
একটি মৃত্যু থেকে শুরু হল বিশাল ঐতিহাসিক গণ-আন্দোলন
সন্ধেবেলা খবর পেলাম, যে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছে তার নাম মনোরঞ্জন প্রামাণিক। বছর বাইশের ছেলে। একটা বিড়ি-সিগারেটের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে আমাদের সঙ্গে পুলিশের লুকোচুরি খেলা দেখছিল। পুলিশের তাড়া খেয়ে আমাকে অনুসরণ করে ছুটছিল। পুলিশ প্রায় ওকে ধরে ফেলবে ভেবে ও ডানপাশের ডোবাটায় ঝাঁপিয়ে পড়ে। সে অবস্থায় পুলিশ তাকে গুলি করে। খোঁজ নিয়ে জানলাম, বৈদ্যবাটি পুরোনো পোস্টাপিসের উল্টোদিকে জিটি রোডের ওপরেই একটা টালির একচালা ঘরে ওদের বাসা। বাবা অসুস্থতা নিয়ে চটকলে কাজ করে। ছোটো দুই ভাই। মা বাসন মাজার কাজ করে।
পরের দিন বিশাল মিছিল করে লাল পতাকা ঢেকে মনোরঞ্জনের মৃতদেহ নিয়ে বিশাল শোকমিছিল বের হয়। মিছিল কংগ্রেস সভাপতির বাড়ির পাশ দিয়ে যাবার সময় মিছিলটা ওই বাড়ির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে সব তছনছ করে দিতে চায়। প্রবীণ কমরেডরা অনেক চেষ্টা করে তাদের শ্মশানমুখী করে তোলে। “শহিদ মনোরঞ্জন, তোমায় আমরা ভুলিনি, ভুলব না”। এই শ্লোগানে পথ কাঁপিয়ে মিছিল হাতিশালা শ্মশানঘাটে এসে থামে। শ্মশান তখন লোকে লোকারণ্য।
“কোন একটা ঘটনায় মানুষের কী প্রতিক্রিয়া ঘটবে সে সম্পর্কে ভবিষ্যৎবাণী করা কঠিন। কখনও কখনও এক হাজার মানুষকে হত্যা করলেও লোকের মনে কোনো রেখাপাত করে না। আবার কখনও একজন মানুষকে খুন করলে গোটা দুনিয়া কেঁপে ওঠে” – এ মূল্যায়ন ইলিয়া এরেনবুর্গের। নুরুল ইসলামের মৃত্যু তেমনি এক ঐতিহাসিক ঘটনা সৃষ্ট আন্দোলন হয়ে উঠেছিল, যা বহু মৃত্যু ও আহত মানুষ, জেলবন্দি মানুষকে সাক্ষী রেখে স্তিমিত হতে হতে একেবারে থেমে গেল। ধীরে ধীরে যারা খাদ্য আন্দোলনে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন, তারা ছাড়া পেলেন। কলকারখানা, অফিস, আদালত, স্কুল, কলেজ আবার চালু হল। আর আমি শহিদ মনোরঞ্জনের পরিবারের দেখভালের দায়দায়িত্ব নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। ছোটো ছেলেদু’টোকে পড়ানোর দায়িত্ব দিলাম এক বন্ধুকে। রোগাক্রান্ত বাবাকে নিয়ে শ্রীরামপুর ইএসআই হাসপাতালে ভর্তি করে দিয়ে এলাম। এর-ওর কাছ থেকে চেয়ে-চিন্তে টাকাপয়সা জোগাড় করে রেশনটা নিয়মিত ধরে দিতে লাগলাম। মনোরঞ্জনের মা একজন ছোটোখাটো মানুষ। ময়লা সাদা শাড়িতে শরীর ঢেকে চোখের জলে গলা ভিজিয়ে ভেজা গলায় বলতেন, “তুমি আমাদের জন্য কত করবে বাবা”। আমি বললাম, “তুমি তো শুধু মনোরঞ্জনের মা নও, আমাদেরও মা, আমারও মা”। মনোরঞ্জনের মা ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। বেশ কয়েকমাস এ দায়িত্ব পালন করার পর বুঝলাম, শুধু ‘শহিদ শহিদ’ আবেগ দিয়ে চিঁড়ে বেশিকাল ভিঁজবে না। এভাবে ভিখ মেগে একজন অসুস্থ রোগী সহ চারজনের পরিবারকে বস্তুগতভাবে বেশিদিন টেনে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। তাই, অনেক কষ্টে একজন বন্ধু মানুষকে ধরে-করে একটি প্রাইমারি স্কুলের পিওনের কাজ পাইয়ে দিলাম আমার নতুন মা’কে। দু’জনেই একটু নিশ্চিন্ত হলাম।
চিন-ভারত সীমান্ত সংঘর্ষে এই ষাটের দশকের প্রথমভাগে যাদের দেশদ্রোহী বলে জেলে ভরেছিল, ষাটের দশকের শেষের দিকে তারাই লোকের চোখে ‘বীর’ হিসেবে মালা পরে জেল থেকে বেরিয়ে এল।
(চলবে)
