
মাগেন ডেভিড সিনাগগ-কলকাতা
কলকাতা ভারী আজব শহর। রাস্তায়, গলিঘুঁজিতে ছড়ানো হরেক মণিমুক্ত। কোথাও মন্দিরের পুজোর মন্ত্র, কোথাও বা ভোরের আজানের সুর। শ্যাওলাভেজা গলি, লোহার ঘোরানো সিড়ি, মরা আলোর বিকেল মাখা চিলেকোঠার নড়বড়ে ঘর পেরিয়ে চিনেদের কালীমন্দির। কোথাও আবার পূর্ণিমা চাঁদের আলোতে যখন ভেসে যায় আদিগন্ত, তখন শতাব্দী প্রাচীন নাটমন্দিরে খোল করতালের বোল কখনো রাধা, কখনো বিষ্ণুপ্রিয়া হয়ে বেজে ওঠে নিজের ছন্দে। ঠিক তখনি আবার গির্জাতে চলছে ক্যারলের সুর।
সত্যি বলতে, কলকাতার মত এতগুলো ধর্মের উপাসনালয় আর কোনো শহরে পাওয়া মুশকিল। হিন্দুদের মন্দির অথবা মুসলমানদের মসজিদ তো পাড়ায় পাড়ায়। খ্রিস্টানদের গির্জাও কিছু কম সংখ্যায় নেই। কিন্তু তা ছাড়াও বৌদ্ধ, জৈন, পারসি, চৈনিক, পোর্তুগিজ, গ্রীক, আরমেনিয়ান, ব্রাহ্ম, ইহুদি এবং শিখ – কলকাতায় সবই আছে। বর্তমানে কলকাতায় প্রায় ফুরিয়ে যাওয়া এক জাতি, ইহুদিদের নিয়েই এই লেখা।

বেথ এল সিনাগগ-কলকাতা
ইহুদিরা অন্যান্য বিদেশিদের মতই এদেশে এসেছিল বাণিজ্য করতে। পলাশির যুদ্ধের ঠিক পরপরই আরমেনিয়ান, ডাচ, ইহুদি আর ফরাসিরা আসে এদেশে বণিকের মানদন্ড হাতে। কলকাতার রেকর্ড অনুযায়ি প্রথম ইহুদি অধিবাসী ১৭৯৮ সালে কলকাতায় এসেছেন শালোম ওবাদিয়া কোহেন। কোহেন ১৭৬২ সালে জন্মগ্রহণ করেন আল্লেপোতে, যা বর্তমানে সিরিয়া। ব্রিটিশ শাসনে কলকাতা যখন বাণিজ্যনগরী হিসেবে সমৃদ্ধ থেকে তর, তম হচ্ছে সেই সময় কোহেন সুরাত হয়ে কলকাতায় আসেন। এই সময়ের বেশির ভাগ ইহুদি যেহেতু বর্তমানের ইরাক ও সিরিয়া অঞ্চল থেকে আসত, তাই এদের বলা হত বাগদাদি ইহুদি।
নির্বাক চলচ্চিত্র যুগের নামী অভিনেত্রী আরতি দেবী আসলে ছিলেন ইহুদি। তাঁর নাম ছিল রাচেল সোফাইয়ার। ‘প্রমীলা’ নামে অধিক প্রসিদ্ধ, এসথার ভিক্টোরিয়া আব্রাহাম ছিলেন স্বাধীন ভারতের প্রথম ‘মিস ইন্ডিয়া’।
শালোম কোহেনের গল্পে চোখ রাখা যাক খানিক। তিনি বাণিজ্য শুরু করেন জহরত, গোলাপ জল এবং আরবি ঘোড়ার। এছাড়াও মশলা, সিল্ক, নীলও নাম লিখিয়েছিল তার বাণিজ্যের খাতায়। ব্যাবসা চলছিলো ভালোই। ইতিমধ্যে ১৮১৬ খ্রিস্টাব্দে তিনি অযোধ্যার নবাব আবুল মুজাফফর গাজি উদ্দীন খানের খাস জহুরি পদে নিযুক্ত হন। তাকে ডেকে পাঠান পাঞ্জাবের মহারাজা রঞ্জিত সিং স্বয়ং। কোহিনূর-এর মূল্য নির্ধারণ করার জন্য। এতটাই খ্যাতি তিনি পেয়েছিলেন। এর কুড়ি বছর পর কোহেন মারা গেলে বাণিজ্যের হাল ধরেন তাঁর জামাই মোজেস ডোয়েক কোহেন। কলকাতার ইহুদি সম্প্রদায়ের প্রাণপুরুষ ধরা হয় তাঁকেই।
উনিশ শতকের প্রথমার্ধে মূলত ইহুদিরা কলকাতায় বসবাস করা শুরু করেন। ১৯৪০ সালের প্রথম দিকেও কলকাতায় প্রায় ছ’হাজারের কাছাকাছি ইহুদি ছিলেন। তবে ইহুদিরা শুধু ‘ছিলেন’ বললে ভুল হবে। স্বাধীন ইজরায়েল গঠন এবং আরও নানা কারণে একসময় দলে দলে ইহুদি ভারতবর্ষ ছেড়ে চলে যেতে থাকেন। একসময় পাঁচ হাজারেরও বেশি ইহুদি ছিলেন কলকাতায়। এখন সংখ্যাটা মেরেকেটে ২০। যে ক’জন এখনও এই শহরে, এই শহরটাকে ভালবেসে রয়ে গিয়েছেন তাঁরা কিন্তু শক্ত মুঠিতে ধরে রেখেছেন তাঁদের হারিয়ে যাওয়া স্মৃতি, ভালবাসা। এই উদ্দেশ্যেই সময়ের ছাপ পড়ে যাওয়া মাগেন ডেভিড সিনাগগ এবং বেথেল এল-এর সংস্কার শুরু করা হয়। প্রায় দু’বছর বন্ধ থাকার পর সম্প্রতি সিনাগগ দু’টি খুলে দেওয়া হয়েছে।

নেভে শালম সিনাগগ-কলকাতা
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ নাগাদ বহু ইহুদি ছিলেন কলকাতায়। তবে শুধু এসেছিলেন বলাটা বোধহয় ভুল হবে। এঁরা এসেছিলেন এবং জয় করেছিলেন। রিয়াল এস্টেট, চলচ্চিত্র আর গ্ল্যামারের দুনিয়া ঝলমলে হয়ে ওঠে এঁদের উজ্জ্বল উপস্থিতিতে। শিক্ষা বা নারীদের প্রগতিশীলতাতেও এঁদের অবদান কম ছিল না। নির্বাক চলচ্চিত্র যুগের নামী অভিনেত্রী আরতি দেবী আসলে ছিলেন ইহুদি। তাঁর নাম ছিল রাচেল সোফাইয়ার। ‘প্রমীলা’ নামে অধিক প্রসিদ্ধ, এসথার ভিক্টোরিয়া আব্রাহাম ছিলেন স্বাধীন ভারতের প্রথম ‘মিস ইন্ডিয়া’। ১৯৬৭-তে তাঁর মেয়েও ‘মিস ইন্ডিয়া’ হন। স্বাধীন দেশের প্রথম মহিলা দন্তচিকিৎসকও ছিলেন একজন ইহুদি—ডা: তাভিতা সোলোমন। ৭১-এর বাংলাদেশ যুদ্ধের একজন নায়ক ছিলেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল জ্যাকব ফারজ রাফায়েল। রিয়েল এস্টেটের ব্যবসাতেও সেই সময় ইহুদিদের একচেটিয়া প্রতিপত্তি ছিল। তাঁদের মধ্যে সবথেকে প্রতিপত্তিশালী ছিলেন ডেভিড জোসেফ এজরা। তাঁকে পরাধীন ভারতের একজন ‘বিজনেস ম্যাগনেট’ বলাই যায়, এতটাই ছিল তার প্রভাব-প্রতিপত্তি। ব্রিটিশ ভারতের কলকাতার শেরিফ ছিলেন তিনি, ছিলেন রিজার্ভ ব্যাংকের একজন ডিরেক্টর, যুক্ত ছিলেন এশিয়াটিক সোসাইটির সঙ্গেও। এজরাদের বেশ কিছু স্থাপত্য কলকাতা আজও আগলে রেখেছে যত্নে। তারই কিছু নিদর্শন হল মেডিক্যাল কলেজের মধ্যে এজরা বিল্ডিং, চৌরঙ্গি ম্যানসন সহ আরও বেশ কিছু বাড়ি। এগুলি তৈরি করেছিলেন এজরা। এছাড়া, আজও অতীতের স্মৃতি বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে লালবাজারের সদর দপ্তরের প্রায় সংলগ্ন মানাসেহ মায়ার ভবন। এই বাড়ি যাঁর নামে, সেই স্যার মানাসেহ মায়ার ছিলেন একজন প্রতিপত্তিশালী ব্যাবসায়ী এবং সমাজ সংস্কারক।
এতো গেল ধন-সম্পত্তি, খ্যাতি-অখ্যাতির কথা। এবার আবার আমরা ফিরবো সেই কলকাতায়, যেখানে শাঁখের আওয়াজ মিশে যায় আজানের শব্দে। সেই যত মত তত পথের শহরে ইহুদিদের সিনাগগ বা উপাসানালয় থাকবে না তাই আবার হয় নাকি! রইলো সেইসব উপাসনালয়ের খোঁজ।
ক্যানিং স্ট্রিট আর ব্রাবোর্ন রোডের ক্রসিংয়ের পাশের ফুটপাত – যেখানে বিরাট বিরাট ত্রিপল খাটিয়ে পুরোদমে চলছে ব্যাবসা, অজস্র বাস-কন্ডাকটর আর ক্রেতাদের ভিড়ে, চিৎকার-চেঁচামিচিতে কান পাতা দায়, সেখানে খেয়াল করলে দেখবেন ত্রিপলের মাথা ছাড়িয়ে উঁকি দিচ্ছে টকটকে লাল এক তেকোণা মিনার – মাগেন ডেভিড সিনাগগ এমনই এক জায়গা। কলকাতায় ইহুদিদের হাতে গোনা কয়েকটি উপাসনাস্থলের মধ্যে অন্যতম, ১৯ নম্বর সিনাগগ স্ট্রিট।
এছাড়াও আরেকটি সিনাগগ আছে ইন্দ্রকুমার কারনানি স্ট্রিটে—নেভে শালম সিনাগগ। এটি কলকাতার প্রাচীনতম সিনাগগ – মূলত এজেকিয়েল মুসলিয়া এবং বেঞ্জামিন আব্রাহাম সলোমন ডেভিড এই দু’জন ইহুদির উদ্যোগে তৈরি।

নেভে শালম সিনাগগ-কলকাতা
এলিয়াস ডেভিড এজরা তাঁর বাবা, জোসেফ এজরার স্মৃতিতে ১৮৮৪-তে তৈরি করেন মাগেন ডেভিড সিনাগগ। ইতালিয় রেনেসাঁসের আদলে লাল ইট দিয়ে তৈরি বাইরের দিক। আর ভিতরটা ঠিক ততটাই শান্ত, কয়েক দশকের গল্প এক পুরোনো শহর জমা রেখেছে এর প্রতি কোণে। বিরাট বড়ো একটি হল, মাঝখানে মঞ্চের মতো উঁচু জায়গা। এখানে রাবাই, অর্থাৎ ইহুদি পুরোহিতরা বিশিষ্টদের নিয়ে দাঁড়াতেন প্রার্থনার সময়। উঁচু জানলা আর ছাদে লাগানো বহু রংয়ের কাচের টুকরো থেকে সূর্যের আলো প্রতিফলিত হয়ে সিনাগগের থামগুলি আলোর প্রতিফলন ফেরত দেয়। হলের শেষ প্রান্তে গ্যালারির মতো একটি জায়গা রয়েছে। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে হয় এখানে। সিনাগগগুলির এই জায়গাটি সবথেকে সুন্দর। কারুকার্যময় কাঠের রেলিং দিয়ে ঘেরা। এখানে রয়েছে তিনটি দরজা। এর ভিতরে রক্ষিত রয়েছে ইহুদিদের পবিত্র গ্রন্থ ‘তোরা’। ইহুদিদের ধর্মশাস্ত্রের প্রথম পাঁচটি গ্রন্থের সমাহার এটি। এর ওপরে রয়েছে একটি হাফ ডোম বা অর্ধ গম্বুজ। ঘন নীল দেওয়ালে সাদা সোনালী তারা। মাঝের দরজার উপর রয়েছে ইহুদি ধর্মের প্রতীক মেনোরা বা বাতিদান। মেনোরা-র দুই দিকে তিনটি করে মোট ছ’টা শাখা বা ব্রাঞ্চ থাকে। মেনোরা-র পাশে থাকে ছ’টি মুখের তারা। একে বলে, মাগেন ডেভিড বা ইহুদি শিল্ড অব ডেভিড। এই ছয় মুখের তারার অর্থ, পূর্ব-পশ্চিম, উত্তর-দক্ষিণ, উপর-নীচ—এই ছয় দিক দিয়ে ভক্তকে রক্ষা করেন ঈশ্বর। মাঝের দরজার ঠিক ওপরে রয়েছে একাধিক হিব্রু ইনস্ক্রিপশন। এরই সঙ্গে রয়েছে টেন কম্যান্ডমেন্টস বা আসেরেত হাদিব্র। ৬১৩টি নির্দেশের মধ্যে প্রথম ১০টি নির্দেশ, যা ইহুদিরা পালন করে। প্রতিটি দরজার পর্দাতেও টেন কম্যান্ডমেন্টস রয়েছে। সিনাগগের মূল হল থেকে উপরে সিঁড়ি উঠে গিয়েছে। ব্যালকনির মতো এই জায়গায় মহিলারা প্রার্থনা করতেন।
মাগেন ডেভিড সিনাগগ থেকে অদূরেই, ২৬ নম্বর পোলক স্ট্রিটে ইহুদিদের আর একটি উপাসনালয় বেথ এল সিনাগগ। বেথ এল-এর মানে হল ঈশ্বরের ঘর। মার্বেলের সিঁড়ি পেরিয়ে ভিতরে ঢুকলে বিরাট হলঘরে অপূর্ব ঝাড়লণ্ঠন। মাগেন ডেভিডের মতোই সিঁড়ি দেওয়া মঞ্চ রাবাইদের দাঁড়ানোর জন্য। একই রকম ওপরে ব্যালকনি ঘেরা জায়গা মেয়েদের প্রার্থনা করার জন্য। কলকাতায় একসময় প্রচুর তোরা ছিল। এখন আর তার কিছুই অবশিষ্ট নেই। এর মধ্যে মাত্র দু’টি এখনও সংরক্ষিত রয়েছে বেথ এল সিনাগগে।
এছাড়াও আরেকটি সিনাগগ আছে ইন্দ্রকুমার কারনানি স্ট্রিটে—নেভে শালম সিনাগগ। এটি কলকাতার প্রাচীনতম সিনাগগ – মূলত এজেকিয়েল মুসলিয়া এবং বেঞ্জামিন আব্রাহাম সলোমন ডেভিড এই দু’জন ইহুদির উদ্যোগে তৈরি। এছাড়াও কলকাতায় ছিল আরও একটি সিনাগগ। মাগেন এবথ সিনাগগ, যেটি ২০০৭ সালে ভেঙে ফেলা হয় এবং সেখানে নির্মাণ হয় একটি ফ্ল্যাট। সেই সিনাগগের অস্তিত্ব বলতে এখন শুধুই একটি মার্বেল ফলক মাত্র।
হাজার গল্প, ইতিহাস, সত্যি-মিথ্যের ভিড়ে এক অবশ্যম্ভাবি সত্য মৃত্যু। সেই সব গল্প জানে অতীত দিন। তাই শহরের বুকে অফুরান সবুজ মেখে শুয়ে আছে অতীত। নারকেলডাঙাতে রয়েছে ইহুদিদের সমাধিস্থান। কথিত আছে শালম কোহেন এক বাঙালি বন্ধুর থেকে এই জমি পেয়েছিলেন।
এনারকেলডাঙাতে রয়েছে ইহুদিদের সমাধিস্থান। কথিত আছে শালম কোহেন এক বাঙালি বন্ধুর থেকে এই জমি পেয়েছিলেন।

নেভে শালম সিনাগগ-কলকাতা
কলকাতায় ইহুদি কমতে কমতে এখন একের ঘরে। কিন্তু ইহুদিদের নিয়ম অনুযায়ী প্রার্থনার জন্য কমপক্ষে ১০জন পুরুষ দরকার; হিব্রুতে এদের বলে মিনইয়ান। এখন আর তাই নিয়ম করে প্রার্থনা হয় না। অনেকটা ঐ ঠিকানাবিহীন চিঠিগুলোর মত, যেগুলো আকাশের ঠিকানায় হারিয়ে গেছে। তাই মলিন ফুটপাত আরো মলিন হয়। ধুলো জমে শতাব্দী প্রাচীন গাছগুলোর পাতায়। একদিকে আলো, অন্যদিকে অন্ধকার – মাঝে ভেসে থাকা জীবন। আর তাই হয়তো এখনো থেকে যাওয়া কোনো কোনো ইহুদি কোনো এক শুক্রবার প্রথামাফিক মোম জ্বালিয়ে জলে ভাসিয়ে দেন। সেই ভাসতে থাকা মোম মনে করিয়ে দেয়, কীভাবে কলকাতার ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটা সম্প্রদায় হারিয়ে যাচ্ছে।
২০২৪–২০২৫ সালের হিসেবে জনসংখ্যা প্রায় ২০ থেকে ৩০ জন। ১৯৪০-এর দশকে যেখানে সর্বোচ্চ জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৬০০০ জন, সেখানে একশো বছরের মধ্যে ইহুদি সম্প্রদায় কলকাতায় প্রায় বিলুপ্তির পথে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মুসলিম তত্ত্বাবধায়কেরা কলকাতার শেষ দিকের ইহুদি উপাসনালয়গুলোর একটি—মাগেন ডেভিড সিনাগগে কাজ করে আসছেন। কিন্তু কলকাতার ইহুদি সম্প্রদায় ক্রমশ কমে আসছে- এই সিনাগগের ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত।
