
ছোটোবেলায় দূরদর্শনের ‘ছুটি ছুটি’-তে কখনও ‘পথের পাঁচালী’ দেখিয়েছে বলে তো মনে পড়ে না। ‘বাড়ি থেকে পালিয়ে’ একাধিকবার দেখানো হয়েছিল। অপু যেন ছোটো হয়েও ঠিক ‘ছোটোদের’ নয়। সম্পূর্ণ ‘পথের পাঁচালী’ নয়, উপন্যাসের দ্বিতীয় ‘অংশ’-টিই মূলত ছোটোরা পড়ে ‘আম আঁটির ভেঁপু’ নামে। সত্যজিৎ রায়ও শিশু চলচ্চিত্র নির্মাণ করছিলেন। তাঁর নিও রিয়ালিজম চর্চায় অপু এক নিষ্পাপ রিয়্যালিস্ট, যে কখনও প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড় একাত্মতায়, কখনও আবার মৃত্যুর অবশ্যম্ভাবিতার মাধ্যমে জীবনকে ক্রমশ চিনছে। তার এই চেনা প্রায় রাবীন্দ্রিক। ঔপনিষদিকও বলা যায়। ‘আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু… তবু অনন্ত জাগে৷’ অপুকে স্থান-কালে বাঁধা যায় না। সে এক চিরন্তন চৈতন্য, যা আবালবৃদ্ধবনিতাকে ভাবিয়েছে। অন্যদিকে ঋত্বিকের কাঞ্চন স্পষ্টতই এক শিশুতোষ নাগরিক রূপকথার নায়ক। ‘বাড়ি থেকে পালিয়ে’ চলচ্চিত্রে একটা অন্তর্নিহিত বৈপরীত্য আছে। শিশুর মনোরঞ্জন তার উদ্দেশ্য না হলে টাইটেল কার্ড আঁকাবাঁকা শিশুসুলভ হাতের লেখায় লিখিত হত না, কিংবা তা সাজানো থাকত না শিশুর ড্রয়িং-খাতার ছবিতে। অর্থাৎ, চিরন্তনকে ছোঁয়া তার প্রাথমিক উদ্দেশ্য নয়। প্রাথমিক উদ্দেশ্য শিশুমনকে ছোঁয়া৷ তাকে আমরা নাগরিক রূপকথা বলছি বটে। অথচ তা ভীষণ রাজনৈতিক, কালিক ও স্থানিক। পথের পাঁচালী (১৯৫৫) ও বাড়ি থেকে পালিয়ে (১৯৫৮) প্রায় সমসময়ে নির্মিত। বিভূতিভূষণের উপন্যাসটি প্রকাশিত হয় ১৯২৯ সালে। শিব্রাম চক্রবর্তী ‘বাড়ি থেকে পালিয়ে’ লেখেন ১৯৩৭ সাল নাগাদ৷ দুজনের লেখার ঘরানা, উদ্দিষ্ট পাঠককূল, বলা বাহুল্য, আলাদা। শিব্রাম শিশুপাঠ্য ম্যাগাজিনের জন্যই উপন্যাসটি লিখেছিলেন। আবার সত্যজিৎ রায় ও ঋত্বিক ঘটকও চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসাবে দুই ভিন্ন পথের পথিক। তাই অপু আর কাঞ্চনের মধ্যে কিছু মিল থাকলেও, অমিলও বিস্তর। শিশুতোষ যা কিছু, গুরুত্ব সহকারে তার পর্যালোচনা করতে বাংলা সংস্কৃতির একটু সময় লাগে। বাঙালি স্বীকার করেছে যে শিশুতোষ অথচ ধ্রুপদী সাহিত্য সৃষ্টি করতে পেরেছেন সুকুমার রায়৷ কিংবা চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে সত্যজিতের ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’ এমন এক নিদর্শন। কিন্তু সচরাচর বাঙালি শিশুতোষ কোনোকিছুকে ঠিক ততটা আলোচনাযোগ্য মনে করে না৷ তাই হয়তো সত্যজিতের ছোটো অপু যতটা বাঙালির প্রিয় পাত্র, কাঞ্চন ততটা হয়নি। কিন্তু ‘ছুটি ছুটি’-র ক্ষুদে দর্শকদের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা ছিল প্রশ্নাতীত। (পথের পাঁচালীর অপু এবং বাড়ি থেকে পালিয়ের কাঞ্চন)
সত্যজিৎ-এর চিরন্তনকে বোঝা যদি শিশুর পক্ষে দুষ্করও বটে, কিন্তু কাঞ্চনের নাগরিক একাকিত্ব, বিভ্রান্তি, আত্ম-সংকটও কি তার পক্ষে অনুভব করা কঠিন হতে পারত না? অথচ হয়নি। দুই চরিত্রই বাড়ি ও পথের টানাপোড়েনে দোদুল্যমান৷ ঘর ও বাহিরের ঘাত-প্রতিঘাতে তারা দুজনেই গড়ে ওঠে।
সত্যজিৎ-এর চিরন্তনকে বোঝা যদি শিশুর পক্ষে দুষ্করও বটে, কিন্তু কাঞ্চনের নাগরিক একাকিত্ব, বিভ্রান্তি, আত্ম-সংকটও কি তার পক্ষে অনুভব করা কঠিন হতে পারত না? অথচ হয়নি। দুই চরিত্রই বাড়ি ও পথের টানাপোড়েনে দোদুল্যমান৷ ঘর ও বাহিরের ঘাত-প্রতিঘাতে তারা দুজনেই গড়ে ওঠে। কিন্তু সত্যজিৎ (তথা বিভূতিভূষণ) পথ-কে আশার প্রতীক হিসেবে উপস্থান করেন৷ কাঞ্চনের পথ শিশুকে ক্লান্ত করে তুলতে পারত, কারণ সেখানে বাস্তবতা নিতান্তই ছাল-ছাড়ানো, উদগ্র। ‘পথের পাঁচালী’-তে দারিদ্র আছে৷ তা নিয়ে বিশ্বজোড়া চর্চাও হয়েছে। কিন্তু সেই দারিদ্র্য ‘বাড়ি থেকে পালিয়ে’-র সেই দৃশ্যের মতো ক্রূর নয়, যেখানে ভিখারিরা বিয়েবাড়ির উচ্ছিষ্ট খুঁটে খায়৷ তবু ‘বাড়ি থেকে পালিয়ে’ শিশুতোষ, আর ‘পথের পাঁচালী’ প্রাপ্তবয়স্ক মননেই ছাপ ফেলে বেশি। কেন? (পথের পাঁচালীর অপু এবং বাড়ি থেকে পালিয়ের কাঞ্চন)

অপু একদিকে কৌতূহলী ও স্বপ্নময়, অন্যদিকে সংবেদনশীল ও পর্যবেক্ষক। বিভূতিভূষণ লেখেন— ‘অপুর চোখে সবই নতুন, সবই বিস্ময়কর—বন, মাঠ, নদী, আকাশ, এমনকি পথের ধুলোও।’ কাঞ্চনও এলডরেডোয় ডাক শুনতে পায়। কিন্তু তার পথে বেরিয়ে পড়া শুধু অভিযান নয়, সামাজিক নিঃসঙ্গতার পরিণাম। ‘কাঞ্চন জানত না কেন তার ঘরে থাকা দমবন্ধ লাগে, কেন রোজকার কথাবার্তায় তার এত বিতৃষ্ণা।’ কাঞ্চন যেন সামাজিক একাকিত্বের নিরিখে আরও বেশি ‘আধুনিক’ এক মানুষ। তার নিঃসঙ্গতা অস্বস্তিকর৷ অবশ্য শিশুর বোঝার উপযোগী গৃহত্যাগের এক কারণও রাখা হয়েছে গল্পে। আপাতভাবে কাঞ্চন পালায় বাবার শাসনের ভয়ে৷ তাই শিশুদের একাত্মবোধ করতে অসুবিধে হয় না। (পথের পাঁচালীর অপু এবং বাড়ি থেকে পালিয়ের কাঞ্চন)
‘পথের পাঁচালী’ উপন্যাসটি অপুর একান্ত বিল্ডুংসরোমান হলেও, ছবিটি দুর্গারও, সর্বজয়া, হরিহর এবং ইন্দির ঠাকরুনেরও। এই পরিবারকে ছবিটি ধরে অপুর জন্মের আগে থেকে। অবশ্য বিভূতিভূষণের ‘পথের পাঁচালী’র প্রথম অংশ ‘বল্লালী বালাই’-তেও মূলত আছে ইন্দির ঠাকরুনের কথা, সর্বজয়া আর হরিহরের কথাও। দ্বিতীয় অংশ ‘আম আঁটির ভেঁপু’-তেই অপুর কীর্তিকলাপের সঙ্গে আমরা পরিচিত হলাম৷ আমরা অপুকে চোখের বড়ো হতে দেখি। তার পাঠশালা যাওয়া, পণ্ডিত মশাইয়ের চাল বিক্রি করতে করতে পড়ানো, দিদির সান্নিধ্যে প্রকৃতি দেখা সবই আমরা দেখি। আমরা দেখি দুর্গার নোলা, সর্বজয়ার ক্ষুদ্রতা দেখি। রবিশংকরের সেতারের মূর্চ্ছনার মাঝে কাশফুলে ঢাকা মাঠের মধ্যে দিয়ে যখন অপু ছুটে যায় দুর্গার হাত ধরে আর ট্রেন ধেয়ে আসে, সেই মুহূর্তে আমরা বুঝি, অপুর চেতনায় বহির্বিশ্বের অভিষেক ঘটছে। শেষত আমরা দেখি, অপু, বা একজন মরমী শিশু, কীভাবে জীবনের চরমতম সত্যকে গ্রহণ করতে শেখে। সে সত্য হল মৃত্যু। পুরো ছবিতে খুব কম সংলাপ আছে অপুর। কম কথাই অপুর চরিত্রকে গড়ে তোলে। সে যে গভীর ভাবে অনুভব করে সব কিছু, ডাগর চোখ মেলে সব কিছু দেখে, তা বোঝানোর জন্য অভিব্যক্তি, আবহসংগীত বেশি জরুরি সংলাপের থেকে। পাঠশালার পণ্ডিত মশাইয়ের আচরণ, রাতের যাত্রা পালা, দিদির ব্যথাতুর চোখ, কিছুই এড়িয়ে যায় না তার পর্যবেক্ষণ। সে শান্ত, ধীর। দার্শনিক। (পথের পাঁচালীর অপু এবং বাড়ি থেকে পালিয়ের কাঞ্চন)
অন্যদিকে ‘বর্ণপরিচয়ের’ গোপাল-রাখাল বাইনারিতে শিবরাম বা ঋত্বিক উভয়ই যে রাখালের দলে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না৷ তাই কাঞ্চনও তদনুরূপ। ধীরতা তার স্বভাবে নেই৷ ব্রাহ্মণবালক বিনোদ নিয়ম-মানা গোপাল হলে, কাঞ্চন নিয়মভাঙা রাখাল। কাঞ্চনের হেডমাস্টার বাবা কিন্তু তাকে চাণক্য শ্লোক-নির্দিষ্ট পথেই চালনা করতে চান। ব্রাহ্মণ্যবাদ-সীমায়িত সেই পরিসরকে হেলায় অগ্রাহ্য করে বিনোদ পাড়ি দেয় তার ‘এলডরেডোয়’, কলকাতায়। স্টেটাস-কো-কে ছিঁড়েখুড়ে ফেলাতেই যে কাঞ্চনের স্বস্তি, তা প্রতিভাত হয়, যখন তার আক্রমণে বিনোদের পৈতে যায় ছিঁড়ে৷ (পথের পাঁচালীর অপু এবং বাড়ি থেকে পালিয়ের কাঞ্চন)
কাঞ্চনও দেখতেই চায়। কিন্তু গ্রাম্য প্রকৃতিতে নিহিত শ্বাশ্বত প্রকৃতিকে নয়। সে শহর দেখতে চায়। দারিদ্র্য তাকে আশৈশব গ্রাস করেনি৷ দারিদ্র্য সে দেখে শহরে এসে। শহরের বুকে একাকী কাঞ্চনের ক্ষতবিক্ষত হওয়ার সম্ভাবনা আরও বেশি৷ কিন্তু তার চোখে পরিচালক শৈশবের রংচশমা পরিয়ে দিয়েছেন। তাই হাওড়া ব্রিজের ওপারে সূর্যোদয়ের সময় ক্যামেরায় শহরকে মায়াময় দেখায়। ক্যামেরা তো কাঞ্চনের চোখ! কিন্তু তারপরেই ধেয়ে আসে বড়ো বড়ো মোটরগাড়ি৷ ঋত্বিক ব্যবহার করেন তাঁর পছন্দের লো অ্যাঙ্গেল শট, যা ছোট্ট মানুষটির দৃষ্টিভঙ্গির দ্যোতক৷ গাড়ি-ঘোড়া-ট্রাম-হাইরাইজ সবকিছুই বিশাল বড়ো লাগে৷ শহর কাঞ্চনের কাছে কিন্তু অবিমিশ্র খারাপ হিসেবে ধরা দেয় না। মিনির বাড়ির ছাদ থেকে শহর দেখে কাঞ্চন বলে ওঠে, ‘বাঃ!’ এ শহরে কাঞ্চন খুঁজে পায় উদ্বাস্তু স্কুলমাস্টার হরিদাসকে, যে দাড়িগোঁফ লাগিয়ে ঝোলা নিয়ে এক শিশুতোষ ভেক ধরে বুলবুলভাজা ফিরি করে। হরিদাস উদ্বাস্তু অভিজ্ঞতাও শিশুর মনোমতো করে বোঝাতে পারে—বলে, সে-ও বাধ্য হয়েছে ‘বাড়ি থেকে পালিয়ে’ আসতে। আবার, হরিদাসের মা-ও ‘বাড়ি থেকে পালিয়ে’ গেছেন, আসলে চলে গেছেন ইহলোক থেকে৷ সেই মা আর ফেলে আসা দেশ-মা এক হয়ে যায় তার বর্ণনে। লক্ষ্যণীয়, শৈশব আশ্চর্যভাবে বেঁচে আছে হরিদাসের মধ্যে। সেই বাউলের মধ্যেও, যে গায় ‘আমি অনেক ঘুরিয়া শ্যাষে আইলাম রে কলকাতা/ হেথা রকম সকম দেইখ্যা আমার ঘুইরা গ্যাসে মাথা।’
অপু মৃত্যুকে চেনে কখনও নিঃসাড়ে—যেমন ইন্দির ঠাকরুনের মৃত্যুদৃশ্যে কোনো বাড়াবাড়ি নেই, শুধু এক ঘটির গড়িয়ে যাওয়া। আবার কখনও তীব্র নিনাদে—যেমন দুর্গার মৃত্যুর রাতে ঝড়ের দাপটে বাড়ির জানালা দরজা প্রবল শব্দে বারবার ধাক্কা খায়, ধাক্কা দেয় বুকে। দুর্গার মৃত্যু অপুকে খানিক বড়ো করে দেয়। সে আর ‘নেবুপাতা করমচা আয় বৃষ্টি থেমে যা’ নামক শিশুভোলানো ছড়ায় বিশ্বাস করে না৷ আকাশে মেঘ দেখলে ফিরে এসে ছাতা নিয়ে বেরোয়৷ সে মৃত দিদির নাকছাবি চুরির অপরাধটি সুচতুর ভাবে ঢেকে দেয়। সে সেই পথের দেবতার কাছে আত্মসমর্পণ করে, যিনি মৃত্যু ও শোকের মাঝেও জীবনকে বহমান রাখেন। কাঞ্চন মৃত্যুকে দেখে অন্যভাবে। মিনির মায়ের মৃত্যু তাকে অভিজ্ঞ করে বটে, কিন্তু বোবা-ভেকধারী ভিখারি ছেলের যে শোষিত জীবন সে দেখে, তা মৃত্যুর চেয়েও ভয়ংকর৷ মৃত্যুতে তবু ‘ক্লোসার’ আছে। শিশুশ্রমের বীভৎসতায়, উদ্বাস্তু জীবনের নির্মমতায় ‘ক্লোসার’ নেই। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, শিব্রাম কিন্তু বাড়ি থেকে পালিয়ে-কে স্থাপন করেছিলেন স্বদেশী আন্দোলনের কালে, কারণ সেটাই তাঁর সমকাল, তিনি নিজেও ছিলেন অসহযোগী৷ কিন্তু ঋত্বিক গল্পকে এনে ফেলেছিলেন পঞ্চাশের দশকে, দেশভাগজনিত বীভৎসতার মাঝে।
অপু বারবার আহত হয়। কিন্তু আমরা তাকে ভেঙে পড়তে দেখি না৷ সে হয়তো বিশ্বপ্রাণের সন্ধান পেয়েছে। কাঞ্চন, বীর কাঞ্চন, কিন্তু ভেঙে পড়ে। বলে, ‘এত দুঃখ কেন?’ তার এলডরেডো খানখান হয় তারই চোখের সামনে। তবু সে টিকে যায়৷
অপু বারবার আহত হয়। কিন্তু আমরা তাকে ভেঙে পড়তে দেখি না৷ সে হয়তো বিশ্বপ্রাণের সন্ধান পেয়েছে। এদিক ওদিক কিছু সেলাই ছিঁড়ে গেলেও আদতে সার্বিকভাবে জগতজোড়া বৃহৎ নকসিকাঁথাটি যে অমলিন আছে, তা যে অক্ষয়, তা যেন সে জেনে গেছে। কাঞ্চন, বীর কাঞ্চন, কিন্তু ভেঙে পড়ে। বলে, ‘এত দুঃখ কেন?’ তার এলডরেডো খানখান হয় তারই চোখের সামনে। তবু সে টিকে যায়৷ টিকে যায় কারণ ঋত্বিক বা শিব্রাম কেউই চান না তাকে হারিয়ে দিতে, শিশু হিসেবে এটুকু পক্ষপাত সে পায়। নীতা বাড়ি ফিরতে পারে না। সীতাও ফিরতে পারেনি। কিন্তু কাঞ্চন পারে।

‘এত দুঃখ’ সত্ত্বেও ‘বাড়ি থেকে পালিয়ে’ এক আদ্যন্ত শিশুতোষ চলচ্চিত্র কীভাবে হয়ে ওঠে? কেন তা এক আধুনিক নাগরিক রূপকথা? এই যে কাঞ্চনের তিন মা (নিজের মা, মিনির মা ও শহরে পাওয়া এক খেটে-খাওয়া মা), এই যে হরিদাস, মিনির বাবা, এঁরা কাঞ্চনকে ঘিরে থাকেন৷ হঠাৎ ক্ষুধার্থ কাঞ্চনকে ছাতু খাওয়ান যে হিন্দুস্থানি ফিরিওয়ালা, ট্রামে টিকিটহীন যাত্রা করতে দেন যে কন্ডাকটার, তাঁরাও তার মাথায় অদৃশ্য হাত দিয়ে বিলি কেটে দেন। তাই রূপকথা মরে না। হরিসাস নিজের দাড়ি আর ঝোলা যখন কাঞ্চনকে উপহার দেয়, তখন সে যেন সুদূরের নেশা ত্যাগ করে। জগৎ উপলব্ধির ভার তখন নতুন শিশুর৷ হরিদাসের স্ব-আরোপিত কাজ হয়ে ওঠে গ্রামগঞ্জ থেকে পালিয়ে আসা শিশুদের শহরের বুকের সমস্ত বিপদ থেকে, সমস্ত দুঃখযন্ত্রণা থেকে বাঁচিয়ে রাখা। যাতে তাদের রূপকথা বেঁচে থাকে। পরিযায়ী পাখিদের আশ্রয় দেওয়া ঝিল হয়ে যায় হরিদাস, যাতে পাখিরা বাড়ি ফিরে রূপকথার গল্প শোনাতে পারে৷ তা শুধুই সুখের গল্প নয়, দুঃখের ও ভয়ের আখ্যানও আছে। তবু তা রূপকথা। এন্ড ক্রেডিটে আবার শিশুর হাতে আঁকা ছবিতে দেখা যায় হরিদাসের ঝোলা আর দাড়ি পরে কাঞ্চন নৌকা বেয়ে পাড়ি দিয়েছে দূর দেশে৷ কিন্তু এইবার হরিদাসের ছোঁয়ায় তার ‘ইনোসেন্স’, ‘এক্সপিরিয়েন্স’-কে মাড়িয়ে এসেই হয়ে উঠেছে এমন কিছু, যাকে উইলিয়াম ব্লেক ‘হায়ার ইনোসেন্স’ ভাবতেন। কোনোকিছুতেই এখন তার মনের শিশুটিকে মেরে ফেলতে পারবে না।
অপু সেই ‘হায়ার ইনোসেন্সে’ পৌঁছয় তার নিজস্ব পথে৷ ট্রিলজি পুরোটা দেখে ফেললে আমরা বুঝি, সেই যাত্রা সম্পূর্ণ হয় শেষ শোকটুকুও জয় করার পর। তার যাত্রাটি সেই উচ্চতম সারল্যে পৌঁছনোর সুরেই যেন আশৈশব বাঁধা ছিল। সে যাত্রা যত না বহির্মুখী, তার চেয়ে ঢের বেশি অন্তর্মুখী। চলমান রাজনীতি ও সমাজবাস্তবতার ঊর্ধ্বেও মানুষের এক নিজস্ব যাত্রা থাকে, অপু তারই প্রতিভূ। সুদূর অভিজ্ঞতার ডালি নয়, জীবনের প্রতি গভীর মমত্ববোধ তার বেলাশেষের অর্জন। তার নীরবতা ও আবহ সংগীতের মিশেলে জীবনবোধের যে পাঁচালী লেখা হয়, তা কাব্যের মাত্রা পায়।
কাঞ্চন তার অনভিজ্ঞতায় আর সাহসে, অভিযানপ্রিয়তায় ও আশঙ্কায় শিশুকে স্বাভাবিক ভাবেই স্পর্শ করে। সেই শিশুকে, সে বড়ো হয়ে দেশভাগকে আরও বীভৎসভাবে চাক্ষুষ করে ঋত্বিকের পার্টিশন ট্রিলজিতে। তারপর যখন সেই প্রাপ্তবয়স্কর অস্থির লাগবে, তাকে হতাশা গ্রাস করবে, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে নিজেকে অসহায় মনে হবে, তখন অপু তাকে আশ্বস্ত করতে পারবে নিশ্চয়৷ বলতে পারবে, ‘সে পথের বিচিত্র আনন্দ রঙের অদৃশ্য তিলক তোমার ললাটে পরিয়েই তো তোমায় ঘরছাড়া করে এনেছি, চল এগিয়ে যাই।’

