কলকাতার ‘দ্য রাসেল এক্সচেঞ্জ’ : কেমন আছে দেশের সবচেয়ে পুরোনো এই নিলাম ঘর?

১৯৪০ সালে বারেলির বাসিন্দা আব্দুল মাজিদ গড়ে তোলেন নিলাম ঘর

সাহেবপাড়ার ওল্ড বিউরিয়াল রোড ধরে কিছুটা এগোলেই, বিখ্যাত বই বিপনী এবং পানশালা। পার করলেই উল্টোফুটের কুইন্স ম্যানশনের গা ঘেঁষে যে রাস্তা গগনচুম্বী ‘দ্য ফর্টি টু’ অট্টালিকা অবধি চলে গেছে, সে রাস্তার নাম রাসেল স্ট্রিট। যেখানে আধুনিক কলকাতার ঝাঁ চকচকে জৌলুসের মাঝে আজও বর্তমান এক টুকরো কলোনিয়াল ক্যালকাটা। ‘দ্য রাসেল এক্সচেঞ্জ’, ভারতের সবচেয়ে পুরোনো অকশন হাউজ বা নিলাম ঘর। বাইরে থেকে দেখে বোঝা না গেলেও একটা কাঠ বোর্ডের গায়ে বড়ো হরফে লেখা ‘অকশন ডান হেয়ার’ – আর এই দোকানে পা দেওয়া মাত্রই টাইম ট্র্যাভেল করে আপনি পৌঁছে যেতে পারেন প্রায় আট দশকের ফেলে আসা পুরোনো ‘ক্যালকাটা’য়।

১৯৪০ সালে বারেলির বাসিন্দা আব্দুল মাজিদ গড়ে তোলেন তৎকালীন ক্যালকাটার বুকে এই অকশন হাউজ বা নিলাম ঘর, যা নিজেই এক জীবন্ত ইতিহাসের নির্বাক দলিল। বর্তমানে এই নিলাম ঘরের দায়িত্ব সামলান আব্দুল মাজিদের তৃতীয় প্রজন্ম এরশাদ সেলিম এবং আনোয়ার সেলিম ভাইয়েরা। বাইরের পৃথিবীটা আমূল বদলে গেলেও এই দোকানের প্রতিটা আনাচেকানাচে ফিসফিস করে কথা বলে ইতিহাস। পুরু ধুলোর আস্তরণে মোড়া টেবিল ল্যাম্প, সৌখিন মোমদানি থেকে শুরু করে, চাইনিজ ভাস, রৌশনদান, ঝাড়বাতি, ব্রিটিশ এমব্লেম, ক্যামেরা, জামাকাপড়, বার্মাটিকের আসবাব, কী নেই? তবে যার অধিকাংশই ভিন্টেজ এবং নিখুঁত নির্মাণশৈলীর।

আপনার মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে, খাস কলকাতার বুকে এই নিলাম ঘরের দরকারটাই বা পড়লো কেন? বা কী এর গুরুত্ব? সেটা জানতে হলে পিছিয়ে যেতে হবে অনেকটাসময়, সেই ব্রিটিশ শাসিত তৎকালীন ভারতবর্ষে। স্বাধীনতার প্রাক্কালে মূলত অ্যাংলো ইন্ডিয়ান এবং মধ্যবিত্ত সৌখিন ব্রিটিশরা এদেশ থেকে পাততাড়ি গোটানো আরম্ভ করলে, তাদের সংগ্রহের যাবতীয় সৌখিন আসবাব, ঘর সাজাবার সৌখিন মূর্তি, পেয়ালা পিরিচ, নজরকাড়া সব ছবি, শ্বেত-মর্মর মূর্তি সমস্তটাই জলের দরে বেচে দেওয়া শুরু করলে, সেগুলো কিনে নিতে শুরু করেন বণিক শ্রেণির বৃটিশরা। সেই ব্যবসা-ই হাত বদলে কিনে নেন আব্দুল মাজিদ এবং সেগুলি নিলাম করা শুরু করেন সৌখিন মানুষদের জন্য। সেই ট্রাডিশন আজও চলছে।

তবে বর্তমান মালিকের কথা অনুযায়ী সম্ভবত এই ব্যবসা একেবারেই তলানিতে এসে ঠেকেছে, কারণ তাঁদের প্রজন্মের পরে আর নতুন কেউ এই ব্যবসায় আসছেন না। আধুনিক বাঙালিও এইসব এন্টিক তথা ভিন্টেজ জিনিসের কদর করে না আর আজকাল। তবে রাসেল এক্সচেঞ্জের ক্রেতার নামের তালিকা দেখলে অবাক হতে হয় বৈকি! কে আসেননি এখানে! প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা সত্যজিৎ রায় থেকে মহানায়ক উত্তমকুমার, মহানায়িকা সুচিত্রা সেন প্রমুখদের নিয়মিত আনাগোনা ছিল রাসেল এক্সচেঞ্জে। সুচিত্রা-কন্যা মুনমুন সেন, পরিচালক অনীক দত্তের মতো নানা গুণীজন আজও আসেন এই রাসেল এক্সচেঞ্জে তাঁদের মনের মতন পুরোনো সামগ্রী সংগ্রহের ঝোঁকে।

তবে অকশন ছাড়াও আপনিও চাইলে কিনে নিতে পারেন এখানকার নানা তারিফযোগ্য সামগ্রী। বিক্রি বাদেও ছবির শুটিংয়ে ভাড়া যায় এখানকার নানান ভিন্টেজ আসবাব। কলকাতার লোকজন খাস কলকাতার বুকে এরকম রত্ন ভাণ্ডার সম্পর্কে অধুনা অবগত না হলেও, রাসেল এক্সচেঞ্জকে কেন্দ্র করে নির্মিত ব্রিটিশ তথ্য চিত্রকর এডওয়ার্ড আউলসের ‘দ্য অকশন হাউস : দ্য টেল অফ টু ব্রাদার্স’ (২০১৪) তারিফ কুড়োয় আন্তর্জাতিক মহলে।

‘দ্য অকশন হাউস : দ্য টেল অফ টু ব্রাদার্স’ (২০১৪)

“ছেড়েছ তো অনেক কিছুই পুরোনো অভ্যেস…”-এর মতো বাঙালি এখন আর চট করে ঢুঁ মারে না এই নিলাম ঘরে। তবুও কিছু পুরোনো জিনিসের তারিফ করা ক্রেতারা ভিড় করেন প্রতি রবিবার। ওই একটা দিন গমগম করে ওঠে নিলাম ঘর তার পসরা সাজিয়ে। কাঠের হাতুড়ির ঘায়ে গমগম করে ওঠে “সোল্ড” শব্দ।

Post Tags
Developed by DXDasia