ঠাকুরবাড়ির মেয়েরা দিনের আলোয় পরতেন সোনা, বিকেলে মুক্তো আর রাতে হিরে-জহরত

ঠাকুরবাড়ির মেয়েদের রূপচর্চা




লেখিকা মহুয়া দাশগুপ্তের কণ্ঠেও শুনে নিতে পারেন এই লেখা

রবি ঠাকুর বলেছিলেন বটে, ‘যেমন আছো তেমনি এসো, আর কোরো না সাজ!’ সেকথা ঠাকুরবাড়ির মেয়েদের ক্ষেত্রে খাটে না। উনিশ শতকের আলো হয়ে প্রায় সব ক্ষেত্রেই পথ দেখিয়েছে ঠাকুরবাড়ি। ঠাকুর পরিবারের মেয়েদের রূপচর্চাও তাই আলোচনার বাইরে নয়। সময়ের ধূলি সরিয়ে কৌতূহলের আলো ঠাকুরবাড়ির চিকের আড়ালে গিয়ে পড়লে এক্ষুণি হয়তো ধড়মড়িয়ে জেগে উঠবে ফেলে আসা সময়। ভারি ভারি গয়না পরা, বড়ো ঘোমটা টানা মেয়েরা এসে দাঁড়াবেন মনের অন্দরমহলে। তাঁদের সাজ আর অনিন্দ্য সৌন্দর্য মুগ্ধ করবে সকলকে। আশ্চর্য রুচিশীল সাজে আবার ঠাকুরবাড়িকে অনুকরণ করবে বাঙালি সমকালে এবং ভবিষ্যতেও। 

মেয়েরা সাজতে ভালোবাসে। পুরাকালের সাহিত্যে কত ভঙ্গিতে মেয়েদের সাজগোজের বর্ণনা করেছিলেন কবিরা। রোমান পাতাল দেবী পার্সিফোনের একটা সাজের বাক্স ছিল আর রূপকথায় রানি ম্যাজিক আয়নার কাছে বারবার জানতে চাইতেন, ‘ধরাতলে কে বেশি রূপসী?’ সেই দিক থেকে ঠাকুরবাড়ির মেয়েদের অন্দরমহলের গল্পে রূপচর্চাও বেশ আকর্ষক বিষয়। 

ঠাকুরবাড়ির মেয়ে বৌয়েরা প্রায় প্রত্যেকেই ছিলেন সুন্দরী। মেয়েদের সৌন্দর্য অনিন্দ্যসুন্দর! ঠাকুরবাড়ির পুত্রবধূরা অনেকে শ্যামবর্ণের ছিলেন। তাদের ত্বকের যত্ন নেওয়া হত রূপটান মাখিয়ে। দ্বারকানাথ ঠাকুরের স্ত্রী দিগম্বরীর সৌন্দর্য ছিল স্বর্গীয়। দুধে আলতা মেশানো গায়ের রং, একঢাল কোঁকড়া চুল, দেবী প্রতিমার মতো পায়ের পাতা! তাঁর মুখের আদলে ঠাকুরবাড়িতে প্রতিমা গড়া হত। দিগম্বরীর সাজ বলতে ছিল নীলাম্বরী শাড়ি আর মুখমণ্ডলে ভক্তির স্নিগ্ধ কিরণ। রবীন্দ্রনাথের মা সারদাসুন্দরী সন্তানদের রূপটান মাখিয়ে দেওয়াতেন নিয়ম করে। কিন্তু নিজে পরতেন হালকা  বালুচরি শাড়ি, লাল টকটকে সিঁদুর। তবে সেই সাধারণ সাজপোশাকের অসাধারণ মহিলার গৌরবর্ণের প্রতি একটু বেশি আকর্ষণ ছিল। তাই বাড়ির সামান্য শ্যামলা রঙের পুত্র, কন্যা এবং পুত্রবধূদেরও ঘষেমেজে উজ্জ্বল করে তুলতে চাইতেন। স্বামী দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে যাওয়ার সময় একটি সুতির শাড়ি আর আতর— এই ছিল তাঁর সাজ। সেকালে ঠাকুরবাড়ির মেয়েরা স্বামীর কাছে যেতেন পরিপাটি সেজে, মাথায় রকমারি খোঁপা করে, তাতে ফুলের মালা জড়িয়ে!

গিরীন্দ্রনাথের স্ত্রী যোগমায়া দেবীর গায়ের রং ছিল সোনার মতো আর শরীরে নাকি পদ্মগন্ধ ছিল। রবীন্দ্রনাথের দিদি সৌদামিনী সকলকে রকমারি খোঁপা বেঁধে দিতেন। তিনি নিজে যখন খোঁপা বাঁধতেন, দর্পণে তাঁর মুখের ছায়া আর টিউলিপ ফুলের ছায়া পড়ত একসঙ্গে— এমন ছবি স্মৃতিচারণায় আঁকা আছে। 

ঠাকুরবাড়ির মেয়েদের পোশাকের কথা বৈপ্লবিকভাবে ভেবেছিলেন সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্ত্রী জ্ঞানদানন্দিনী। তার আগে শাড়ি আর শীতকালে চাদর —এই তো ছিল পোশাক! সত্যেন্দ্রনাথের কাছে যাবেন বলে প্রথমে ফরাসী দোকানে অর্ডার দিয়ে তাঁর জন্য তৈরি করানো হয়েছিল ‘ওরিয়েন্টাল ড্রেস’। সে পোশাক পরে নাজেহাল জ্ঞানদানন্দিনী আয়ত্ত করেন পার্সি মেয়েদের শাড়ি পরার ছিমছাম পদ্ধতি। তাঁর এই শাড়ি পরা ব্রাহ্মিকাদেরও আকৃষ্ট করে। অনেকে জ্ঞানদানন্দিনীর কাছে আসতেন শাড়ি পরা শিখতে। আসলে তখনকার দিনের মেয়েদের বাইরে বেরোবার কোনো ভদ্র পোশাক ছিল না। এই শাড়ি পরাকে প্রথমে নাম দেওয়া হয়েছিল ‘বোম্বাই দস্তুর’। তারপর সকলে বলতেন, ‘ঠাকুরবাড়ির শাড়ি’! শাড়ির সঙ্গে সায়া, সেমিজ, ব্লাউজ, জ্যাকেট পরার প্রচলনও জ্ঞানদানন্দিনী করেছিলেন। এর জন্য তাঁকে অনেক প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়। আজ বাঙালির নিজস্ব ফ্যাশনের সঙ্গে তাঁর নামটি জড়িয়ে আছে। এটা অস্বীকার করার কোনো জায়গা নেই। তবে এখনকার বাঙালি মেয়েদের শাড়ি পরার পদ্ধতি প্রচলন করেছিলেন সুনীতিদেবী।

জ্ঞানদানন্দিনীর শাড়ি পরা একটু আলাদা ছিল। তখন মেয়েরা অনেকসময় মাথায় টুপি পরতেন। শাড়ির আঁচলে থাকতো ব্রোচ। ত্রিকোণ কাপড়ের টুকরো ঘোমটার মতো করে মাথায় দিতেন। পরে  ঠাকুরবাড়ির মেয়ে ইন্দিরাদেবী মাথায় আলগোছে ঘোমটা দেওয়ার রীতি আবার ফিরিয়ে আনেন। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন বিলিতি দরজির দোকান থেকে সব ছাঁটাকাটা নানাধরনের রেশমের ফালির সঙ্গে নেটের টুকরো আর লেস মিশিয়ে মেয়েদের জামা বানানো হত। এইসব আবার সেই আমলে নিন্দনীয় ছিল। ১৯০১ সালে গগনেন্দ্রনাথের মেয়ে সুনয়নীর বিয়ের সময় রব উঠেছিল, সেলাই করা কাপড় পরে মেয়ে সম্প্রদান হয় না। গগনেন্দ্রনাথ শিল্পী মানুষ, মেয়েকে শাড়ি পরাতে বলেছিলেন এমন কায়দায় সকলে ভেবেছিলেন সেলাই করা কাপড়! ঠাকুরবাড়ির মেয়ে শরৎকুমারী রূপচর্চা করতে ভালোবাসতেন। রূপটান মেখে চৌবাচ্চার জলে সাঁতার কেটে অনেকটা সময় কাটিয়ে দিতেন। 

ঠাকুরবাড়ির মেয়েদের রূপ নিয়ে অনেক গুজব ছড়িয়েছিল। দুধে আর মদে স্নান করেই তাদের নাকি এই রূপ! প্রফুল্লময়ীদেবী ঠাকুরবাড়ির ভারি ভারি গয়না পরার রেওয়াজের কথা বলেছিলেন। যৌতুকে বৌয়েদের গা ভরা গয়না দেওয়ার রীতি ছিল। ননদেরা নাকি বাক্স ভর্তি গয়না নিয়ে কনে সাজাতে বসতেন। প্রফুল্লময়ীর স্মৃতিচারণায় চুড়ি, বালা, বাজুবন্ধ, মুক্তোর গোছা, বীরবৌলী, কানবালা, জড়োয়া সিঁথি, পাঁয়জোড়, মল, ছানলা, চুটকি, গোট, চুনি মুক্তো বসানো নথ, মুক্তোর সাতনটি, হিরের ঝাপটা, বাউটি ইত্যাদি গয়নার কথা জানতে পারা যায়। ঠাকুরবাড়ির কনে সাজানোর রীতিটিও বেশ অন্যরকম ছিল। কপালে ভালো করে চন্দন লেপে, ছোটো হাতির দাঁতের চিরুণি দিয়ে টেনে দিয়ে তার উপর সিঁদুর, কুমকুম অথবা খয়েরের টিপ দিয়ে কারুকাজ করা হত। শাঁখার কোলে পরিয়ে দেওয়া হত সোনাবাঁধানো লোহা। ঠাকুরবাড়িতে দুই হাতে লোহা পরানোর রেওয়াজ ছিল। খোঁপা বেঁধে ফুলের মালা জড়ানো ঠাকুরবাড়ির মেয়েদের একটা পছন্দের সাজ! সৌদামিনীদেবীর কাছে মেয়েরা রাঙা শাড়ি পরে, চোখে কাজল টেনে খোঁপা বেঁধে এসে দাঁড়াতেন, সৌদামিনী দেবী তাঁদের খোঁপায় জড়িয়ে দিতেন ফুলের মালা। বিনয়িনী দেবী নানাধরণের খোঁপা বাঁধতে জানতেন— বেনেবাগান, মনভোলানো,  ফাঁকা জাল, কলকা, বিবিয়ানা আরো কত বাহারি নামের খোঁপা। কুন্তলীন তেল মাখার রেওয়াজ ছিল । ঠাকুরবাড়ির মেয়েরা অন্দরমহলে নানারকম গয়না পরে থাকলেও বাইরে গেলে গয়না দেখাতেন না। তখন একটা বিশ্বাস ছিল, গয়না দেখায় বাঈজীরা। বড়ো বাড়ির মেয়েরা দৃশ্যমান গয়নাগুলিকে মসলিনের পাতলা কাপড় দিয়ে বেঁধে তারপর বাইরে যেতেন একটা সময়। 

ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহলে বারোমাসে তেরো পার্বণ ছিল। সেই অবসরে নিজেদের বেশ সাজিয়ে তুলতেন ঠাকুরবাড়ির মেয়েরা! প্রতিমাদেবীর স্মৃতিচারণার থেকে জানা যায়, প্রতি উৎসবেই মেয়েদের বিশেষ সাজ ছিল। বসন্ত পঞ্চমীর দিন বাসন্তী রঙে ছোপানো কালো পেড়ে শাড়ি, মাথায় ফুলের মালা , কপালে খয়েরের টিপ! দুর্গাপুজোয় ছিল রংবেরঙের উজ্জ্বল বুটিদার শাড়ি, ফুলের গয়না, চন্দন আর ফুলের প্রসাধন! পায়ে আলতা ও নূপুর,গায়ে আতর! দোলপূর্ণিমায় ঠাকুরবাড়ির মেয়েরা হালকা মসলিনের শাড়ি, ফুলের গয়না আর আতর গোলাপের গন্ধমাখা মালা পরতেন। সাদা মসলিনে আবিরের লাল রং রঙিন বুটি তৈরি করে আলাদা আবেদন ছড়িয়ে দিত! 

ঠাকুরবাড়ির মেয়েরা দিনের ঝলমলে আলোর সঙ্গে মিলিয়ে পরতেন সোনার গয়না, রাতে হিরে-জহরত আর বিকেলে মুক্তো! রাতের আলোয় হিরে-জহরতের জৌলুস বোঝা যায়। বিকেলের মনখারাপ করা আলোয় মুক্তোর গয়না আলাদা আভিজাত্য নিয়ে আসতো। 

এই তো ছিল রেওয়াজ। রূপচর্চা বিশিষ্ট হয়ে উঠত ঠাকুরবাড়ির মেয়েদের ব্যক্তিত্বের মিশেলে। দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্ত্রীর লাল পেড়ে শাড়ি, মৃণালিনীদেবীর হালকা ঘরোয়া সাজ, কাদম্বরীদেবীর শ্যামলা হাতের দুগাছা চুরি— সেও তো আলাদা আবেদন নিয়ে এসেছে। আসলে রূপে নয়, ভালোবাসায় ভোলানোর গল্পটাই সত্যি! কিন্তু ঠাকুরবাড়ির প্রতি সদস্য শিল্পী, তাই ঠাকুরবাড়ির মেয়েদের এই রূপচর্চা পৌঁছে গিয়েছে শিল্পের পর্যায়ে। উনিশ শতকের যে অন্ধকার সময়ে মেয়েরা নিজেদের মানুষ ভাবতে ভুলে গিয়েছিল, ঠাকুরবাড়ির মেয়েরা সেখানে নিজেদের ভালোবেসে যত্নে সাজিয়ে তুলেছিলেন তাঁদের অন্তর ও বাহির। উনিশ শতকে দাঁড়িয়ে এই বোধ সত্যিই ছিল ‘নূতন আভরণ’! ঠাকুরবাড়ির মেয়েদের রূপচর্চা বাঙালি মেয়েদের কাছে অবশ্যই আর এক দক্ষিণের জানালা।

সহায়ক গ্রন্থঃ

ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহল, চিত্রা দেব
ঠাকুরবাড়ির সাতকাহন, শান্তা শ্রীমানী
স্মৃতিকথা, সোমেন্দ্রনাথ বসু (সম্পাদিত)

Developed by DXDasia