
কলকাতার সঙ্গে পার্সিদের সম্পর্ক কী?
কলকাতার প্রথম পার্সি অগ্নিমন্দির
প্রথম সৈয়দ মুজতবা আলীর লেখায় পরিচিত হয়েছিলাম “মৌন শিখর” শব্দটির সঙ্গে — মৌন শিখর অর্থাৎ “টাওয়ার অফ সাইলেন্স” (Tower of Silence)। প্রাচীন পার্সিদের বিশ্বাস ছিল পৃথিবী, আগুন, জল-সহ প্রকৃতির পাঁচটি উপাদান পবিত্র। তাই মৃত্যুর পর এঁরা দেহাবশেষ রাখতেন উঁচু সৌধে বা টাওয়ারে — চিল, শকুন ও বাজ পাখিদের খাদ্য হিসেবে। কলকাতার একমাত্র টাওয়ার অফ সাইলেন্স বেলেঘাটায়, পাঁচিল ঘেরা কয়েক টুকরো জমি, যা সমগ্র পশ্চিম বাংলার একটি হেরিটেজ অংশে অন্তর্ভুক্ত।
স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে — কারা এই পার্সিরা? কলকাতার সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক কী? ইতিহাসের পাতা উল্টে দেখে নেওয়া যাক।
ইরান পার্সিদের আদিভূমি। মধ্যযুগে মুসলিম আক্রমণে বিধ্বস্ত ইরান ছেড়ে একসময় দলে দলে মানুষ গ্রীস, রোম, চীন, ভারত-সহ বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে চলে আসতে থাকেন। পারস্যের বাসিন্দা ছিলেন বলে এঁদের পার্সি বলা হয়। ভারতের পার্সিরা উপমহাদেশে আগমনের পর থেকেই বিভিন্ন অঞ্চলে বিস্তৃতভাবে বসতি স্থাপন করেছিলেন।
পার্সি বাগান লেন, কলকাতা
কলকাতার একমাত্র টাওয়ার অফ সাইলেন্স বেলেঘাটায়, পাঁচিল ঘেরা কয়েক টুকরো জমি, যা সমগ্র পশ্চিম বাংলার একটি হেরিটেজ অংশে অন্তর্ভুক্ত।
ইতিহাস অনুযায়ী, পার্সিদের আগমন ঘটে অষ্টম শতকে এবং ক্রমে ক্রমে অষ্টাদশ শতক থেকে কলকাতা পার্সি বসতির একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে। ১৭৬৭ সালে পশ্চিম ভারতের সুরাট থেকে কলকাতায় প্রথম পার্সি দাদাভাই বেহরামজি বানাজি আসেন। ছিলেন ব্যবসায়ী এবং তাঁর মূল উদ্দেশ্য বাংলায় বাণিজ্য এবং পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যিক যোগাযোগ স্থাপন করা। ইতিহাসের পাতায় নজর দিলে দেখা যায় ১৬৯০ সালে জব চার্নক প্রথম কলকাতায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাণিজ্যিক কুঠি স্থাপন করেন এবং আনুষ্ঠানিকভাবে ১৭৫৭-এ কলকাতা ব্রিটিশদের দখলে যায়। ১৯১১ সাল পর্যন্ত কলকাতা ছিল ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী। ফলে অষ্টাদশ শতকে কলকাতা ভারত, পূর্ব এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে গড়ে ওঠা বাণিজ্য ত্রিভূজের কেন্দ্র হয়ে ওঠে। এই বাণিজ্যে মূলত ভারতীয় পণ্য, বিশেষত আফিম, চীনে ও পূর্ব এশিয়ার বাকি অঞ্চলে রপ্তানি হতো এবং বিনিময়ে চিনা চা আমদানি করে তা ভারত ও ব্রিটেনে পাঠানো হতো — এখানে পার্সিরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। প্রথমে তাঁরা দোভাষী হিসেবে কাজ করতেন। ১৮৩৪ সাল পর্যন্ত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি চিনের সঙ্গে বাণিজ্যে একচেটিয়া অধিকারী ছিল। পার্সিদের ক্রমে কোম্পানির নির্ধারিত শর্তে চীন বাণিজ্যে অংশগ্রহণের অনুমতি দেওয়া হত। এই সময়ে পার্সিরা “country trader” নামে পরিচিত ছিল। ১৮৩৪-র পর চীনের সঙ্গে বাণিজ্যের পুরো দখল নেয় পার্সিরা। এখানে উল্লেখ করতে হয় তৎকালীন বিখ্যাত পার্সি Jamsetji Jejeebhoy-কে, যাঁর নিজের জাহাজ পরিবহন ব্যবস্থা ছিল বোম্বে ও কলকাতায়।
ক্রমে ক্রমে কলকাতা পার্সিদের মাঝেই জাহাজ নির্মাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে। ১৮৩৭ সালে রুস্তমজি কাউয়াসজি বনাজি কলকাতার খিদিরপুর এবং শালকিয়া ডকইয়ার্ড কিনে নেন এবং বোম্বে থেকে পার্সি জাহাজ নির্মাতাদের কলকাতায় নিয়ে আসেন — D. R. M. Wadia, একজন বিখ্যাত পার্সি জাহাজ ব্যবসায়ী, এই সময়ে কলকাতায় আসেন। ধীরে ধীরে কলকাতা হয়ে ওঠে পার্সিদের প্রাণকেন্দ্র।
আজও এত বছর পর কলকাতায় রয়ে গেছে রুস্তমজির নাম — আক্ষরিক অর্থেই। বর্তমানে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগ রাজাবাজার সায়েন্স কলেজের গায়ে লেগে আছে এক সরু গলি — নাম তার পার্সিবাগান লেন। এখানেই ছিল রুস্তুমজি কাউয়াসজি বনাজীর বিলাসবহুল বাগানবাড়ি, তৈরি হয় ১৮৩৯ সালে। তখন আপার সার্কুলার রোড-কে বলা হতো নর্দান সার্কুলার রোড। রুস্তুমজি মারা যান ১৮৫২ সালে, এবং পরে তাঁর পুত্র Manekji Rustamji পার্সি এই বাড়িতে বাস করেন। তাঁর নামেই পার্সি বাগানের পার্শ্ববর্তী এলাকার নাম হয়েছে মানিকতলা। বহুবার হাতবদলের পর এই বাড়ির মালিক হন তারকনাথ পালিত এবং ১৯১২ সালে এটি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়কে দান করেন।
পার্সি ফায়ার টেম্পেল, এজরা স্ট্রিট
এ ধরনের অসংখ্য ঘটনার ছোঁয়ায় পুরো কলকাতায় আজও জীবিত পার্সিরা রয়েছেন।
স্যার জামশেদজি জিজিভয়; নুসরওয়ানজি কাওয়াসজি পেটিট; দিনশা পেটিট; ফ্রামজি বনাজি (রুস্তমজি বনাজির ভাই); জাহাজ নির্মাতা ওয়াদিয়া পরিবার; ফেরোজশাহ মেহতার পিতা মেহেরওয়ানজি মেহতা; খুরশেদজি কামা; দাদাভাই নওরোজি; ভারতীয় চলচ্চিত্রের জনক জামশেদজি মদন; এবং মেহেরওয়ানজির ভাই দোরাব মেহতা — এঁদের প্রত্যেকের জীবন শুরু কলকাতাতেই। এছাড়াও কয়েকজন আন্তর্জাতিক খ্যাতনামা পার্সি ব্যক্তিত্বকে আমরা ভুলেই গেছি, যাঁদের গভীর কলকাতা যোগ অনস্বীকার্য। তাঁদের মধ্যে অন্যতম বিশ্বখ্যাত ভূতত্ত্ববিদ D. N. Wadia; শিল্পী Erach Bhiwandiwala; A. C. Ardeshir; এবং Dr. Irach Taraporewala — ‘Divine Songs of Zarathustra’–র রচয়িতা।
কলকাতা শহরেই রয়েছে একাধিক পার্সি উপাসনালয় বা Agnimondir / Fire Temple। কলকাতার প্রথম পার্সি অগ্নিমন্দিরটি নির্মিত হয়েছিল আজ থেকে প্রায় ১৮৫ বছর আগে, রুস্তমজির উদ্যোগে। “Rustomji Cowasji Banaji Agiary” নামে পরিচিত এই অগ্নিমন্দিরটি কলকাতার কেন্দ্রে ২৬, এজরা স্ট্রিটে অবস্থিত। ১৮৩৯ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর রুস্তমজি কাওয়াজি বনাজি এই মন্দিরের উদ্বোধন করেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে কলকাতার তৎকালীন বহু বিশিষ্ট বাসিন্দা উপস্থিত ছিলেন — ছিলেন রুস্তমজির ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং তৎকালীন কলকাতার অন্যতম ব্যবসায়ী মেগনেট দ্বারকানাথ ঠাকুর।
গথিক স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত এই মন্দিরটি এক বিঘা ১৮ কাঠা জমির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। বারান্দার ছাদ ধরে রেখেছে বিশাল স্তম্ভ এবং কাঠের নকশাদার ঝাঁঝরি-শাটার। মন্দিরটির বাইরে সামনে Doric pilaster রয়েছে এবং দরজা-জানালার উপরে ত্রিভুজাকৃতি pediment বসানো। ডান দিকের অংশ দিয়ে প্রবেশযোগ্য মূল গর্ভগৃহটি বর্গাকার। এর কেন্দ্রে ছিল একটি গোলাকার বেদি, যার ওপর ১.৪২ সেন্টিমিটার উচ্চতার একটি রুপোর brazier-এ পবিত্র অগ্নি সংরক্ষিত থাকত — যা ১৯৮০-এর দশক পর্যন্ত জ্বালানো হতো।
অভ্যন্তরীণ বিবাদ ও বহিরাগত চ্যালেঞ্জের কারণে ট্রাস্টটি সমস্যায় পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত আইনি লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়ে। ১৯৮৯ সালে মন্দিরটি বন্ধ হয়ে যায়। ২০১৮ সালের এপ্রিল মাসে পরিবারের শেষ পরিচিত ট্রাস্টি ও বংশধর Cursetjee Manackjee Rustamji-র মৃত্যুর পর পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। কলকাতার পার্সি সম্প্রদায় — যাঁদের সংখ্যা এখন মাত্র ৩৫০ জনের মতো — প্রার্থনার জন্য বর্তমানে মেটক্যাফে স্ট্রিটে অবস্থিত অন্য অগ্নিমন্দিরটিতেই যান।
বর্তমানে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগ রাজাবাজার সায়েন্স কলেজের গায়ে লেগে আছে এক সরু গলি — নাম তার পার্সিবাগান লেন। এখানেই ছিল রুস্তুমজি কাউয়াসজি বনাজীর বিলাসবহুল বাগানবাড়ি, তৈরি হয় ১৮৩৯ সালে।
আঞ্জুমান আটাশ আদরান ফায়ার টেম্পল, কলকাতা
বৌবাজার স্ট্রিট বা বিপিন বিহারী গাঙ্গুলি স্ট্রিট ধরে সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ থেকে লালবাজারের দিকে এগোলে পড়ে এখানকার চশমার দোকানগুলো। সেই সব দোকানের কাছেই বাঁ দিকে একটা ছোটো গলি — মেটক্যাফে স্ট্রিট। বৌবাজারের ট্রাম লাইন থেকে ঢুকে কয়েক পা এগিয়ে ডানদিকে পার্সিদের বর্তমান মন্দির — ১৯১২ সালে তৈরি “Zoroastrian Anjuman Atas Adaran”। পার্সিরা অগ্নির পূজারী, বা বলা ভাল — অগ্নির মাধ্যমেই তাঁরা ঈশ্বরের উপাসনা করেন। তাই গেটের ওপর যেমন মন্দিরের নাম, তেমনি গেটে আগুনের ছবিও। অনেকে এটিকে পার্সি চার্চ বা চার্চও বলে। মন্দিরে প্রবেশের অধিকার শুধুমাত্র পার্সিদের। ১৯১২ সালে মন্দিরটি তৈরি করান Arvad Dhunjibhoy Byramji Mehta। বাইরের গেটের ওপর তাঁর নাম খোদাই করা আছে। উপরের মন্দিরে বেদীর ওপর আছে সর্বক্ষণ জ্বলন্ত পবিত্র অগ্নিশিখা।
যখন ইরান থেকে পার্সিরা ভারতে প্রথম আসেন, সঙ্গে নিয়ে আসেন তাঁদের পবিত্র অগ্নি, যা স্থাপন করা হয় Gujarat Navsari-তে। সেই Navsari থেকে হাতে বহন করে, ৭৩ দিন ধরে পায়ে হেঁটে পবিত্র অগ্নি আনা হয় এখানে। এই পবিত্র অগ্নি যেমন ইরান থেকে গুজরাত হয়ে বোম্বে, কলকাতা সব জায়গায় ছড়িয়ে রয়েছে ঠিক তেমনি পার্সিরাও রয়েছেন সর্বত্র। কলকাতায় তাঁদের সংখ্যা দিনদিন কমছে কিন্তু সর্বধর্ম সমন্বয়ের শহরে পার্সি সুগন্ধ আজও বহমান।
নিজের নামের সার্থকতা প্রমাণ করে কলকাতা আছে কলকাতাতেই।
