করোনা পরিস্থিতিতে কেমন আছে বিনোদনের প্রাচীন মাধ্যম সার্কাস?
ঘড়ির কাঁটায় ঠিক বিকেল চারটে, ফাইনাল বেলটা বেজে উঠলো। সঙ্গে সঙ্গে নিয়ম মেনে শুরু হয়ে গেল শো। হাজার জনের আসনে হাতে গোনা মাত্র ১০-২০ জন দর্শক, কিন্তু তাতে ভ্রূক্ষেপ নেই দলের। হিসেব মতো মঞ্চে চলতে লাগল একের পর এক খেলা। এবং এসবের মধ্যেই রোজ স্বপ্ন দেখে চলেছেন একদল সার্কাস শিল্পী। বেশ কিছুদিন হল সিঁথির মোড় ক্রসিং লাগোয়া ময়দানে তাঁবু পড়েছে। তাঁবুর সামনে চওড়া গেট, আর তাতে বড়ো বড়ো করে লেখা ‘অজন্তা সার্কাস’।
“একটা কথা কী বলুন তো, লাইভ শো নেভার এন্ডস”, এমনটাই বিশ্বাস করেন অজন্তা সার্কাসের একজন বর্তমান কর্মকর্তা রবিউল হক। আধুনিক শহরের হাজার উপেক্ষা সত্ত্বেও লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে একরোখা এই দলটি। রবিউলবাবু আরও বলেন, “কী করবো বলুন? একেই দুবছর কোভিডের জন্য শো বন্ধ ছিল, একদিকে শিল্পীদের প্র্যাকটিস হারিয়ে যাচ্ছে অন্যদিকে পেটের টান, তাই আমাদের হাতে আর কোনো উপায় নেই। রোজই এই আশায় শো করছি যাতে কিছু মানুষ অন্তত দেখতে আসেন, যাতে এই প্রাচীন শিল্পটা হারিয়ে না যায়!”
ডিসেম্বরের শহরে যখন সাজো সাজো রব কলকাতায়, তখনই শুরু হয় শো দেখানো। যদিও ক্রমশ দাপট কমছে বাংলার সার্কাসের। খাঁ খাঁ করছে সিঁথির সার্কাস ময়দানও। টিকিটের মূল্য ৮০ থেকে ৩০০ টাকা। কিন্তু ছাত্রছাত্রীদের জন্য রয়েছে ৫০ শতাংশ ছাড়ের সুযোগ। যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পুরোনো ঐতিহ্য আরও বেশি সহজে পৌঁছাতে পারে, সেই কথা মাথায় রেখেই তাঁদের এই ভাবনা। করোনার আবহে নিয়মিত স্যানিটাইজ করেই চলছে খেলা দেখানো। সরকারি নিয়ম মেনে এখানে আপাতত শুধু কুকুর, ঘোড়া আর পাখির খেলা রয়েছে। এছাড়া ব্যালেন্স বা জিমন্যাস্টিক তো রয়েছেই।
‘সার্কাস’ শব্দটা শুনলেই মনে পড়ে যায় আমাদের ফেলে আসা দিনের একরাশ রঙিন স্মৃতি। চোখের সামনে ভেসে ওঠে যেন ছোটোবেলার আস্ত একটা 'জঙ্গল বুক'। সার্কাসের প্রাণ ছিল পশু পাখিরাই। আজকের দিনে যখন দিকে দিকে পশু চুরি অথবা পশু হত্যার দামামা তখন যেন ‘সার্কাস’ তার বিপরীতে দাঁড়িয়ে এক অন্যরকম বন্ধুত্বের গল্প মনে করিয়ে দেয়। খেলোয়াড়ের নিশানায় যেন প্রকৃত অর্থেই বাঘে গরুতে এক ঘাটে জল খেতে পারতো সার্কাসের মঞ্চে। মানুষের এই অসাধারণ বশ মানানোর দক্ষতাই ছিল সার্কাসের আসল এসেন্স। একদিকে বাঘ, সিংহের মতো জন্তু অনায়াসে নাগালের মধ্যে, অন্য দিকে জেব্রা কিংবা ঘোড়াদের অসাধারণ সব খেলা। কখনো দূরে রাখা গোল পোস্টে তাক করে বল মারছে প্রভুভক্ত কুকুর আবার কখনো ব্ল্যাক বোর্ডে হাতি কষছে নির্ভুল অঙ্ক। আর নয় তো রং-বেরঙের পাখিদের নিত্যনতুন খেলা। এছাড়াও ছিল অনবদ্য সব ব্যালেন্সের খেলা। কখনো দড়ি বেয়ে উঠে যাচ্ছে একের পর এক ছেলেমেয়ে, আবার কখনো বা দু-হাতে কিছু রঙিন বোতল অথবা চাকতি নিয়ে অসাধারণ কায়দায় চলছে জাগলিং। যাকে বলে একেবারে টানটান উত্তেজনা। আর এই সবকিছুর মধ্যে আসল মশলা ছিল জোকারের মজার মজার কাণ্ডকারখানা। সব মিলিয়ে মনমুগ্ধকর এক আসর।
কিন্তু ১৯৯৮ সালে সুপ্রিম কোর্টের বন্য জন্তু সংরক্ষণ সংক্রান্ত রায় অনুযায়ী সার্কাস থেকে বাদ পড়ে যায় T ফর টাইগার কিংবা L ফর লায়নেরা। যদিও তখনও সম্বল ছিল হাতির খেলা। তবে ২০১৩ সালের রায় অনুযায়ী সার্কাস থেকে বিদায় নেয় হাতিরাও। সার্কাসের প্রচলিত আকর্ষণে সম্পূর্ণভাবে ছেদ পড়ে তখনই। তবুও নিত্যনতুন বিনোদনের প্রতিযোগিতায় পাল্লা দিতে শুরু হয় নতুন নতুন উদ্যোগ। জিমন্যাস্টিক, ব্যালেন্সিং কিংবা ছোটোখাটো ম্যাজিকের খেলার প্রচলন করে ধরে রাখতে চায় পুরোনো জৌলুস।
বিনোদনের ইতিহাসে ‘সার্কাস’ শব্দটি আজকের নয়। ‘সার্কাস’ মূলত ইংরেজি শব্দ হলেও এর আগমন গ্রিক শব্দ Kirkos থেকে। যার অর্থ গোলাকার ক্রীড়াচক্র বা রিং। এই ‘রিং’ই ছিল সার্কাসের মঞ্চ। আর রিং-এর যিনি নায়ক, তিনি হলেন ‘রিং মাস্টার’। সমগ্র অনুষ্ঠানটি পরিচালনার ভার থাকত তাঁরই হাতে।
এই খোদ বিদেশি শব্দের ভারতে যাত্রা শুরুর ইতিহাসটাও বেশ অন্যরকম। সময়টা ১৮৭৯ সাল। রোমান উইলিয়াম সিরিন একটি ইতালিয়ান সার্কাস দল নিয়ে উপস্থিত হন ভারতের কেরালা রাজ্যে, চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেন ভারতীয়দের। ভারতে তখনও সার্কাসের খেলা দেখানো ছিল প্রায় আকাশছোঁয়া স্বপ্নের মতো। কিন্তু চ্যালেঞ্জের মুখে নিজেদের প্রমাণ করার তাগিদ অনুভব করে ভারতীয়রাও। রপ্ত করে ফেলে একাধিক ইতালিয়ান সার্কাসের খেলা। ভেঙে দেয় রোমান অহঙ্কার। আর এই জয়ের পরই তিন ভারতীয় মিলে প্রতিষ্ঠা করেন একটি সার্কাস দল। শুধু দল গঠনই নয়, পাশাপাশি তৈরি করেন করেন সার্কাস স্কুলও। তার পর থেকেই আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি ভারতীয় সার্কাসকে। একে একে 'গ্রেট বোম্বে সার্কাস', 'অলিম্পিক সার্কাস', 'রাশিয়ান সার্কাস', 'ফেমাস সার্কাস' কিংবা 'অজন্তা সার্কাস' ইত্যাদি একাধিক দল সারা ভারতে দাপিয়ে শো করে বেড়াতে শুরু করে।
একসময় শীতকালীন কলকাতার প্রাণভোমরা ছিল ‘সার্কাস’। শুধু কলকাতা নয়, গ্রাম মফস্সলের বিভিন্ন মেলা কিংবা উৎসবের আসরেও ডাক পড়ত সার্কাস দলের, ফলে সেখানে হাতের কাছে এক টুকরো চিড়িয়াখানার স্বাদ পেত অনেকেই। একসময় শীতের শহর মানেই বড়ো কোনো মাঠে মাস খানেকের আস্তানা, তারপর সময় ফুরোলে আবার অন্য কোথাও। এই ছিল সার্কাস দলের পরিচিত অভ্যেস। কলকাতার জনপ্রিয় অঞ্চল পার্কসার্কাসের নামকরণও হয় এই থেকেই। নব্বই দশকের শেষ দিক পর্যন্ত প্রতি বছরের শীতের আমেজ জমিয়ে রাখতো এই পার্কসার্কাস ময়দান। সার্কাস যেন ছিল আমাদের ছোটোবেলার কার্টুন চ্যানেলের বাস্তব ছবি। তবে শুধু ছোটোরা নয়, আট থেকে আশি সব বয়সের মানুষের মনেই শীতকালীন উত্তেজনার নাম ছিল ‘সার্কাস’।
অথচ আজ লোক খুঁজতে গাঁ উজাড়! রবিউলবাবু বলেন, “আগে অভিবাবকরা ছেলেমেয়েদের বায়না মেটাতে সার্কাসে নিয়ে আসতেন কিছু শেখানোর জন্য। আর আজকের মা-বাবারা তো শুধু ভিডিও গেম কিংবা মোবাইল কিনে দেয়”। তাঁর এই অভিযোগ যথার্থই। একদিকে ডিজিটাল দুনিয়ার হাতছানি, অন্যদিকে করোনার লাগামছাড়া উপদ্রব সব মিলিয়ে ধুঁকছে এই প্রাচীন শিল্প, তবুও হাল ছাড়তে নারাজ ‘অজন্তা সার্কাস’। রিল থেকে রিয়েলের যাত্রাপথে তাদের একটাই লক্ষ্য, “দ্য শো মাস্ট গো অন”।
যদিও আজ কলকাতার বুকে একেবারে ম্লান হয়ে পড়েনি সার্কাস, উত্তর কলকাতার সিঁথি ছাড়াও দক্ষিণ কলকাতার পাটুলিতে একমাস ব্যাপী সার্কাসের আয়োজন করা হয়। কিন্তু করোনা পরিস্থিতি তে পাটুলির সেই সার্কাস প্রদর্শন দুইবছর বন্ধ আছে। শহরের বাইরে বিভিন্ন জেলাতেও অজন্তার মতো কিছু সার্কাস প্রদর্শন হচ্ছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আরো কিছু দিন চলবে সিঁথির মোড়ের অজন্তা সার্কাস। রবিউল বাবুর কথায়, “আসুন না একদিন, আমাদের টিকে থাকার লড়াইটা নিজের চোখে দেখে যান একবার। কথা দিচ্ছি, মন্দ লাগবে না!”