প্রবাসী সায়ক মিত্রের শিল্প-ভাবনায় ‘অতিতুচ্ছ’ ফেলে দেওয়া সামগ্রী

প্রায় বছর পঁচিশ আগে আমাকে আর আমার খুড়তুতো-ভাই কে নিয়ে আমার মেজকাকা কোন্নগরে গঙ্গার ব্রাহ্ম-সমাজ ঘাটে নিয়ে যেত সাঁতার শেখাতে। তখন দেখতাম প্রায়শই একদল ডাকাবুকো ছেলে-মেয়ের দল গঙ্গার অনেকটা দূরে গিয়ে খড়-দিয়ে মোড়া বাঁশের আস্ত স্ট্রাকচার তুলে নিয়ে এল। সেকি কী সেলেব্রেশন! পরে কাকা বুঝিয়েছিল এগুলোই গঙ্গার ধারের প্রতিমা শিল্পীরা কিনে আবার নতুন ঠাকুর গড়বেন — আমাদের বাড়িতে মা কালীর বিগ্রহ থাকার জন্য বুঝতেও সমস্যা হয়নি পুরো সাইকেলটা। বাড়িতে খবরের কাগজের ঠোঙা, ডিমের কার্টন এইসব জমিয়ে রাখা হত পরে ব্যবহার করার জন্য। রিসাইকেল (Recycle)

মার্কিন শিল্প-গবেষক স্টিফেন হাইলার লেকচার দেবেন প্রখ্যাত শিল্পী বিয়েট্রেস উডসের ক্যালিফোর্নিয়ার ওহাই-এর বসতবাড়িতে। গুরুত্বপূর্ণ আর্ট মুভমেন্ট ডাডা-র সক্রিয় শিল্পী-কর্মীর বাড়িতেই রয়েছে বড়ো লেকচার রুম, লাইব্রেরি, আর্ট গ্যালারি, আর কর্নারে হস্তশিল্প কেনাকাটার ছোটো কয়েকটা সেল্ফ। সেখানে রয়েছে পুরোনো শাড়ি দিয়ে করা বাংলার কাঁথা। আমার মা-পিসিরা সুতির শাড়ি জমিয়ে এক কাঁথা-শিল্পীকে দিত এবং কয়েক মাস পরে আমরা কাঁথা পেতাম — এক্কেবারে সেই জিনিস বিক্রি হচ্ছে শিল্পী উডসের বাড়িতে। আপসাইকেল (Upcycle)

গতবছর বোস্টন ইউনিভার্সিটি কহর্টস ও প্রফেসরদের সঙ্গে হার্ভার্ড আর্ট মিউজিয়ামের পিগমেন্ট কালেকশন এন্ড আর্ট কনসারভেশন দেখতে গিয়েছি। নরওয়েন শিল্পী এডভার্ড মুঙ্খ-এর ১৯০৬ সালে আঁকা তেলরং ছবি ‘টু হিউম্যান বিংস’ (দি লোনলি ওয়ানস)-এর রেস্টোরেশন চলছে। একটা ইজেলে রাখা এইরকম মূল্যবান পেইন্টিং। পেইন্টিংয়ের পিছনের স্ট্রাকচার দেখেই চমকে উঠলাম। শুধু একটা কর্নারে ক্যানভাস লাগাতেই তিনটে কাঠ। স্ট্রেচার বার বানাতে গিয়ে তক্তা কম পড়েছিল কিনা রেস্টোরেশন এক্সপার্ট জানেন না, তবে মুঙ্খ নাকি এভাবেই জিনিসের রি-উইজ করে থাকেন — যেকোনও ভাবেই হোক। বর্তমানের আর্কাইভাল শব্দের ভার কাঁধ থেকে কমলো বটে। আমি এখন যে শহরে থাকি, সেখানে একটা আস্ত সেন্টার রয়েছে — পিটসবার্গ সেন্টার ফর ক্রিয়েটিভ রিউইজ। ক্রিয়েটিভ রি-ইউজ (Creative Reuse)

১৯৯০-এর প্রথম দিকে, কোন্নগরে তখনও পুরোনো বাড়ি ভেঙে উঁচু অ্যাপার্টমেন্ট ওঠা শুরু হয়নি কিন্তু লিলুয়া, বেলুড়ের দিকে হয়েছে। বাড়িতে একটা কাঠের দরজা লাগবে, বাবা বলল হাওড়ার ঘুসুরি থেকে পুরোনো কাঠের দরজা আনবে। দরদাম করলে সস্তা হবে আবার মজবুতও হবে নাকি। রিক্লেমেড মেটেরিয়াল (Reclaimed Materials)

রিক্লেমেড মেটেরিয়াল, ক্রিয়েটিভ রি-ইউজ, আপসাইকেল, রিসাইকেল নিয়ে গ্লোসারি-সুলভ ভনিতা করার কারণ এটাই যে — এইসব ভারি ভারি শব্দগুলো আসলে আমাদের নিত্যদিনের সঙ্গী। আমি শুধু শিল্প-ইতিহাস, ভৌগোলিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক প্র্যাকটিসগুলোকে গঙ্গা, আলেঘেনি, চার্লস নদী দিয়ে কানেক্ট করার চেষ্টা করেছি।

সায়ক মিত্রের শিল্পকর্ম

এই শতাব্দীর দৃশ্যকলার শিল্পীদের প্রধান ভাষা হল শিক্ষামূলক বায়ো আর্ট, সাস্টেনেবল আর্ট, সোশ্যালি এনগেজড আর্ট — শিল্পচর্চার একটা দিশা বলতে পারা যায় যেখানে কার্বন ফুটপ্রিন্ট ও কার্বন এমিশন কমানো যায় এবং ব্যক্তি-কেন্দ্রিক উপাসনা থেকে সরে এসে সমাজের এই ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে যুক্ত মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধি। বিষয়ভিত্তিক সচেতনতা, ক্রিটিকাল-চিন্তাভাবনার প্রতি সহানুভবিতা, জাঁকজমক-বিহীন সমগ্র ইকো-পরিবারের কথা শুধুমাত্র ফাইন আর্টিস্ট বা পরিবেশ কর্মীর দল নয়, গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানও এই সৎ চেষ্টার পৃষ্ঠপোষক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরেও এই প্রবণতা দেখা যায় তবে ইন্টরনেট পূর্ববর্তী প্রজন্মের কাছে ইডিওলজি ছড়িয়ে দেওয়া সহজ ছিলনা। একদিকে সমাজের মুষ্টিগত এলিট অডিয়েন্স-কে টার্গেট করে কন্সেপচুয়াল কাজের চর্চা আর অন্যদিকে এন. এ. আর. পি (নিউরাল এস্থেটিক রেসপন্স প্রোডাকশন। মার্কিন শিল্প সমালোচক বেন ডেভিস যেটা কয়েন করেছেন)-স্টাইল এস্থেটিক ফ্যাশন-ভিত্তিক বিনোদন। এর মধ্যে যে বিরাট ফর্মাল ও কনটেন্ট-গত গ্যাপ সেটা কমাতে রিসাইকেল আপসাইকেল-ধর্মী সাস্টেইনাবল প্র্যাক্টিস দরকারি। শুধুমাত্র শিল্পের গ্রহণযোগ্যতার জন্য নয় সমাজের সব স্তরের শিল্পচর্চা সব ক্লাসের শিল্পীদেরও বাঁচিয়ে রাখার আশা দেখায়।

রিক্লেমেড মেটেরিয়াল, ক্রিয়েটিভ রি-ইউজ, আপসাইকেল, রিসাইকেল নিয়ে গ্লোসারি-সুলভ ভনিতা করার কারণ এটাই যে — এইসব ভারি ভারি শব্দগুলো আসলে আমাদের নিত্যদিনের সঙ্গী। আমি শুধু শিল্প-ইতিহাস, ভৌগোলিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক প্র্যাকটিসগুলোকে গঙ্গা, আলেঘেনি, চার্লস নদী দিয়ে কানেক্ট করার চেষ্টা করেছি।

এবার আসি আমার নিজের কাজে, কীভাবে গ্রাজুয়ালি এই ‘ট্র্যাশ ইন এন্ড ট্র্যাশ আউট’ শিল্প-দর্শন আরও বিশ্বাসযোগ্যতা পাচ্ছে। এক কথায় বলতে গেলে — কনসেপ্ট অফ ভেরাসামিলাচুড এন্ড প্রাগমাটিজম। চর্চা বহুদিন করলেও শিল্পে আমার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা তিন বছর আগেও ছিলো না, ফলে আর্ট কলেজের মাধ্যম ও উপকরণের ওপর মাম্বো-জাম্বো থিসিস-অ্যান্টি থিসিস মনে দানা বাঁধেনি। বরং আমার ফ্যাক্টরিতে কাজ বা ইউসার ইন্টারফেস মাল্টিমিডিয়া বা কনস্ট্রাকশন সাইটে কাজের অভিজ্ঞতাতে এস্থেটিক-র জায়গা খুবই কম — ফলে পূর্ববর্তী এস্থেটিককে আইডিয়ালাইজড করার প্রবণতাও কমে যায়।

সচেতনতা আরও বাড়ানো দরকার। মাটির ভাঁড় দিয়ে প্যান্ডেল, তালা-চাবি ঝালাই করে ইকোনোগ্রাফি, পঁচিশ পয়সার কয়েন দিয়ে সরস্বতী – এমন অনেক পলিশড গিমিকি কাজের একটি ইতিহাস আছেই। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে এদের সবটাই মেটেরিয়াল-এর নতুন ট্রান্সফর্মড দিককেই দেখায়। ভাঁড়, তালা-চাবি, পঁচিশ পয়সার কয়েন এগুলোর মেটেরিয়াল সত্ত্বার মূল্যায়ন তো হয়ই না, বরং এটার একটা কমোডিটি ভ্যালু তৈরি হয় যার ফলে তালা-চাবির ঠাকুরের প্যাকেজটার বিক্রয় মূল্যের যৌক্তিকতা রিপিট হতে থাকে। তালা-চাবির অন্যান্য যান্ত্রিক প্রয়োগ বা লোহার খনিজ মূল্যের প্রতি সহানুভূতি দেখানো তো দূর অস্ত।

এই ধরনের মিডিয়াম-মেটেরিয়াল-ম্যাটারদের টানাপোড়েন সবসময় আমাদের ভাবায়। পশ্চিমের দেশগুলোর অর্থনৈতিক পরিকাঠামো স্থিতিশীল হওয়ায় এই সব ব্যাপার নিয়ে ভাবার সময় ও সুবিধা পাওয়া যায় এবং আর্জেন্সিটা চিন্তায় রূপান্তরিত হয়। এখনও কিছুটা পারফর্মটিভ ও এক্সপ্লইটারি অফ কজ জায়গাতে থাকলেও ভারতীয় উপমহাদেশেও এই নিয়ে প্রচুর ভাবনা চিন্তা চলছে। অনেক কাজও হচ্ছে — বিশেষ করে ফিল্ম ও নিউ মিডিয়াতে। বোস্টন ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময় বেশ কয়েকজন ফ্যাকাল্টি এই ব্যাপারগুলো বুঝতে খুব সাহায্য করেছেন এবং তাদের রাইটিং ও প্র্যাকটিসের কেন্দ্রেও এই ধরনের সচেনতা। এঁরা এই ধরনের কাজে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটো জিনিসের ওপর রিসার্চ করতে সাহায্য করেছিলেন – এক) মেটেরিয়াল ন্যারেটিভ; দুই) ক্রিটিকাল অটো-এথনোগ্রাফি। এর সঙ্গে হিউমার, প্রাদেশিকতা, জিওপলিটিক্স, সামাজিক ঘটনার প্রভাব। সব থেকে বড় কথা আর্ট সাপ্লাই-এর বিল ঘাড় থেকে নেমে যাওয়া একটা বিরাট স্বস্তির — তাতে যে ফ্রিডমটা পাওয়া যায় সেটাও কাজকে ফর্মাল দিক থেকে নতুন গঠনমূলক পরিপূর্ণতা দেয়।

ফ্রিডমের কথা বলতে সবচেয়ে প্রাচীন শিল্পাভ্যাস হল — ড্রয়িং। কমিউনিকেশন থেকে ক্রিটিকাল স্টেটমেন্ট; এর ব্যাপ্তি ও সম্ভাবনা অফুরন্ত। সবচেয়ে কম ফিনান্সিয়াল বার্ডেনে হাইস্টেক কাজ করার জন্য এর বিকল্প কিছু হয় না। আমার মনে হয় অনেকটা কবিতার মতো। স্বভাবতই, ড্রইংয়ের খিদে মেটাতে লাগবে কাগজ, অথচ বড়ো কাগজের প্রচুর দাম। আমি আঁকতে শুরু করলাম বাজারের ব্রাউন পেপার ব্যাগ। কখনও-সখনও ১০ সেন্ট নেয় (সেটাই কিন্তু ৮ টাকা ইন্ডিয়ান কারেন্সিতে) তবে বেশিরভাগ সময়ই ফ্রিতে পাওয়া যায়। অনেক বন্ধুও তাদের ব্যাগগুলো আমার ষ্টুডিওতে দিয়ে যেত। টার্গেট, ট্রেডার জোস্, হোল ফুডস, হোম ডিপো থেকে সি ভি এস, মার্কেট বাস্কেট, ইন্ডিয়ান ফুড জয়েন্ট ভাঙ্গা ও আরও অনেকে — গ্রোসারি, ওষুধ, হার্ডওয়ার, ইন্ডিয়ান খাবারের ব্যাগ। শুধু পেপার ব্যাগ ট্র্যাক করলেই মধ্যবিত্ত বাঙালি ছাত্রের জীবন-যাপনের দলিল পাওয়া যাবে! কিন্তু প্রধান সমস্যা হল ব্রাউন-ছাত্রের বিদেশে জীবন নিয়ে ছবি আঁকা বিপণন-যোগ্য এবং ডাইভার্সিটির বিজ্ঞাপণ পোস্টার হিসাবে এটা সবচেয়ে সহজলভ্য। ডাইভার্সিটি টোকেনের পোস্টারের সঙ্গে আমেরিকার গুড সামারিটান আদর্শের কোনও মিল নেই – থাকলেও সেটা শুধুমাত্র বিপণন-মূল্যের মূল্যের সুবিধা নেওয়ার জন্য। তূলনা করা যায় সেল্ফ-ওরিয়েন্টালিজমের সঙ্গে। সেই কারণে রিয়্যালিজম বা ইলাস্ট্রেশন থেকে সরে এসে সিম্বলিকভাবে জীবনকে ধরার উপায় খুঁজতে শুরু করি।

গঙ্গা/ সায়ক মিত্র

যাই হোক, এই ব্যাগের ফাঁকা জায়গাতে আমি স্কেচ করা শুরু করি। চারকোল, গ্রাফাইট, ওয়াটার কালার, গুয়াশ  এমনকি অয়েল স্কেচও করেছি — শুরু করেছিলাম ১০৮টা করবো বলে কিন্তু আর থামিনি। অনেক বেশি সংখ্যক পৃথক কাজ একসঙ্গে বড়ো স্কেল নেওয়ায় আর্কিটেকচারালি একটা সুবিধা হয়ে গেল। প্রদর্শনের ধরনকে এক্সপেরিমেন্ট করতে এই ব্যাগগুলো বহু রকম ভাবে প্রদর্শিত করেছি — কখনও মাটিতে ত্রিপলের ওপর বিছিয়ে, কখনও সেন্টার স্টিচ করা (সুতোর বদলে জিপ লক) হাতে তৈরি বইয়ের মতো। ফাইনালি, এমএফএ সেমেস্টার শোতে ফ্রিজের মতো — পরপর রেলগাড়ির মতো লম্বা পেন্টিংয়ের ধরন। ইনস্টিটিউট অফ কনটেম্পোরারি আর্টের (বোস্টন শাখা) কিউরেটর জেফরি ডি ব্লোয়া রিসাইকেলড পেপার ব্যাগের মধ্যে দিয়ে পুরোনো আর্কিটেকচারের এলিমেন্টটা নোটিশ করেছিলেন, যেটা পশ্চিমের স্কলাররা সচরাচর দেখতে পান না। ভারতীয় আর্কিটেকচারের স্ক্রলের মতো, আর্কিটেকচারের ফ্রিজের ডিজাইনও আমার বেশ লাগে। সাদা ঝকঝকে দেয়ালের ওপর পাঁচ মেশালি ছেঁড়া তাপ্পি-মারা ব্যাগগুলোতে অনেক গল্প বলেছি। সবগুলোই ডি-কনস্ট্রাক্টেড, নন-লিনিয়ার, আন-সেটেলিং, এনক্রিপ্টেড কখনও সখনও কম্প্লিসিট। একটা অংশে যুদ্ধ ব্যবসা ও এক্সপ্লোইটরি বিশ্বায়ন নিয়ে ড্রয়িং — জেমস রবিনসন ও ড্যারেন এসমোগ্লুর হোয়াই নেশান ফেল থেকে এষ্টর ডুফলো ও অভিজিৎ ব্যানার্জীর পুওর ইকোনমিক্সকে বেস করে উইনস্টন চার্চিল-কেন্দ্রিক এর আদারিসম ফিকশন। এর সঙ্গে সিঙ্গার-সং রাইটার ফিয়ানিসের গানের লাইন — ‘ডু ইউ হ্যাভ এ ডলার? উড ইউ লাইক টু ফান্ড আ ওয়ার?’-কে স্কেচি ডেকোরেটেড-স্টাইলে ধরবার চেষ্টা করেছি। বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু মাধ্যম এতই মামুলি যে, যেকোনও সার্ভিলেন্স এড়ানো যায়। কোনও ব্যাগ মনে হলে কম্পোস্ট-ও করা যায়।

https://how2recycle.info/ এই ওয়েবসাইটটি সাধারণ পেপার, ব্রাউন পেপার ব্যাগের মতো কপোস্টবেল মেটেরিয়াল সম্পর্কে অনেক ইনফরমেশন ও ডু ইট ওয়ারসেল্ফ জাতীয় ইনিশিয়েটিভ নিচ্ছে, কমিউনিটি-বেসড রিসাইকেলের ওপর জোর দিচ্ছে — যেগুলো খুব ইন্টারেস্টিং। যেহেতু পুরো প্রজেক্টটার মধ্যে একটা অনন্ত স্রোত আছে, আমি নাম দিয়েছি, গঙ্গা — যার স্রোতের গতি ও দিক স্থির নয়; নেই শেষ-শুরু, শুধুই বহমানতা।

শহরতলির মুদির দোকান, বাসস্টপের গায়ে চপ ও পানের দোকান, রেল লাইনের ধারে ফল-ফুলের দোকানগুলোর একটা চরিত্র আছে — ক্রেতা বিক্রেতার মধ্যে একটা আত্মীয়তার সম্পর্ক। কমিউনিটিগুলো পশ্চিমের মতো বড়ো বড়ো পুঁজিবাদীদের কাছে ম্যাক ডোল্যান্ড, স্টার বাকের মতো অর্থই-ধর্ম আদর্শে আত্ম সমর্পন করেনি।

এরপর বলব, কয়েকটি খুব সাধারণ রিসাইকেল করার মতো জিনিস নিয়ে কাজ। সোডা ক্যান, প্লাই উড, পেগ বোর্ড, ফুড-প্যাকেজিং কার্ডবোর্ড নিয়ে কাজ। এর সঙ্গে ত্রিপল, পেপার ক্লিপের মতো কিছু হার্ডওয়ার, স্টেশনারি মেটেরিয়ালও আছে। কাজটার নাম ধুলাগড় ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক। আগের গঙ্গা প্রজেক্টটার মতোই এইটাও আমি একটা সিরিজের মতো এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই — যেখানে আমার ইন্টারেস্ট হল হোমোমরফিজম। কাজটার কন্সেপ্ট আরেকটু বর্ণনা করলেই ছোটোবেলার ম্যাথ ক্লাসের হোমোমরফিজমের সঙ্গে সমাজ বিজ্ঞানের সম্পর্কগুলো পরিষ্কার হবে। কাজটা কিছুটা সলিড জিওমেট্রিক — কিছুটা কার্টোগ্রাফিক। মানচিত্রের ক্লোজ-আপ। আমি বোস্টনে আমাদের পুরোনো স্টুডিও বিল্ডিং-এর কিছু আনউসুয়াল শেপ কপি করেছি, এমনকি সরাসরি ট্রেস-ও করেছি। চতুর্ভূজ শেপ থেকে বেরোবার জন্য। অকস্মাৎ স্টুডিও বিল্ডিং-এর একটা অংশের সঙ্গে আমার ২০০৮-এ ধুলাগড়ের প্রাক্তন কর্মক্ষেত্রের মিল পাই। হাওড়ার ধুলাগড় ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক-এর কয়েকটি কারখানার কিছুটা অংশ — গুগল ম্যাপস এন্ড আমার নিজের কিছু ট্রেসড ড্রয়িং নিয়ে কাজটার প্রধান আউটলাইন। স্টুডিও বিল্ডিংয়ের লাগোয়া ইউনিভার্সিটির থিয়েটার — বুথ থিয়েটার। অত্যন্ত আধুনিক মিনিমালিস্ট আর্কিটেকচার। সুবিধা হল, থিয়েটার প্রোডাকশনের ব্যবহার হয়ে যাওয়া জিনিস জমা হয় বিশাল উড-মেটাল রিসাইকেল-ডাম্পস্টারে। শুধুমাত্র প্লাইউড বা তক্তা নয়, ভালো ফেব্রিক, উড প্যানেলও পাওয়া যায় অনেক সময়। স্টুডেন্টরা সেইসব প্লাইউড উডশপে স্টক করে পরবর্তী কাজের সম্ভাব্য মেটেরিয়াল হিসেবে — এটা একটা ট্র্যাডিশন বলা যায়।

বাতিল হয়ে যাওয়া জিনিসপত্র গুরুত্ব পাচ্ছে সায়কের শিল্পকর্মে

এবার ধুলাগড় ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক ওরফে স্টুডিও বিল্ডিং-এর দেওয়ালের শেপের আউটলাইন বেস করে প্লাই উড-পেগ বোর্ড দিয়ে একটা শেপ তৈরি করি। কারখানা এলাকার বড়ো বড়ো ব্যারেলের ছবিকে অনুকরণ করতে সোডা ক্যান ব্যবহার করেছি। তাতে কিছু পেইন্ট করে হুবহু কারখানার ছবিকে রিক্রিয়েট, আবার কিছু ক্যানও রয়েছে — ব্র্যান্ড আইটেমগুলো দেখানোর জন্য — কখনও ক্যানের নিজের কালার টাকেই পেইন্টিংয়ের পিগমেন্ট হিসেবে দেখানোর জন্য। আমেরিকাতে মানুষ সারাদিন স্পার্কলিং ওয়াটার, এনার্জি ড্রিংক, আইসড টি, চিলড কফি ড্রিঙ্কস করে যাতে কাজ করেই যেতে পারে — বিশেষ করে ফাস্টপেস ওয়ার্ক লোডকে সামলাতে। কিছু ক্যান আমার নিজের ইউজ করা। কিছু ক্যান ষ্টুডিওমেটদের থেকে পাওয়া, বেশ কিছু রিসাইকেল বিন থেকে বা রাস্তা থেকে কুড়িয়ে পাওয়া — যদি তাতে ইন্টারেস্টিং কালার থাকে। কাঠের প্লাইউডকে গোল করে কেটে ভেলক্রো দিয়ে ক্যানগুলো বোর্ডে লাগানো। কাজের পরটিবিলিটির কথা ভাবলে ভেলক্রো খুব দরকারি টেম্পোরারি এডহেসিভ।

এইরকম কিছুটা কলকারখানার ইম্প্রেশন ও কমপ্লেক্স নন-আর্কিটেকচার কাজটায় বেশ কিছু বাঙালি আইডেন্টিটিও আছে। সেগুলো এনক্রিপ্টেড এবং ওরিয়েন্টালিজম ও আর্ট-মার্কেট বিরোধী। একটি খুব পপুলার ইন্দো-পর্তুগিজ ডিশ-ল্যাম্ব ভিন্ডালু ফ্রোজেন ফুডের কার্ডবোর্ড বাক্স — তাতে ছাত্র আন্দোলনের-স্পিরিটে লেখা — ‘খাবো কী?’ বলতে পারি, এই ক্যালিগ্রাফি ও সাইন শিল্প-শ্রমিকদের বাঁচার অধিকার ও শোষণের প্রতিবাদ। আরেকটি, দক্ষিণ আমেরিকার মাতের (ক্যাফিন ড্রিংক — আমার আর্জেন্টিনার সহপাঠী নেশা ধরিয়েছে — ওরা বলে আরহেন্তিনা, আর্জেন্টিনা-র বদলে) ক্যানে বাংলায় লিখেছি — ‘ডানদিকে’ সঙ্গে লেফট অ্যারো সিম্বল। সিগ্নিফিয়ার ও সিগনিফায়েড তত্ত্ব নস্যাৎ। এটাও ভারতের হিন্দিভাষী ও পাশ্চাত্যের নিজেদের ভাষার বাইরে সব ভাষার প্রতি উদাসীনতার প্রতি তির্যক মন্তব্য। বাংলা-ভাষাকে শুধুমাত্র অবজেক্ট বা লিবারাল পুঁজিবাদের এক্সটিক হোম ডেকোর হয়ে থাকাটা মেনে নিতে পারি না। সুতরাং আমার কাজ বুঝতে ন্যূনতম বাংলা জানতে হবে — বুঝতে হবে।

আগেরগুলোর মতো, জেনেরেটিভ ধরনের না হলেও — কাজটার চোদ্দো-আনা ভিত রিসাইকেল। এটার মূল অনুপ্রেরণা, আমেরিকার নেপালি, বাংলাদেশি, ভারতীয় মুদির দোকানের ইন্টেরিয়র। কিছু কিছু জায়গাতে স্পেনসার, মোর-এর মতো পেল্লাই মার্কেট থাকলেও আমি যেসব জায়গাতে থেকেছি সেখানে পাইনি। পেল্লাই মার্কেটগুলো মূলত শহরের বেশ কিছুটা বাইরে — যেখানে যেখানে প্রবাসী ভারতীয়রা থাকে, বা যেখানে আইটি বা বায়ো টেক বা ইউনিভার্সিটি-কে কেন্দ্র করে। সারাজীবন কোন্নগরে কাটিয়েছি বলে এগুলো বেশ নস্টালজিকও। শহরতলির মুদির দোকান, বাসস্টপের গায়ে চপ ও পানের দোকান, রেল লাইনের ধারে ফল-ফুলের দোকানগুলোর একটা চরিত্র আছে — ক্রেতা বিক্রেতার মধ্যে একটা আত্মীয়তার সম্পর্ক। কমিউনিটিগুলো পশ্চিমের মতো বড়ো বড়ো পুঁজিবাদীদের কাছে ম্যাক ডোল্যান্ড, স্টার বাকের মতো অর্থই-ধর্ম আদর্শে আত্ম সমর্পন করেনি। আমি লিস্ট করেছিলাম এই চরিত্রের বৈচিত্র্যগুলো। আমেরিকার বিগ বক্স স্টোর, সুপার মার্কেট, মল — হোল ফুডস, টার্গেট, কসকোর মতো মার্কেটের সঙ্গে ভারতীয়, নেপালি বা বাংলাদেশি স্টোরগুলোর পার্থক্য। প্রধান চরিত্রের জন্য আমার দরকার ছিল কাজটার আর্মেচার — সেটা হল শেল্ফের স্ট্রাকচার। নিজেদের মতো করে কাঠের তক্তা দিয়ে, রং করে বা না করেই তাতে মশলা, চানাচুর, ডাল, ঘি সাজিয়ে বিক্রি শুরু। দেশের বাইরে থাকতে, শহরের প্রবাসী উচ্চবিত্তের উচ্চ শিক্ষিত ঝাঁ চকচকে নাক উঁচু মানুষও — ছোট্ট দোকানে হলদিরামের ডালভাজা বা হিং-এর কন্টেনার খুঁজছে। এই ক্লাস কংশাসনেসটা শেল্ফের চরিত্রের সঙ্গে মেলে না। মিল-অমিল ভাবতে ভাবতেই একদিন একটা শেল্ফ আমার হাতে এল।

সাক্ষী ছিল সিদ্ধার্থ/ সায়ক মিত্র

তবে সেটাও মজার ঘটনা। একটা বিরাট ফ্লোরে আমাদের স্টুডিওগুলো ড্ৰাই-ওয়ালের দেয়াল দিয়ে ভাগ করা। এক সহপাঠী তার দেওয়াল ভেঙে জায়গা বড়ো করবে — পুরো দেয়ালটা একটা ফ্রেমের মতো আটকানো ছিল। একদিকের ড্রাই ওয়াল সরাতেই দেখি মুদির দোকানের শেল্ফ। ড্রাই ওয়াল হল এক ধরনের হালকা জিপসাম বোর্ড; অনেকে স্টাকো ওয়ালও বলে। একেবারে হাতে চাঁদ। এরপর সেটা যত্ন করে এনে শেল্ফ নিজের মতো আইটেম রাখতে শুরু করি। আইটেম হিসেবে মূলত কিছু ছোটো পেইন্টিং যেগুলো ছোটো কাঠের প্যানেলে করা বা ডাম্পস্টারে পাওয়া স্কেচপ্যাড। প্যানেলগুলোতে যুদ্ধ-প্রেমীদের নীতিকথা, ঔপনিবেশিক বা বিশ্বায়নে পুঁজিবাদীদের কবজ, প্রবাসীদের প্রবাস-বিরোধী সংস্কার — এইসব হিউম্যান ফ্র্যাটিলিটিজ। আমি একটা কিছু অস্বচ্ছ লেয়ার খুঁজছিলাম — শেলফের জিনিসগুলোকে দেখা-অদেখার খেলা দেখতে। জুটে গেল জুটের বস্তা। খুব পাতলা। জুটের বস্তা মূলত গার্ডেনিং-এর কাজে লাগে — বুনো গাছ বা ঘাস গজানো আটকানোর জন্য। বাড়ির বাগানে বা সাইড ওয়াকের পাশে দেখা যায়। কিন্তু আমার প্রিয় চালের বস্তা যেগুলো ভারত থেকে আসে। আমি যেটা পেলাম সেটা জুটের রোল — এটাও মনে হয় থিয়েটারের সেটের জন্য লেগেছিল তারপর ঠাঁই হয়েছিল থিয়েটারের গুদামে। এর সঙ্গে বলে নেওয়া দরকার যে ফ্রেঞ্চ ফিলজফার মরিস মেলো পন্টি-র দর্শন আমাকে ইউরো-সেন্ট্রিক কিছু পার্সেপশন বুঝতে সাহায্য করেছিল। বিশেষ করে প্রতিটি বস্তুর যে একটা সত্ত্বা আছে — সেটাকে গ্রহণ করা। এর সঙ্গে থিওলজিক্যালি ভারতীয় অদ্বৈতবাদ দর্শনের যোগ সূত্র দেখা যেতেই পারে। এবার ফর্মালি দিকটাও বেশ মজাদার, একদিক থেকে ওপর দিকে মেলে দিতেই জলরঙের মতো পাতলা ব্রাউন ওয়াশ হয়ে গেল। মেটেরিয়াল নিজেই মাল্টি লেয়ার হিসেবে হাজির। পুরো কাজটা একদম বোস্টনের নেপালি দাদার ‘বোম্বে মার্কেট’ দোকানের মতো লাগছে। কোথায় যেন আমার কোন্নগর, শিক্ষা-তীর্থ বোস্টন একাকার। কাজটার নাম — সাক্ষী ছিল সিদ্ধার্থ।

______________ 
সায়ক মিত্র আমেরিকার পিটসবার্গে বসবাসকারী প্রবাসী-ভারতীয় ভিজ্যুয়াল আর্টিস্ট। প্রায় দুই-দশক ট্রাডিশনাল ও কনটেম্পোরারি নিউ মিডিয়াতে প্র্যাকটিস করছেন। বর্তমানে পিটসবার্গের শেডিসাইড একাডেমিতে শিক্ষকতা করছেন ও আর্ট-এডুকেশন সংস্থার সঙ্গে যুক্ত। ক্ষমতা, উৎখাত, সামাজিক অবিচার, সমাজ-শ্রেণি সমস্যা সায়কের পেইন্টিং, ফটোগ্রাফ, ইন্সটলেশন কাজে উঠে আসে। সায়ক তাঁর ম্যুরাল পেইন্টিংয়ের জন্য ক্যালিফোর্নিয়ার সান্তা বারবারাতে ট্রেসি লি স্টামের সঙ্গে যৌথভাবে হিউ আব্দ মার্জারই পিটারসন অ্যাওয়ার্ড ফর পাবলিক আর্ট (২০২২) পুরস্কার পেয়েছেন।

Written by