তখন রাজনৈতিক দলের নিজস্ব প্রতীকে ভোটে দাঁড়ানো যেত না

‘দুই পাহাড়ে সূর্য, বাজায় রণতূর্য’

আমাদের চাঁপদানির বাড়ির নিকট প্রতিবেশী ছিলেন ডাঃ প্রফুল্ল ঘোষ। তাঁর দুই মেয়ে ও চার ছেলে। ওদের পরিবার পাড়ার মধ্যে বিখ্যাত হয়ে উঠেছিল একটি কারণে – প্রফুল্লদার স্ত্রী একসঙ্গে তিনটি সন্তান প্রসব করেছিলেন তারা সবাই সুস্থভাবে বড়ো হয়ে উঠেছিল। ওনার বড়ো ছেলে ছিল পান্না। পান্না ও আমি ছিলাম একেবারে ঘনিষ্ট বন্ধু। এক ক্লাসে পড়তাম, একসঙ্গে খেলাধুলো করতাম। একদিন তাদের বাড়িতে এলেন সমীর রায় নামের এক তরুণ ভদ্রলোক। ওরা তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে দিল। কলকাতায় লেক মার্কেটের কাছে, জনক রোডে দাদা-দাদা বৌদিদের সঙ্গে ভাড়া বাড়িতে থাকেন। উনি সম্পর্কে ওদের মামা। সমীর মামা। তিনি আমার সঙ্গে আলাপ-পরিচয় করে বুঝে গেলেন আমার রাজনৈতিক মনোভাব ও কাজকর্ম। কথা বলে জানলাম, ওনারা একটা পত্রিকা প্রকাশ করেন – রাজনীতি ও সাহিত্য আশ্রয়ী পত্রিকা। তিনি কলকাতায় ওই পত্রিকা অফিসে আমাকে যোগাযোগ করতে বললেন। এই যোগাযোগই আমার ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক জীবনের নির্ধারক যোগাযোগ হয়ে উঠেছিল। সমীর রায় হয়ে উঠেছিলেন প্রকৃত হয়ে উঠেছিলেন প্রকৃত অর্থেই আমার রাজনৈতিক সহযোদ্ধা – আমার কমরেড সমীরদা।

কমিউনিস্ট পার্টির ভেতরে তর্কাতরি চললেও, আগেও বলেছি, পার্টি তখনও দ্বিখণ্ডিত হয়ে যায়নি। এমন সময়ে চাঁপদানি পৌরসভার নির্বাচন ঘোষিত হল। আমাদের এমএলএ গিরিজা মুখার্জির প্রস্তাবে আমাকে আমাদের ওয়ার্ডে নির্বাচনে দাঁড় করানো হল। তখন রাজনৈতিক দলের পরিচয় নিয়ে ভোটে দাঁড়ানো যেত না। প্রার্থীর কর্মকাণ্ড ও তার সমর্থক কর্মীদের রাজনৈতিক পরিচয় থেকে ভোটদাতারা বুঝে যেতেন ভোটপ্রার্থীর রাজনৈতিক পরিচয়। আমার বিরুদ্ধে কংগ্রেসের প্রার্থী ছিলেন সত্যনারায়ণ সিংহ – চাঁপদানির গঙ্গাপারের এক ইটখোলার মালিক – বলতে গেলে লাখপতি। আর আমি ছিলাম সাধারণ মানুষের দু’চার টাকা দানের ওপর নির্ভরশীল কমিউনিস্ট পার্টি সমর্থিত প্রার্থী। বহুদিন পর্যন্ত চাঁপদানি পৌরসভা অঘোষিতভাবে কংগ্রেসিদের দ্বারাই পরিচালিত হয়ে আসছিল। চেয়ারম্যান ছিলেন অনাথ মুখোপাধ্যায় – চাঁপদানির ভূতপূর্ব জমিদারদের একজন।

আমি যে ওয়ার্ড থেকে দাঁড়িয়েছিলাম তার তিনভাগের একভাগই ছিল অবাঙালি এবং শ্রমিক পরিবারের ভোটার। বাকি একভাগ ছিল বাঙালি এবং তার মধ্যে বেশিরভাগই ছিল পূর্ববাংলা থেকে এখানে এসে ঠাঁইগাড়া, আমাদের মতো নিম্ন আয়ের বাঙাল মানুষ। স্বাভাবিকভাবেই আমার জেতার কোনো সম্ভাবনা ছিল না। শুধু পার্টির গণপরিচিতি গড়ে তোলার উদ্দেশ্য নিয়েই আমাকে দাঁড় করানো হয়েছিল। আমার প্রতীক ছিল দুই পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে উঁকি মারা উদীয়মান সূর্য। আমাদের স্লোগান ছিল, “দুই পাহাড়ে সূর্য, বাজায় রণতূর্য”। আমার প্রতিদ্বন্দ্বীর প্রতীক ছিল মাছ। পোস্টার লেখায় আমার হাত তখন থেকেই পাকতে শুরু করেছিল। সত্যনারায়ণ সিংহকে ব্যঙ্গ করে আমি পোস্টার আঁকলুম – একটা বড়ো মাছ হাঁ করে এগিয়ে আসছে, আর ছোটো মাছগুলো সবই সেই বড়ো মাছটার মুখগহ্বরে ঢুকে যাচ্ছে। আরেকটা পোস্টার এঁকেছিলাম, যার বিষয়বস্তু ছিল সাত ঘোড়ার রথে চেপে সূর্যদেব আকাশে উড়ে চলেছেন, তার নিচে লেখা, “সূরজ দেওতা কো ভোট দেও”। জেলা পার্টির একজন সদস্য পোস্টারটা দেখে আমার খুব প্রশংসা করলেন এবং আমার পিঠে এক চাপড় দিয়ে বললেন, “মুসলমান এলাকায় এ পোস্টার টাঙাস না যেন”। ভোটে না দাঁড়ালে নির্বাচন জেতার এইসব কৌশল আমি রপ্ত করতে পারতাম না কখনও।

যথারীতি আমি হারলাম। কংগ্রেসিরা বলেছিল, ওরা আমাকে একেবারে গো-হারা হারাবে, জামানত বাজেয়াপ্ত করে ছাড়বে। তবে তারা তা করতে সক্ষম হয়নি। আমাদের ‘বাঙাল’রা কেউ সত্যনারায়ণ সিংহকে একটা ভোটও দেয়নি, যেমন অবাঙালিরা দু-পাঁচজন বাদে কেউ আমাকে ভোট দেয়নি। তবে তবে ওই ভোটে দাঁড়াবার প্রক্রিয়ায় আমার পরিচিতি বেড়েছিল, আমাকে সংগঠক হয়ে উঠতে ওই ভোট পরিক্রমা সহায়ক হয়ে উঠেছিল। শ্রমিকদের মধ্যে পরবর্তীকালে কাজ করার ক্ষেত্র তৈরিতে সহায়তা করেছিল ওই ভোটপ্রার্থী হওয়ার কর্মকাণ্ড।
 

Developed by DXDasia