক কারণ বুঝে ওঠা কঠিন। সারা দুনিয়ার মধ্যে প্রথম ট্রাম চালু হয়েছিল ১৮০৭ সালে লন্ডনে। ব্রিটেনে প্রথম বৈদ্যুতিক ট্রাম চালু করে ব্ল্যাকপুল ট্রামওয়ে ১৮৮৫ সালে। সেই ট্রামরুট আজও চালু আছে।

ভারতে যখন ট্রাম তুলে দেওয়ার সংগঠিত উদ্দ্যোগ শুরু হয় তখনও আমাদের ভাবনায় পাতাল রেল আসেইনি। আর পাতাল রেল এলেও ট্রাম তুলে দিতে হবে এমন কোন মাথার দিব্যি কোথাও কেউ দেয়নি। পৃথিবীর ব্যস্ততম শহরগুলি পাতাল রেল আসার পরেও ট্রামকে বর্জন করেনি। লন্ডন শহরে ২০০ বছর ধরে ট্রাম চলছে যদিও গত নব্বই বছর সেখানে পাতাল রেলও রয়েছে। একই কথা সমান ভাবে প্রযোজ্য মস্কো, বার্লিন, রোম, লস এঞ্জেলেস, প্যারিস এবং মেলবোর্নের মত শহরগুলিতে।

সম্প্রতি ট্রাম নিয়ে দুনিয়া জোড়া যে সমীক্ষা হয়েছে তাতে দেখা যাচ্ছে জার্মানিতে এখনও ষাটটি রুটে ট্রাম চালু আছে। আমেরিকায় পঁয়তিরিশ, ফ্রান্সে আঠাশ, জাপানে ষোল, পোল্যান্ডে পনেরো, ব্রিটেনে দশ এবং চীনে নয়টি অঞ্চলে ট্রাম হেসে খেলে চলছে। তার বাইরেও রয়েছে আরও অনেক শহর।

অবাক করার মত তথ্য হল ভারতের মত যে সব দেশ ট্রাম বন্ধ করার জন্য কোমর বেঁধে নেমেছিল তারাও আবার ট্রাম ফিরিয়ে আনছে। সেখানে আর্জেন্টিনা, আলজেরিয়া, উত্তর কোরিয়া, তুরস্ক এবং পেরু-র মত পনেরোটি দেশ আছে। তার মধ্যে ভারতের নিকট প্রতিবেশী সিঙ্গাপুর এবং মায়ানমারও রয়েছে।

আরও অবাক হওয়ার মত কথা হল যে সব দেশে কোন দিনই ট্রাম ছিল না যেমন – দুবাই, ইজরাইল এবং তাইওয়ান – তারাও গত বছর থেকে নিজের নিজের দেশে ট্রাম চালু করেছে। যানবাহন হিসেবে ট্রাম পরিবেশ বান্ধব, সুশৃঙ্খল এবং পাতাল রেলের তুলনায় অনেক কম খরচে তা চালানো সম্ভব। এই সব কথা মাথায় রেখেই আগামী পাঁচ বছরে দশটি দেশে ট্রাম নেটওর্য়াক আরও সম্প্রসারিত হতে চলেছে। তার মধ্যে শিল্পোন্নত আমেরিকা এবং অষ্ট্রেলিয়া যেমন আছে তেমনি রয়েছে বেলজিয়াম, সুইডেন এবং ডেনমার্কের মত দেশ।

কিন্তু আমরা বিগত পঞ্চাশ বছরে তার উলটো পথে হাঁটছি। সারা ভারতের কথা ছেড়েই দিলাম। বিগত ষাটের দশকেই হাওড়া থেকে ট্রাম তুলে দেন প্রফুল্ল চন্দ্র সেন। ১৯৬৭ সালে প্রথম যুক্ত ফ্রন্ট সরকারের আমলে উপ-মুখ্যমন্ত্রী তথা অর্থমন্ত্রী জ্যোতি বসু ব্রিটিশ ট্রাম কোম্পনিকে রাষ্ট্রায়ত্ত করেছিলেন। বাম জামানায় উল্টোডাঙ্গা বা জোকা পর্যন্ত ট্রাম লাইন চালু হলেও সামগ্রিক ভাবে ট্রামের শ্রীবৃদ্ধি ঘটেনি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যখন কলকাতাকে লন্ডন বানানোর প্রতিজ্ঞা নেন তখন আশা করা গিয়েছিল ট্রাম স্বমহিমায় ফিরে আসবে। কিন্তু গড়ফা ট্রাম ডিপো পুরোটা এবং টালিগঞ্জ ট্রাম ডিপোর অর্ধেক ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি হয়ে গেছে।

ট্রামকে দুয়োরানি হিসেবে দেখার প্রবণতা কোন দিনই বন্ধ হয়নি। ধর্মতলা থেকে টালিগঞ্জ পর্যন্ত যখন মেট্রো চালু হল তখন প্রশান্ত শূর ওই রুটে ট্রাম তুলে দেওয়ার প্রস্তাব দেন। তাঁর বিরোধিতা করেছিলেন বামফ্রন্টের পরিবহন মন্ত্রী রবীন মুখার্জি। সুভাষ চক্রবর্তী পরিবহন মন্ত্রী থাকা কালে টালিগঞ্জ ট্রাম ডিপো এবং রবীন্দ্র সরোবরের জমি ব্যবসায়ীদের হাতে তুলে দেওয়ার প্রস্তাব করেন। তা নিয়ে বামফ্রন্টে যেমন আপত্তি ছিল তেমনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যাও প্রতিবাদে পথে নেমেছিলেন।

বোঝা যায় কর্তাব্যক্তিরা কেউই ট্রামের বিশ্ব জোড়া মানচিত্রটা খুলে দেখেননি। একমাত্র প্রবল জন মতই হয়তো তাদের টনক নড়াতে পারে।

কলকাতার কণ্ঠে ট্রাম যে গৌরবের গজমোতি সে কথা রাজনীতির কারবারীরা না  বুঝলেও ইতিহাসের পাতা সেই বিষয়ে কখনই নীরব থাকবে না।

Developed by DXDasia