আশ্রয়, ঝড়, ঝোড়ো আশ্রয় : অরুন্ধতী রায়ের ‘মাদার মেরি কামস টু মি’

০০৮ সাল নাগাদ অ্যালিস ওয়াকারের মেয়ে রেবেকা ওয়াকার লেখেন: অদ্ভুতভাবে, আমার মা নিজেকে খুব মাতৃসুলভ মনে করতেন। নারীদের নির্যাতিত ভেবে তিনি তাদের অধিকার বিষয়ে বিশ্বজোড়া প্রচার করে বেড়াতেন। আফ্রিকায় পরিত্যক্ত মেয়েদের জন্য সংগঠন গড়তেন— নিজেকে মাতৃত্বের এক প্রতিমূর্তি হিসেবে হাজির করতেন।

অ্যালিস ওয়াকার ছিলেন নারীবাদী সমাজকর্মী, দ্বিতীয় তরঙ্গের নারীবাদের অন্যতম কেন্দ্রীয় বই ‘দ্য কালার পার্পল’-এর লেখিকা। রেবেকার লেখাটির নাম ছিল ‘হাউ মাই মাদার’স ফ্যানাটিকাল ভিউজ টোর আস অ্যাপার্ট।’ (Mother Mary Comes to Me by Arundhati Roy)

মা তাঁর আশ্রয়, তাঁর ঝড়। আবার ঝড় যুঝে টিকে যাওয়ার পর, ঝড়ের কেন্দ্র থেকে নিরাপদ দূরত্বে সরে যাওয়ার পর, মা তাঁর লেখকসত্তার কাছে ‘চিত্তাকর্ষী বিষয়বস্তু৷’ চরিত্র-মনস্তত্ব অধ্যয়ন তিনি যেন মাকে পর্যবেক্ষণ করেই শেখেন।

২০২৫ সালে এরিকা জং-এর মেয়ে মলি জং-ফাস্ট লিখলেন: মজার ব্যাপার, ছোটোবেলায় মা আমাকে বলতেন যে তিনি নাকি দারুণ এক মা। একটু বড়ো হতে তিনিই আবার বলতেন, তিনি নাকি আমায় ‘মৃদু অবহেলা’-য় অভ্যস্ত করতে চাইতেন। যেন এটা বাচ্চা মানুষ করার একটা সুচিন্তিত ধরন। একদিন যখন এই এক কথা বারবার বলছিলেন (নিঃসন্দেহে তিনি জানতেন যে মা হিসেবে তিনি জঘন্য), তখন আমি ফুঁসে উঠেছিলাম। বলেছিলাম, “অবহেলা-কে অবহেলাই বলবে। ‘মৃদু অবহেলা’ শুনলে কেমন যেন মনে হয় ওটা পরিকল্পিত৷ ওইটা বলা বন্ধ করো।” এরপর আর কখনও মা ওটা বলেনি। (Mother Mary Comes to Me by Arundhati Roy)

এরিকা জং-এর নারীবাদী উপন্যাস ‘ফিয়ার টু ফ্লাইট’ একদা আলোড়ন ফেলেছিল৷ মলি জং ফাস্ট-ও লেখিকা। উপরিউক্ত কথাগুলো তিনি লেখেন ‘হাউ টু লুজ আ মাদার’ বইতে৷

২০২৫ সালেই এল আরেকটি বই। অরুন্ধতী রায়ের মাদার মেরি কামস টু মি (Mother Mary Comes to Me by Arundhati Roy)। অরুন্ধতী ‘গড অফ স্মল থিংস’-এর জন্য বুকারজয়ী এমন এক লেখিকা, যিনি বুকার-জয়ের পরও স্থিতিশীল স্বারস্বত যাপন চাননি। তাঁর কলম ‘নর্মদা বাঁচাও’ আন্দোলনের শরিক, কর্পোরেটের জঙ্গল অধিগ্রহণ বা কাশ্মীরে আফস্পা-র বিরুদ্ধে সোচ্চার। ‘মাদার মেরি কামস টু মি’-তে অরুন্ধতী ও তাঁর মা মেরি রায়ের ব্যক্তিগত টানাপোড়েনের প্রেক্ষাপটে বয়ে চলে নকশাল আন্দোলন, এমার্জেন্সি থেকে শুরু করে আজকের ফ্যাসিবাদী আগ্রাসন পর্যন্ত সময়কাল। সমকাল। নর্মদা উপত্যকার কথা, দান্তেওয়াড়ার কথা, কাশ্মীরের কথা এখানেও বিশদে আসে— কিন্তু এসব বিষয়ে এমন কোনো নতুন কথা আসে না যা তাঁর আগের রাজনৈতিক নিবন্ধগুলোতে ছিল না। রাষ্ট্রের চোখে চোখ রেখে কথা বলার জন্য যেমন সাহস দরকার, তেমনই সাহস দরকার হাট করে নিজের একান্ত ঘরখানি খুলে দেখাতে। নারীবাদ মতে সেই ‘ব্যক্তিগত’ আলোচনাও রাজনৈতিক। আবার জঁনারিক ঢঙে, তাত্ত্বিক পরিভাষার আড়ালে নিজের ব্যক্তিগত না-পাওয়ার কথা তৃতীয় পুরুষে বলা একরকম৷ আর সে পর্দাটিও খসিয়ে নিখাদ প্রথম পুরুষে নিজস্ব ক্ষতগুলো উন্মোচন করা হল আরেকরকম উত্তরণ। সেই উত্তরণই ‘মাদার মেরি…’-র প্রাপ্তি।  (Mother Mary Comes to Me by Arundhati Roy)

এদিকে, মা-বিষয়ক তাঁর আখ্যান স্বতন্ত্র রেবেকা ওয়াকার বা মলি জং-ফাস্টের থেকেও। তাঁর দেখার চোখটি যত না কন্যার, তার চেয়ে বেশি সহনারীর। যে কলমটি তিনি ধরেন আত্মজীবনী তথা মাতৃজীবনী লেখার জন্য, সে কলম ঔপন্যাসিকের। ফিকশন আর নন-ফিকশনের সীমারেখা গুলিয়ে যায় পাঠকের। লেখকও তা চান। তিনি মনে করেন, ‘উপন্যাস সেই আশ্চর্য ধোঁয়াটে জিনিস, যা পরিপূর্ণ ভাবে লেখকের নিজস্ব নয়, অথচ যাকে লেখক নিজস্ব ভাবেন৷’ বলেন, ‘একে উপন্যাস হিসেবে পড়া হোক। এই বই এর বেশি কিছু দাবি করে না।’

অরুন্ধতীর নিজস্ব জানালা যে সাহিত্য রচনা, তাতেও উৎসাহিত করেছেন মা। মেয়েকে ‘ফ্রি রাইটিং’-এ বসাতেন মিসেস রায়। মনে যা আসে, সব যে লিখে ফেলা যায়, নিজেকে খোঁড়া যায়, খোঁজা যায়, তা মা-ই শিখিয়েছেন। তিনিই অরুন্ধতীকে শেক্সপিয়র, কিপলিং অথবা বিশ্বসাহিত্যের সঙ্গে পরিচিত করিয়েছেন, কমিউনিজমের প্রথম পাঠ দিয়েছেন, ভিয়েতনামের যুদ্ধের কথা বলেছেন৷

মা তাঁর আশ্রয়, তাঁর ঝড়। আবার ঝড় যুঝে টিকে যাওয়ার পর, ঝড়ের কেন্দ্র থেকে নিরাপদ দূরত্বে সরে যাওয়ার পর, মা তাঁর লেখকসত্তার কাছে ‘চিত্তাকর্ষী বিষয়বস্তু৷’ চরিত্র-মনস্তত্ব অধ্যয়ন তিনি যেন মাকে পর্যবেক্ষণ করেই শেখেন। বলেন, ‘মায়ের তল পেতে গিয়ে, তাঁর চোখ দিয়ে দেখতে গিয়ে, তাঁকে বুঝতে গিয়ে, তাঁর বেদনা ছুঁতে গিয়ে, কেন যে কী করেছেন তিনি, আর ভবিষ্যতে কী কী করতে পারেন, তার হদিশ পেতে গিয়ে, আমি নিজেই একটা গোলকধাঁধা হয়ে গেছি, অনেক আঁকাবাঁকা পথের একটা কাটাকুটি— যা অদ্ভুত সব জায়গায় আমায় নিয়ে গেছে, নিজেকে অতিক্রম করে অপরের দৃষ্টিভঙ্গির উৎস সন্ধানে। এই প্রচেষ্টাই আমাকে লেখক করেছে। ঔপন্যাসিক মানেই একেকটা গোলকধাঁধা।’

***
‘গড অফ স্মল থিংস’-এর মতোই এই আত্মজৈবনিক লেখাটি একাধারে কাব্যিক ও রসিক। রাহেল আর এস্থার ‘আম্মুর’ মতো মিসেস মেরি রায়ও বিবাহবিচ্ছিন্না। দুজনেই কম বয়সে বিয়ে করেন বাড়িখানা অসহনীয় ছিল বলে— বাড়িতে অত্যাচারিত, অবদমিত শত শত মেয়ে যেমন স্রেফ পালাতে চেয়ে যে কোনো প্রেম-নিবেদককে বিয়ে করে ফেলে। মেরি রায়ের সিভিল সার্ভেন্ট বাবা স্ত্রী-পুত্র-কন্যা সকলকেই নির্বিচারে ঠ্যাঙাতেন। অতএব মেরি রায় বিয়ে করে আসামের টি-এস্টেটে বরের সঙ্গে স্বেচ্ছা-নির্বাসিত হলেন। তিন বছরেই দুই সন্তানের মা হলেন। মিকি রায়ের মাদকাসক্তি ধরা পড়ার পর তিনি নিশ্চিত হলেন যে জনহীন অরণ্যে দুই সন্তানকে বড়ো করে তিনি জীবন কাটাতে চাননি। অসম থেকে কলকাতা হয়ে উটির পরিত্যক্ত পৈতৃক বাগানবাড়িতে ফিরে এলেন তিনি। কিন্তু অরুন্ধতীর প্রায়ান্ধ দিদিমা, যাঁর সাধের বেহালাটি ভেঙে দিয়েছিলেন সেই মারকুটে সিভিল সার্ভেন্ট স্বামী, তিনি মেয়ের পাশে দাঁড়ানোর বদলে ছেলেকে নিয়ে কেরালা থেকে উজিয়ে এলেন তামিলনাড়ুর উটিতে— মেয়ে ও নাতি-নাতনিদের উৎখাত করতে। সে যাত্রায় তাঁরা বেঁচে যান কারণ কেরালার সিরিয়ান ক্রিশ্চান উত্তরাধিকার আইন তামিলনাড়ুর উটিতে বলবৎ নয়। কিন্তু অদূর ভবিষ্যতে অপমান গিলে মেরিকে উটি ছেড়ে কেরালাতেই ফিরতে হয়েছিল। হাঁফানিতে কাবু হয়ে স্কুলের চাকরি তিনি হারিয়েছিলেন৷ অনিচ্ছুক মা, মাসি, ভাইয়ের আশ্রয়ে মেরি রায়ের যে গ্লানির দিনাতিপাত, তা বুঝলেও হয়তো তাঁর পরবর্তী বিষোদ্‌গারকে সমর্থন করা যায় না। কিন্তু বিষের উৎসের হদিশ পাওয়া যায়। যে নারী দুই সন্তানকে রাতের অন্ধকারে টানতে টানতে উকিলের বাড়ি দৌড়েছেন গৃহহীনতার আশঙ্কা বুকে চেপে, তাঁর ‘ট্রমা’ ছুঁতে পারলে তাঁর রুক্ষ্মতার কার্যকারণ ধরা যায়৷ অরুন্ধতীর চোখ দিয়ে আমরাও দেখি, পিতৃতান্ত্রিক ভায়োলেন্সের ধারা কেমন বইতে থাকে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে। শুধু পুরুষেরা নয়, নারীরাও তার ব্যাটন বয়। বেহালা ভেঙে দেওয়া হয়েছিল যে দিদিমার, তিনি মেয়ের মাথায় ভরসার হাত রাখতে পারে না৷ যাঁকে ঘাড় ধরে বের করার উদ্যোগ নিয়েছিল আপনজন, সেই মা-ও নিজের সন্তানকে বিদ্ধ করেন নিষ্ফল রাগে।

পুরুষ চরিত্রগুলিকেও—মেরি রায়কে উৎখাত করতে আসা ভাই জে আইজাক-কে, নিজের বাবা মিকি রায়কে—অরুন্ধতী খলনায়কোচিত ভাবে দেখান না। চরিত্রের গভীরে প্রবেশ করা যে ঔপন্যাসিকের স্বভাবজ! তিনি নির্মম ভাবে উন্মোচন করেন ‘কসমোপলিটান’ পরিবারের প্রাত্যহিক টাকাপয়সা-জনিত খেউড়, দেখান ‘রোডস স্কলার’ মার্ক্সিস্ট মামা সম্পত্তি সম্পর্কে উদাসীন হতে পারেননি। কিন্তু এই মামাই যে মীনাচিল নদী চেনান অরুন্ধতীকে, তাঁর রসবোধ যে অরুন্ধতী ধারণ করেছেন, অরুন্ধতীর বইগুলি যে তিনি আগাপাশতলা মুখস্থ করেন, তা জানাতে ভোলেন না৷ বাবা ‘নাথিং ম্যান’ মিকি রায় এ ‘গল্পের’ আকর্ষণীয় পার্শ্বচরিত্র। ব্যর্থ মানুষেরও নিজস্ব রং, রস থাকে। সেসব অরুন্ধতীর কলমে অনুপুঙ্খ উঠে আসে৷

বিয়ের আগে শিক্ষিকা হিসেবে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মেরি কোট্টায়াম নামের ছোট্ট শহরে একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। আবার তিনিই ১৯৮৬ সালে সুপ্রিম কোর্টে মামলা করে সিরিরান খ্রিশ্চান সমাজের মেয়েদের পৈতৃক সম্পত্তির উত্তরাধিকার সুনিশ্চিত করেছিলেন। অধ্যক্ষ ও শিক্ষিকা হিসেবে তাঁর শিক্ষণপদ্ধতি ছকভাঙা। ছোটো শহরের প্রথম মিশ্র লিঙ্গের মাধ্যমিক স্কুলে ছেলেরা বয়ঃসন্ধির মেয়েদের উত্যক্ত করছে শুনে তিনি হস্টেল থেকে নিজের অন্তর্বাস আনতে পাঠান সেই ‘দুই অপরাধী’ ছেলেদের। তাদের নাকের ডগায় ব্রা-টি ঝুলিয়ে বলেন: ‘এটা ব্রা। সব মহিলারা পরেন। তোমার মা পরেন। তোমার বোনরাও শীঘ্র পরবে। এটা নিয়ে এত উত্তেজনা যখন, তখন তোমরা এটা রাখতে পারো৷’ মেয়েরা তাঁর স্পর্শে অন্ধকূপ থেকে বেরিয়ে আসার সাহস পায়। ছেলেরা অবধারিত পিতৃতান্ত্রিক নির্যাতক হওয়ার হাত থেকে বেঁচে যায়৷ ভাড়াবাড়ি থেকে এই স্বপ্নের স্কুল পরে পাহাড়ের পরিত্যক্ত জমিতে স্থানান্তরিত করেন তিনি। খ্যাতনামা স্থপতি লরি বেকার-কে দিয়ে স্কুলবাড়ি তৈরি করান।

অথচ নিজের কিশোর ছেলেকে তিনি ‘মেল শভিনিস্ট পিগ’ বলেন অম্লানবদনে। ছেলের ‘মাঝারি গ্রেড’-এ ক্ষুব্ধ মেরি তাকে বেধড়ক মারেন। বলেন ‘তোমার মতো কুৎসিত আর বোকা হলে আমি আত্মহত্যা করতাম।’ অরুন্ধতী নিজের ভালো ফলের জন্য যে প্রশংসা পেতেন, তা দাদার অপমানের ছায়ায় ঢাকা পড়ে যেত। ‘তারপর থেকে… যখনই আমার প্রশংসা করা হয়, সবসময় মনে হয় যে অন্য কেউ, শান্ত কেউ, অন্য ঘরে মার খাচ্ছে’, তিনি বলেন। মেরি রায় চাকরদের প্রতি দুর্মুখ ও অত্যাচারী। ছোট্ট অরুন্ধতী ভুল করে টেলিফোন লাইন কেটে দিলে সবার সামনে তাকে বলেন ‘বিচ।’ মেয়ের প্রথম সম্পর্কের পর তাকে ‘বেশ্যা’ বলে গালি দেন। তিনি শুধু রাগের মাথাতেই এসব বলতেন বা করতেন, তা নয়। মেয়ে যাতে হঠকারী সিদ্ধান্ত না নেয় সম্পর্ক বা সন্তানধারণ সম্পর্কে, তাই তাকে ‘সতর্ক করার জন্য’ বার বার বলতেন, সেই মেয়ের জন্ম কত অবাঞ্ছিত ছিল তাঁর কাছে। নিজেকে অনায়াসে নিজের ছেলেমেয়ের ‘ব্যাঙ্কার’ বলেন তিনি। প্রভুর প্রতি চাকরের যে প্রশ্নহীন আনুগত্য, তা তিনি তাদের থেকে দাবি করেন সে কারণে। তাঁর যৌন অবদমনের করুণতম শিকার দিদো, অরুন্ধতীর পোষা কুক্কুরী, বেজাত-কুজাতের কুকুরের সঙ্গে মিলনে গর্ভবতী হলে যাকে গুলি করে মারেন মেরি রায়। একে অরুন্ধতী ‘অনার কিলিং’ বলেন৷ এসব সময়ে মেরি রায়কে উন্মাদ, বিকারগ্রস্ত মনে হতে পারে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, গৃহহিংসা ও অবহেলায় প্রায়োন্মাদ এমন মেয়েরা রয়েছে ভারতের ঘরে ঘরে। তাঁরা সকলে মেরি রায়ের মতো পারদর্শী সংগঠক নন, কিন্তু নির্যাতন তাঁদের একই রকম বিকারগ্রস্ত করেছে৷ তাঁদের পরিপাটি মাতৃত্বের আড়ালেও থাকে নিদারুন সন্তাননিগ্রহ। যে মা-ভাই এককালে মেরিকে উটির বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করতে চেয়েছিলেন, পরে তিনি তাঁদের কেরালার বাড়ি থেকে আইনি ডিক্রির বলে সত্যি উচ্ছেদ করেন। মেরি অধিকার বুঝে নেওয়ার বেলায় নির্মম, কারণ অধিকার চিরকাল তাঁকে কেড়েই নিতে হয়েছে৷

ষোল বছর বয়সে অরুন্ধতী স্থাপত্যবিদ্যা পড়তে দিল্লি যান। ‘মাকে ভালোবাসি না বলে নয়, যাতে মাকে ভালোবেসে যেতে পারি, তাই।’ অথচ, স্থাপত্যবিদ্যায় তাঁর আগ্রহ জন্মাল কেন? মায়ের প্রিয় স্থপতি, স্বপ্নের স্কুলের স্থপতি লরি বেকারের কাজ দেখে। অরুন্ধতীর নিজস্ব জানালা যে সাহিত্য রচনা, তাতেও উৎসাহিত করেছেন মা। মেয়েকে ‘ফ্রি রাইটিং’-এ বসাতেন মিসেস রায়। মনে যা আসে, সব যে লিখে ফেলা যায়, নিজেকে খোঁড়া যায়, খোঁজা যায়, তা মা-ই শিখিয়েছেন। তিনিই অরুন্ধতীকে শেক্সপিয়র, কিপলিং অথবা বিশ্বসাহিত্যের সঙ্গে পরিচিত করিয়েছেন, কমিউনিজমের প্রথম পাঠ দিয়েছেন, ভিয়েতনামের যুদ্ধের কথা বলেছেন৷ কেরলে অরুন্ধতীর প্রথম উপন্যাসের উদ্বোধন করেছেন নিজের স্কুলে। আরেক দুঃসাহসী কবি কমলা দাসকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন প্রধান অতিথি হিসেবে৷ কিন্তু মেয়ে মাকেও ছাপিয়ে যাচ্ছে বুঝলে, সেই মায়ের গরিমা আহত হয়েছে। তিনি ক্রমাগত কমলা দাসের সঙ্গে কথা বলে উপন্যাসাংশ পাঠ ব্যহত করেছেন।

এ কাহিনি যতখানি মেরি রায়ের, ততখানিই অরুন্ধতীরও। যে বছরগুলি তিনি মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেননি, সে বছরগুলি অরুন্ধতীর নিজস্ব সংগ্রামের, বেড়ে ওঠার। এই সময়ের চিত্রায়নে ভিড় করে আসে বন্ধুরা, প্রেমিকরা: কার্লোস, প্রদীপ কিষেণ, সঞ্জয় কাক, গোলক আর প্রথম প্রেমিক জেএস— এঁদের বিষয়ে অরুন্ধতী শ্রদ্ধাশীল স্মৃতিচারণ করেন। আরও ভিড় করে আসে অযাচিত পুরুষরা, যারা একলা মেয়ের দরজায় রাতে কড়া নাড়ে। তখনও রসবোধই অরুন্ধতীর রক্ষাকবচ। হলেও-হতে-পারে-ধর্ষক সম্পর্কে তিনি বলেন, তাকে ‘হাস্যকর বিশ্রী ট্যাটুর মতো দেখতে।’ মিসেস রায় (মা নয়, মিসেস রায় নামেই অরুন্ধতী তাঁকে সম্বোধন করেন) ব্যক্তি হিসেবে, নারী হিসেবে আমাদের সহানুভব তথা সমানুভব দাবি করেন। কিন্তু মা হিসেবে তিনি অপূরণীয় ক্ষতি করেন সন্তানদের। এমন মায়ের সন্তানেরা ঘূর্ণাবর্তে হারিয়ে যায়, পালাতে গিয়ে ভুল পাথরে মাথা কুটে মরে। অরুন্ধতীর অসামান্য নিজস্বতা তাঁকে বাঁচিয়েছে। কিন্তু স্নেহশূন্য শৈশব তাঁকে বন্ধু, গুণগ্রাহী, প্রেমিকের উপস্থিতি সত্ত্বেও রেখেছে ‘ভিড়ের মধ্যে একা।’

জেমস জয়েস লিখেছিলেন ‘আ পোর্ট্রেট অফ অ্যান আর্টিস্ট অ্যাজ আ ইয়ং ম্যান।’ এই বই হয়ে ওঠে ‘পোর্ট্রেট অফ অ্যান আর্টিস্ট অ্যাজ আ ইয়াং উওম্যান।’ তা অরুন্ধতীর লেখক হিসেবে নিজেকে খুঁজে পাওয়ার গল্পও বলে— সেই যখন তিনি নিজস্ব ভাষা খুঁজছিলেন: ‘আমাকে এক নিজস্ব ভাষাকে শিকার্যের মতো পেড়ে ফেলতে হত। টেনে হিঁচড়ে তার শরীর বের করে এনে সেটি তারিয়ে তারিয়ে খেতে হত… এক জ্যান্ত ভাষা-পশু, ডোরাকাটা, সে চরছিল, শিকারী আমি-টার জন্য অপেক্ষা করছিল।’ অরুন্ধতীর এক প্রবণতা দেখা যায়, যেখানেই মায়ের উন্মাদ নির্যাতনের নিস্পৃহ বর্ণনা দেন, সেখানেই তার কার্যকারণ বুঝিয়ে দিতে চান, অত্যাচারের অভিমুখ তাঁর নিজের প্রতি হলেও। একে মায়ের প্রতি মেয়ের পক্ষপাত মনে হতে পারে। কিন্তু আবারও, তা লেখকের ‘চরিত্রের’ গভীরে ঢোকার অভ্যাসলব্ধ সিদ্ধিও বটে।

বিটল্‌সের গান থেকে বইয়ের শিরোনাম গৃহীত। ‘হোয়েন আই ফাইন্ড মাইসেল্ফ ইন টাইমস অব ট্রাবল, মাদার মেরি কামস টু মি, স্পিকিং ওয়ার্ডস অব উইজডম: লেট ইট বি!’ জীবনকে আশ্চর্য নিরাসক্তিতে ‘লেট ইট বি’ বলতে অরুন্ধতী নিঃসন্দেহে পেরেছেন। কিন্তু এই পেরে যাওয়ায় তাঁর নিজস্ব ‘মাদার মেরির’ ভূমিকা কতটা? বলা বাহুল্য, বিটল্‌সের গানে উল্লিখিত মা মেরির মতো সন্তসুলভ দার্শনিক অভিজ্ঞান মেরি রায়ের নেই৷ তবু অরুন্ধতী যেমনটা, তেমনটা হয়ে ওঠার পিছনে তাঁর অবধারিত ছাপ রয়ে গেছে। মেরি রায় যে রোখ নিয়ে সমাজের বিরুদ্ধে, পিতৃতন্ত্রের বিরুদ্ধে, কালেক্টরের বিরুদ্ধে লড়েন, তা অরুন্ধতীতে সঞ্চারিত হয় বলে তিনি সরকার বা আদালতের সামনে অকুতোভয়। বিক্ষত মায়ের কাঁটার উপহারও তাঁকে শুধু ধ্বস্ত করে না—সহিষ্ণু করে, দ্রষ্টা করে, লেখক করে।

বিটল্‌সের গান থেকে বইয়ের শিরোনাম গৃহীত। ‘হোয়েন আই ফাইন্ড মাইসেল্ফ ইন টাইমস অব ট্রাবল, মাদার মেরি কামস টু মি, স্পিকিং ওয়ার্ডস অব উইজডম: লেট ইট বি!’ জীবনকে আশ্চর্য নিরাসক্তিতে ‘লেট ইট বি’ বলতে অরুন্ধতী নিঃসন্দেহে পেরেছেন।

এই বইয়ের দুটি মুহূর্ত বড়োই মর্মস্পর্শী। এক, ‘গড অফ স্মল থিংস’ পড়ে মেরি রায় জিজ্ঞাসা করেন, ‘এত ছোটো ছিলে, তোমার এসব মনে ছিল?’ উল্লিখিত জায়গায় ঝগড়াঝাঁটি করে পৃথক হওয়ার আগে বাবা আর মা কেউই সন্তানদের দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত নয়। অরুন্ধতী বলছেন: ‘এটা ফিকশন৷ বানানো।’ মেরি রায় বলছেন, ‘না, বানানো নয়।’ বলে, মুখ ঘুরিয়ে নিচ্ছেন। হলুদ পর্দায় মরা আলো এসে পড়ছে মেরি রায়ের অব্যক্ত কথার ব্যথা বয়ে।

অন্য মুহূর্তটি মেরি মায়ের জীবৎকালের শেষদিকের। উন্নতশির মিসেস রায়, যিনি কখনও সন্তানদের জড়িয়ে ধরে আদর করেননি, তিনি নিজে আর টাইপ করতে পারেন না। অ্যাসিস্ট্যান্টকে দিয়ে টাইপ করিয়ে, নিতান্তই কেজো ভাষায় মেয়েকে মোবাইল বার্তা পাঠিয়েছিলেন যে, তিনি মেয়েকে বড়োই ভালোবাসেন। কেজো ভাষায়, কারণ আদরের ভাষা তিনি জানেন না। অপ্রেমের বরফ-চাঁই-তে চিড় ধরেছিল শেষমেশ। দীর্ঘ অনভ্যাসে তা থেকে স্নেহের ধারাজল প্রবল উচ্ছ্বাসে আছড়ে পড়েনি। কিন্তু কুলকুল করে কিছু একটা বইছিল।

নারীবাদী সংগঠক, শিক্ষক আর লেখক হিসেবে যে মায়েরা সফল, তাঁরা যে সন্তানের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্কে কোনো কোনো সময় ব্যর্থ, তা নতুন তথ্য নয়। নারীবাদে সন্তানকে নিজের আগে স্থান দিতে বলা হয়নি, বরং সেখানে সন্তান প্রতিপালনের প্রক্রিয়ায় মেয়েদের ক্রম-অবক্ষয়ের কথা বলা আছে। কিন্তু অ-নারীবাদী মায়েরা আর নারীবাদী-মায়েরা নিজের চেয়ে দুর্বলতার প্রতি, সন্তানের প্রতি যদি একই রকম নির্মম হন, যদি একই ভাবে নিজের নির্যাতিত অতীতের বোঝা তাদের উপর চাপান, তাহলে নারীবাদ যে এই দিকটির কোনো সমাধান করতে পারেনি, একথা মেনে নিতে হয়। কেন এমন হয়? হয়তো ব্যক্তি স্রেফ জানেন না স্নেহ করতে, কারণ তিনিও স্নেহবঞ্চিত৷ অরুন্ধতী ‘মাদার মেরি…’ লিখে এক চির-অশান্ত, চির-রুক্ষ্ম মায়ের চুলে বিলি কেটে দেন। সব মেরি রায়দের, নারীবাদী ও অনারীবাদী সব কর্কশ মায়েদের মাথায় ক্রমাগত হাত বুলিয়ে দিতে পারলে একদিন নির্ঘাৎ সব সুপ্ত ফল্গুরই কুলকুল শোনা যেত।

______________
মাদার মেরি কামস টু মি | লেখক: অরুন্ধতী রায় | প্রকাশক: পেঙ্গুইন | ভাষা: ইংরেজি | পৃষ্ঠা: ৩৭৬ | মূল্য: ৮৯৯

Written by