
রবীন্দ্রনাথ অরবিন্দের জীবনব্যাপী কর্মকাণ্ডে প্রণত হয়েছেন
সে অনেক কাল আগের কথা! পুরোনো কলকাতার (Kolkata) আদালতে মামলা চলছে, আলিপুর বোমার মামলা। বিচারপতি পিসি বিচক্রফট। বিচার করতে এসে স্তম্ভিত হয়ে গেলেন এক কারাবন্দিকে দেখে। অরবিন্দ ঘোষ, বিচক্রফটের সহপাঠী। বিলেতে পড়ার সময় অরবিন্দ সব পরীক্ষায় বিচক্রফটের চেয়ে ভালো ফলাফল করে এসেছেন। বিচক্রফট সৌজন্য করে অরবিন্দকে কারাজালের বাইরে এসে বসতে বললেন। কিন্তু অরবিন্দ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। এই মামলায় অন্যতম সন্দেহজনক ব্যক্তি হিসেবে গ্রেপ্তার করা হয় অরবিন্দকে। তাঁর ঘর থেকে কাগজে মোড়া মাটি পেয়ে ইংরেজরা ভেবেছিলেন, তা বুঝি বোমা বাঁধার মশলা। কিন্তু আসলে তা ছিল দক্ষিণেশ্বরে ঠাকুর শ্রী রামকৃষ্ণের (Sri Ramakrishna) পায়ের স্পর্শ পাওয়া মাটি! চিত্তরঞ্জন দাশের সাহায্যে এই মামলা থেকে বেকসুর মুক্তি পেয়েছিলেন শ্রীঅরবিন্দ। কিন্তু তখন তিনি অন্য মানুষ। বিপ্লবী অরবিন্দ থেকে ঋষি অরবিন্দ (Rishi Aurobindo) হয়ে ওঠার এই যাত্রাটি অলৌকিক।
একটা সময় বাংলাদেশের (Bangladdesh) সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনের ‘আদি পুরোহিত’ ছিলেন অরবিন্দ। বরোদায় থাকাকালীন যতীন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে যোগাযোগ হয় অরবিন্দের। তারপর বাংলাদেশে ফিরে গোপন বিপ্লবী সমিতি সৃজন করেন। তারপর বিপিনচন্দ্র পাল সম্পাদিত ‘বন্দেমাতরম’ (Bandemataram) পত্রিকায় রাজদ্রোহমূলক প্রবন্ধ লিখতে থাকেন তিনি। এই সূত্রে ছয় মাসের কারাবরণ করেন অরবিন্দ। রবীন্দ্রনাথ (Rabindranath Tagore) তখন শান্তিনিকেতনে (Shantiniketan)। অরবিন্দের জন্য চিন্তিত। কিন্তু প্রকাশ্যে মত প্রকাশ করতে পারছিলেন না। রথীন্দ্রনাথকে লেখা ব্যক্তিগত পত্রে অরবিন্দের প্রসঙ্গ নিয়ে আসেন রবীন্দ্রনাথ— “কিন্তু অরবিন্দকে যদি জেলে দেয় তা হলে ও কাগজের কী দশা হবে জানিনে। বোধহয় জেল থেকে সে নিষ্কৃতি পাবে না। আমাদের দেশে জেলখানার ভয় না ঘোচাতে পারলে আমাদের কাপুরুষতা দূর হবে না।” অরবিন্দকে ‘দেশবন্ধু’ এবং ‘স্বদেশ আত্মার প্রতিমূর্তি’ বলে সম্বোধন করলেন। লেখেন ‘নমস্কার’ কবিতাটি।
বন্ধনশৃঙ্খল তার
চরণ বন্দনা করি করে নমস্কার—
কারাগার করে অভ্যর্থনা। রুষ্ট রাহু
বিধাতার সূর্য প্রাণে বাড়াইয়া বাহু
আপনি বিলুপ্ত হয় মুহূর্তেক্ পরে
ছায়ার মতন।
রবীন্দ্রনাথ তখন শান্তিনিকেতনে। অরবিন্দের জন্য চিন্তিত। কিন্তু প্রকাশ্যে মত প্রকাশ করতে পারছিলেন না। রথীন্দ্রনাথকে লেখা ব্যক্তিগত পত্রে অরবিন্দের প্রসঙ্গ নিয়ে আসেন রবীন্দ্রনাথ
রবীন্দ্রনাথ এবং অরবিন্দের মধ্যে ছিল আধ্যাত্মিকতার সেতু। অরবিন্দ যুবসম্প্রদায়ের মধ্যে এই আধ্যাত্মিক বোধ জাগিয়ে তুলতে চেয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথের অন্তরের সুরও ছিল তাই। অরবিন্দ ব্রিটিশ শাসনের অত্যাচারকে ‘মায়া’ বা ‘ইলিউশন’ বলে উড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথও একইভাবে লিখেছিলেন—
দুঃখ কিছু নয়,
ক্ষত মিথ্যা, ক্ষতি মিথ্যা, মিথ্যা সর্ব ভয়।
কোথা মিথ্যা রাজা, কোথা রাজদণ্ড তাঁর!
কোথা মৃত্যু, অন্যায়ের কোথা অত্যাচার !
ওরে ভীরু , ওরে মূঢ়, তোলো তোলো শির।
আমি আছি, তুমি আছ, সত্য আছে স্থির।
এই সত্যের শক্তিই ছিল অরবিন্দের। ১৯০৮ সালের কারাবাস অরবিন্দের ভিতর থেকে টেনে আনবে এক আধ্যাত্মিক পুরুষকে। তিনি অন্ধকার কারাকক্ষে এক আদিত্যবর্ণের মহাপুরুষকে দেখেছিলেন। তাঁর জীবনের লক্ষ্যের বদল হল। ‘কর্মযোগীন’ পত্রিকায় নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা লিখে চললেন। অরবিন্দের জীবনের গতিপথ নির্দিষ্ট ছিল। পণ্ডিচেরিতে জীবনের শেষ চল্লিশ বছর কাটিয়েছেন। এ তাঁর তপস্বী জীবন। বিপ্লবী অরবিন্দকে চেনার আর কোনো উপায় নেই। দক্ষিণ ভারতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে দেখা হয় অরবিন্দের। অনেকক্ষণ সংলাপ বিনিময়ের পর জন্ম নেয় একটি প্রবন্ধ। সেইদিনই লিখে ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় পাঠিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। প্রতিমাদেবীকে চিঠিতে লিখেছিলেন, “পণ্ডিচেরীতে অরবিন্দের সঙ্গে দেখা করে আমার মনে এলো আমারও কিছুদিন এইরকম তপস্যার খুবই দরকার। নইলে ভিতরের আলো ক্রমে ক্রমে কমে আসবে।” কন্যা মীরাদেবীকেও চিঠিতে একই কথা লিখেছেন, ‘মীরু–স্থির করেছি এবার ফিরে গিয়ে অরবিন্দ ঘোষের মতো সম্পূর্ণ প্রচ্ছন্নতা অবলম্বন করব কেবল প্রতি বুধবারে সাধারণকে দর্শন দেব— বাকি ছয়দিন চুপচাপ নিজের নিঃশব্দ নির্জন শান্তি অবলম্বন করে গভীরের মধ্যে তলিয়ে থাকব। অরবিন্দকে দেখে আমার বড় ভালো লাগল— বেশ বুঝতে পারলুম নিজেকে ঠিকমত পাবার এই ঠিক সময়।”
রবীন্দ্রনাথ দেখেই বুঝেছিলেন অরবিন্দ আত্মাকে সত্য করে চেয়েছিলেন এবং সত্য করে পেয়েওছিলেন। রবীন্দ্রনাথ অরবিন্দের জীবনব্যাপী কর্মকাণ্ডে প্রণত হয়েছেন, বলেছেন, “অরবিন্দ, রবীন্দ্রের লহ নমস্কার।”
রবীন্দ্রনাথ দেখেই বুঝেছিলেন অরবিন্দ আত্মাকে সত্য করে চেয়েছিলেন এবং সত্য করে পেয়েওছিলেন। রবীন্দ্রনাথ অরবিন্দের জীবনব্যাপী কর্মকাণ্ডে প্রণত হয়েছেন, বলেছেন, “অরবিন্দ, রবীন্দ্রের লহ নমস্কার।” রবীন্দ্রনাথ কিন্তু অরবিন্দকে আধুনিক কালের ব্যবসায়ী অবতার হিসেবে মানেননি। দিলীপ কুমার রায়কে চিঠিতে লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ, “এ কথা সকলেরই জানা আছে, বাংলাদেশে অবতারের এপিডেমিক দেখা দিয়েছে, তার কারণ সস্তায় মুক্তি পাওয়ার জন্য একদল লুব্ধ।” অরবিন্দকে এইসব মেকি আধ্যাত্মবাদ থেকে অনেক ঊর্ধ্বে স্থান দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। অরবিন্দও মুগ্ধ ছিলেন রবীন্দ্রসাহিত্য পড়ে। লিখেছিলেন, “রবীন্দ্রকাব্যের দ্রুত ও আকস্মিক সাফল্যের মূলে নিহিত রহস্যটি হল তাঁর মধ্যে এই নতুনত্ব। যে জিনিসটির জন্য আধুনিক অনুসন্ধানে রত সমসাময়িক অন্য সকলের চেয়ে তাকেই তিনি বেশি প্রকাশ করে প্রসার দিতে পেরেছেন। তাঁর কাব্যে বর্তমানের এপারের সীমা অতিক্রমণের ক্লান্তিহীন অশেষ সঙ্গীত, মন্ত্রধ্বনিমুখর দৈবলোক উদ্ভাসিত—সেখানে আত্মলোকের সত্যতার সূক্ষ্ম ধ্বনি ও আলো নিয়ে জীবনের কর্মসুন্দর ধারাগুলি অর্থপূর্ণ হয়ে ওঠে।”
একটি সময়ের দুই প্রবাদপ্রতিম পুরুষ। দুজনেরই মনের চোখ উন্মোচিত হয়েছিল। যেন তৃতীয় নয়ন! সমাজের দুর্দিনে এই দুই মহাপুরুষের উপলব্ধি অক্ষরের বর্ম হয়ে ঘিরে ছিল পরাধীন ভারতবর্ষকে।
সহায়ক গ্রন্থঃ
রবীন্দ্রনাথ ও বাংলার বিপ্লবী সমাজ, মঞ্জুশ্রী মিত্র

