কলকাতা ও লখনৌর সাংস্কৃতিক আদানপ্রদান, নিবেদনে সৌম্যদীপ রায়

শেহরাসোব : স্টুডিও বাড়িতে চলছে সৌম্যদীপ রায়ের প্রদর্শনী

প্রতিটি শহরের ইঁট কাঠের ইমারত, সংস্কৃতি, খাওয়া দাওয়া, লোকজনের কথোপকথন যেন বলে যায় বয়ে যাওয়া দিনের ইতিহাস, সেই ফিসফিস করে বলে চলা কথায় কান পাতলে আপনি শুনতে পাবেন এই ইতিহাস আসলে কোনো একটা শহরের ইতিহাস নয়। বিভিন্ন শহরের টুকরো অংশ গড়ে তোলে নতুন এক শহর। এভাবেই শহর কলকাতার মধ্যেও কোথাও গড়ে উঠেছে এক টুকরো লখনৌ, কোথাও শিখ, গুজরাটি, মাড়োয়ারিরা বসতি স্থাপন করে আপন করে নিয়েছেন এই শহরকে। কোথাও আবার ওপারের ঢাকা, ময়মনসিংহ, যশোর একাকার হয়ে গেছে কল্লোলিনীর বুকে।

কিন্তু এই লখনৌতে নবাবী সংস্কৃতির উৎস কী? এই প্রশ্নই ভাবিয়ে ছিল সৌম্যদীপকে। দীর্ঘ আট বছর ধরে এর উত্তর খুঁজতে খুঁজতে তিনি আবিষ্কার করেন এখানেও আছে সেই ভাঙাগড়ার খেলা। রং তুলিতে সেই আবহমান কালের গল্পই ফুটিয়ে তুলেছেন সৌম্যদীপ।

আসলে নদীর মতোই প্রতিটি শহরেরও আছে ভাঙা গড়ার গল্প। প্রায় এক দশক ধরে এই গল্প শুনতেই কান পেতেছেন কলকাতার শিল্পী সৌম্যদীপ রায় (Soumyadeep Roy)। গল্পের নেশা তাকে নিয়ে গেছে সেই কবেকার লখনৌ শহরে, যেখান থেকে কলকাতায় এসেছিলেন নবাব ওয়াজেদ আলি শাহ। তাঁর হাত ধরে উত্তরপ্রদেশের রাজধানী শহরের খণ্ডিত টুকরো এসে পড়েছিল ভাগীরথীর তীরে মাটির স্তুপে বা ব্রুজে, অর্থাৎ আজকের মেটিয়াবুরুজে। কলকাতা তখন চিনতে লাগল নতুন নতুন অনেক কিছু। নবাবের সঙ্গে সঙ্গে লখনৌ থেকে এলো নতুন ধরনের খাবার দাবার, পোশাক-আশাক, আমোদ প্রমোদ ইত্যাদি। শুধু তাই নয়, কলকাতার স্থাপত্যের গায়েও লাগলো নতুনত্বের ছোঁয়া।

কিন্তু এই লখনৌতে নবাবী সংস্কৃতির উৎস কী? এই প্রশ্নই ভাবিয়ে ছিল সৌম্যদীপকে। দীর্ঘ আট বছর ধরে এর উত্তর খুঁজতে খুঁজতে তিনি আবিষ্কার করেন এখানেও আছে সেই ভাঙাগড়ার খেলা। রং তুলিতে সেই আবহমান কালের গল্পই ফুটিয়ে তুলেছেন সৌম্যদীপ। শীতের কলকাতায় দমদম মেট্রো স্টেশনের খুব কাছেই স্টুডিও বাড়িতে তাঁর উদ্যোগে শুরু হয়েছে এক প্রদর্শনী, নাম শেহরাসোব (Shahrashob : Letters between Lucknow and Calcutta)। প্রদর্শনীর এই নামকরণের মধ্যেই লুকিয়ে আছে তাঁর ভাবনা। পারসি, উর্দু কবিতার এক শৈলীর নাম শেহরাসোব, এই ধরনের কবিতায় বর্ণিত থাকে শহরের ভেঙে যাওয়ার ইতিবৃত্ত। এক সময় যে বর্ণনা কবিতায় ফুটে উঠতো আজ তাই উঠে এসেছে শিল্পীর রং-তুলিতে।

ইতিহাস বলছে, লখনৌ গড়ে উঠেছিল দিল্লির টুকরো অংশে। ১৭৩৯ সাল নাগাদ দিল্লি আক্রমণ করেন পারস্য দেশের শাসক নাদির শাহ। রাজনৈতিক আক্রমণ অস্থির করে তোলে সমাজ সংস্কৃতিকেও। সে সময় দিল্লির কবি, সাহিত্যিক, শিল্পীরা ছড়িয়ে পড়েন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। তবে সিংহভাগই চলে আসেন লখনৌতে। সেখান থেকেই শুরু হয় আওধের নিজস্ব শিল্পচর্চা। আবার বদলে যাওয়া রাজনৈতিক পটভূমিকায় পুনরাবৃত্ত হয় সেই ঠিকানা বদলের ইতিহাস। নবাব ওয়াজেদ আলি যখন কলকাতায় আসেন দেশে তখনও জ্বলে ওঠেনি মহাবিদ্রোহের আগুন। অর্থাৎ, ১৮৫৭ সালের কিছুটা আগে ইংরেজদের নীতিতে হারানো রাজ্য পুনরুদ্ধার করার জন্য তিনি ভারতের তৎকালীন রাজধানী কলকাতায় আসেন বড়লাটের সঙ্গে দেখা করতে। তারপর বিভিন্ন ঘটনার ঘনঘটায় আর তার নিজের রাজ্যে ফেরা হয় না। তবে এই ঘটনা গঙ্গা ও গোমতীর তীরবর্তী দুই শহরের সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে খুলে দিয়েছিল এক অদৃশ্য বন্দর। যে বন্দরের মাধ্যমে অবাধে আদান-প্রদান হয়েছে শিল্প-সংস্কৃতির নতুন নতুন চিন্তাভাবনা। কলকাতার স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে নবাব এবং তাঁর পার্শ্ববর্তী মানুষজন যেমন কলকাতাতে নিয়ে এসেছেন শিল্প-সংস্কৃতির নতুন ধারা, তেমনই বাংলার নিজস্ব চিন্তাভাবনা নোঙর করেছে গোমতীর বন্দরে।

সেকালের শিল্প চিন্তার এই আদান-প্রদান মন দিয়ে লক্ষ্য করেছেন একালের শিল্পী সৌম্যদীপ। তাই তাঁর প্রদর্শনী জুড়ে শুধুই চিন্তা প্রবাহের আসা-যাওয়া। সে সময় স্থাপত্যের খিলানের উপর একটি ফুলের নকশা অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল। আজও পুরোনো স্থাপত্যে সেই নকশা দেখতে পাওয়া যায়, তবে যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে তার বেশিরভাগই আজ ভগ্নপ্রায়। সে ভগ্নপ্রায় স্থাপত্যের নকশা ভিড় করেছে শিল্পীর ক্যানভাসে। সেখানে কোথাও আছে লখনৌয়ের খিলানের উপর পলাশ ফুলের নকশার প্রতিচ্ছবি, কোথাও বা মুর্শিদাবাদের কোনো ইমারতের ভাঙা খিলানের ওপরের ফুল।

শুধু স্থাপত্য বা চিত্রে নয়, সংগীতের ক্ষেত্রেও এই দুই শহরের সংস্কৃতি ধারার প্রবাহমানতা আজও বহমান। সে কথা স্মরণ করে গত ৩০ নভেম্বর এই প্রদর্শনীর মাঝে স্টুডিও বাড়িতে আয়োজিত হয়েছে সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা ‘রঙ্গী-বিরঙ্গী’।

লখনৌ থেকে কলকাতা এসেছিলেন স্যালি বেগম, তখন তিনি নিতান্তই কিশোরী। কলকাতার সঙ্গে কীভাবে সম্পর্কিত তিনি? তা উঠে এসেছে এই মিউজিয়ামে। চিত্রিত আছে নিকি বাইয়ের অবয়বও, কলকাতার সঙ্গে তারও যোগাযোগ নিবিড়, শোনা যায় তিনি দুর্গাপুজোর সময় শোভাবাজার রাজবাড়িতে আসতেন। যদিও তার সত্যতা নিয়ে মতান্তর আছে। ওয়াজেদ আলি শাহ নন, সৌম্যদীপ কাজ করতে চেয়েছিলেন তাঁর সঙ্গে আসা মানুষজনদের বিষয়, যদিও সেখানে ঘুরেফিরে এসেই পড়েছে নবাবের প্রসঙ্গ। গ্যালারির দোতলা জুড়ে নবাব এবং তাঁর সঙ্গে আসা লোকজনের প্রতিকৃতি যেন এক লহমায় দর্শককে বসিয়ে দেয় টাইম মেশিনে, নিয়ে যায় সেই অষ্টাদশ শতকের আওধে।

সংস্কৃতিক যে আদান-প্রদান শুরু হয়েছিল মহাবিদ্রোহের আগে থেকেই তা আজও বহমান। সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গেও লখনৌয়ের প্রত্যক্ষ যোগাযোগের প্রমাণ ছড়িয়ে আছে অনেক জায়গায়। নবাবের শহরে ছিল সত্যজিৎ রায়ের মামাবাড়ি। শান্তিনিকেতনের কলাভবনের ছাত্র থাকাকালীন বেশ কিছুটা সময় তিনি মামাবাড়িতে ছিলেন। তখন তাঁর মা ছিলেন পুনেতে। সেই সময় মাকে লেখা সত্যজিতের চিঠি আজ সম্পদ, কারণ চিঠিগুলো পরিচয় করায় অচেনা সত্যজিতের সঙ্গে। দমদমের এই প্রদর্শনীতে উঠে এসেছে সেই চিঠিও।

শুধু স্থাপত্য বা চিত্রে নয়, সংগীতের ক্ষেত্রেও এই দুই শহরের সংস্কৃতি ধারার প্রবাহমানতা আজও বহমান। সে কথা স্মরণ করে গত ৩০ নভেম্বর এই প্রদর্শনীর মাঝে স্টুডিও বাড়িতে আয়োজিত হয়েছে সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা ‘রঙ্গী-বিরঙ্গী’।‌ তৈশী, সপ্তক, সৌগত, সায়ন এবং সায়ন্তন। লখনৌ কলকাতার সংযোগে তৈরি হওয়া উর্দু, পার্সি ভাষায় লেখা বিভিন্ন গান নতুনভাবে উঠে এল সুর-তাল-ছন্দে। ২০ জানুয়ারি (২০২৬) অবধি চলা এই প্রদর্শনীতে‌ ১৩ ও ১৪ ডিসেম্বর দর্শকদের জন্য থাকবে আরও অনেক চমক।

শহরকে যারা ভালোবাসেন, তারা ভালোবাসেন শহরের খুঁটিনাটিকেও। শহরের বাড়িগুলোর স্থাপত্য থেকে বৌদ্ধিক চর্চা সবকিছুকেই তারা দেখেন প্রেমিকের দৃষ্টিতে। তাই শহরের বদলে যাওয়া চরিত্রও নজর এড়ায় না তাদের। তবে পরিবর্তন যে জীবনের ধর্ম, আর পরিবর্তন পুরোনোর গন্ধ মেখেই আপন করে নেয় নতুনকে। সেই গন্ধটুকু নস্টালজিক মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে স্মৃতিতে, সত্তায়। সেভাবেই কলকাতা ও লখনৌ এই দুটি শহর বেঁচে আছে একে অপরের মধ্যে। দমদমের স্টুডিও বাড়িতে সেই লুকিয়ে থাকা সম্পর্ককেই সৌম্যদীপ মিলে ধরেছেন সকলের জন্য।

__________________ 
ছবি: সৌম্যদীপ রায়, প্রদীপ্তা কুণ্ডু

Post Tags
Developed by DXDasia