শতবর্ষ পেরনো দুষ্প্রাপ্য বইয়ের প্রদর্শনী এবার বইমেলায়

পি অ্যান্ড এম কমিউনিকেশনস এবং বঙ্গদর্শন-এর H21 নম্বর স্টলে দেখা যাবে বইগুলি

মাতৃভাষার স্বাদান্বেষণে হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁর ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’ হল ‘জিন’ (আশ্চর্য প্রদীপের), যা চাইবে তাই পাবে; যত সহজে এই কথাটা বলা হল, ততটা সহজ ছিল না বাংলাভাষার এই অমূল্য রত্নটি আবিষ্কার করা। শব্দ-কারিগর হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর নিষ্ঠায় বাংলা ভাষার এই শব্দকোষ গড়ে তুলতে ব্যয় করেছিলেন তাঁর জীবনের অধিকাংশ সময়, প্রায় ৪০ বছর! তাঁকে এ যাবৎ খুব কাছাকাছি রাখা হয়, এমনটা হয়তো আর বলা যাবে না। তাঁর বহু যত্নে গড়া ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’-এর প্রয়োজন এখন ‘লিমিটেড’। তিনিও স্মরণাতীত। তবে তাঁর ‘লিমিটেড’ অনুগামীদের মধ্যে যাঁরা পড়েন, তাঁরা হয়তো এখনও মনে রাখেন তাঁকে। এবার হরিচরণকৃত সেই বঙ্গীয় শব্দকোষ-এর দুষ্প্রাপ্য ৫টি খণ্ড প্রদর্শিত হতে চলেছ কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলায়। প্রদর্শিত হবে আরও তিনটি দুষ্প্রাপ্য বই- আর্ট ও আহিতাগ্নি : যামিনীকান্ত সেন, RABINDRANATH TAGORE A Centenary Volume, Abanindranath Tagore and the art of his times. পি অ্যান্ড এম কমিউনিকেশনস এবং বঙ্গদর্শন-এর H21 (হল নং-১) নম্বর স্টলে দেখা যাবে বইগুলি। বইগুলি ‘দ্য বেঙ্গল স্টোর’-এর দুষ্প্রাপ্য সংগ্রহ। 

বঙ্গীয় শব্দকোষ 

হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় কর্মসূত্রে জীবনের অনেকটা কাটিয়েছিলেন শান্তিনিকেতনে। সেখানে প্রায় বছর তিনেক শিক্ষকতা করা হয়ে গিয়েছে, ঠিক সেই সময়েই একদিন হরিচরণের কাছে রবীন্দ্রনাথ তাঁর স্ব-ইচ্ছা জানালেন। জানালেন- “আমাদের বাংলা ভাষায় কোনও অভিধান নেই, তোমাকে একখানি অভিধান লিখতে হবে।” 

রবীন্দ্রনাথের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাবোধে তিনি অতি উদ্যমে শুরু করে দেন শব্দ-অর্থ সন্ধানের কাজ। রবীন্দ্রনাথও তাঁর নিষ্ঠা দেখে খুশি হয়ে রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিপাঠীকে লেখেন, “এ গ্রন্থখানি রচিত ও প্রকাশিত হইলে দেশের একটি মহৎ অভাব দূর হইবে।” 

তবে, অর্থকষ্ট তাঁর পিছু না ছাড়ায় তাঁকে অভিধানের কাজ অসম্পূর্ণ রেখে আশ্রম ছেড়ে চলে আসতে হয়েছিল। সেই সময় খুব আর্থিক টানাপোড়েন চলছিল শান্তিনিকেতনে। বাধ্য হয়েই ছেড়েছিলেন আশ্রম। তারপর ক্ষুদিরাম বসুর সাহায্যে একটা চাকরি জোটালেন। সেন্ট্রাল কলেজে সংস্কৃত পড়ানোর চাকরি। পড়ানোর চাকরি করছেন, অথচ মনপ্রাণ সবই তাঁর গুরুদেবের সেই ইচ্ছাপূরণেই পড়ে আছে। মানসিক কশাঘাতে একদিন গিয়ে পৌঁছলেন জোড়াসাঁকোয়, সবটা বললেন রবীন্দ্রনাথকে। 

রবীন্দ্রনাথ সবটা মন দিয়ে শুনে তাঁর হিল্লে করে দেন কাশিমবাজারের মহারাজা মণীন্দ্রচন্দ্র নন্দীর কাছে। হরিচরণ মাসিক পঞ্চাশ টাকা বৃত্তি পেতে শুরু করেন মহারাজার তরফে। বেহাল অবস্থায় খানিক স্থিতি আসে। বৃত্তি পেয়ে তিনি সেই যে কলকাতা ছেড়েছিলেন, ১৯৫৯ সাল অবধি আমৃত্যু শান্তিনিকেতনেই থেকে গিয়েছিলেন। যেটুকু অর্থ সঞ্চয়ে রাখতে পেরেছিলেন তার সবটাই দিয়ে দিয়েছিলেন অভিধান প্রকাশের কাজে। ‘বিশ্বকোষ’-এর নগেন্দ্রনাথ বসু নিয়েছিলেন বই প্রকাশের দায়িত্ব। একে একে তেরো বছর ধরে মোট একশ’ পাঁচটি খণ্ডে প্রকাশ পায় ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’। তা উৎসর্গিত হয় রবীন্দ্রনাথের প্রতি।
বিশ্বভারতী অভিধান বিক্রির ব্যবস্থা করে দেয়। অর্থ সাহায্য আসে রথীন ঠাকুর, নাড়াজোলার মহারাজা, আশ্রমিক সঙ্ঘ, বিশ্বভারতী সংসদ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে। প্রশংসা আসে মহাত্মা গান্ধীর কাছ থেকে। গান্ধী তাঁর ‘হরিজন’ পত্রিকায় হরিচরণকে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক গিলবার্ট মারের সঙ্গে তুলনা করেন। হরিচরণের মৃত্যুর পর দু’টি খণ্ডে গোটা অভিধানটি প্রকাশ করে সাহিত্য অ্যাকাডেমি।
শুধুমাত্র বঙ্গীয় শব্দকোষই নয়, হরিচরণ রবীন্দ্রনাথকে গুরুদক্ষিণায় দিয়েছিলেন নিজের দু’টি চোখও। দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে তাঁকে বলতে শোনা যেত, ‘‘গুরুদেবের নির্দিষ্ট কাজে চোখ দু’টো উৎসর্গ করতে পেরেছি, এটাই পরম সান্ত্বনা।’’ 

অভিধান নিয়ে তাঁর প্রজ্ঞা সম্বন্ধে সুরঞ্জন ঘোষের একটি লেখায় বর্ণনা পাওয়া গিয়েছে— 
‘‘প্রতিদিন সান্ধ্য আহ্নিক সেরে লন্ঠনের আলোয় কুয়োর ধারে খড়ের চালাঘরে পশ্চিম জানলার কাছে হরিবাবু কাজ করতেন। সুনীতিকুমারের স্মৃতিতেও এই ‘ক্ষীণপ্রায় ব্রাহ্মণ’-এর ছবিটা প্রায় একই রকম। সুনীতিবাবু যখনই হরিচরণের বাড়ি যেতেন, তখনই দেখতেন তক্তপোষের উপর ডাঁই করে রাখা উর্দু, পার্সি, ইংরেজি, ওড়িয়া, মারাঠি-সহ বিভিন্ন ভাষার অভিধান ছড়ানো রয়েছে। দ্বিজেন ঠাকুর তো ছড়াই বেধে ফেলেছিলেন, ‘‘কোথা গো মেরে রয়েছ তলে/ হরিচরণ, কোন গরতে?/ বুঝেছি, শব্দ-অবধি-জলে/ মুঠাচ্ছ খুব অরথে।।’’ 

হরিচরণের শব্দ-শব্দার্থ আগ্রহের বিষয়টি প্রথম ধরা পড়েছিল রবীন্দ্রনাথের কাছেই। শিক্ষিত-সংস্কৃতজ্ঞ হরিচরণ ছিলেন ঠাকুর পরিবারের পতিসরের জমিদারির সেরেস্তা। একদিন জমিদারির কাজকর্ম দেখতে এসে রবীন্দ্রনাথ আবিষ্কার করেছিলেন হরিচরণ দিনে সেরেস্তার কাজ করলেও সন্ধের পর থেকে তাঁর কাজের পরিসর যেত পাল্টে। সন্ধ্যার পর চলত সংস্কৃত আলোচনা, বইয়ের পাণ্ডুলিপি দেখে প্রেসের কপি-পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত করা। সেইসব পাণ্ডুলিপি নিরীক্ষণ করেই হরিচরণের গূঢ় রহস্য ভেদ করে ফেলেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। বিধুশেখর শাস্ত্রী, ক্ষিতিমোহন সেন, জগদানন্দ রায় এবং অবশ্যই ঠাকুর পরিবারের দিকপালদের সঙ্গে একই সারিতে রবীন্দ্রনাথ হরিচরণকে ঠাঁই দিয়েছিলেন অধ্যাপক হিসেবে। 

আর্ট ও আহিতাগ্নি
শ্রী যামিনীকান্ত সেন লিখিত, ১৩২৮ বঙ্গাব্দে প্রকাশিত এই বইটি ‘দ্য বেঙ্গল স্টোর’-এর দুষ্প্রাপ্য সংগ্রহ। “আর্ট ও আহিতাগ্নি”, কাব্য এবং চিত্রকলার ভাব ও আদর্শে সমৃদ্ধ। কবিতা এবং ছবির দুনিয়ায় ভাব ও কল্পনা মিলেমিশে যে আবহ তৈরি করেছে তার কথাও রয়েছে এই বইয়ে। ভারতের পাশাপাশি ইউরোপ এবং এশিয়ার শ্রেষ্ঠ আর্টের ধারাবাহী আলোচনার হদিশ মিলবে এই দুস্প্রাপ্য বইয়ের পাতায়। 

Abanindranath Tagore and the art of his times 

জয়া আপ্পাস্বামী লিখিত এই বইটিতে বাংলা চিত্রশিল্পের ইতিহাসের নিদর্শন রয়েছে। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নন্দলাল বসু, বিনোদ বিহারী মুখার্জি, রামকিঙ্কর বেইজ প্রমুখ বিখ্যাত শিল্পীদের ছবির গল্পে সমৃদ্ধ এই বইটি। এই দুষ্প্রাপ্য বইয়ে পাবেন শিল্পীদের নিজস্ব ছবির ইলাস্ট্রেশন। পাশাপাশি লোকচিত্রের আঙিনায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর, যামিনী রায় –এর মতো শিল্পীদের ছবির দুনিয়ার খোঁজও মিলবে এই বইয়ে।  

RABINDRANATH TAGORE A Centenary Volume 1861 – 1961 

সাহিত্য অকাদেমি থেকে প্রকাশিত এই বইয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিয়ে কলম ধরেছেন বিশিষ্ট ব্যক্তিরা। এই বইয়ের ভূমিকা লিখেছেন জহরলাল নেহেরু। বইয়ে রয়েছে ইন্দিরা দেবী চৌধুরানী, ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো, রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রমুখের সঙ্গে রবি ঠাকুরের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার জার্নিও।

Developed by DXDasia