দক্ষিণের বারান্দা ভেঙে যাওয়ার সময় অবনীন্দ্রনাথ অদ্ভুত কিছু ফ্রেস্কো আঁকেন
ছবিঃ প্রতীকী
আশাপূর্ণাদেবীর ‘সুবর্ণলতা’-র একটিই স্বপ্ন ছিল—দক্ষিণের বারান্দা। আসলে কল্পনাপ্রবণ, শিল্পমনস্ক মনের একচিলতে নিজস্ব কোণের স্বপ্ন থাকে। সে খোলা উঠোন হোক, চিলেকোঠা হোক বা একফালি বারান্দা। আধুনিক কবির কলমেও সেই একই সুর—
‘ও বারান্দা তোমার হলুদ কোণে
আমার ধূসর স্মৃতির ভার
রইল পড়ে অপেক্ষাতে
রেলিঙের ধারটায়।’
কলকাতা শহরের শিল্পমনস্ক এক পরিবার ঠাকুরবাড়ি! বাড়ি তো নয়, যেন গন্ধর্বলোক। প্রত্যেকেই সৃষ্টিশীল, প্রত্যেকেই গুণীজন। তাঁদের কিন্তু একলা লম্বা দক্ষিণের বারান্দা ছিল। এই বারান্দাই আমাদের আজকের কথকতার প্রাণভোমরা।
পাঁচনম্বর ঠাকুরবাড়ির লাইব্রেরি ঘরের গা ঘেঁষে ছিল দক্ষিণের বিরাট বারান্দা। পূব থেকে পশ্চিমে ছিল তার বিস্তার। উপর থেকে সারা বারান্দায় ঝুলন্ত কাঠের ঝিলিমিলি, বারান্দার গথিক থাম, বিলিতি ঢালাই করা গ্রিল অন্যরকম এক শোভা তৈরি করেছিল ঠাকুরবাড়ির বারান্দায়। বারান্দার অন্য ধারে ছিল দেওয়ালে গাঁথা খড়খড়ি দেওয়া বিরাট বিরাট দরজা। এই দরজা বন্ধের জন্য মস্ত বড় ও লম্বা পিতলের ছিটকিনি ছিল। বারান্দায় লাল মেঝে ছিল কালো ডোরাকাটা। ছয় নম্বর ঠাকুরবাড়িতেও দক্ষিণের বারান্দা ছিল। তবে দেবেন্দ্রনাথের আমল থেকে দুই বারান্দার মধ্যিখানে একটুকরো ফাঁক ছিল প্রাচীন সময়ের মতদ্বৈধের প্রতীক হিসেবে। জোড়াসাঁকোর এই পাঁচ নম্বর ঠাকুরবাড়ি দ্বারকানাথ অত্যন্ত পরিকল্পনা করে তৈরি করেছিলেন।বিলেত থেকে স্থপতি আনিয়ে ১৮২৩ সালে এই বৈঠকখানা বাড়ি তিনি তৈরি করিয়েছিলেন। দিগম্বরী দেবীর সঙ্গে মানসিক দূরত্বের ফলে পরে এই বৈঠকখানা বাড়িতেই তিনি বসবাস শুরু করেন। এই অংশ দেশবিদেশের রাজা রাজরা, অতিথি অভ্যাগতের অতিথিশালা হিসেবে ব্যবহার করা হত। এইখানেই দ্বারকানাথের সময় অতিথি আপ্যায়ন হত এবং ভোজসভা বসত। তাঁর মৃত্যুর বেশ কয়েকবছর পর গিরীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অকালমৃত্যু হলে দ্বারকানাথের উইল অনুসারে ঠাকুর পরিবারের সম্পত্তি আলাদা হয়ে যায়। দ্বারকানাথের বৈঠকখানা পেলেন গিরীন্দ্রের পরিবার। পরে গিরীন্দ্রনাথের স্ত্রী যোগমায়াদেবীর অনুরোধে গৃহদেবতার দায়িত্ব পায় পাঁচ নম্বর ঠাকুরবাড়ি। দ্বারকানাথের এই বৈঠকখানা বাড়ির চেহারাটি ছিল ইংরেজি এলের মতো। দেউড়িতে ঢুকে বাঁদিকে ছিল দোতলার নাচঘর, লাইব্রেরি আর দক্ষিণের বারান্দায় যাবার মেহগনি কাঠের কালো সিঁড়ি। এইটু তফাতে ছিল ছয় নম্বর ঠাকুরবাড়ির বারান্দা। তাদের মাঝে একটুকুরো ফাঁক যেন দুই পরিবারের ধর্মভাবনার ভাঙা সেতুর মতো। অথচ শিল্পভাবনায় দুই পরিবার হরিহর আত্মা। ধর্মচিন্তার বৈপরীত্য তাঁদের সখ্যের পথে অন্তরায় ছিল না। এইসব কিছুর সাক্ষী দক্ষিণের বারান্দা।
অবনীন্দ্রনাথের দৌহিত্র সুমিতেন্দ্রনাথ ঠাকুরে স্মৃতিচারণ থেকে জানা যায় দক্ষিণের বারান্দার বড়ো বড়ো দরজার সামনে অবনীন্দ্রনাথেরা তিন ভাই বসতেন। যেন মগ্ন তপস্বী! এই দক্ষিণের বারান্দায় যে কত বড় শিল্প আন্দোলন হয়ে গেছে তার খবর সেকাল না রাখুক একাল রেখেছে। পাশ্চাত্য শিল্পের ঘেরাটোপ থেকে ভারতীয় শিল্প হকে মুক্ত করেছেন তিন সাধক অবনীন্দ্রনাথ, গগনেন্দ্রনাথ এবং সমরেন্দ্রনাথ। ভারতীয় শিল্প সাধনায় অবনীন্দ্রনাথ ও গগনেন্দ্রনাথের ভূমিকা অপরিসীম। সকাল থেকে দক্ষিণের বারান্দায় ছাত্রদের ভিড় জমত। অবনীন্দ্রনাথের পাশে রাখা থাকত কাঠের খড়খড়িওয়ালা পার্টিশন। তার ওপারে অন্দরমহল। বাইরে গণ্যমান্য কেউ এলেই খড়খড়ির ফাঁক থেকে খবর নিতেন পাঁচ নম্বর ঠাকুরবাড়ির মহিলারা। তাঁরাও কম গুণবতী ও বিদুষী ছিলেন না। অবনীন্দ্রনাথ যে চেয়ারে বসে আঁকতেন, তার সামনেই ছিল চিত্রবিচিত্র গোল জলের গামলা। তিনপায়া টুলের উপর জার্মান সিলভারের ঢাকনা দেওয়া। পাশে কালো লম্বা টেবিলে রঙবেরঙের বাক্স, সরঞ্জাম, জাপানী ফ্ল্যাট ব্রাশের গুচ্ছ। মুখে জ্বলন্ত সিগার অথবা গড়গড়ার সটকা। আগুন নিভে গেলেও খেয়াল করতেন না। এমনি মগ্ন থাকতেন আঁকায়। এই বারান্দাতেই অবনীন্দ্রনাথের জন্মদিন পালন হয়েছে অনেক সময়।
ছয়নম্বর ঠাকুরবাড়িতে দীর্ঘসময় ধরে ছিল দেবেন্দ্রনাথের ব্যক্তিগত শাসন। তাই ইচ্ছেমতো আনন্দের পরিবেশের বদলে নিয়ন্ত্রিত আনন্দের আবহাওয়াই সেখানে গুরুত্ব পেত। অথচ অদূরেই পাঁচ নম্বর ঠাকুরবাড়ি থেকে ভেসে আসত খোলা হাসির আনন্দ। উপচে পড়ত হাসি, অক্ষয় চৌধুরীর উদ্দাম নৃত্য। জ্যোতিরিন্দ্রনাথের আমলে হিন্দুমেলার আয়োজন, অনুষ্ঠানের মহড়া সবই তো ওই দক্ষিণের বারান্দাকে ঘিরেই। শিশু রবিও গভীর মুগ্ধতার সঙ্গে চেয়ে থাকতেন সেই দিকে। ছয় নম্বরের বারান্দার পূর্বদিকের কোণে ছিল ভৃত্য মহল। সেখানেই কেটেছে রবীন্দ্রনাথের শৈশব। কোনো অবেলার অবসরে দক্ষিণের বারান্দটিই হয়ে যেত রবীন্দ্রনাথের ওরিয়েন্টাল সেমিনারির ক্লাসরুম। তারপর দিন গড়িয়েছে। বারান্দা রবীন্দ্রনাথের জীবনের অনেক স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। মাকে শেষবারের মতো চিরঘুমে ঘুমন্ত দেখেছেন বারান্দায়। বাবার শোকে স্তব্ধ উপাসক মূর্তিও দেখেছেন বারান্দার এককোণে। জোড়াসাঁকোর বারান্দা ঘুরে বিয়ে করতে গিয়েছেন নিয়ম মেনে। ছোটোবেলায় রবীন্দ্রনাথ দক্ষিণের বারান্দায় আতার বীজ পুঁতে রোজ জল দিতেন দীর্ঘ কোনো বৃক্ষের আশায়। তবে দক্ষিণের বারান্দা সরগরম করেছেন অবনীন্দ্রনাথ, গগনেন্দ্রনাথরাই। রবীন্দ্রনাথ পরে এই বারান্দাতেই অনুষ্ঠানের মহড়া করিয়েছেন। একবার ‘শেষ বর্ষণ’-এর মহড়া করাচ্ছেন রবীন্দ্রনাথ। একটু দূরে ওই দক্ষিণের বারান্দাতে বসেই অবনীন্দ্রনাথ আঁকছেন ওই মহড়ার ছবি। শোনা যায় বেলজিয়ামের রাজা রানি এসেও ওই বারান্দাতেই বসেছিলেন। অনুষ্ঠান দেখেছিলেন। পূর্ণিমার এবং প্রতিভার আলোয় বারান্দা ভরাট হত আলোর বন্যায়। ঠাকুরবাড়ির দক্ষিণের বারান্দায় সত্যিই চাঁদের হাট বসত।
তবে দক্ষিণের বারান্দার গল্পটা রূপকথা হয়েই রয়ে গেল। সংরক্ষণ করা যায়নি পাঁচ নম্বর বাড়ির অনেকটাই। রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পর ভাঙন ধরছিল বাড়ির অন্তরে। ছয় নম্বর বাড়ি রক্ষা করা গেলেও পাঁচ নম্বর বাড়ি বিক্রি করা হয় বড়োবাজারের এক মারোয়াড়ি ব্যবসায়ীর কাছে। অত্যন্ত ভাঙা মন নিয়ে শিল্পসাধক অবন ঠাকুরকেও চলে যেতে হয় তাঁর প্রায় আজীবনের নন্দনকানন ছেড়ে। তাঁরা সপরিবারে চলে গেলেন বরানগরের গুপ্তনিবাসে। মনখারাপের মেঘ কতটা জমেছিল তা জানা নেই, কিন্তু ওই দক্ষিণের বারান্দা জানতে পারে নি আসন্ন দুর্যোগের ঘনঘটা। একদিন অবনীন্দ্রনাথকে বোঝানো হল পাঁচ নম্বর বাড়ি রক্ষা করে মিউজিয়ম হবে। অবনীন্দ্রনাথের ছবি তাঁদের চাই। প্রথমটা রাজি না হলেও মিউজিয়মের কথাটায় ভরসা করেই অবনীন্দ্রনাথ ছবি দিতে রাজি হন। বহু ছবি দিয়ে দেওয়ার পর শোনা গেল পাঁচ নম্বর ঠাকুরবাড়ি ভাঙা হচ্ছে। সেই সঙ্গে দক্ষিণের বারান্দাও। যুক্তি ছিল এই যে এত প্রাচীন বাড়ি নাকি রাখা যাবে না। তবে এই বাড়ি ভাঙা নিয়ে সংশয়ের মেঘ এখনও যায় নি। শেষ হয়ে গিয়েছিল অনেক স্মৃতির, আদরের দ্বারকানাথের বৈঠকখানা, অবনীনদ্রনাথের দক্ষিণের বারান্দা আরো অনেক স্মৃতিভরা স্থাপত্য। সুমিতেন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘ঠাকুরবাড়ির জানা অজানা’ বইতে সরাসরি বলেছিলেন, ‘তিন কর্তা ও তাঁদের পিতা-পিতামহ-প্রপিতামহের বৈঠকখানার চিহ্নকে একেবারে দ্বারকানাথের গলি থেকে লোপাট করে—শুধু দেবেন্দ্র ও রবীন্দ্রপরিবারের কীর্তিকেই জগৎবাসীর কাছে জিইয়ে ও বাঁচিয়ে রাখার এই যে প্রচেষ্টা, তার পিচনে কারো কালো অদৃশ্য হাত ছিল কিএই প্রশ্ন আজও বারবার ঘুরেফিরে আমার মনে ঘামেরে যায়।’
দক্ষিণের বারান্দা ভেঙে যাওয়ার সময়ে অবনীন্দ্রনাথ অদ্ভুত কিছু ফ্রেস্কো আঁকেন। চুনবালি খসা দেওয়ালে ফুটিয়ে তুলেছেন হরপার্বতীর মুখ, হিমালয়ের আভাস, একটু দূরে সরস্বতী। একজন শিল্পীর মনখারাপ তাঁর শিল্পচর্চাতেই রয়ে যায়। এখনকার সময় হয়তো ঠাকুরবাড়ির দক্ষিণের বারান্দার গুরুত্ব বুঝবে না। কিন্তু অতীতের দিন মহাকালের স্মৃতির অ্যালবামে আজও জ্বলজ্বল করছে। চারিদিকে গুণীজন নিয়ে অবনীন্দ্রনাথরা তিন ভাই মগ্ন হয়ে এঁকে চলেছেন ছবি। মহাকাল জানে ওই মগ্ন তুলির টান ভারতীয় শিল্পচর্চায় ঠিক কতখানি বিপ্লব এনেছিল।
সহায়ক তথ্যঃ
ঠাকুরবাড়ির জানা অজানা, সুমিতেন্দ্রনাথ ঠাকুর
ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহল, চিত্রা দেব
ঠাকুরবাড়ির বাহিরমহল, চিত্রা দেব
এবং
ইন্টারনেট থেকে পাওয়া জয়ন্তী মণ্ডলের লেখা ফিচার ‘জোড়াসাঁকো—হারিয়ে যাওয়া দক্ষিণের বারান্দা’
কবিতাটির উদ্ধৃতি কবি সোমা দত্তের লেখা ‘মনখারাপের বারান্দা’ থেকে নেওয়া হয়েছে।
