শান্তিনিকেতন বিদ্যায়তন প্রতিষ্ঠায় ইনি ছিলেন রবীন্দ্রনাথের অন্যতম সহায়ক
বিপ্লব হয় ঝড়ের মতো। ঝড় থেমে গেলেও যেমন রেশ রেখে যায়, বিপ্লবের রেশও তেমন রয়ে যায় অনেকদিন। উনিশ শতক ঝড় বিদ্যুতের সময়। আজকের গল্পকথা অতীতের বিপ্লব। আজ এমন এক বিপ্লবীর কথা বলি, যিনি রবীন্দ্রনাথের কাছের মানুষ ছিলেন একসময়। রবীন্দ্রনাথ (Rabindranath Tagore) তাঁর সম্পর্কে লিখেছিলেন, ‘তিনি ছিলেন রোম্যান কাথলিক সন্ন্যাসী অপরপক্ষে, বৈদান্তিক,—তেজস্বী, নিজস্বী, ত্যাগী, বহুশ্রুত ও অসামান্য প্রভাবশালী। অধ্যাত্মবিদ্যায় তাঁর অসাধারণ নিষ্ঠা ও ধীশক্তি আমাকে তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধায় আকৃষ্ট করে।’ তিনি ব্রহ্মবান্ধব উপাধ্যায়। শান্তিনিকেতন (Shantiniketan) বিদ্যায়তন প্রতিষ্ঠায় ব্রহ্মবান্ধব ছিলেন রবীন্দ্রনাথের অন্যতম সহায়ক। অথচ জীবনের তীব্র গতি তাঁদের গতিপথ ভিন্ন করে দেয় । কিন্তু বন্ধুত্বের স্মৃতি হয়ে রবীন্দ্রনাথের মনে রয়ে যান ব্রহ্মবান্ধব।
স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে ব্রহ্মবান্ধবের সরাসরি যোগাযোগ ছিল। তিনিও সন্ন্যাসীর জীবনযাপন করতেন। বাগ্মী সুরেন্দ্রনাথের কথকতা তাঁকে দেশের জন্য বিপ্লবমুখী করে তোলে। কিন্তু এই বিপ্লব সশস্ত্র বিপ্লব। মসী নয়, অসি— এই নীতিতে বিশ্বাস করে ভারতবর্ষের স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিলেন ব্রহ্মবান্ধব। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর পরিচয় একটি লেখার সূত্রে। ১৯০০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে সাপ্তাহিক ‘সোফিয়া’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল ব্রহ্মবান্ধবের ‘The World Poet of Bengal’ নামের প্রবন্ধটি। তিনিই রবীন্দ্রনাথকে প্রথম ‘বিশ্বকবি’ (World Poet) সম্বোধন করেন। রবীন্দ্রনাথের এক অলৌকিক অনুভূতিপ্রবণতার কথাও তিনি বলেছিলেন। ‘বিশ্বনৃত্য’ কবিতার সূত্রে ব্রহ্মবান্ধবের এই উপলব্ধি। তিনি বলোছিলেন, বিদেশিরা একদিন রবীন্দ্রনাথের জন্যই বাংলা শিখবে। রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে বলেছিলেন, তিনি দেবদারু গাছের মতো, তার শিকড়গুলি চলে গেছে মাটির নিচে অনেক অনেক দূরে কিন্তু আশঙ্কা হয় তার শীর্ষদেশ আকাশ বিদ্ধ করবে এমনই তার সমুন্নতি।’
রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর পরিচয় একটি লেখার সূত্রে। ১৯০০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে সাপ্তাহিক ‘সোফিয়া’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল ব্রহ্মবান্ধবের ‘The World Poet of Bengal’ নামের প্রবন্ধটি।
রবীন্দ্রনাথের ‘নৈবেদ্য’ কাব্যগ্রন্থের উপর একটি সমালোচনা লিখেছিলেন ব্রহ্মবান্ধব। রবীন্দ্রনাথ এই সূত্রে লিখেছিলেন, ‘ব্রহ্মবান্ধব উপাধ্যায় (Brahmabandhab Upadhyay) যখন Twentieth Century মাসিকপত্রের সম্পাদনায় নিযুক্ত, তখন সেই পত্রে তিনি আমার নূতন প্রকাশিত ‘নৈবেদ্য’ গ্রন্থের এক সমালোচনা লেখেন। তৎপূর্বে আমার কোনো কাব্যের এমন অকুণ্ঠিত প্রশংসাবাদ কোথাও দেখিনি। এই উপলক্ষ্যে তাঁর সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয়।
ব্রহ্মবান্ধব ছিলেন প্রবল হিন্দুত্ববাদী (Hinduism)। রবীন্দ্রনাথ যখন নবপর্যায় বঙ্গদর্শনের (Bongodorshon) সম্পাদক, তখন ব্রহ্মবান্ধবের বিখ্যাত প্রবন্ধ ‘হিন্দুজাতির একনিষ্ঠতা’ প্রকাশিত হয়। একনিষ্ঠভাবে হিন্দু রীতিনীতি পালন করার কথা বারবার বলতেন ব্রহ্মবান্ধব। তিনি ছিলেন কর্মী মানুষ। তাই কাজের বলয়ের মধ্যে নিজে থাকতেন। তাঁর আদর্শ ছিল প্রাচীন গুরুগৃহে শিক্ষা। এই কারণে শান্তিনিকেতনের বিদ্যালয় স্থাপনের যুগে ব্রহ্মবান্ধব রবীন্দ্রনাথকে সহায়তা করেছিলেন। কিন্তু প্রত্যক্ষ রাজনীতির কারণে শান্তিনিকেতনে বেশিদিন থাকতে পারেননি। সশস্ত্র সংগ্রাম আবার রবীন্দ্রনাথের নীতিবিরুদ্ধ ছিল। ব্রহ্মবান্ধব তাঁর সম্পাদিত ‘সন্ধ্যা’ পত্রিকায় লিখেছিলেন, ‘প্রত্যেক গ্রামাঞ্চল, হাট, বাট, আবাস দুর্গে পরিণত করতে হবে। লাঠি, সড়কি, গুপ্তি। ছোরা, প্রভৃতি অস্ত্র প্রতি হাতের শোভা বর্ধন করবে। তীর ধনুক এবং ‘কালীমায়ির বোমা’ প্রচুর পরিমাণে সংগ্রহ করতে হবে। এই বোমা আগুন দিয়ে ধরাতে হবে না।’
ব্রহ্মবান্ধব যে জালে জড়িয়ে পড়েছিলেন তার থেকে নিষ্কৃতির কোনো পথই ছিল না। রবীন্দ্রনাথ ‘চার অধ্যায়’ উপন্যাসের ইন্দ্রনাথ চরিত্র গড়েছিলেন ব্রহ্মবান্ধব উপাধ্যায়ের আদলে।
‘এখন ঠেকে গেছি প্রেমের দায়ে’, ‘সিডিশানের হুড়ুম দুড়ুম ফিরিঙ্গির আক্কেল গুড়ুম’ ইত্যাদি প্রবন্ধের জন্য তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। মাথা নুইয়ে থাকেননি তিনি। বক্তব্যের সম্পূর্ণ দায়িত্ব নিজে নিয়েছেন। জবাবদিহি করতে চাননি। ফিরিঙ্গিদের জেল খাটতে চাননি। সত্যিই আশ্চর্য, অভিযুক্ত থাকার সময় তাঁর মৃত্যু হয়।
সশস্ত্র আন্দোলন দুই বন্ধুর মধ্যে দূরত্ব তৈরি করে। রবীন্দ্রনাথ (Rabindranath Tagore) বেদজ্ঞ সন্ন্যাসীর এই বদল মেনে নিতে পারেননি। বিরক্ত হয়ে লিখেছিলেন, ‘সেইসময়ে দেশব্যাপী চিত্তমথনে যে আবর্ত আলোড়িত হয়ে উঠল তারইষমধ্যে একদিন দেখলুম এই সন্ন্যাসী ঝাঁপ দিয়ে পড়লেন । স্বয়ং বের করলেন ‘‘সন্ধ্যা’’ কাগজ, তীব্র ভাষায় যে মদির রস ঢালতে লাগলেন তাতে সমস্ত দেশের রক্তে অগ্নিজ্বালা বইয়ে দিলে। এই কাগজেই প্রথম দেখা গেল বাংলাদেশে আভাস ইঙ্গিতে বিভীষিকা পন্থার সূচনা। বৈদান্তিক সন্ন্যাসীর এতোবড় প্রচণ্ড পরিবর্তন আমার কল্পনার অতীত ছিল।’ ব্রহ্মবান্ধব যে জালে জড়িয়ে পড়েছিলেন তার থেকে নিষ্কৃতির কোনো পথই ছিল না। রবীন্দ্রনাথ ‘চার অধ্যায়’ উপন্যাসের ইন্দ্রনাথ চরিত্র গড়েছিলেন ব্রহ্মবান্ধব উপাধ্যায়ের আদলে। বিপ্লবের হিংসাত্মক প্রকাশে ব্রহ্মবান্ধবের অপরিসীম জীবনীশক্তি এবং সৃজনশীলতা হারিয়ে যায়। রবীন্দ্রনাথের কাছেও বড়ো বেদনার ছিল এই বিচ্ছেদ। তবে ব্রহ্মবান্ধব উপলব্ধি করেছিলেন নিজের অবক্ষয়। মৃত্যুর আগে একটিবার তাঁর দেখা হয়েছিল রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে। বলেছিলেন, ‘রবিবাবু আমার পতন হয়েছে।’
সহায়ক গ্রন্থঃ
রবীন্দ্রনাথ ও বাংলার বিপ্লবী সমাজ, মঞ্জুশ্রী মিত্র
