
বাংলায় এখন ভরা কার্তিক; হেমন্ত ঋতুর প্রথম মাস। শরতের হৈ-হৈ আর শীতের রিক্ততার মাঝে এই হেমন্ত যেন আত্মদীপ জ্বালানোর ঋতু। তমসাকে জয় করে কার্তিক মাসের অমাবস্যাতেই ঘরে ঘরে জ্বলে ওঠে দীপাবলির আলো। আর সেই মাসের পূর্ণিমায় সেই চিরন্তন প্রেমে জীবাত্মা মিলে যান পরমাত্মার সঙ্গে। এই মিলনের নামই রাস। তাই রাস উৎসব বৈষ্ণবদের কাছে পবিত্র প্রেমের উৎসব। (শান্তিপুরের রাস)
দেবতারে প্রিয় আর প্রিয়েরে দেবতা করে তোলার এই উৎসবের রেশ দ্বাপর যুগের বৃন্দাবন ছাড়িয়ে, ছড়িয়ে পড়েছে কলির বঙ্গদেশে। দ্বাপরে যে উৎসব ছিল একান্তই রাধা-কৃষ্ণ আর বাকি সব গোপিনীদের, কলিতে তা হল সর্বজনের। যমুনা পাড়ের কৃষ্ণলীলার আবেগ মিশে গেল গঙ্গার স্রোতে; বৃন্দাবনের বাঁশির সুর মধ্যযুগে শুনলো নদিয়ার শান্তিপুর। সময়ের স্রোত বহুযুগ পেরিয়ে ২০২৫ সালে পৌঁছে গেলেও কৃষ্ণপ্রেমে মাতোয়ারা নদিয়ার শান্তিপুরবাসীর কানে আজও বাজে মোহন বাঁশির সুর, কার্তিক পূর্ণিমায় আজও তারা মেতে ওঠে প্রেমের অলৌকিক মিলনের উৎসব রাসে। (শান্তিপুরের রাস)
যমুনা পাড়ের কৃষ্ণলীলার আবেগ মিশে গেল গঙ্গার স্রোতে; বৃন্দাবনের বাঁশির সুর মধ্যযুগে শুনলো নদিয়ার শান্তিপুর। সময়ের স্রোত বহুযুগ পেরিয়ে ২০২৫ সালে পৌঁছে গেলেও কৃষ্ণপ্রেমে মাতোয়ারা নদিয়ার শান্তিপুরবাসী।
শারদীয়া দুর্গোৎসব আধুনিক বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব, পিছিয়ে নেই হুগলি জেলার জগদ্ধাত্রী পুজোও। কিন্তু শান্তিপুরের জনপ্রিয় রাস উৎসবকে বাঙালির অন্যতম প্রাচীন সর্বজনীন উৎসব বললে অত্যুক্তি করা হয় না। বাঙালির উৎসবের মরশুমে রাসের আবহে বঙ্গদর্শন.কম পৌঁছে গিয়েছিল শান্তিপুরের বড়ো গোস্বামী বাড়িতে। এই বাড়ির সঙ্গেও জুড়ে আছে বাংলার আধ্যাত্মিকতার ইতিহাস। কী সেই ইতিহাস? জানালেন গোস্বামী পরিবারের সদস্য অদ্রীপ গোস্বামী। (শান্তিপুরের রাস)
বাংলায় রাসের ইতিহাস জানতে হলে এই পরিবারের সূত্র ধরেই আমাদের ফিরে যেতে হবে অনেক বছর আগে। শান্তিপুরের রাস সর্বজনীন রূপ ধারণ করেছে এই পরিবারের সদস্য মথুরেশ গোস্বামীর হাত ধরে। কিন্তু এই উৎসবের সঙ্গে জড়িয়ে আছে তারও পূর্বপুরুষ অদ্বৈত আচার্য গোস্বামীর নাম। শুধু নাম নয়, জড়িয়ে আছে নানা কিংবদন্তিও। সেই কিংবদন্তি ভাগ করে নিলেন অদ্রীপ। (শান্তিপুরের রাস)

কথা শুরু সেই দ্বাপর যুগ থেকে। কথিত আছে, কৃষ্ণপ্রেমে মাতোয়ারা গোপিনীরা এই পূর্ণিমা তিথিতে মিলিত হতেন কৃষ্ণের সঙ্গে। কৃষ্ণ ও গোপিনীদের সেই লীলা ক্ষেত্রে কৃষ্ণ ব্যতীত কোন পুরুষের প্রবেশের অধিকার ছিল না। সেই লীলার টান ছিল এমনই যে স্বয়ং মহামায়া পর্যন্ত এই দিন হাজির হতেন ওই লীলা কুঞ্জে। এমনই এক পূর্ণিমায় মহাদেব কৌতুহলী হয়ে নারীর ছদ্মবেশে এসে পৌঁছান সেই গোপন রাসকুঞ্জে। অন্য পুরুষের উপস্থিতি টের পেয়েই সঙ্গে সঙ্গে রাসলীলা ভঙ্গ করে সেখান থেকে কৃষ্ণ চলে যান। কৃষ্ণের চলে যাওয়া দেখে বাকিরাও বোঝেন নিশ্চয়ই কিছু একটা গণ্ডগোল হয়েছে, তবে একমাত্র দেবী মহামায়া বুঝতে পারেন আসল কারণটি কী? তিনি তখন ছদ্মবেশী মহাদেবের কাছে গিয়ে ক্রোধ প্রকাশ করেন। অপমানিত মহাদেব প্রতিজ্ঞা করেন যে রাসলীলা দেখার জন্য তাকে এত অপমানিত হতে হল কোন না কোন সময় সেই রাসলীলা তিনি জগৎবাসীকে দেখাবেন। (শান্তিপুরের রাস)
মানুষের প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী দ্বাপর যুগ কেটে গিয়ে আসে কলিযুগ। জনশ্রুতি, এই যুগে হরি এবং হর অর্থাৎ বিষ্ণু এবং সদাশিবের মিলিত তনু রূপে শ্রীহট্টে (অধুনা বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চলে) জন্মগ্রহণ করেন কমলাক্ষ মিশ্র, পরবর্তীকালে যিনি অদ্বৈত আচার্য গোস্বামী নামে পরিচিত হন। মাত্র বারো বছর বয়সে বিদ্যাশিক্ষার উদ্দেশে অদ্বৈত এসে পৌঁছান নদিয়ার শান্তিপুরে। অতি অল্প বয়সেই নানাবিধ শাস্ত্র অধ্যয়ন করে তিনি শান্তিপুরেই বসবাস স্থাপন করেন। এবং এখানে রাসের প্রচলন করেন। তবে সেই রাস তখন এই রূপে পালিত হত না। তা ছিল অন্যান্য পুজোর মতোই আরও একটি পুজো।
জগৎবাসীকে কৃষ্ণের রাস দেখালেন অদ্বৈত আচার্য গোস্বামীর পৌত্র মথুরেশ গোস্বামী, এর পেছনেও আছে আরও এক কাহিনি। ভারতে একসময় রাজনৈতিক অস্থিরতায় বারবার আক্রান্ত হয়েছে ওড়িশার পুরীর জগন্নাথ মন্দির। এ সময় দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল এই মন্দির। তখন বাংলাদেশের বারো ভুঁইয়ার অন্যতম মানসিংহ এগিয়ে আসেন প্রতিবেশী রাজ্যের রাজাকে সাহায্য করতে। ওড়িশায় পৌঁছে মানসিংহ যুদ্ধে জিতে পুরী পুনরুদ্ধার করেন। এই যুদ্ধ জয়ের স্মারক রূপে তিনি তার কাকা বসন্ত রায়ের কথা মতো একটি কৃষ্ণমূর্তি এবং একটি শিব মূর্তি নিয়ে যশোহরে ফেরেন।
এরপরে কেটে গেল বেশ কিছু বছর। উড়িষ্যা থেকে আনা সেই গোবিন্দ মূর্তি এবং শিব মূর্তি তখন পূজিত হচ্ছেন যশোহরে। কিন্তু আবার রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা গেল। এবার অকুস্থল বাংলা অর্থাৎ অধুনা বাংলাদেশ। অস্থির সময়ে পরিবারের পূজিত দেবতার অবহেলা হতে এই আশঙ্কায় বসন্ত রায় তখন তার কুল গুরু মথুরেশ গোস্বামীকে অনুরোধ করেন দোল গোবিন্দকে তার বাড়িতে নিয়ে যেতে। সেই কথা অনুযায়ী মথুরেশ সেই কৃষ্ণমূর্তিটি শান্তিপুরে তার বাড়িতে নিয়ে আসেন। খোঁজ পাওয়া যায়নি শিব মূর্তিটির। সেই থেকে শান্তিপুরেই পূজিত হয়ে আসছেন। শান্তিপুরে পৌঁছে বিগ্রহের নাম বদলে হয়ে যায় রাধারমণ। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, কৃষ্ণের পাশে শ্রীমতি বা রাধারানী তখনও ছিলেন না। তাহলে রাধারানী এলেন কীভাবে?
মথুরেশ গোস্বামীর বাড়িতেই পূজিত হতে হতে হঠাৎ একদিন চুরি হয়ে যান রাধারমণ। বৈষ্ণব পরিবারে এ যেন এক মহা অঘটন। শাস্ত্র ঘেঁটে দেখা গেল কৃষ্ণ অন্তর্হিত হলে কাত্যায়নী পূজো করলে কৃষ্ণকে ফিরে পাওয়া যায়। সেইমতো পরিবারের মহিলা সদস্যরা কাত্যায়নী ব্রত শুরু করেন। এমন সময় পরিবারের জেষ্ঠ্যা বধূ স্বপ্নাদেশ পান শান্তিপুর এবং কৃষ্ণনগরের মাঝে দিগনগর নামক এক স্থানে রাঘবেশ্বর শিব মন্দিরের কাছে একটি দিঘিতে রাধারমন আছেন। পরের দিন সেই মতো সেখানে খোঁজ করে সত্যিই উদ্ধার হল সেই বিগ্রহ। সাধারণ মানুষের মনে বেড়ে গেল বিশ্বাস। তখন সকলে ভাবলেন পরিবারের সকল সদস্যই স্বামী স্ত্রী মিলে যুগলে রয়েছেন, শুধু রাধারমন একা। তাই এখানে তার ভালো লাগছে না। এইজন্য তার পাশে শ্রীরাধিকার অবস্থান জরুরি। তখন গোস্বামী পরিবারের একটি অংশ শ্রীরাধিকার অষ্টধাতুর মূর্তি নির্মাণ এবং প্রতিষ্ঠার ব্যবস্থা করেন।
এই শ্রীরাধিকার প্রতিষ্ঠার সঙ্গেই আছে শান্তিপুরের রাসের সর্বজনীন হয়ে ওঠার ইতিহাস। শ্রীরাধিকার প্রতিষ্ঠা কবে হবে? ঠিক হয় যেহেতু রাস পূর্ণিমা রাধা কৃষ্ণের মিলন তিথি তাই এখানেও রাস পূর্ণিমাতে রাধারমনের পাশে শ্রীমতির প্রতিষ্ঠা করা হবে। এই মিলনের ক্ষেত্রেও এক অভিনবত্ব দেখা যায় শান্তিপুরে। রাধা কৃষ্ণের প্রেম পরকীয়া প্রেম হিসাবে পরিগণিত হলেও শান্তিপুরে রাধার সঙ্গে কৃষ্ণের লৌকিক বিবাহের মাধ্যমে মিলন করানো হয়। লৌকিক বিশ্বাসে, দ্বাপরের সেই ভেঙে যাওয়া রাসলীলা এবং ক্রোধান্বিত শিবের সেই রাসকে সর্বজনীন করার কথাই শিবের অবতার অদ্বৈত আচার্যের বংশধরের মাধ্যমে সত্যি হলো শান্তিপুরে। তাই এই ভাঙা রাস নামে পরিচিত।
বড়ো গোস্বামী পরিবার সূত্রে জানা গেল শান্তিপুরের রাসের একটি বিশেষত্ব শেষ দিনে কুঞ্জ ভঙ্গের ঠাকুর নাচ। রাসের শেষ দিন কৃষ্ণের মূল মন্দিরে আবার এক বছরের জন্য ফিরে আসার দিন।

বিবাহের রীতি অনুযায়ী তৃতীয় দিন বধূ পরিচিতির দিন। শ্রীমতির প্রতিষ্ঠার পর প্রথম রাসের তৃতীয় দিনে শান্তিপুরের এক বিখ্যাত ব্যবসায়ী পরিবারের আর্থিক আনুকূল্যে বধূ পরিচিতির উদ্দেশ্যে বাদ্যযন্ত্রসহ এক বিশাল শোভাযাত্রা বের করা হয়। সঙ্গে থাকে অন্যান্য গোস্বামী পরিবার এবং অন্যান্য বিগ্রহ বাড়ির অনেক ঠাকুর। কিন্তু শান্তিপুরের রাসের প্রথম শোভাযাত্রা বেরোয় বড়ো গোস্বামী বাড়ি থেকে। আজও সেই ধারা প্রবাহমান। এভাবেই ধীরে ধীরে রাধাকৃষ্ণের রাস হয়ে উঠল সর্বজনীন।
কালের নিয়মে আরও নতুনত্ব এসেছে রাসে। শান্তিপুরের পর মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের পৃষ্ঠপোষকতায় নবদ্বীপের শুরু হয় রাস উৎসব। কিন্তু সেই রাস শাক্ত রাস। রাজ পৃষ্ঠপোষকতায় শুরু হওয়ায় নবদ্বীপের রাস ক্রমে বেশি জনপ্রিয় হতে শুরু করে। তখন শান্তিপুরের মানুষজন চিন্তা করেন কীভাবে তাদের রাসের জনপ্রিয়তা আবার ফিরিয়ে আনা যায়। সে জনপ্রিয়তা ফেরানোর উদ্দেশেই শান্তিপুরের রাসে যোগ হয় ‘রাই রাজা’। বারো বছরের মধ্যের সুন্দরী ব্রাহ্মণ বালিকাকে রাইকিশোরী সাজিয়ে পুজো করে তাকে হাওদা অর্থাৎ চতুর্দোলায় বসিয়ে নগর পরিভ্রমণ করা হয়। এই রাই রাজার সংযোজনের ফলে আবার জনপ্রিয়তা ফিরে পায় শান্তিপুরের রাস। বর্তমানে গোস্বামী বাড়িগুলির সঙ্গে যোগদান করে বিভিন্ন বারোয়ারি সংস্থা।
বড়ো গোস্বামী পরিবার সূত্রে জানা গেল শান্তিপুরের রাসের একটি বিশেষত্ব শেষ দিনে কুঞ্জ ভঙ্গের ঠাকুর নাচ। রাসের শেষ দিন কৃষ্ণের মূল মন্দিরে আবার এক বছরের জন্য ফিরে আসার দিন। সেদিন পরিবারের সদস্যরা রাধারমণ শ্রীমতি এবং অন্যান্য বিগ্রহদের বুকে নিয়ে ঢাকের তালে নাচাতে নাচাতে মূল মন্দিরে ফিরিয়ে আনেন। এভাবেই শেষ হয় রাস উৎসব।
শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক উৎকর্ষের জন্য নদিয়া জেলা একসময় বাংলার অক্সফোর্ড নামে পরিচিত ছিল। শান্তিপুরের অদূরে ফুলিয়ায় কবি কৃত্তিবাস ওঝা লিখেছিলেন বাংলা ভাষায় প্রথম রামায়ণ। সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যমণ্ডিত এই জেলার রাস উৎসবের খবর রাজ্যের বর্তমান রাজধানী কলকাতার নাগরিক বাঙালি কতটা রাখে তা প্রশ্ন সাপেক্ষ হলেও বাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে শান্তিপুরের রাস অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে তা অনস্বীকার্য।

