শহিদের রক্ত, হবে নাকো ব্যর্থ
পশ্চিমবঙ্গে খাদ্য সমস্যা চিরায়ত – খাদ্য আন্দোলন এই রাজ্যের বাৎসরিক অভিজ্ঞতা। প্রতি বছর আগস্ট-সেপ্টেম্বর এলেই খাদ্যাভাব চরমে উঠবে এবং খাদ্যের দাবিতে মানুষ পথে নামবে – এটাই নিয়ম।
সুতরাং সে বছরেও চালের দাম নিয়মমাফিক হুহু করে বাড়তে লাগল। চোরাকারবারিরা দু’হাত তুলে নাচতে লাগল। সরকারের রক্তচক্ষু, ধরপাকড় তাদের কার্যকর কোনো বাঁধা সৃষ্টি করতে পারল না। দলে দলে দুঃস্থ মেয়েরা চাল পাচারে নেমে পড়ল। রেলের কামরায় পুলিশ ও সাধারণ যাত্রীদের মধ্যে ধস্তাধস্তি দৈনন্দিন দৃশ্যে পর্যবসিত হল। মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্ল সেনের খাদ্যনীতির বিরুদ্ধে তাঁর দল কংগ্রেসের মধ্যেও বিভেদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠল।
একদিকে খাদ্যসংকট, আরেক দিকে তার সঙ্গে এসে যুক্ত হল কেরোসিন তেলের সংকট। পশ্চিমবাংলার তিন হাজার গ্রাম রাতের অন্ধকারে ডুবে গেল। চালের অভাবে খাবার বন্ধ। কেরোসিনের অভাবে ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া বন্ধ। মার্কিন জাহাজ ‘পিএল ৪০০’ গম নিয়ে কলকাতা বন্দরে নোঙর ফেলল। আমি তখন ছড়া লিখলাম, “৪০০! ৪০০! / ভাত কমাইয়্যা গম খা বেশি, / খুলবো স্বাস্থ্য, ফুলবো পেশি, / বাড়াই দিমু কোটা / তাতেও যদি শান্ত না হোস,/ শ্যাম চাচারে বাবা না কস, / খাইবার লাইগ্যা পাঠাই দিমু বস্তা ভরা টোটা / লালগো হাতে দিতে নারি / ভারতবর্ষ গোটা”। মিছিলে মিটিং-এ ওই ছড়া জনগণের সম্পত্তি হিসেবে উচ্চারিত হতে লাগল। আর সেই মার্কিন জাহাজ গম নিয়ে কলকাতা বন্দরে পৌঁছবার হপ্তাখানেক পরে মানুষ দেখতে পেল, বসিরহাটের স্কুলের কাচ্চাবাচ্চা ছেলেরা কেরোসিনের দাবিতে মিছিল করে আদালতের দিকে এগিয়ে চলেছে। রক্ত ও আগুনের মেলবন্ধনে সৃষ্টি হল নতুন ইতিহাস।
হাজারো-কৃষক ও ছাত্রদের ওই মিছিল বসিরহাট এসডিও কোর্টের সামনে পৌঁছুবার সাথে সাথে মিছিলের ওপর পুলিশের গুলিবর্ষণ শুরু হল। দুপুর ১২টা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত গুলি চলেছে ১১ রাউন্ড। গ্রেপ্তার করা হয়েছে ১০৬ জনকে। কিন্তু লাঠি মেরে, গুলি চালিয়ে, গ্রেপ্তার করে বসিরহাটের ছাত্রসমাজকে রুখে দেওয়া সম্ভব হয়নি। তাদের থেকে উদ্দীপনা পেয়ে জ্বলে ওঠে তামাম পশ্চিমবঙ্গ। ক্ষুধার অন্ন নিয়ে শাসকের ছিনিমিনি খেলা নীরবে আর মেনে নেবার নয় পশ্চিমবাংলার পক্ষে। চারদিকে স্কুল কলেজের ক্লাস বর্জন করে দলে দলে ছাত্রছাত্রী পথে নামল। স্বরূপনগরে বিক্ষোভকারী ছাত্রদের উপর গুলি চালাল পুলিশ। গুলি খেয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র নুরুল ইসলাম। নুরুলের মৃত্যুতে উত্তেজনা লেলিহান রূপ নিল। সারা বাংলা নুরুলের মৃত্যুর বদলা নেবার জন্য রুখে দাঁড়াল। স্ফূলিঙ্গ অগ্নিশিখার রূপ নিল। অগ্নিশিখা দাবানল সৃষ্টি করল। নানা স্থানে পুলিশের সঙ্গে ক্ষুব্ধ জনতার সংঘর্ষ ঘটতে লাগল। অনশনকেও হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে লাগলেন কেউ কেউ।
মার্চ মাসের গোড়ার দিকে খাদ্য আন্দোলন বিস্ফোরক রূপ নিতে শুরু করল। কৃষ্ণনগর রেল স্টেশন, সরকারি দপ্তর দাউদাউ করে জ্বলে উঠল। জনতা-পুলিশ সংঘর্ষে তিনজন পুলিশ মারা গেলেন। কৃষ্ণনগর শহরে কার্ফু জারি হল। ছাত্র মিছিলে গুলিচালনার পরিণতিতে ১৭ বছরের এক তরুণ যুবক, নাম আনন্দ হাইত শহিদ হলেন। আহত হল আরও তিন জন। জনসাধারণের ক্রোধের আগুনে বহু সরকারি অফিস জ্বলে পুড়ে ছাই হয়ে গেল। এই বীভৎস দমননীতির বিরুদ্ধে, এই জনগণের রক্তে হোলিখেলার বিরুদ্ধে উপযুক্ত জবাব দিতে ১০ই মার্চ তারিখ হরতাল ও সাধারণ ধর্মঘটের ডাক দেওয়া হল।
আর এই ১০ই মার্চ আমার জীবনের এক স্মরণীয় দিন – স্মরণীয় দিন বৈদ্যবাটি-চাঁপদানি অঞ্চলের বামপন্থী রাজনৈতিক কর্মী ও সাধারণ মানুষের কাছেও। আগের দিন রাতে আমরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলাম – পরের দিন আমরা কিছুতেই ট্রেন চলতে দেব না। ওভারহেড লাইনে কলাপাতা ফেলে, ভেজা নারকেল দড়ি ঝুলিয়ে দিয়ে, রেলওয়ের স্ক্রু খুলে দেবার চেষ্টা করেও আমরা বাজিমাত করতে পারলাম না। পরদিন সকালবেলা বৈদ্যবাটি রেলগেটে দাঁড়িয়ে আমরা দেখতে লাগলাম একের পর এক ট্রেন চলে যাচ্ছে। একেকটা ট্রেন যাচ্ছে আর মনে হচ্ছে আমাদের বুকের হাড়গুলো ট্রেনের চাকা গুড়িয়ে দিয়ে যাচ্ছে। সাধারণ মানুষ, আমরা কী করি তা চাক্ষুষ করার জন্য আমাদের ঘিরে দাঁড়িয়ে। একটা অব্যক্ত যন্ত্রণায় আমরা ছটফট করছিলাম। দেবুদা, দেবু মুখোপাধ্যায় ছিল আমাদের মধ্যে বয়সে বড়ো। দেবুদা আমাকে একপাশে টেনে নিইয়ে গিয়ে কানে কানে একটা বুদ্ধি দিল। রেলওয়ে কেবিন থেকে একটা ডাউন এক্সপ্রেস ট্রেন আসার কথা ঘোষণা করা হল। আমি ও দেবুদা একটা বড়ো লাল পতাকা ও নুরুল ইসলামের দড়মায় সাঁটা ছবি নিয়ে লাইন ধরে শেওড়াফুলির দিকে বেশ কিছুটা এগিয়ে গেলাম। আমরা দু’জনে ঠিক করলাম – ট্রেন আসলে লাল পতাকা দুলিয়ে আমরা ইঞ্জিনের সামনে দাঁড়িয়ে পড়ব। ট্রেন যদি আমাদের চাপা দেয় বা ট্রেনের রক্ষীবাহিনী যদি আমাদের ওপর গুলি চালায়, অবস্থা পাল্টে যেতে বাধ্য। মানুষ সেক্ষেত্রে ঝাঁপিয়ে পড়বে।
আরও পড়ুন
ভারত-চিন যুদ্ধে উত্তাল হয়ে উঠল ছাত্রসমাজ
পরিকল্পনা অনুযায়ী আমরা রেললাইনে দাঁড়িয়ে পড়লাম। আমাদের পরিকল্পনা ছিল, আমরা এমন জায়গায় দাঁড়াবো, যাতে রেলবগিগুলো রেলওয়ে ক্রসিং অতিক্রম করে না যেতে পারে। তাহলে এক ঢিলে দু’পাখি মারা হবে। ট্রেন আটকাবে। আবার রেলগেট না তুলতে পারার জন্য জিটি রোডও বন্ধ হয়ে যাবে। শ্রীরামপুর থেকে দলে দলে পুলিশ চন্দননগর-চুঁচুড়া ছুটতে পারবে না। তেমনি চন্দননগর চুঁচুড়া থেকে পুলিশ শ্রীরামপুরে যেতে পারবে না।
(চলবে)
