
লাহোর-করাচিতে গজল গেয়ে বেড়াতেন গোলাম মুস্তাফা নামে
সতীনাথ মুখোপাধ্যায় প্রয়াত হন ১৯৯২ সালের ১৩ ডিসেম্বর। কলকাতার পিজি হাসপাতালে বুকের ব্যথায় আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হন। তারপর প্রয়াত হন সেখানেই। সতীনাথ মুখোপাধ্যায়ের জন্ম ১৯২৫ সালে। বাবার চাকরিসূত্রে লখনৌতে জন্ম হলেও ছোটোবেলাতেই সতীনাথ চলে আসেন হুগলির চুঁচুড়ায়। এখানেই তাঁর বেড়ে ওঠা ও বিএ পর্যন্ত লেখাপড়া। এরপর এমএ পড়ার জন্য চলে আসেন কলকাতায়। পড়া বাদ দিয়ে সতীনাথ চিন্ময় লাহিড়ীর কাছে শাস্ত্রীয় সংগীত চর্চা করেন। আধুনিক বাংলা গান, নজরুল সংগীত ও গজল শিল্পী হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন। কণ্ঠশিল্পীর বাইরেও তিনি ছিলেন একজন গীতিকার ও সংগীত পরিচালক।
গানের কোনো লাইন যখনই মনে আসতো তখনই লিখে ফেলতেন। গান মনে এল তো, সিগারেটের প্যাকেট ছিঁড়ে তাতেই কথা লিখেছেন। নোটেশন করেছেন। চাঁদনি রাতে গাড়িতে যেতে যেতে হঠাৎই লিখে ফেলছেন, ‘জীবনে যদি দীপ জ্বালাতে নাহি পারো’ কিংবা ‘এখনও আকাশে চাঁদ ওই জেগে আছে’।
পঞ্চাশ আর ষাট দশক ছিল অনেকের মতে বাংলা আধুনিক গানের স্বর্ণযুগ। কথা ও সুর সেই সময়ে একে অন্যের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে শ্রোতাদের মন জয় করেছিল। সুরকারদের মধ্যে ছিলেন সলিল চৌধুরী, সুধীন দাশগুপ্ত, সতীনাথ মুখোপাধ্যায়, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, শ্যামল মিত্রের মত দিকপালেরা। আর গীতিকার হিসেবে ছিলেন গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার, শ্যামল গুপ্ত, পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়, বিমল ঘোষের মতো প্রতিভাবান লেখকের দল।
ছোটোবেলা থেকেই সতীনাথ সংগীতানুরাগী ছিলেন। সে সূত্রে শাস্ত্রীয় সঙ্গীত, ধ্রুপদ-ধামার-টপ্পা শেখেন। ঠাকুরদা রামচন্দ্র বেহালা বাজাতেন ও বাবা তারকচন্দ্র গান গাইতেন। তবে কেউ পেশাদারি ছিলেন না। কর্মজীবনে যোগদান করেন কলকাতার অ্যাকাউন্টেন্স জেনারেল (এজি বেঙ্গল)-এ। ১৯৬৮ সালে সতীনাথ সংগীত শিল্পী উৎপলা সেনের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন।
নজরুলগীতিরও তিনি জনপ্রিয় শিল্পী ছিলেন। ‘রমজানের ওই রোজার শেষে এল খুশির ঈদ’ সম্ভবত তাঁর কণ্ঠেই প্রথম রেকর্ড হয়েছিল। ১৯৪২ সালে সতীনাথ প্রথম রেকর্ড করলেন নজরুলগীতির। ‘ভুল করে যদি ভালোবেসে থাকি’। তুমুল সাড়া পেল। কিন্তু পরের গানের রেকর্ড ‘আমি চলে গেলে পাষাণের বুকে লিখো না আমার নাম’ আর ‘এ জীবনে যেন আজ কিছু ভালো লাগে না’ যখন বেরোল, তত দিনে পেরিয়ে গেছে দশটি বছর!
তাঁকে নিয়ে ছড়িয়ে আছে মজার মজার গল্প। সময়টা পঞ্চাশের শুরু। কলকাতার এক বিখ্যাত জলসার আসর। উস্তাদজির গানের পর মঞ্চে উঠবেন লতা মঙ্গেশকর। এই দুই শিল্পীর মাঝখানের সময়টুকু ভরাট করতে গান গাইতে বসবেন এমন কাউকে পাওয়া যাচ্ছে না। সতীনাথ এগিয়ে এলেন। সদ্য যুবক। আহির-ভৈঁরো রাগে ধরলেন ‘না যেও না গো চলে যেয়ো না’। গান শেষ হতে শ্রোতারা উচ্ছ্বসিত। ‘এনকোর এনকোর’। তন্ময় সতীনাথ শুনলেন ‘নো মোর নো মোর’। উঠে পড়তে যাচ্ছিলেন। ভুল ভাঙাতে মঞ্চে উঠে এলেন লতাজি। গ্রিন রুমে জড়িয়ে ধরলেন উস্তাদ বড়ে গোলাম আলি। বললেন, ‘তুমি সতীনাথ নও, শিউনাথ (শিব)।’
আবার, রান্নার পাশাপাশি জমিয়ে বাজারও করতেন সতীনাথ। নিউমার্কেটে তাঁর বাঁধা মুরগিওয়ালা ছিলেন আলাউদ্দিন। উর্দুভাষী। আর নিজে উর্দুটা যেহেতু বলতে, লিখতে পারতেন, সতীনাথ তাঁর সঙ্গে উর্দুতেই কথা বলতেন। সে-উর্দু এতটাই চোস্ত ছিল, আলাউদ্দিন ধরেই নিয়েছিলেন খদ্দের বাবুটি মুসলিম। কিন্তু তাঁর খটকা লাগত অন্য জায়গায়। একদিন আর থাকতে না পেরে বলেই ফেললেন, ‘আপ মুসলমান হোকে ধোতি কিঁউ প্যাহেনতে হ্যায়?’ শেষে গলার উপবীত দেখিয়ে তাকে বোঝানো গিয়েছিল, ‘না বাবা, আমি মুসলিম নই, হিন্দু ব্রাহ্মণ।’
উর্দুটা ভালো জানতেন বলে গজলটাও ভালো গাইতেন। ’৪৭-এর আগে লাহোর-করাচিতে গজল গেয়ে বেড়াতেন গোলাম মুস্তাফা নামে। অনেকটা সেই কাশেম মল্লিক যেমন ভক্তিগীতি গাইতে গিয়ে কে মল্লিক হয়েছিলেন, তেমন।

আরেকটি ঘটনা এইরকম — নতুন গানের সুর ভাঁজতে গিয়ে বেখেয়ালে নিয়ম ভেঙে থানাতেও গেছেন। ভুল পার্কিং করে ফেলেছিলেন। ট্রাফিক পুলিশ সোজা পার্ক স্ট্রিট থানায় ধরে নিয়ে যান। তাতেও হুঁশ নেই। থানার চেয়ারে বসে বসেই সুর লাগাচ্ছেন। গলা শুনে ওসি ছুটে এসে দেখেন সতীনাথ মুখোপাধ্যায়! তখন সেই ট্রাফিক পুলিশেরই সাজা হয় আর কী!
আরেকটি ঘটনা তো আরও অবাক করার মতো — চল্লিশের দশক। হুগলি মহসিন কলেজে ফুটবল ম্যাচ হচ্ছে। গোলকিপিং করছে যে ছেলেটি, সে মাঝে মাঝেই গুন গুন করে গান গায়। দর্শক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সতীনাথ। তাঁর কানে গেল সেই গান। খেলা শেষে ছেলেটিকে ডেকে নিয়ে তিনি কলকাতায় গিয়ে ভালো গান শেখার পরামর্শ দিলেন। সে দিনের সেই গোলকিপার, পরবর্তীকালের শ্যামল মিত্র। অবিশ্বাস্য হলেও এটাই চরম সত্যি।
তথ্যঋণ – রাইজিংবিডি.কম
