ধানছড়া মালা, শঙ্খলতা হাঁসুলি বা পাছাপেড়ে শাড়ি : বাঙালির শিকড় চেনাচ্ছে ‘শৈলী’

সাজের মধ্যে দিয়ে একটি কুটিরশিল্পোদ্যোগ

শৈলী-র ধানছড়া মালা

বি জয় গোস্বামী বলেছেন তিনি আর কবিতা প্রকাশ করবেন না। সম্প্রতি গয়না ও পোশাকের একটি ব্র্যান্ডের প্রদর্শনী তথা আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে, স্বরচিত কিছু কবিতা পড়ছিলেন তিনি। এমন একটা অনুষ্ঠানে কবি কবিতা পড়বেন! এই অনিবার্য বিস্ময়ের গোড়ায় খানিকটা ছাই ফেলে দিয়ে তিনি পড়লেন, “…প্ল্যাটফর্মে ঝুড়ি-বস্তা/ মানুষ নামবার জায়গা নেই/ তার মধ্যে কাঁইমাঁই, চুলোচুলি, হুড়মুড় মানুষ/ পুরুষ নামমাত্র সব, মেয়ে লোক, মেয়েছেলে লোক/ কে এরা?/ সুভাষগ্রাম, বারুইপুর, ধবধবি, শাসন/ দূর দূর থেকে আসা ছুটিহীন ডেলি প্যাসেঞ্জার/ উঁচু-বেঁটে ফ্ল্যাটবাড়ি বাবুবৌদি ন’টায় বেরোন/ তার আগে বাসন মাজা, ঝাঁট দেওয়া, দুধ আনা, বাচ্চা ধরা/ ভোরবেলাকার গন্ধ মিথ্যে ঘোরে এদের পেছনে/ তিরিশে পৌঁছেই এরা পোক্ত, ঝগড়াটে, তেতো মুখ, স্বামী নেয় না বাচ্চা আছে/ তাও যায়নি আঁকাবাঁকা পথে, পাঁচ বাড়ি খেটে খাবে, খেটে মরবে/ মুখে মাছি, জেলা হাসপাতালে…”

কবি বললেন প্রান্তিক, শ্রমজীবি মানুষ – মেয়েদের কথা; দুর্দশা যাঁদের নিয়তি। আর যে গয়না ও পোশাকের ব্র্যান্ডটির আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানে এই কবিতা পড়া হলো, সেই ‘শৈলী’-র অন্তরেও প্রান্তিক, শ্রমজীবি মানুষ – মেয়েদের কথা; দুর্দশা যাঁদের নিয়তি। একে সমাপতন বলা যায়। যাপনের অঙ্গ হিসেবে বাঙালির অলঙ্কার ও বসনের ইতিহাস আর গল্পকে বাস্তব রূপ দিচ্ছে ‘শৈলী’-র অন্য রকম উদ্যোগ। বাঙালি মানে শুধু হিন্দু বাঙালি, গঙ্গাপাড়ের বাঙালি নয়; তরাইয়ের সাগর-ছোঁয়া বাঙালিও। কুটিরশিল্প বাঁচুক, শিকড়হারা বাঙালি ফিরুক শিকড়ে -এই ভাবনা ও পরিকল্পনা নিয়েই ‘শৈলী’ গড়েছেন জলপাইগুড়িনিবাসী সংস্কৃতি জগতের মানুষ শৈবাল বসু। সঙ্গে রয়েছেন তাঁর কন্যা সৃষ্টি বসু। শৈলী’র নামাঙ্কণ করে দিয়েছেন শিল্পী রামানন্দ বন্দ্যোপাধ্যায়। 

যাপনের অঙ্গ হিসেবে বাঙালির অলঙ্কার ও বসনের ইতিহাস আর গল্পকে বাস্তব রূপ দিচ্ছে ‘শৈলী’-র অন্য রকম উদ্যোগ। বাঙালি মানে শুধু হিন্দু বাঙালি, গঙ্গাপাড়ের বাঙালি নয়; তরাইয়ের সাগর-ছোঁয়া বাঙালিও।

এমন অনেক উদ্যোগীই তো আছেন, যাঁরা গ্রামীণ কারিগর, হস্তশিল্পীদের থেকে সরাসরি সামগ্রী কিনে অথবা নিজস্ব ডিজাইনে তাঁদের দিয়ে বানিয়ে নেন। ‘শৈলী’ কি তার থেকে আলাদা কিছু? “নদিয়া জেলার ফুলিয়াতে প্রতি সোমবার ভোরবেলা গুজরাট থেকে ট্রাকভর্তি ‘বাম্পার’ নামের এক ধরনের সিন্থেটিক সুতো আসে। সেই সুতো দিয়ে পাওয়ার লুমে বোনা শাড়ি হ্যান্ডলুম বলে বাজারে দেদার বিক্রি হয়, যা পরিবেশের জন্য ভালো নয়—বায়োডিগ্রেবল নয়। ফুলিয়ার প্রবীণ সুতো-কর্মী ননীবালা পাল বলেছিলেন, উদ্বাস্তু হয়ে এখানে চলে আসার পর সংসারটা দাঁড় করিয়ে ফেলেছিলাম সুতো দুসু করে, এখন আমার কোনও রোজগার নাই বাবা। ননীবালা এখনও চরকায় সুতো কাটেন, ‘শৈলী’-র পাছাপেড়ে শাড়ির জন্য দিয়েছেন। ‘শৈলী’ এঁদের কথা বলছে।” উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বলছিলেন শৈবাল বসু। যিনি অনেক বছর পর ফিরিয়ে এনেছেন বাঙালি নারীর শরীর থেকে উবে যাওয়া চিরন্তন পাছাপেড়ে শাড়ি

‘শৈলী’র পাছাপেড়ে শাড়ি

শৈলী'র গয়না পরে শৈবাল বসু

শৈবাল বসু’র পেশা শিক্ষকতা। তিনি নকশাকার নন। নকশা বা বুননের সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পর্ক নেই। কিন্তু নারী-পুরুষের সাজ, অলংকার নিয়ে ভাবিত। তাঁর নিজের সাজ-পোশাক দেখলেই তা অনুমান করা যায়। শৈবাল বসু বলছেন, “আমরা দুঃস্বপ্নেও ভাবতে পারব না যে, ঘরে ফেরা পাখির নীড়ের মতো চোখ তুলে নাটোরের বনলতা সেন যে শাড়িটি পরে আছেন, সেটির মাঝ বরাবর একটি পাড় বয়ে গেছে। হ্যাঁ, তিনপাড়ের শাড়ি প্রান্তিক মানবীর শাড়ি হয়ে হয়ে, এই নব্য-নাগরিক চাহিদার আধিপত্যের যুগে হারিয়ে গেছে চিরতরে।”

 শৈলী-র যোনিধারা (vagina series) সিরিজের দুটি নমুনা

শৈলী সব অর্থেই কুটিরশিল্প – জলপাইগুড়ির পুরোনো স্যাকরার, বীরভূমের গ্রামের শিল্পীর, ফুলিয়ার তাঁতি ঘরের মায়ের, জলপাইগুড়ির হোম-এর পরিবারহারা মেয়েদের হাতের ছোঁয়া প্রত্যেক কাজে। শৈলীর জন্য গ্রামের কারিগররা বানিয়েছেন কাজললতা হার, ধানছড়া মালা, ছোটো ঝুমকো, পদ্মপাশা, কলকা পাশা, খইয়ের মাড় দেওয়া পাছাপেড়ে শাড়ির সঙ্গে মানানসই শঙ্খলতা হাঁসুলি। মাটি, কাঠ, তামা, পিতল, রুপোর মিশেলে অভিনব সব গয়না। লিখিত পত্রীতে তাঁদের নাম-পরিচয়, শাড়ির গায়ে তাঁতশিল্পীর নাম। শিল্পীর  স্বাক্ষর। 

চণ্ডীমঙ্গল কাব্যে খুলনার বিয়ের আসরে আত্মীয়দের উপহারের তালিকায়, কবিকঙ্কন মুকুন্দরাম পাটের শাড়ির উল্লেখ রেখেছেন। সেখান থেকে উদ্বুদ্ধ হয়ে তৈরি হয়েছে শৈলী’র পাটের শাড়ি। পাটের তন্তু থেকে সুতো তৈরি হয়েছে কালিয়াচকে। বুনেছেন নদিয়া কালীরহাটের খোকন মজুমদার।

আবার, রবীন্দ্রনাথ মণিপুরী নৃত্যে যে দেহভঙ্গীর সংগীত খুঁজে পেয়েছিলেন, তা মনে রেখে শৈবালবাবু গড়েছেন পিতল, তামা আর রূপা- তিন ধাতুর আভরণ। পাছাপেড়ে ছাড়াও শৈলীর অন্যান্য শাড়িতে পাওয়া যাবে পোড়ামাটির মন্দিরের কারুকাজ, সুচিত্রা মিত্র পরিহিত একটি তাঁতের শাড়িতে খুঁজে পাওয়া উচ্ছেপাতা-নকশার পাড়। এই সূক্ষ ভাবনাগুলিই শৈলীর ইউএসপি। শৈলী'র সমস্ত সামগ্রীর দামই মধ্যবিত্তের সাধ্যের মধ্যে। 

শৈবাল বলছিলেন, “একজন মেয়েদের ইস্কুলের সাহিত্যের দিদিমণি আমার কোনো বয়ান প্রসঙ্গে "নারীবাদের ধ্বজা ওড়ানো"  কথাটি শ্লেষভরে  ব্যবহার করেছিলেন। আমার অবাক লাগেনি। মনে পড়ে, একটি হোম-এ rescued হয়ে এসেছিল একটি ১৩ বছরের মেয়ে। মায়ের দ্বিতীয় স্বামীর দিনের পর ধর্ষণের শিকার। এগারোটা সেলাই পড়েছিল…সেই মেয়েটির সঙ্গে কথা হয়েছিল আমার। সেখান থেকেই শৈলী-র যোনিধারা (vagina series) সিরিজ। এই সিরিজের জন্য অনুপ্রাণিত হয়েছি বিক্রম সিং খাঙ্গুরা, চন্দনা হোরের চিত্রকর্ম থেকে। গয়নার জন্য পেতলের কাজ করে আমায় কৃতজ্ঞ করেছেন বীরভূম-এর বিষ্ণু রায়। এছাড়াও সাহায্য করেছেন জলপাইগুড়ির সুবোধ কর্মকার, সৃষ্টি বসু, অপ্রতিম দাস।”

 শৈলী-র শাড়িতে মমতা শঙ্কর ও সৃষ্টি বসু

কবিতা পড়ছেন জয় গোস্বামী

কসবার উদয়ন কলাকেন্দ্রে গত ১৯ জানুয়ারি সন্ধেতে আনুষ্ঠানিক শুভসূচনা হয়েছে শৈলী'র। উপস্থিত ছিলেন কবি জয় গোস্বামী, মমতা শঙ্কর, চন্দ্রোদয় ঘোষ, বিবি রাসেল, চৈতালী দাশগুপ্ত, সুজয়প্রসাদ চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ বিশিষ্ট। ঘুরে দেখতে পারেন ‘শৈলী’র অফিসিয়াল ওয়েবসাইট- www.soilee.co.in

Developed by DXDasia