সর্বজনের দুর্গাপুজো : শিল্পী পার্থ দাশগুপ্তের নির্মাণ-ভাবনাকে সংরক্ষণের প্রচেষ্টা

“ওরে নবমী নিশি না হইও রে অবসান।
শুনেছি দারুন তুমি না রাখো সতের মান।।”

সাধক কবি কমলাকান্তের এই বিখ্যাত পদে নবমী নিশির প্রতি মা মেনকার এই আকুল মিনতি বুঝিয়ে দেয় দুর্গাপুজোর সঙ্গে বাঙালির একাত্মতা ঠিক কতটা! আসলে বাঙালির কাছে দুর্গাপুজো তো মেয়ের ঘরে ফেরা, সেখানে মানুষের আত্মিক আবেগ ছাপিয়ে ওঠে শাস্ত্র উপাচারের নিয়মকে। আর তাই, বছরের কয়েকটা দিন আদরের মেয়েকে ঘরে আনার জন্য প্রায় সারাবছর পরিশ্রম করেন গিরিতনয়ার বাঙালি বাবা মায়েরা। মেয়েকে আনার পরিকল্পনা থেকে তিলে তিলে তার পরিস্ফুটন তারপর মেয়ে আবার কৈলাসে ফেরার সঙ্গে সঙ্গে পরের বছরের জন্য দিন গোনা; পুজোর এই রীতিই চলে আসছে আবহমান কাল ধরে।

শহর হয়ে ওঠে বৃহত্তর শিল্প প্রদর্শনশালা। তবে, মাত্র কয়েকদিনের জন্যই। কিছু প্রতিমা সংরক্ষিত হলেও এই বিপুল কর্মযজ্ঞের নেপথ্যের নির্মাণ কাহিনি জানতে পারে ক’জন?

যুগের চাহিদা মেনে, দুর্গাপুজোতেও এসেছে অনেক অনেক পরিবর্তন। ধনী গৃহের আঙিনা ছেড়ে দুর্গা এলেন বারোয়ারি প্যান্ডেলে। ক্রমে ক্রমে তিনি হয়ে উঠলেন সর্বজনের। শিল্পীর কল্পনায় কখনো তিনি গড়ে উঠেছেন দেশ মাতৃকা রূপে, তাঁকে ঘিরে হয়েছে বীরপূজা আবার কখনো তিনি পূজিতা হন শিল্পের দেবী হিসাবে। শুধু শিল্পের বিকাশই নয়, কত সামাজিক বার্তার প্রকাশ মাধ্যম হয়ে ওঠে পুজোর প্যান্ডেলগুলো। তবে এত আনন্দ আয়োজন যাকে ঘিরে, রীতি মেনে সেই দেবী যখন মণ্ডপ থেকে নেমে শোভাযাত্রায় মাধ্যমে এগিয়ে চলেন বিসর্জনের পথে, তখন শূন্য মণ্ডপে এতদিনের এত মানুষের পরিশ্রমের নীরব সাক্ষী হয়ে, আবার আগামী বছরের অপেক্ষায় জ্বলতে থাকে একটি প্রদীপ। আর দর্শকের কাছে পুজোর সাক্ষী বলতে থাকে কয়েকটা ছবি আর ভিডিও।

বিশ্বায়নের পৃথিবীতে অনেক কিছুর মতো দুর্গাপুজোতেও নতুন রুচির ছোঁয়া। চিরাচরিত ধারণার পাশাপাশি শিল্পমনের ছোঁয়ায় এসেছে থিম। শহর জুড়ে শিল্পীদের দীর্ঘদিনের পরিশ্রমে যখন ধীরে ধীরে প্রস্তুত হয় বিভিন্ন মণ্ডপ। শহর হয়ে ওঠে বৃহত্তর শিল্প প্রদর্শনশালা। তবে, মাত্র কয়েকদিনের জন্যই। কিছু প্রতিমা সংরক্ষিত হলেও এই বিপুল কর্মযজ্ঞের নেপথ্যের নির্মাণ কাহিনি জানতে পারে ক’জন?

এই ভাবনাই শিল্পী পার্থ দাশগুপ্তের কলমে উঠে এসে দুই মলাটে ধরা দিয়েছে ‘প্রতিমায়ন’ নামে। ২০২২ সালে দক্ষিণ কলকাতার প্রান্তিক অঞ্চলে বর্তমানে বন্ধ হয়ে যাওয়া গুরুসদয় মিউজিয়ামকে কেন্দ্র করে ‘লোকশিল্পপ্রবাহ’ নামে একটি দুর্গাপুজোর পরিসর নির্মাণ করেন শিল্পী পার্থ দাশগুপ্ত। সেই কাজের গবেষণালব্ধ অধ্যায়গুলোই তাঁরই হাতের কলমে লিপিবদ্ধ হয়েছে ‘প্রতিমায়ন’ বইটিতে। পার্থবাবুর সঙ্গে শিল্প-গবেষক সৌরভ বন্দোপাধ্যায়ের গবেষণা এবং শিল্পী শান্তনু মিত্রের ছোঁয়ায় গড়ে উঠেছে নির্মাণের এই অক্ষরচিত্র। আর দুইমলাটের অবয়বে বইটি প্রকাশ করেছে ‘কারিগর’।

২০২৩ সালে পূর্বাচল শক্তি সঙ্ঘের মাঠে পার্থবাবুর শিল্পভাবনায় সর্বজনের দুর্গাপুজোর মণ্ডপ গড়ে ওঠে। এই কাজের নেপথ্যেও ছিল প্রায় দশ বছরের গবেষণা।

দুর্গাপুজোর সংরক্ষণ কীভাবে সম্ভব? এপ্রসঙ্গে পার্থবাবু বঙ্গদর্শন.কম-কে জানান, “কোনও পুজোকে কেন্দ্র করে যে কাজ হয় তা বিসর্জনের জন্যই সৃষ্টি হয়। এটাই রীতি, এটাই ভবিতব্য। বাস্তবিক কারণেই পুজো সংক্রান্ত কোনো নির্মাণকে আজীবন অটুট রাখা সম্ভব নয়। তাই এক্ষেত্রে সংরক্ষণ আসলে ভাবনার সংরক্ষণ। বিভিন্ন মাধ্যমে এই ধরনের সৃষ্টির তাৎপর্য, কর্মযজ্ঞের নানা তথ্য সংরক্ষণেই এক্ষেত্রে সংরক্ষণ”।

প্রসঙ্গত উঠে আসে ঋদ্ধিক দত্তের তথ্যচিত্র ‘সর্বজনের দুর্গাপুজো’-র কথা। ২০২৩ সালে পূর্বাচল শক্তি সঙ্ঘের মাঠে পার্থবাবুর শিল্পভাবনায় সর্বজনের দুর্গাপুজোর মণ্ডপ গড়ে ওঠে। এই কাজের নেপথ্যেও ছিল প্রায় দশ বছরের গবেষণা। বীরভূম জেলার হাটসেরান্দি গ্রামের পট আর বাংলার উনিশ শতকের কাঠখোদাই এই দুয়ের সমন্বয়ে কলকাতার ডোমপাড়ার কারিগরদের হাতে পূর্বাচল শক্তিসঙ্ঘের মাঠে ধীরে ধীরে সৃষ্টি হয়েছিল সর্বজনের দুর্গাপুজো। আর ঋদ্ধিক দত্ত ক্যামেরা বন্দী করেছেন এই সৃষ্টির প্রতিটা স্তর, তাঁর এই কাজ শুরু হয়েছিল এই নির্মাণ ভাবনার দশ বছর আগে থেকেই। সব মিলিয়ে ঋদ্ধিক নির্মাণ করলেন এই দুর্গাপুজোর হয়ে ওঠার তথ্যচিত্র।

 

ঘরের আদরের মেয়েকে বরণের এই উৎসব বাঙালির কাছে বড়ই আন্তরিক। কলকাতা তথা বাংলা এমনকী প্রবাসেও যেখানেই বাঙালি সেখানেই দুর্গাপুজো। কলকাতার পুজো এখন বিশ্বের দরবারেও সমাদৃত। ২০২১ সালের ১৫ নভেম্বর ইউনেস্কো কলকাতার দুর্গাপুজোকে  ‘Intangible Cultural Heritage of Humanity’ সম্মানে ভূষিত করেছে। তবে প্রতিবছরই উমা ফিরে গেলে এত আনন্দ আয়োজন সবই স্মৃতির পাতায় নাম লেখায়। আর স্মৃতি নির্মাণের নেপথ্য কাহিনী কখনো ছাপার অক্ষরে কখনো বা পর্দায় ফুটে উঠে হয়ে ওঠে শিল্পভাবনার জীবন্ত দলিল।

Written by