বিজ্ঞান আর সাহিত্যকে কোনোদিন আলাদা করেননি বিশ্বভারতীর প্রথম শিক্ষক

জগদানন্দ রায় রবীন্দ্রনাথের অন্যতম প্রধান সহকারী ছিলেন, ১৯১০ সালে আশ্রমের প্রথম সর্বাধ্যক্ষ হয়েছিলেন তিনি

১৯০১ সালের ২২ ডিসেম্বর (৭ পৌষ)। ভুবনডাঙায় সেদিন সদ্য ডানা মেলছে রবি ঠাকুরের স্বপ্ন।  শান্তিনিকেতনে বিদ্যালয় স্থাপনের প্রতিষ্ঠা উৎসব ছিল সেইদিন। এখনকার পাঠভবন গৃহের হলঘরে সেদিন দীক্ষা নিয়েছিলেন পাঁচটি ছাত্র— রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সুধীরকুমার নান, গিরীন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য, গৌরগোবিন্দ গুপ্ত এবং প্রেমকুমার গুপ্ত। সেই অনুষ্ঠানে তসরের ধুতি চাদর পরে উপস্থিত ছিলেন দুই শিক্ষক প্রতিনিধি। একজন শিবধন বিদ্যার্ণব আর অন্যজন জগদানন্দ রায়। শান্তিনিকেতন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এই পথচলায় তাঁর ভূমিকা মনে রাখার মতো। আজকের কথকতা তাঁকে নিয়েই।

‘জগদানন্দ বিলান জ্ঞান/ গিলান পুঁথি ঘর-জোড়া।/ কাঁঠাল গুলান কিলিয়ে পাকান,/ গাধা পিটি করেন ঘোড়া।’ দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা ছড়ায় ঠিক এমনটাই জগদানন্দ, একজন আদর্শ শিক্ষক। রবীন্দ্রনাথ নিজে তাঁর সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘শিক্ষাদানে তাঁর স্বভাবে ছিল অকৃত্রিম তৃপ্তি। ছাত্রদের কাছে সর্বতোভাবে আত্মদানে তাঁর একটুও কৃপণতা ছিল না। শিক্ষার উচ্চ আদর্শ রক্ষার জন্য তাঁর অক্লান্ত চেষ্টা ছিল। যে শিক্ষকেরা আশ্রমের সৃষ্টিকার্যে আপনাকে সর্বতোভাবে উৎসর্গ করেছিলেন জগদানন্দ তাঁর মধ্যে অগ্রগণ্য ছিলেন।’ জগদানন্দের পড়ানোর বিষয় ছিল গণিত আর বিজ্ঞান। বিষয়দুটি মগ্ন হয়ে পড়াতেন। ছাত্রদের পূর্ণ মনোযোগ আর মগ্নতার অভাব তাঁকে রীতিমতো আঘাত করতো। বিজ্ঞান পড়াতেন গল্পের ছলে। রথীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিচারণায় তাঁর গল্প বলার আশ্চর্য ক্ষমতার কথা এসেছে। যন্ত্রের সাহায্যে তাঁর পরীক্ষা নিরীক্ষার সময় ছাত্ররা মুগ্ধ হয়ে থাকতো। প্রশ্নের পর প্রশ্নের উত্তর হাসিমুখে দিতেন জগদানন্দ। পাঠক্রমের বাইরের পৃথিবীর দরজাও খুলে দিতেন জগদানন্দ। তাতে রবীন্দ্রনাথের স্বীকৃতি আর অনুমোদন দুইই ছিল। সেই আমলে তিনশো টাকা দিয়ে একটি তিন ইঞ্চি টেলিস্কোপ জগদানন্দকে কিনে দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। রাত নামলেই সেই টেলিস্কোপ হাতে গ্রহ নক্ষত্র দেখতেন জগদানন্দ।রবীন্দ্রনাথ সম্পাদিত তত্ত্ববোধিনী পত্রিকায় একের পর এক বিজ্ঞান বিষয়ক প্রবন্ধ লিখেছিলেন জগদানন্দ।

বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান সাধনার এক অন্যতম সাধক ছিলেন জগদানন্দ রায়। সহজ ভাষায় বিজ্ঞানের কঠিন তত্ত্ব লিখতেন তিনি। ‘সাধনা’ পত্রিকায় তাঁর লেখা পড়েই রবীন্দ্রনাথ তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হন। পরে যখন জানতে পারেন পিতৃবিয়োগের পর জগদানন্দের পারিবারিক দরিদ্রতার কথা, তখন তাঁকে  শিলাইদহের সেরেস্তাদারের কাজ দেন রবীন্দ্রনাথ। তার সঙ্গে শিলাইদহের কুঠিবাড়িতে প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়ে পড়াতেন জগদানন্দ! সেখানেই তাঁর সত্তার মুক্তি। রবীন্দ্রনাথ গভীর অনুভূতিশীল মানুষ, তাই জগদানন্দের বিজ্ঞানী মনটিকে সেরেস্তাদার করে রাখতে চাননি। সেই কারণেই ১৯০১ সালে শান্তিনিকেতন বিদ্যালয়ে ডাক পাঠালেন তাঁকে। রবীন্দ্রনাথ তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, তিনি জমিদারীর কাজে থাকতে চান না শিক্ষক হতে চান? জগদানন্দ আনন্দের সঙ্গে জানিয়েছিলেন যে তিনি ‘নায়েব’ হতে চান না। রবীন্দ্রনাথের মুখে ‘তথাস্তু’ শুনে তিনি হাতে স্বর্গ পেয়েছিলেন। বলা ভালো নিজের জীবনের লক্ষ্য খুঁজে পেয়েছিলেন।

রবীন্দ্রনাথ এইভাবেই শান্তিনিকেতন আশ্রমের জন্য একের পর এক গুণী মানুষকে খুঁজে এনেছিলেন। জগদানন্দ রবীন্দ্রনাথের অন্যতম প্রধান সহকারী ছিলেন। ১৯১০ সালে আশ্রমের প্রথম সর্বাধ্যক্ষ হয়েছিলেন তিনি। রবীন্দ্রনাথ তাঁকে বিদ্যালয়ের ‘কর্ণধার’ বলেছিলেন। প্রথম তিনবছরের পর আবারও তাঁকেই সর্বাধ্যক্ষ করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ নিজেই। ১৯২১ সালে যখন আনুষ্ঠানিক ভাবে বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠিত হয়,তখন প্রথম কর্মসচিব এবং শান্তিনিকেতন সচিবের পদেও নির্বাচিত হন জগদানন্দ। এরপর ‘শান্তিনিকেতন’ পত্রিকা আর শান্তিনিকেতন প্রেসের পরিচালক পদও গ্রহণ করেছিলেন জগদানন্দ। ‘বিশ্বভারতী সমবায় কেন্দ্রীয় কোষ’-এর প্রথম সম্পাদকও হয়েছিলেন জগদানন্দ। রথীন্দ্রনাথের অনুপস্থিতিতে যুগ্ম শ্রীনিকেতন সচিবের দায়িত্বও পালন করেছিলেন জগদানন্দ। সেবামূলক নানা কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন । বোলপুর ইউনিয়ন বেঞ্চ কোর্টের অনারারি ম্যাজিস্ট্রেট পদেও যুক্ত ছিলেন তিনি।

এইসব ছাড়াও তিনি এক অসাধারণ কথক ছিলেন। সন্ধ্যা নামলেই ছাত্রদের নিয়ে বসে যেতেন গল্প বলতে। গল্পের কেন্দ্রে থাকতো তাঁর রসবোধ। এমন করে গল্প বলতেন যে সকলে ভাবতো বুঝি সত্যি!আপাতভাবে তাঁর খড়গের মতো বাঁকা নাক, চোখে মোটা কাচের চশমা, চাপা ঠোঁট, মুখে বিরক্তি আর কম্বল মুড়ি দেওয়া ভঙ্গি ছাত্রদের মনে ভয়ের সঞ্চার করলেও অচিরেই ধরা পড়তো তাঁর মায়ের মতো নরম মনটি। রবীন্দ্রনাথ নিজে লক্ষ্য করেছিলেন জগদানন্দের ছাত্রদরদী মনটিকে। একবার এক ছাত্রকে কোনো এক শিক্ষক একবেলা না খাওয়ার শাস্তি দিয়েছিলেন। তার জন্যও গোপনে অশ্রুবর্ষণ করেছিলেন জগদানন্দ। ছাত্রদের তিনি নিজে বকুনি দিলেও পরে বিস্কুট লজেন্সও দিতেন। ছাত্ররাও কখনো সাহসী হয়ে উঠতো। আশ্রমিকদের মুখে শোনা যায়, একবার ঘুমন্ত জগদানন্দকে রথীন্দ্রনাথ আর তাঁর সহপাঠীরা খাটসুদ্ধ ‘হরিবোল’ ধ্বনি দিতে দিতে বাঁধের জলে নামিয়েছিলেন।

জগদানন্দ অভিনয় করতেন। শেক্সপিয়রের মিড সামার নাইটস ড্রিম নাটকে অভিনয় করেছিলেন। ১৯০৮ সালের আশ্বিন মাসে ‘শারদোৎসব’ নাটকে কৃপণ লক্ষেশ্বরের ভূমিকায় অসাধারণ অভিনয় করেছিলেন জগদানন্দ। ‘প্রায়শ্চিত্ত’ নাটকে রামচন্দ্র, ‘রাজা’ নাটকে কোশলরাজ, ‘ফাল্গুনি’-তে দাদাঠাকুর আর ‘অচলায়তন’-এর মহাপঞ্চকের ভূমিকাতেও তাঁকে দেখা যায়। গান আর ছবি সম্পর্কে তাঁর ভালো লাগা তো ছিলই! তাঁর অবসর ভরে যেতো বেহালার সুরে। এক বিরল প্রতিভাবান মানুষ ছিলেন তিনি।  অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত তাঁর প্রতিভার সম্পর্কে একটি যথাযথ মন্তব্য করেছিলেন, ‘জগদানন্দ বিজ্ঞান আর সাহিত্যের মধ্যে কোনো কৃত্রিম শিবির বিভেদ স্বীকার করেননি।’ 

রবীন্দ্রনাথের অপরিসীম প্রেরণায় এই প্রতিভাবান মানুষটি। নিজেকে বিকশিত করতে পেরেছিলেন। মাতৃভাষায় বিজ্ঞান সাধনায় তাঁর ভূমিকা অনবদ্য। ব্রিটিশ সরকার তাঁকে ‘রায় সাহেব’ উপাধি দেয়। নৈহাটির বঙ্গীয় সাহিত্য সম্মেলনে বিজ্ঞান শাখার সভাপতি ছিলেন তিনি। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা কমিটির সদস্য ছিলেন তিনি।

জগদানন্দের মৃত্যুর পর তাঁর উদ্দেশে বলা রবীন্দ্রনাথের শব্দগুলি উল্লেখযোগ্য — ‘পরলোকগত জগদানন্দ রায়ের নাম বাংলাদেশের ছেলেমেয়েরা আর তাদের বাপ-মা সকলেই জানে। জ্ঞানের ভোজে এদেশে তিনিই প্রথম কাঁচা বয়সের পিপাসুদের কাছে বিজ্ঞানের সহজ পথ্য পরিবেশন করেছিলেন। আমরা জানি, শিশুদের পরে তাঁর এই ভালোবাসা ছিল সুগভীর, তাঁর দান সেই ভালোবাসার  দান। তাঁর মৃত্যুর পরে আজও সেই দানের রস নষ্ট হয় নি।’

সময় গড়িয়ে চলেছে। বিজ্ঞান এখন পৃথিবীকে নিয়ন্ত্রণ করছে। বহু বছর আগে শান্তিনিকেতন আশ্রমে এক সাধকের নিরলস বিজ্ঞান সাধনার সম্পর্কে অনেকেই উদাসীন। অথচ সাহিত্য ও বিজ্ঞানের যুগ্ম সাধনায় এক মৌন সাধক ছিলেন জগদানন্দ রায়। 

সহায়ক গ্রন্থঃ

রবীন্দ্র পরিকর,পূর্ণানন্দ চট্টোপাধ্যায়
রবীন্দ্রনাথ ও শান্তিনিকেতন, প্রমথনাথ বিশি

Developed by DXDasia