কেমন আছে দ্বারকানাথের স্বপ্নের বেলগাছিয়া ভিলা?

দ্বারকানাথ ঠাকুরের বেলগাছিয়া ভিলা ছিল প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মিলনকেন্দ্র

প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর। এক জীবনে যতটা বিচিত্র কর্মকাণ্ড নিয়ে ব্যস্ত থাকা যায়, হয়তো তার চেয়ে অনেকটা বেশি কাজই সামলেছিলেন তিনি। সেই চিত্র বিচিত্র, প্রশংসিত সমালোচিত কর্মকাণ্ডের মধ্যে আজ কলমের সূচিমুখে থাক বেলগাছিয়া ভিলা, উনিশ শতকের এক বিলাসী বাগানবাড়ি।

‘বেলগাছিয়ার বাগানে হয় 
    ছুরি কাঁটার ঝনঝনি,
  খানা খাওয়ার কত মজা,
      আমরা তার কি জানি?
    জানেন ঠাকুর কোম্পানি।’

একটা বাগানবাড়িকে কেন্দ্র করে এমন চর্চা, সংবাদপত্রে প্রতিবেদন প্রকাশ, ব্যঙ্গ কবিতা লেখার কারণ ছিল। আসলে দ্বারকানাথ ঠাকুরের দুটি সত্তা — একটি পরিশ্রমী, কর্মী আর অন্যটি প্রবল বিলাসী। বেলগাছিয়া ভিলা ছিল দ্বারকানাথের সেই বিলাসী সত্তার প্রকাশ। তবে, উনিশ শতকের সমাজ ও সংস্কৃতির ইতিহাসে বেলগাছিয়া ভিলা এক অত্যন্ত প্রয়োজনীয় নাম। খুব রুচিশীল কারুকাজে বেলগাছিয়া ভিলা ছিল সেকালের অন্যতম আকর্ষণ। বেশ চওড়া একটা বাগানের মধ্যে এঁকেবেঁকে এগিয়ে গিয়েছে মতিঝিল। লাল, নীল পদ্ম আর বিচিত্র ফুলের শোভা ঠিক যেন রূপকথার মতো সুন্দর। বসন্তকালে আক্ষরিক অর্থে ফুলের ঐশ্বর্য ছড়িয়ে পড়ত চারিদিকে। পিটুনিয়া, পিঙ্ক, ফ্লকস, গোলাপ, জিনিয়া ফুলের রত্নে ঝলমল করত চারিপাশ। দ্বারকানাথের চিত্র ও ভাস্কর্য বিষয়ে উৎসাহ ছিল। কাজেই বেলগাছিয়া ভিলার দেওয়ালগুলি রীতিমতো শিল্পভাবনায় সমৃদ্ধ ছিল। বৈঠকখানা ঘরের পিছনে ছিল মার্বেল পাথরে বাঁধাই করা একটা ফোয়ারা, তার উপরে ছিল কিউপিডের একটি মূর্তি। মতিঝিলের ঠিক মাঝে একটি গ্রীষ্মাবাস। একটি ঝুলন্ত লোহার সেতু আর একটি কাঠের সেতু গ্রীষ্মাবাসটিকে মূল বাগানের সঙ্গে যুক্ত করেছে। বেলগাছিয়া ভিলাকে বলা হত কলকাতার ওয়েস্ট এন্ড বা কেনসিংটন। দ্বারকানাথের অতিথিরা আসতেন এইখানে। শুধু চারিদিকের মনোরম দৃশ্য নয়, এখানকার খাওয়া দাওয়াও নাকি ছিল অতুলনীয়। প্রাচ্য আর পাশ্চাত্য খাবারের মিশেল অতিথিদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষক ছিল। ফরাসী খাবারও যুক্ত ছিল খাদ্যতালিকায়। কাবাব, পোলাও আর হোসেনির কদর ছিল সবচেয়ে বেশি। সোজা ইউরোপ থেকে সেরা জাতের মদ আমদানি হত। শহরের সেরা খাইয়েদের মিলনক্ষেত্র হয়ে গিয়েছিল এই ভিলা।

বেলগাছিয়া ভিলার আতিথ্য গ্রহণ করতেন সব সেকালের মান্যগণ্য ব্যক্তিত্ব। ১৮৩৬ সালের নভেম্বরে লর্ড অকল্যান্ড বড়লাট হয়ে আসার পর বেলগাছিয়া ভিলায় এসেছিলেন। প্রথমে বেশ তাচ্ছিল্য করে দেশিলোকের বাড়ি দেখতে গেলেও বেলগাছিয়া ভিলা তাঁকে মুগ্ধ করেছিল। স্মৃতিচারণে তিনি জানিয়েছিলেন, ‘–পৌঁছালাম নেহাত অভদ্রের মতো এবং রইলাম অত্যন্ত আরামে। দ্বারকানাথ নিজে সুন্দর ইংরেজি বলতে পারেন এবং তিনি মিঃ পার্কার বলে এক অতি বু্দ্ধিমান লোককে রেখেছিলেন আমাদের দেখাশোনার জন্য। সন্ধেবেলা অন্যদিনের চেয়েও গরম কম ছিল। আর মাঠে হাতি, ঝিলে নৌকা, বারদ্বারীতে বরফ, ঘরের ভিতর সুন্দর সুন্দর ছবি ও বই— কাজেই ব্যাপারটা মন্দ হল না। শেষকালে যতটা সম্ভব হই হুল্লোড় করতে করতে সকলে বাড়ি ফিরে এলাম খেতে। শুনেছি ভদ্রলোক নাকি লোকজনকে খাওয়ানও খুব ভালোভাবে।’ উন্নাসিক শ্বেতাঙ্গ বড়লাটকেও মুগ্ধ করেছিল বেলগাছিয়া ভিলা। 

বাড়ির একাংশ

মার্বেল পাথরের হলঘর, দেওয়ালে ঠেস দেওয়া প্রায় ঝুলন্ত সিঁড়ি, শ্বেতপাথরের মূর্তি, মূর্তির উপরে আলো দেওয়ার জন্য ঝাড়লন্ঠন, বহুমূল্য ছবি, বড়ো গোলাপ ফুলে ঘেরা নাচঘর, উত্তরের বারান্দা, পাতার দেওয়াল, ফুলের মালার তাঁবু, লাল মখমলের উপর জড়ির কাজ করা মসনদ, সোনা-রুপোর কাজ করা আসবাব নিয়ে সে এক স্বপ্নপুরী। একটি গানের ঘর ছিল। পাথরের ঘড়ি, মার্বেলের আসবাব, ছবি, রেশমের পর্দা রীতিমতো রাজকীয়। মস্ত বাগান, চার রকমের পুল, সেই পুল পৌঁছে দেবে দ্বীপের মতো একখণ্ড সাজানো জমিতে। আবার একটি জাপানি মন্দির, গ্রিক কায়দার মন্দির, চিনা প্যাগোডা দ্বারকানাথের আভিজাত্যের প্রতীক। বাগানের মস্ত বাংলো আর তার সংলগ্ন বাড়িগুলি ছিল প্রদীপ দিয়ে সাজানো। লোকজন এলে আতশবাজি, শ্যাম্পেন, সেরা মিঠাই, বিলাতি নাচে জমজমাট বেলগাছিয়া ভিলা দ্বারকানাথের রোম্যান্টিক মনটাকে ছুঁয়ে উনিশ শতকের নস্টালজিয়া। 

১৮৪৩ সালে ‘বেঙ্গল হেরাল্ড’ পত্রিকা একটি প্রতিবেদনে বেলগাছিয়া ভিলার বর্ণময় বিবরণ প্রকাশ করেন। লাটপত্নী শ্রীমতী বার্ডকে সংবর্ধনা জানাতে দ্বারকানাথ জমকালো পার্টির আয়োজন করেন। অনেক সম্ভ্রান্ত লোক ছিলেন ভিলার ভিতর। ভিলার বাইরের চওড়া বাগান সেদিন খুলে দেওয়া হয়েছিল সাধারণ মানুষের জন্য। সকলে এসেছিল সাদা ধুতি ও চাদর পরে, সাদা পাগড়ি মাথায় বেঁধে। হাজার লোকের ভিড়, কিন্তু সংযত, সুন্দর।

বেলগাছিয়া ভিলা ছিল দ্বারকানাথের প্যাশন। ভিলাটি সাজানো নিয়ে মনে অতৃপ্তিও ছিল। ইংলন্ডে ডিউক অফ ডেভনশায়ারের সুসজ্জিত ভবনটি দেখে বেলগাছিয়া ভিলার কথা মনে হয়েছিল তাঁর। তবে আবার প্যারিসের রাজভবনের ফোয়ারা দেখে খুশি হয়ে বলেছিলেন, ‘It is exactly like that of my Belgachia Villa’.

এই বেলগাছিয়া ভিলা ছিল প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মিলনকেন্দ্র। তিনি ইউরোপীয় ও ভারতীয়দের সহজ হৃদ্যতা চেয়েছিলেন। কিন্তু সে উদ্দেশ্য সেই সময়ের মানুষ ঠিকভাবে গ্রহণ করেননি। দ্বারকানাথের ছেলে দেবেন্দ্রনাথও নয়। তাই বাবার মৃত্যুর পর অর্থের সংকটের সময় তিনি বেলগাছিয়া ভিলা বিক্রি করে দেন পাইকপাড়ার রাজাদের কাছে। বলা ভালো, দ্বারকানাথের স্বপ্ন দিয়ে গড়া সেরা সম্পদ হস্তান্তরিত হয়। 

হয়তো উনিশ শতকের প্রাচীন সময়ের গর্ভে এখনও জমজমাট হয় বেলগাছিয়া ভিলা। চৌকো ছককাটা মখমলের জামা, গলায় সোনার চেনে মহারানি ভিক্টোরিয়ার দেওয়া স্বর্ণপদক ঝুলিয়ে প্রশান্ত মুখে অতিথির যত্ন করা দ্বারকানাথের ছবি রাখা আছে সময়েরই ফ্রেমে। সেই সঙ্গে বাঙালির নস্টালজিয়ায় বেলগাছিয়া ভিলাও জেগে আছে রূপকথার মতো। স্মৃতির শেষ নেই কোনো। 

সহায়ক গ্রন্থঃ
ঠাকুরবাড়ির বাহির মহল, চিত্রা দেব
এবং
রবীন্দ্রনাথ রবীন্দ্রনাথ, পূর্ণানন্দ চট্টোপাধ্যায়

Developed by DXDasia