পার্টিতে যোগদানের আবেদনপত্র পুড়িয়ে ফেললেন একজন কমরেড

ভাঙনের মুখে এসে দাঁড়াল অবিভক্ত ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি

সভা নিস্তব্ধ। প্রধান বক্তা কী যেন বলতে উসখুশ করছিলেন। তাঁকে বলার কোনো সুযোগ না দিয়ে আমি বলে উঠলাম, “চিনা সৈন্যরা যে অঞ্চল দখল করেছে, সে অঞ্চলে ঘাসও জন্মায় না”। বলেই আমি চুপ। চিনের দালালদের বিরুদ্ধে আবার মুহূর্মুহু শ্লোগান শুরু হয়। আমি বলা আরম্ভ করি – “সে দুর্গম অঞ্চলে দাঁড়িয়ে আমাদের সেনাবাহিনী অভূতপূর্ব বীরত্বের সাথে যে লড়াই লড়ছে, তাকে স্বল্প বেতন বা বেশি বেতন দিয়ে মূল্যায়ন করা কখনও উচিত নয় বলেই আমি মনে করি”। অতঃপর ধন্যবাদ দিয়ে আমি মাইক্রোফোনের কাছ থেকে সরে এলাম। 

আমাদের অর্থাৎ ছাত্র ফেডারেশনের সমর্থক বন্ধুরা এবার প্রাণ ফিরে পেল। তারা সোচ্চারে ছাত্র পরিষদের ছেলেদের ‘দুয়ো’ দিতে লাগল। দু’পক্ষে ঠেলাঠেলি, মারামারি। মিটিং ভেঙ্গে গেল। কমান্ডার সাহেবকে নিয়ে প্রিন্সিপ্যাল তাঁর ঘরের দিকে রওনা দিলেন। ‘দেশপ্রেমের যাত্রা’ সেদিন এভাবেই শেষ হয়েছিল। 

ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি তখনও দু’ভাগ হয়ে যায়নি। তবে শীঘ্র ভাগ হয়ে যাবার সম্ভাবনায় উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল। এই সময়ে হুগলি জেলা কমিউনিস্ট পার্টির পক্ষ থেকে দু’জন নেতৃস্থানীয় কর্মী আমার সঙ্গে দেখা করতে এলেন। খাদ্য আন্দোলনের মিছিলে যোগ দিয়ে আমার ‘মার’ খাওয়া ও জেলে যাওয়ার গল্প তাঁরা কোনওভাবে পেয়েছিলেন। তাঁরা এসে আমার ‘বীরত্বের’ প্রশংসা করে এমিল বার্নসের ‘মার্কসবাদ’ এবং সংগঠন সম্পর্কে ‘লেনিন-স্তালিন-মাওসেতুং’ ইত্যাদির রচনার একটি সংকলন আমার হাতে তুলে দিয়ে আমাকে উৎসাহিত করলেন এবং ক’দিন পরে এসে আমার হাতে পার্টি সদস্যপদ অর্জনের একটি আবেদনপত্র দিয়ে তা পূরণ করে জমা দিতে বললেন। 

সত্যি সত্যি কী গুণরাজি থাকলে একজনকে কমিউনিস্ট বলা যায় তার কিছুই আমি তখন জানি না। জানি না কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হলে কী করতে হয়। আমার সেই জেঠতুতো ভাই, পার্টি যখন নিষিদ্ধ ছিল, সেই পর্বের পার্টি সদস্য ছিলেন। তাঁর লুকিয়ে চুরিয়ে বাড়িতে আসা, তাঁকে কোনওরকমে খাইয়ে দাইয়ে বাড়ির পেছন দিকের জঙ্গলের মধ্য দিয়ে পালিয়ে যেতে সকলের অস্থিরতাকে আমি চাক্ষুস করেছিলাম। তাঁর মুখে এক সময়ে শুনেছিলাম, কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হতে গেলে নাকি শ্রমিক-কৃষক গরিবদের মধ্যে কাজকর্ম করতে হয়, অস্ত্র হাতে লড়াই করা জানতে হয়। অথচ ওই গুণরাজির কোনোটাই সে সময়ে আমার ছিল না। একবার পুলিশের একটু লাঠির ঘা খেয়ে দিন পনেরো জেলের ভাত খাওয়ার গৌরবে আমি পার্টির সদস্যপদ অর্জনের গুণ অর্জন করে ফেললাম। 

ব্যাপারটা আমার কাছে বিস্ময়ের হলেও ওই আবেদনপত্রটি আমি আনন্দের সাথে পূরণ করে এঁদের হাতে তুলে দিয়েছিলাম। এরপরেই ভারত-চিন সীমান্ত সংঘর্ষ বেঁধেছিল। সদস্য ও সমর্থকরা অনেকেই পালিয়ে বাঁচলেন। অনেকেই গুপ্ত জীবন বরণ করে নিলেন। অনেকে গ্রেপ্তারের ভয়ে বইপত্র পুড়িয়ে ফেললেন। বস্তা বেঁধে ফেলে দিলেন পুকুরের জলে। সেইসঙ্গে একজন কমরেড আমার পূরণ করা সদস্যপদ অর্জনের আবেদনপত্রটিও পুড়িয়ে দিলেন। আমার আর ঐক্যবদ্ধ ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হবার গৌরব অর্জন করা সম্ভব হল না। 

(চলবে) 

Developed by DXDasia