রাহুল পুরকায়স্থের কবিতা একইসঙ্গে শান্ত ও তীব্র ছটফটে

একটি শরীর শুধু
আমার শরীরে আজ
ঘুরপাক খায় –

বি রাহুল পুরকায়স্থ। আমার দেখা একজন স্বয়ং সম্পূর্ণ কবি। যিনি স্বচ্ছ, তীব্র, তর্কপ্রবণ। গণমাধ্যমের সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন বহু বছর। এতদসত্ত্বেও রাহুল প্রকৃত অর্থে একজন কবি। রাহুলদার কবিতায় তথাকথিত কাব্যমাধুর্য পাইনি কখনও। কবিতায় মাধুর্য বিষয়টাই কেমন গোলমেলে লাগে। ওঁর কবিতায় বিস্বাদ আছে, একজন পাঠক হিসেবে সেই বিস্বাদের টানেই বারবার ছুটে যাওয়া। আরোপিত যাপন নয়, নিজের ইচ্ছেয়, নিজের শর্তে বাঁচা আর লিখে যাওয়া – কবি রাহুল পুরকায়স্থ বোধহয় এই পন্থায় বিশ্বাসী ছিলেন। তাই আশির বাংলা কবিতা মুক্ত হয়েছে যাবতীয় ভণিতা থেকে। মিনমিনে বা রিনরিনে কণ্ঠ হয়ে বাজেনি রাহুলের কবিতা, বরং সে কবিতার আবেদন বহু প্রেমিক-মন ছুঁয়ে গেছে। তাঁর কবিতা হয়ে উঠেছে আমার নিজের, সর্বজনেরও।

পাশ ফিরি, স্পর্শে বিদ্যুৎ!
কে ছুঁয়েছে শরীর আমার
দিবাস্বপ্ন! রঙের গোপন!
পাশে তো কেউ নেই!
তোমার আমার মধ্যে ফাঁকটুকু
ভরেছে বাতাস!
তবে কি আমাকে ছোঁয় শূন্যের সংগীত?

আরোপিত যাপন নয়, নিজের ইচ্ছেয়, নিজের শর্তে বাঁচা আর লিখে যাওয়া – কবি রাহুল পুরকায়স্থ বোধহয় এই পন্থায় বিশ্বাসী ছিলেন। তাই আশির বাংলা কবিতা মুক্ত হয়েছে যাবতীয় ভণিতা থেকে। মিনমিনে বা রিনরিনে কণ্ঠ হয়ে বাজেনি রাহুলের কবিতা।

এই শূন্যতা যেকোনো প্রেমিক-মনকে ব্যাকুল করে। এই মন রাহুল পুরকায়স্থেরও। রাহুলদার সঙ্গে যতবার দেখা হয়েছে নানা জায়গায়, ততবারই দেখেছি উদভ্রান্তের মতো ওঁর চারিদিকে চেয়ে থাকা। কবির পৃথিবী একইসঙ্গে শান্ত, আবার ছটফটে। কবির ভিতরে বাস করে একটা আদি ও অকৃত্রিম শিশু। যে শিশুমন তাঁকে চেনা স্রোতের বাইরে হাঁটতে শেখায়। বেড়াজাল না টপকালে আর কীসের কবি! যদি না কিছু ইমেজ বা শব্দের বাইরে বেরিয়ে অশ্বমেধের ঘোড়াই না ছোটালে তাহলে কীসের তোমার কবি পরিচয়! রাহুল পুরকায়স্থের কবিতা পড়ে আমার সেই প্রথম মনে হয়েছিল, এই কবি একইসঙ্গে স্থিতধী প্রেমিকের মতো, যার কোনো তাড়া নেই; একইসঙ্গে ভীষণ চঞ্চল, ভিতরে ভিতরে সে এক তীব্র ছটফটানি। তিনি লেখেন,

শবের শকটে উঠি পক্ষীভাবে আমি
মাঝে মাঝে মেঘে চড়ি, মাঝে মাঝে নামি
গুহার সংসারে আর সংসার-গুহায়
এভাবেই মৃত্যু ও শিল্প জন্মায়

রাহুল পুরকায়স্থের প্রসঙ্গ উঠলেই অনেকে বলেন ওঁর এক সময়ের বেহিসেবি জীবনের কথা। ক্রমশ ক্ষয়ের পথে পা বাড়িয়েছেন রাহুলদা। এতকিছুর পরেও রাহুলদা বাংলার জনপ্রিয় নিউজ মিডিয়ার মাথা হয়ে থেকেছেন। আর লিখে গিয়েছেন কবিতা। কবিতা বিষয়ক আড্ডায় রাহুলদার জুড়ি মেলা ভার। কিন্তু আমি বলব, তাঁর ‘ময়দান ও পাঠশালার’র কথা। যে বইয়ের কাছে বারবার ফিরে গিয়েছি। রাহুল পুরকায়স্থ বর্ণিত এবং হিরণ মিত্র চিত্রিত। রাহুলদা লিখে চলেছেন শুঁড়িখানা যাবার পথে, শুঁড়িখানায় বসে, শুঁড়িখানা থেকে ফিরে। লিখছেন তাঁর কবি বন্ধুদের কথা, লিখছেন শহরের প্রান্তিকজনদের কথা। যাঁদের কথা কেউ জানে না, এ শহরের ইতিহাসে যাঁদের নাম কোনোদিন আসবে না, রাহুলদা তাঁদেরকেই লেখাগুলির নায়ক করে তুলেছেন। আর লিখে চলেছেন সেইসব বিস্ময়কর কথা, “‘হোয়াইট কলার পাব’ নয়, বরং ব্রাউন কলার শুঁড়িখানায় আর নিম্নবর্গের ময়দানে তৈরি হয় যে সব গল্পকথা। তাতে গোর্কির ‘নিচের মহল’কে মনে পড়িয়ে দেওয়া সমাজের প্রান্তিক মানুষেরা থাকেন, যাঁরা হিসাবের ঘর্মাক্ত কড়ি দিয়ে কেনা মদের শেষ ফোঁটাটুকুও গেলাস উপুড় করে গলায় ঢেলে নেন।”

রাহুলের লেখাতেও মিশে থাকে অদ্ভুত কিছু চরিত্র, চেনা পৃথিবীর ছকে যাঁদের বেঁধে ফেলা দুষ্কর। আর রয়ে যান সে সব মদ্যপূজারী কবি ও শিল্পীরা, যারা সাবঅল্টার্ন আবহকেই চিরকাল নিজের বাড়ি ভেবেছেন। পার্কস্ট্রিটের অলি পাবে বসে চিৎকার করে বলে উঠেছেন ‘আমার খালাসিটোলাই ভালো’।

রাহুলের লেখাতেও মিশে থাকে অদ্ভুত কিছু চরিত্র, চেনা পৃথিবীর ছকে যাঁদের বেঁধে ফেলা দুষ্কর। আর রয়ে যান সে সব মদ্যপূজারী কবি ও শিল্পীরা, যারা সাবঅল্টার্ন আবহকেই চিরকাল নিজের বাড়ি ভেবেছেন। পার্কস্ট্রিটের অলি পাবে বসে চিৎকার করে বলে উঠেছেন ‘আমার খালাসিটোলাই ভালো’। রাহুলের লেখায় বীরগাথা হয়ে ওঠে বিহার থেকে আসা শ্রমজীবীর দল, সুলেমান-শাজাহানদের কাহিনি। এ-বইয়ের কাছে আমাদের বারবার ফিরে যেতেই হয়। আজ আমার শুধু মনে পড়ে, বেশ কয়েকবছর আগে রাহুলদাকে বলেছিলাম, দুটো কবিতা দাও। তার মধ্যে একটি কবিতা,

গিয়েছি ভুলের থেকে আরও আরও ভুলের ভিতরে,
দেখেছি ভুলের পোকা নেচে নেচে গান গায়
ফসলের ক্ষেতে,
আমি তো ভাগের চাষী,
শব্দের ফসলে তারা গুনি,
ঘর ভাসে, পথ ভাসে অনিশ্চিত
স্বরহীনতায়
এইরূপে ক্রমে ক্রমে কবিতা মৃত্যুর দিকে যায়

কবিতার নাম ‘মৃত্যুর দিকে’। প্রতিটা মৃত্যুর দিকে যাত্রা বড়ো অসহনীয়। আজ এইক্ষণে দাঁড়িয়ে প্রতিটা মুহূর্তকে স্মরণ করি। রাহুল পুরকায়স্থের কবিতা লাগামহীন বাঁধনছেঁড়া হয়ে আমাদের কাছে থেকে যাক প্রতিটি বাংলা কবিতার দশকে।

_____________________
ব্যবহৃত কবিতা যথাক্রমে:
শূন্য গ্রীবা, শূন্য জিহ্বা, শূন্য কবিতারা/ রাহুল পুরকায়স্থ/ বঙ্গদর্শন.কম
সাদা-কালো লেখা/ রাহুল পুরকায়স্থ/ বাংলালাইভ
মৃত্যুর দিকে/ রাহুল পুরকায়স্থ/ আঙ্গিক পত্রিকা

Written by