শৈবাল বসু ফিরিয়ে আনলেন বাংলার পাছাপেড়ে, শাড়িতে বুনে দিলেন শিল্পীর নাম

শাড়ির জমির মধ্যে দিয়ে বয়ে গেছে তিনটি লাল পাড়ের শঙ্খলতা

“এবার ম’লে সুতো হব/ তাঁতির ঘরে জন্ম লব/ পাছাপেড়ে শাড়ি হয়ে দুলব তোমার কোমরে” – এই কালজয়ী গান একমাত্র বেঁচে আছে মান্নাবাবুর কণ্ঠে আর উত্তমবাবুর ঠোঁটে। সঙ্গে দৃশ্যত সুন্দর সাবিত্রী চাটুজ্জ্যের পরনে পাছাপেড়ে। প্রায় কুড়ি-পঁচিশ বছর তো হবেই শিল্পীরা বন্ধ করে দিয়েছেন পাছাপেড়ে শাড়ির বুনন। তরুণ প্রজন্মের অনেকেই আজ জানে না এ শাড়ির মর্যাদা। খেয়াল করতে দেখা যাবে, মানুষ যতবেশি আধুনিক হয়েছে, ততবেশি করে হারাতে বসেছে কিছু আটপৌরে বাংলা শব্দ। যেমন— পাছা। ধরা যাক, কোনো এক ক্রেতা শাড়ির দোকানে গিয়ে বিক্রেতাকে বলছেন “দাদা, আমাকে একটা পাছা (পাছাপেড়ে) দেখান।” বিক্রেতা তাঁর কর্মীকে বললেন, “ম্যাডামের জন্য সুন্দর একটা পাছা দেখা তো!” এভাবে চলছে কথোপকথন। আর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে চারদিকে ছ্যা ছ্যা রব উঠল। পাছা! এসব শব্দ কেউ বলে নাকি! শিক্ষিত বাঙালির উচ্চারণে ব্রাত্য হয়ে পড়ল এরকম বহু শব্দ।

সুতো দিয়ে বোনা আছে নয়ন সরকার এবং শৈবাল বসুর নাম

বাঙালি নারীর শরীর থেকে উবে যাওয়া চিরন্তন পাছাপেড়ে শাড়ি অনেক বছর পর ফিরে এল। সৌজন্যে শৈবাল বসু। বাস জলপাইগুড়ি। পেশা শিক্ষকতা। তিনি নকশাকার নন। নকশা বা বুননের সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পর্ক নেই। কিন্তু নারী-পুরুষের সাজ, অলংকার নিয়ে ভাবিত। তাঁর নিজের সাজ-পোশাক দেখলেই তা অনুমান করা যায়। শৈবাল বসু বলছেন, “আমরা দুঃস্বপ্নেও ভাবতে পারব না যে, ঘরে ফেরা পাখির নীড়ের মতো চোখ তুলে নাটোরের বনলতা সেন যে শাড়িটি পরে আছেন, সেটির মাঝ বরাবর একটি পাড় বয়ে গেছে। হ্যাঁ, তিনপাড়ের শাড়ি প্রান্তিক মানবীর শাড়ি হয়ে হয়ে, এই নব্য-নাগরিক চাহিদার আধিপত্যের যুগে হারিয়ে গেছে চিরতরে।”

পাছাপেড়ে হোক বা অন্যান্য, শাড়ি আর শুধুমাত্র মেয়েশরীরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। পুরুষরা তাঁদের সমাজলিখিত পৌরুষ ছেড়ে পরনে দিচ্ছেন শাড়ি। কখনও আঁচল সদৃশ, কখনও ধুতি করে। পোশাকের কোনো লিঙ্গ নেই।

পাছাপেড়ে হাতে শৈবাল বসু

পাছাপেড়ে শাড়ির রমরমার সময় পেটিকোটের চল ছিল না। ঠাকুরবাড়িতে জ্ঞানদানন্দিনীদেবীর স্টাইলে যেমন কুঁচি দিয়ে শাড়ি পরাও হত না। শাড়ি পরা হত গিঁট দিয়ে। ফলত নিতম্বের জায়গায় থাকত মোটা পাড়। নারী শরীর নতুন মাত্রায় শোভা পেত। শৈবাল বসু বঙ্গদর্শন.কম-কে বলেন, “আমার পাছাপেড়ে শাড়িকে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে একটু বদলাতে হয়েছে। মহিলাদের ধারণার কিছু বদল এসেছে। সেযুগে শাড়ির বহর কম ছিল, এখন অনেক বেশি। এর কারণ তখন প্রচুর বালিকা একটু উঁচু করে শাড়ি পরত। স্বাভাবিকভাবেই বহর ছিল কম। আমি এটা নিয়ে খুব ভেবেছি। পাছাপেড়ে কিন্তু কুঁচি দিয়ে পরার কথা নয়। তাই এখনকার বাজার আর ফ্যাশনের কথা মাথায় রেখে কিছু জিনিস পাল্টাতে বাধ্য হয়েছি।”

শৈবাল বসু এই শাড়িটি তৈরি করেছেন ৯২ কাউন্টে। তিনি চেয়েছেন তাঁত সকলের পরনে উঠুক আর থাকুক মধ্যবিত্তের নাগালে। তাঁর ঐকান্তিক ইচ্ছায় হোমের প্রাক্তন মেয়েরা এই শাড়ি বিপণন করছেন। পাশাপাশি আরও একটি বিপ্লব ঘটিয়ে ফেলেছেন শৈবাল বসু। শাড়িতে সুতো দিয়ে সেলাই করে দিয়েছেন তাঁতশিল্পী নয়ন সরকারের নাম। সঙ্গে আছে পরিকল্পক শৈবাল বসুর নামও। নদিয়া জেলার ফুলিয়া থেকে বোনা হয়েছে পাছাপেড়ে শাড়ি। এক একটি শাড়ি বুনতে সময় লেগেছে প্রায় সাত-আট ঘণ্টা। চরকায় সুতো কেটেছেন ননীবালা পাল।

চরকায় সুতো কাটছেন ননীবালা পাল

পাছাপেড়ে শাড়ির রমরমার সময় পেটিকোটের চল ছিল না। ঠাকুরবাড়িতে জ্ঞানদানন্দিনীদেবীর স্টাইলে কুঁচি দিয়ে শাড়ি পরাও হত না। শাড়ি পরা হত গিঁট দিয়ে। ফলত নিতম্বের জায়গায় থাকত মোটা পাড়। নারী শরীর নতুন মাত্রায় শোভা পেত।

টাঙ্গাইল গুটিভাঁজ শাড়িতে সুতো প্রথমে চরকায় কেটে নিয়ে তাকে দুসু করা হয়। লম্বালম্বি আর আড়াআড়ি সুতো। এরপর তাকে জলে ভিজিয়ে রেখে শুকোনো হয়। সুতোয় মাড় দিয়ে সুন্দর করে টানা হয় তাকে। তাতে ভাত, গম এসব দেওয়া হয়। শৈবাল বসু আর নয়ন সরকারের এই শাড়ির পাড়ের নকশা শঙ্খলতার। জানা গিয়েছে, বাজারে যে সমস্ত তাঁতের শাড়ি পাওয়া যায়, তা সাধারণত ৫০-৬০ কাউন্টের। এবং তা চড়া দামে বিক্রি হয়। যাঁরা শাড়ির কাপড় চেনেন না, তাঁদের ঠকিয়ে দেওয়ার একটা ব্যবসা চলে ব্র্যান্ডেড দোকানেও। এক্ষেত্রে শৈবাল বসু শিল্পীকে দিয়ে বোনালেন ৯২ কাউন্টের শাড়ি। আর দামও রাখা হয়েছে যৎসামান্য। শাড়ি নির্মাণ করেছেন ফুলিয়া প্রগতিশীল তন্তুবায় সমবায় সমিতি। পুরো কাজটি তত্ত্বাবধান করেছেন শঙ্কর পাল।

ফুলিয়া থেকে খইয়ে মাড় দেওয়া শাড়ি। সাদা ও ছাই রঙা মসৃণ জমির মধ্যে দিয়ে বয়ে গেছে তিনটি লাল পাড়ের শঙ্খলতা। শাড়ির দু-পাশে আরও দুটি কালো ঢালা ইঞ্চি পাড়। ‘মাগ-মিনসে-মাই’-এর মতো ‘পাছা’ শব্দটিও নবজাগরণে শিক্ষিত ‘এলিট’ বাঙালি ব্রাত্য করেছে। সেই অস্পৃশ্য শব্দটিই এবার নতুন শোভা পেল শৈবাল বসুর সৃজনে আর নয়ন সরকারের বুননে। বাংলা ফিরে পেল তার নিজস্ব পাছাপেড়ে।

পাছাপেড়ের প্রথম পরিকল্পনা

পাছাপেড়ে হোক বা অন্যান্য, শাড়ি আর শুধুমাত্র মেয়েশরীরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। পুরুষরা তাঁদের সমাজলিখিত পৌরুষ ছেড়ে পরনে দিচ্ছেন শাড়ি। কখনও আঁচল সদৃশ, কখনও ধুতি করে। পোশাকের কোনো লিঙ্গ নেই। নেই বলেই শাড়ির বাহারি পাড় ফ্লুইডের মতোই বহমান। শৈবাল বসুর সৃজনে পাছাপেড়ে শাড়ি পাওয়া যাচ্ছে কলকাতার বেঙ্গল ঘরানায়। এছাড়াও অনলাইনে রাখার ব্যবস্থা করা হচ্ছে দ্রুত।

Developed by DXDasia