শীতকালীন সাজে বাংলার মেয়েদের হাতে বোনা কাঁথা-সেলাইয়ের উত্তরীয়

শান্তিনিকেতনের ‘আমার কুটির’ এই কাঁথা সেলাইয়ের নানা সামগ্রীর জন্য বিশ্বাসযোগ্য একটি বিপণি

জিআই (Geographical Indications) তকমা পাওয়া এই সূচীশিল্পটিকে (Kantha Stich) জনমানসে বিপুল ভাবে ছড়িয়ে দেওয়ার নেপথ্যে রয়েছে কবি জসীমুদ্দিনের ‘নকশি কাঁথার মাঠ’, এ কথা অনস্বীকার্য। দুহাজার বছরেরও বেশি পুরোনো এই বিশিষ্ট শিল্পকর্মটি ভারতীয় উপমহাদেশের নানা অঞ্চলে দেখা গেলেও, বাঙালির সংস্কৃতিবলয়ে এর প্রকাশ ঘটেছে এক অনন্য নিজস্বতায়। দুর্জনি থেকে জায়নামাজ, আর্শিলতা থেকে বাতায়ন, খিচা থেকে সুজনি—বহু বিচিত্র আকারে এবং নামে তার পরিচিতি। রানফোঁড়, ডালফোঁড়, ক্রশফোঁড়, বেঁকিফোঁড়, জালিফোঁড়—সুচসুতোর নানান কারুকৃতিতে তার উদ্ভাস। বাংলার মেয়েরা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে, প্রীতি-অনুরাগ দিয়ে এই শিল্পকলাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। আমরা জানি যে, শান্তিনিকেতনের ‘আমার কুটির’-এই কাঁথা সেলাইয়ের নানা সামগ্রীর জন্য বিশ্বাসযোগ্য একটি বিপণি। শীতকালে যাঁরা ‘ফ্যাশন-স্টেটমেন্ট’-এ বাড়তি মাত্রা যোগ করতে চান, তাঁরা একবার এই বিপণির কাঁথা-সেলাইয়ের উত্তরীয়র (Kantha Stiched stole) কথা ভেবে দেখতে পারেন। না, তার জন্য আপনাকে আর শান্তিনিকেতন ছুটতে হবে না, এবার আমার কুটির-এর সামগ্রী পৌঁছে যাবে আপনার দোরগোড়ায়। সৌজন্যে অনলাইন বিপণি ‘দ্য বেঙ্গল স্টোর’(The Bengal Store)।  

কাঁথা সেলাইয়ের উত্তরীয়, ডায়েরি, গয়নার বাক্স, মাদুরকাঠির কোস্টার – ‘আমার কুটির’-এর বিভিন্ন হস্তশিল্প সামগ্রী এই প্রথম পাওয়া যাচ্ছে অনলাইনে। দ্য বেঙ্গল স্টোর-এর পক্ষ থেকে অরিজিৎ সেন বলছিলেন, “এরকম একটা ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আমাদের এই ছোটো অনলাইন বিপণির নাম জুড়ে যাওয়ায় সত্যিই খুব ভালো লাগছে। এই উদ্যোগ রবীন্দ্রনাথ বা সুষেণ মুখার্জির গ্রামোন্নয়নের কর্মপদ্ধতির আদর্শকে আগামীতে আরও এগিয়ে নিয়ে যাক, এটাই চাই।”

পুরুষ-মহিলা নির্বিশেষে (শান্তিনিকেতনের স্থানীয় মহিলারা সেভাবেই ডিজাইন করেছেন) যে কেউ এই উত্তরীয় সারা বছরই ব্যবহার করতে পারবেন। তবে, শীতকালীন সাজে রং-বেরঙের কাপড়ের উপর রঙিন সুতো দিয়ে সূক্ষ কাঁথা সেলাইয়ের কাজ আপনার ফ্যাশন-রুচিতে বাড়তি মাত্রা যোগ করবে, এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। তাছাড়া ঠান্ডা মরসুমে কাঁথা-সেলাইয়ের উত্তয়ীর আমারদায়ক উষ্ণ অনুভূতি দেয়। আপনি চাইলে ট্রাঙ্কের কভার হিসেবে, বিছানার স্প্রেড হিসেবে শোভা বর্ধনের জন্য কিংবা কাউকে উপহার দিতে ব্যবহার করতে পারেন কাঁথা-সেলাইয়ের উত্তরীয়।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রতিষ্ঠিত শ্রীনিকেতনের গ্রামোন্নয়নের কর্মপদ্ধতির আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে প্রয়াত স্বাধীনতা সংগ্রামী সুষেণ মুখার্জি (Sushen Mukherjee) ১৯২৩ সালে গড়ে তুলেছিলেন ‘আমার কুটির’ (Amar Kutir)। ১৯৩২ সালে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের (Freedom Fighter) আশ্রয় দেওয়ার অপরাধে আমার কুটিরের কাজকর্ম ব্রিটিশ পুলিশের নজরে আসে এবং ১৯৩৭ সাল পর্যন্ত কারাগারে কাটাতে হয় সুষেন মুখার্জিকে। তার ফলে বেশ কিছুদিনের জন্য আমার কুটিরের কাজকর্ম বন্ধ হয়ে যায়। নানা কারাগারে কাটানোর সময় সুষেণ মুখার্জির সঙ্গে পরিচয় হয় পান্নালাল দাশগুপ্ত, মণি গাঙ্গুলী প্রমুখ স্বাধীনতা সংগ্রামীদের। ১৯৩৮ সালে তদানিন্তন ইংরেজ সরকার কারাগারগুলি থেকে বিপ্লবীদের মুক্তি দিতে শুরু করে। সুষেণ মুখার্জির আহ্বানে বাংলার বিপ্লবীদের একাংশ আমার কুটিরে এসে বসবাস শুরু করেন এবং গড়ে তোলা হয় কম্যুন।

স্বাধীনোত্তরকালে আমার কুটির গ্রামোন্নয়ন সংগঠনে পরিণত হয় এবং মূল লক্ষ্য হয়ে ওঠে গ্রামীণ কুটির শিল্পের উন্নতি ও আত্মনির্ভরশীল মানুষ তৈরির মধ্য দিয়ে উন্নয়নের ধারাকে অব্যাহত রাখা। প্রাক্তন বিপ্লবী ও সমাজসেবী পান্নালাল দাশগুপ্তের প্রচেষ্টায় ১৯৭৮ সালে ‘আমার কুটির সোসাইটি ফর রুরাল ডেভেলপমেন্ট’ শিরোনামে নথিভুক্ত স্বেচ্ছাসেবী সংস্থায় পরিণত হয়। তখন থেকে এখনও পর্যন্ত আমার কুটির গ্রামীণ হস্তশিল্প বিকাশে প্রশিক্ষণ, উৎপাদন ও বিক্রয়ে সহায়তা করে চলেছে। বর্তমানে আমার কুটির সামাজিক উন্নয়নমূলক কাজ এবং সহস্রাধিক হস্তশিল্পীকে বিভিন্ন প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণ দানের সঙ্গে যুক্ত, বিশেষত মহিলাগোষ্ঠী ও উদ্যোগীদের নানা ভাবে সহায়তা দিয়ে থাকে।

‘দ্য বেঙ্গল স্টোর’ থেকে আমার কুটির-এর উত্তরীয় কিনতে চাইলে এখানে ক্লিক করুন।

Developed by DXDasia