
পাশ্চাত্য শিক্ষার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে চিত্তরঞ্জনের মতবিরোধ হয়
শিলাইদহে মাঝেই মাঝেই সংসার পেতে বসতেন আত্মভোলা কবি রবীন্দ্রনাথ। কবিপত্নীর দিন কাটত সাংসারিক নানা কর্মকাণ্ডে। এর মধ্যেই মাঝে মাঝে এসে পড়তেন অমলা দাশ। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের বোন। মৃণালিনীদেবীর সঙ্গে তাঁর খুব সখ্য। অমলার গানের গলা ছিল খুব সুন্দর। রবীন্দ্রনাথ নিজে রাধিকাপ্রসাদ গোস্বামীর কাছে তাঁর গান শেখার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। রথীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিচারণ থেকে জানা যায় শিলাইদহে গভীর রাত পর্যন্ত গানের আসর বসত। অমলাদেবীর ক্লান্তিহীন, মধুর কণ্ঠ ভরাট করে তুলত নির্জন পদ্মাবক্ষ। মৃণালিনীদেবীর সঙ্গে সম্পর্কের সূত্র ধরেই রথীন্দ্রনাথ তাঁর স্মৃতিচারণায় লিখেছিলেন যে অমলাকে তাঁরা পরিবারের একজন বলেই মনে করতেন। অমলাদেবী আর মৃণালিনীদেবীর হৃদ্যতা রবীন্দ্রনাথের কাছে কৌতূকপ্রদ ঈর্ষার কারণ ছিল। তাদের গল্পগাছা ফুরাতেই চাইত না। আমাদের আজকের কথকতার বিষয় অমলা দাশ ও মৃণালিনীর সম্পর্ক নয়, তাঁর দাদা দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ ও রবীন্দ্রনাথের সম্পর্কের রসায়ন। সমসময়ের দুই বিখ্যাত মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের উপর এসে ভর করে সমাজ, রাজনীতি, মত, পথ, আরো কত কী! সেই কারণেই হয়তো সম্পর্কের সমীকরণটা সহজ থেকে জটিল হয়ে যায়। একসঙ্গে চলতে শুরু করলেও সময় জানে, সে পথ যাবে ঠিক কোনখানে। সময় বহতা নদী। তার গর্ভে লুকিয়ে থাকে ভবিষ্যৎ আর সেইখানে যেন প্রাণভোমরার মতো লুকিয়ে থাকে ভবিষ্যতের অনাবৃত সত্য। চিত্তরঞ্জন আর রবীন্দ্রনাথের নিবিড় সখ্যের প্রধান উদ্দীপক ছিলেন মৃণালিনীদেবী ও অমলাদেবীর অমলিন বন্ধুত্ব ও নির্ভরতা।
চিত্তরঞ্জন মূলত ছিলেন একজন আইনজীবী। স্বরাজ্য পার্টির প্রতিষ্ঠাতা। বাংলার ইতিহাসে তিনি দয়াল এক মানুষ, দানবীর।। তাঁর বাবা ভুবনমোহন দাশও ছিলেন বিখ্যাত মানুষ, সমাজের ছকে বাঁধা প্রচলিত নিয়মভাঙাদের দলে। ভুবনমোহনের মতোই চিত্তরঞ্জনও হিন্দুধর্মের দেবতাদের সিদ্ধরূপে মেনে নেননি। গোঁড়া সমাজের প্রতিকূলে গিয়ে অসবর্ণ বিবাহ করেছিলেন। সেই আমলে বিখ্যাত, ধনী উকিলদের মধ্যে চিত্তরঞ্জন দাশ ছিলেন অন্যতম। প্রথমজীবনে দেশের জন্য নিবেদিত প্রাণ ছিলেন না চিত্তরঞ্জন। পেশা ছিল ওকালতি এবং নেশা ছিল সাহিত্যসাধনা। সাহিত্যজগতে প্রতিষ্ঠা পাওয়ারও ইচ্ছে ছিল তাঁর। অনেক অর্থ ব্যয় করে তিনি ‘সাগর সঙ্গীত’ নামে একটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করিয়েছিলেন। অরবিন্দ ঘোষ তার সুললিত অনুবাদ করেছিলেন। তাঁর অন্য একটি কাব্যগ্রন্থের নাম ছিল ‘মালঞ্চ’। সাহিত্যের প্রতি আকর্ষণ এবং অমলাদেবীর সঙ্গে মৃণালিনীদেবীর প্রবল নৈকট্যের সূত্রে চিত্তরঞ্জন ছিলেন রবীন্দ্রনাথের কাছের মানুষ। রবীন্দ্রনাথ ও মৃণালিনীকে কাকা ও কাকিমা সম্বোধন করতেন চিত্তরঞ্জন। ঠাকুরবাড়ির ঘনিষ্ঠ সব সভায় আমন্ত্রিত থাকতেন চিত্তরঞ্জন দাশ। খামখেয়ালি সভার বিশেষ আমন্ত্রিত এগারোজনের তালিকায় চিত্তরঞ্জনের নাম ছিল। খামখেয়ালি সভার দ্বিতীয় অধিবেশনে অভ্যাগতদের সংখ্যা ছিল মাত্র পাঁচ। তার মধ্যেও উজ্জ্বল ছিল চিত্তরঞ্জন দাশের নাম। যে কোনোরকম খাস মজলিসে রবীন্দ্রনাথ তাঁকে আমন্ত্রণ জানাতেন। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের সময় চিত্তরঞ্জন আর রবীন্দ্রনাথ একসঙ্গে কাজ করেছেন। দেশের জন্য অর্থ সংগ্রহ করেছেন। রবীন্দ্রনাথের পঞ্চাশ বছরের জন্মদিনের অনুষ্ঠানেও সানন্দে অংশগ্রহণ করেছিলেন চিত্তরঞ্জন। এরপর চিত্তরঞ্জনের পেশাগত জীবনে ব্যস্ততা চলে আসে। তাঁর বাকপটুত্ব তাঁকে ব্যস্ততম ব্যারিস্টারে পরিণত করে। তবু তিনি ছিলেন রবীন্দ্রনাথের একনিষ্ঠ পাঠক। রবীন্দ্রনাথ একবার জাতীয় সংগীতের খসড়া লেখাটি চিত্তরঞ্জন দাশের বাড়ি ফেলে এসেছিলেন। ১৯১১ সালে এই সংগীত গাওয়া হয়েছিল চিত্তরঞ্জনের বোন অমলা দাশের নেতৃত্বে। চিত্তরঞ্জনের ভাই বসন্তরঞ্জনের অকালমৃত্যুর পর তাঁর বিধবা স্ত্রী সরযুবালা ‘বসন্ত প্রয়াণ’ নামে এক গদ্য লেখেন। লেখাটি দুর্বল রচনা। কিন্তু বন্ধুত্বের জন্যই রবীন্দ্রনাথ স্বভাববিরুদ্ধ ভঙ্গিতেই লেখাটির অনুবাদের অনুরোধ করে রোটেনস্টাইনকে চিঠি পর্যন্ত লেখেন। এই এত ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের মধ্যেও এসে দাঁড়াবে নীরবতার শীতল দেওয়াল। সময় কত রঙ্গই না জানে! কিন্তু সম্পর্কের উষ্ণতা বদলের কারণ কী, সেই নিয়ে খুব জোরালো কোনো তথ্য পাওয়া যায় না।
প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় চিত্তরঞ্জনের ‘সাগরসঙ্গীত’ কাব্যগ্রন্থ সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের নীরবতাকে সম্পর্কের অবনতির প্রাথমিক কারণ হিসেবে দেখেছেন। তবে রবীন্দ্রনাথের যে লেখা ভালো লাগত না, সেই লেখা সম্পর্কে তিনি নীরব থাকতেন। একটি সামান্য বইয়ের কারণে সম্পর্কে চিড় ধরে না। আরো অন্য কারণ ছিল। এর অন্তরালে অবশ্যই ছিল ব্রাহ্মসমাজ। চিত্তরঞ্জন দাশের লেখা ‘মালঞ্চ’ কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের পর থেকে ব্রাহ্মসমাজের সঙ্গে চিত্তরঞ্জনের বিরোধ শুরু হয়। তরুণ লেখক চিত্তরঞ্জনের লেখায় তারুণ্যের উচ্ছ্বাস, মানবপ্রেমের প্রসঙ্গ ছিল। সেই নিয়ে ব্রাহ্মসমাজের নীতিবাগীশদের উপদেশ বর্ষণ শুরু হয়। তাঁরা চিত্তরঞ্জনের ‘বারবিলাসিনী’ কবিতা পড়ে চিত্তরঞ্জনকে একেবারে ‘লম্পট’ বলে বসলেন। অথচ কবিতাটি ছিল সমাজের নিপীড়িত মানুষদের নিয়ে লেখা। এইসব অকবিরা ব্রাহ্মসমাজের সদস্য ছিলেন বলেই বুঝি রবীন্দ্রনাথ এক্ষেত্রেও নীরব রইলেন। দেবেন্দ্রনাথের বাধ্য সন্তান হিসেবে ব্রাহ্মসমাজের এই অন্যায় আচরণের প্রতিবাদও করলেন না। চিত্তরঞ্জন আর বাসন্তীদেবীর বিয়ের মতো ব্যক্তিগত বিষয়েও চলল ব্রাহ্মসমাজের বাধা দেওয়ার প্রবল প্রচেষ্টা। চিত্তরঞ্জন এইসব বিরূপ ঘটনার স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়ায় ব্রাহ্মসমাজ থেকে দূরে সরে গিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথের নৈঃশব্দ্য তাঁকে রবীন্দ্রনাথের থেকেও দূরে নিয়ে গিয়েছিল। হয়তো ব্রাহ্মসমাজের প্রতি এই অন্ধ দুর্বলতা চিত্তরঞ্জনকে রবীন্দ্রনাথের মত ও পথের বিপ্রতীপে এনে দাঁড় করিয়েছিল। শুধু নীরবতা নয়, চিত্তরঞ্জনের প্রেরণায় বিপিনচন্দ্র পালের সহযোগিতায় প্রকাশিত হল ‘নারায়ণ’ পত্রিকা। এই পত্রিকার লক্ষ্যই ছিল প্রমথ চৌধুরী সম্পাদিত ‘সবুজপত্র’, রবীন্দ্রনাথ, দেবেন্দ্রনাথ এমনকি রামমোহন রায়ের সকল রকম কাজের সমালোচনা করা। পরবর্তীকালে ‘নারায়ণ’ পত্রিকা রবীন্দ্রবিরোধিতার অন্যতম মাধ্যম হয়ে যায়। চিত্তরঞ্জন নিজে কখনও রবীন্দ্রনাথের নামে বিরোধিতামূলক কোনো লেখা লেখেননি।
কিন্তু ১৯১৭ সালের বঙ্গীয় প্রাদেশিক সম্মেলনে সভাপতির ভাষণে চিত্তরঞ্জন রবীন্দ্রনাথের সম্পর্কে সামান্য বিরূপ মন্তব্য রাখেন। সঙ্গে সঙ্গে রবীন্দ্র অনুসারী পত্র পত্রিকায় চিত্তরঞ্জনের সমালোচনা প্রকাশিত হতে লাগল। কিন্তু এইসব বিতর্কের উর্ধ্বে উঠে দেশের স্বার্থে রবীন্দ্রনাথের কাছে গিয়েছিলেন চিত্তরঞ্জন, রবীন্দ্রনাথকে কংগ্রেসের অভ্যর্থনা সমিতির সভাপতি করার প্রস্তাব নিয়ে। রবীন্দ্রনাথও সেই অনুরোধ রেখেছিলেন। কিন্তু স্বভাবকবি রবীন্দ্রনাথ অচিরেই রাজনীতির জটিলতা থেকে বেরিয়ে আসেন। এই সূত্রে শিল্পী মুকুলচন্দ্র দে-কে লেখা রবীন্দ্রনাথের একটি চিঠির অংশ উল্লেখ করা যায়, ‘আমাকে চারিদিকের লোকেরা কাজে লাগাতে চায়। আমার ইচ্ছা করে সব চুকিয়ে ফেলে নিজের কাজ করি— তাহলে আমি বাঁচি।’ এরপরেই রবীন্দ্রনাথ পদত্যাগ করেছিলেন। নাইটহুড ত্যাগের সময় চিত্তরঞ্জন দাশের উদ্যোগেই সভা ডেকেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। সিদ্ধান্ত নেওয়ার মুহূর্তে চিত্তরঞ্জন দাশের কথাই তাঁর মনে হয়েছিল। তারপর আবার পাশ্চাত্য শিক্ষার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে চিত্তরঞ্জনের মতবিরোধ হয়। কিন্তু সব মতদ্বৈধ সত্ত্বেও এই দুই ব্যক্তিত্ব দেশের প্রয়োজনে একত্রে কাজ করেছেন। চিত্তরঞ্জনও মৃত্যুর আগে বলেছিলেন, ‘আমি রবিদ্বেষী একেবারেই নই, তাঁর অলৌকিক প্রতিভা আমি কখনই অস্বীকার করি না।’
চিত্তরঞ্জনের মৃত্যুর পর রবীন্দ্রনাথ পুত্র রথীন্দ্রনাথকে লিখেছিলেন, ‘চিত্তরঞ্জনের মৃত্যু উপলক্ষ্যে আমার কলকাতা যাওয়া উচিত বলে আমার মনে একটা আন্দোলন চলচে— বিশেষত চিত্তর সঙ্গে বরাবরই আমার একটা বিরোধ ছিলো— একথা কেউ যেন মনে না করে যে আমার মনে তাঁর প্রতি এতটুকুও প্রতিকূল ভাব আছে।’ বিধানচন্দ্র রায়ের অনুরোধে রবীন্দ্রনাথ চিত্তরঞ্জনের জন্য লিখেছিলেন— ‘এনেছিলে সাথে করে মৃত্যুহীন প্রাণ/ মরণে তাহাই তুমি করে গেলে দান।’ দীর্ঘ আঠাশ বছরের এই অম্লমধুর সম্পর্কের কথকতা একটা সময়কে ছুঁয়ে যায়। ইতিহাস সালতারিখের হিসেব করে, কিন্তু সময় জানে মনের আবেগ, মত ও পথের মিল ও অমিলের কাহিনি। মহাকালের হিসেবখাতায় এর মূল্য কতটুকু জানা নেই, কিন্তু একসময়কার প্রাণবন্ত এই মহান ব্যক্তিত্বদের কাছে নিজেদের হৃদয়ের স্বরের গুরুত্ব তো ছিলই। সেই আবেগের সোনারকাঠি জড় ইতিহাসে প্রাণপ্রতিষ্ঠা করুক।
সহায়ক প্রবন্ধঃ
রবীন্দ্রনাথ ও চিত্তরঞ্জন-রৌদ্র মেঘের খেলা, শ্যামাপ্রসাদ বসু, কোরক সাহিত্য পত্রিকা, শারদ ১৪১৫

