এবার অস্ত্রোপচার সম্ভব হবে স্পর্শ ছাড়াই! পথ দেখালেন নদিয়ার ছেলে শামিম খান

গবেষণাপত্রটি প্রকাশ পেয়েছে বিখ্যাত নেচার জার্নালে

শামিম খান

জৈব ধাতব কেলাস দ্বারা আলোকশক্তির যান্ত্রিক শক্তিতে রূপান্তর। এক কথায় এভাবেই বর্ণনা করা যায় ডঃ শামিম খানের গবেষণাকে। যা প্রকাশিত হয়েছে বিখ্যাত নেচার জার্নালের পোর্টফোলিও জার্নাল কমিউনিকেশন কেমিস্ট্রি (Communication Chemistry)-তে। ডঃ শামিম খান (Dr. Samim Khan) এই গবেষণাপত্রটির প্রথম প্রণেতা। বর্তমানে কলকাতার আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয় (Aliah University Kolkata)-এর রসায়ন বিভাগের পোস্ট-ডকটরাল গবেষক। এই গবেষণার কাজটি সম্পন্ন হয়েছে আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ডঃ মহম্মদ হেদায়েতুল্লাহ মীর-এর অধীনে। গবেষণায় সহায়তা করেছেন আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেকজন প্রাক্তন গবেষক ডঃ বাসুদেব দত্ত (Dr. Basudeb Dutta) (বর্তমানে জাপানে গবেষণারত), সানোবার নাজ (Sanobar Naaz), আইআইটি ভিলাইয়ের ডঃ রাঘবেন্দর মেডিশেট্টি, ডঃ আদিত্য চৌধুরি, আয়ারল্যান্ডের লিমেরিক বিশ্ববিদ্যালয়ের (University of Limerick, Ireland) ডঃ সারা গুয়েরিন।

আলোকশক্তি থেকে যান্ত্রিক শক্তিতে রূপান্তরিত করার অনেক যন্ত্র আছে। যেমন- সৌরকোষ, লেজার মোটর, মাইক্রোওয়েভ ওভেন ইত্যাদি। কিন্তু ন্যানো-ক্রিস্টালগুলিকে (Nano-Crystal) নিয়ন্ত্রণ করে আলোকশক্তিকে যান্ত্রিক শক্তিতে পরিবর্তিত করা, তাও বৃহৎ পরিমাণে, এই প্রথম। বিশদে বলা যায়- ১৮৩৪ সাল থেকেই জানা গিয়েছিল, কিছু কেলাস আছে, যারা সূর্যের আলো পড়লে নড়াচড়া করে। কেলাসের অণুগুলি কখনও লাফিয়ে ওঠে, কখনও একটি বিশেষ দিকে বেঁকে যায় ইত্যাদি। কিন্তু এমন কোনও কেলাস, যার প্রাথমিক/মূল গঠনটি পুরোপুরি সুসজ্জিত নয়, তার থেকে আলোকরশ্মির মাধ্যমে প্রভূত পরিমাণে যান্ত্রিক শক্তি পাওয়া এর আগে সম্ভব হয়নি। “আমরা দুটি কেলাস তৈরি করেছিলাম। একটি জিঙ্ক/জিংক (Zn) ধাতুর এবং একটি ক্যাডমিয়াম (Cd) ধাতুর। দুটির কেলাসের মূল গড়ন প্রায় একই। কেলাসের ক্ষেত্রে একটি বিশেষ গড়নের পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে গোটা কেলাসটি তৈরি হয়। উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, লবণের ক্ষেত্রে, সোডিয়াম (Na) এবং ক্লোরিন (Cl) পরমাণুগুলি একত্রে মিলে একটি ঘনকের আকার তৈরি করে, যা একটি নির্দিষ্ট দিকে সজ্জিত থাকে। এই গড়নটিই সারা কেলাস জুড়ে পুনরাবৃত্ত হয় ও তাদের বৈশিষ্ট্য অপরিবর্তিত থাকে। কিন্তু কিছু কেলাসের ক্ষেত্রে এই পুনরাবৃত্তি হলেও তাদের বৈশিষ্ট্য আলাদা হতে পারে। তাদের আমরা অ্যানাইসোট্রপিক কেলাস (Anisotropic Crystal) বলি। জিঙ্ক/জিংক তেমনই এক ধরনের কেলাস”, বঙ্গদর্শন.কম-কে জানান শামিম খান। খুব শিগগিরই গবেষণার কাজে ফ্রান্সে পাড়ি জমাতে চলা শামিমের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, এমন ধরনের কেলাসের ক্ষেত্রে আলোকশক্তি থেকে যান্ত্রিক শক্তিতে রূপান্তরের ঘটনা এই প্রথম।

গবেষনাগারে শামিম ও ডঃ মীর

জিঙ্ক/জিংক কেলাসের এই বিশেষ চরিত্রকে ব্যবহার করে তৈরি করা যাবে মেমোরি ডিভাইস। আলো পড়লে যা সক্রিয় হয়ে উঠবে, নাহলে নিষ্ক্রিয় থাকবে। এই কেলাস দিয়ে কোনও ওষুধকে মুড়ে দেওয়া হলে, সেই ওষুধটি শরীরের নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছানোর পর ওষুধের উপর আলো ফেললে, উপরের মোড়কটি ছিটকে যাবে যান্ত্রিক শক্তির কারণে। এভাবে ওষুধকে পৌঁছে দেওয়া যাবে শরীরের নির্দিষ্ট ক্ষতস্থানে।

এই কেলাস এবং গোটা পরীক্ষার বিশদ বিবরণ জানতে চাওয়ায় শামিম বলেন, “এটি একটি ধাতব-জৈব যৌগের কেলাস। ধাতু হিসাবে ছিল জিঙ্ক/জিংক আর ক্যাডমিয়াম। আর জৈব যৌগ হিসাবে ছিল হাইড্রক্সি বেঞ্জোয়িক অ্যাসিড (Hydroxy-Benzoic Acid) আর ন্যাপথাইল ভিনাইল পিরিডিন (Napthayl Vinayl Piridin)। জিঙ্ক/জিংক আর ক্যাডমিয়ামের আলাদা আলাদা কেলাস তৈরি করা হয়েছিল। দুটি কেলাসের ক্ষেত্রেই জৈব যৌগগুলি ছিলো এক।” যখন জিঙ্কের/জিংকের কেলাসটির উপর সূর্যালোক বা অতিবেগুনি রশ্মি ফেলা হলো, দেখা গেলো যে, কেলাসটি বেশ খানিকটা দূরে ছিটকে পড়লো, যা খালি চোখে দেখা যায়। শামিমের কথায়, “যেমন পপকর্ণ ভাজার সময়ে দানাগুলি ছিটকে পড়ে, অনেকটা তেমন ঘটনা এটি। এর থেকে বোঝা যায় যে আলোকশক্তি, যান্ত্রিক শক্তিতে রূপান্তরিত হয়েছে।” একে বিজ্ঞানের ভাষায় বলে ফোটোস্যালিয়েন্ট এফেক্ট (Photo-Salient Effect)। কেলাসগুলি আণুবীক্ষণিক দৈর্ঘ্যের হয়ে থাকে। কিন্তু যখন আলোকশক্তি থেকে যান্ত্রিক শক্তিতে রূপান্তরিত হচ্ছে, তা কেলাসটিকে অনেকদূরে ছিটকে দিচ্ছে। এর অর্থ, বহুল পরিমাণে যান্ত্রিক শক্তি পাওয়া যাচ্ছে, কেলাসগুলি থেকে। তাঁর কথায়, “জিঙ্কের ক্ষেত্রে এই ঘটনাটি দেখা যায়, ক্যাডমিয়ামের ক্ষেত্রে দেখা যায় না। তার কারণ আমরা তাত্ত্বিকভাবে বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছি আমাদের গবেষণাপত্রে। এই তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ বিশ্বে প্রথমবার আমরাই করে দেখালাম।”

 

জিঙ্কের/জিংকের ক্ষেত্রে যেহেতু কেলাসজুড়ে বৈশিষ্ট্যের পুনরাবৃত্তি হয় না, তাই প্রতিটি জিঙ্ক/জিংক কেলাস আলাদা আলাদা পরিমাণ আলোকশক্তি শোষণ করে, এবং সেটিকে যান্ত্রিক শক্তি রূপে নিঃসরণ করে। এই ধরনের গবেষণার চ্যালেঞ্জ হলো এই যান্ত্রিক শক্তিকে নিজেদের প্রয়োজন অনুসারে নিয়ন্ত্রন করা। শামিমরা দেখিয়েছেন, কেলাসটি খুব পাতলা হলে খুব বেশি পরিমাণ যান্ত্রিক শক্তি পাওয়া যায়। মাঝারি বেধের কেলাস থেকে পাওয়া শক্তির পরিমাণ অল্প, আর খুব পুরু কেলাস থেকে যান্ত্রিক শক্তি উল্লেখযোগ্য পরিমাণে প্রায় পাওয়াই যায় না। কেলাসের পুরুত্ব এবং আলোকশক্তির পরিমাণ নিয়ন্ত্রন করে যান্ত্রিক শক্তিকে নিয়ন্ত্রন করতে পেরেছেন তাঁরা। শামিম জানান, “জিঙ্কের/জিংকের ক্ষেত্রেই যান্ত্রিক শক্তিতে রূপান্তরের ঘটনা ঘটেছে। ক্যাডমিয়ামের ক্ষেত্রে ঘটেনি।” এখানে জৈব যৌগগুলির কাজ কি? প্রশ্ন করায় শামিম বলেন, “জিঙ্কের/জিংকের স্তরগুলির মাঝে মাঝে এই জৈব যৌগগুলি সাজানো থাকে। জৈব যৌগটিতে দ্বিস্তরীয় কার্বন বন্ড থাকে। আলো পড়লে জৈব যৌগের দুটি স্তরের দ্বিস্তরীয় কার্বন বন্ডগুলি একে অপরের সঙ্গে জুড়ে যায়। একে বলে (২+২)-সাইক্লো অ্যাডিশন (2+2-Cyclo Addition)। এর ফলেই জিঙ্ক/জিংক কেলাসের মধ্যে বৈশিষ্ট্যের তারতম্য ঘটে। আর তার ফলেই আলোকশক্তি যান্ত্রিক শক্তিতে পরিবর্তিত হয়”। তিনি আরও যোগ করেন, “কেলাসের উপর আলো পড়লে সাধারণত কেলাসটি নষ্ট হয়ে যায়। আমাদের গবেষণায় কেলাসটি কিন্তু নষ্ট হয়নি। বিশ্বে এই ঘটনা সম্ভবত দ্বিতীয়বার ঘটলো”।

কেলাসটির রূপান্তর

জিঙ্ক/জিংক কেলাসের এই বিশেষ চরিত্রকে ব্যবহার করে তৈরি করা যাবে মেমোরি ডিভাইস। আলো পড়লে যা সক্রিয় হয়ে উঠবে, নাহলে নিষ্ক্রিয় থাকবে। এই কেলাস দিয়ে কোনও ওষুধকে মুড়ে দেওয়া হলে, সেই ওষুধটি শরীরের নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছানোর পর ওষুধের উপর আলো ফেললে, উপরের মোড়কটি ছিটকে যাবে যান্ত্রিক শক্তির কারণে। এভাবে ওষুধকে পৌঁছে দেওয়া যাবে শরীরের নির্দিষ্ট ক্ষতস্থানে। বিভিন্ন মেডিক্যাল যন্ত্রে এই কেলাস ব্যবহার করে করা যাবে অস্ত্রোপচার। তার জন্য নির্দিষ্ট ক্ষতস্থানকে স্পর্শ করার দরকার পড়বে না। বিনা স্পর্শে অস্ত্রোপচার করা সম্ভব হলে তা হবে চিকিৎসাক্ষেত্রে এক মাইলস্টোন। একে ব্যবহার করা যাবে রোবটিক্সেও। আলাপচারিতার শেষভাগে, নদিয়ার নারায়ণপুরের ভূমিপুত্র শামিম জানান, “এই ক্ষেত্রে প্রতিটি উপাদানই খুব সহজলভ্য এবং কোনোটিই বহুমূল্য নয়। তাই খুব সহজেই এই কেলাসকে ব্যবহার করা যায়। আর আলোকশক্তি তো সূর্য থেকেই সংগ্রহ করা সম্ভব। তাই পুরো ব্যবস্থাটি যথেষ্ট সস্তা। আর কেলাসটি যেহেতু নষ্ট হচ্ছে না, তাই এটিকে বারংবার ব্যবহার করা যাবে। আমরা আশা করছি, আমাদের এই গবেষণা চিকিৎসাবিজ্ঞানকে আরও কয়েক ধাপ এগিয়ে দেবে।” 

Developed by DXDasia