
রবীন্দ্রনাথের ছোটো ছেলে শমীন্দ্রনাথের গপ্পো
সকলের মনের ক্যানভাসে একটা ছবি আঁকি। একটি ছোট্ট ছেলে খেলার মাঠের পাশ কাটিয়ে ছুটে চলেছে প্রকৃতির ঘন আড়ালে। মাথার উপর বোলপুরের আকাশ, ভুবনডাঙার ভাবুক প্রকৃতি যেন পথের পাঁচালির দুগ্গার মতো ছেলেটির সঙ্গে সঙ্গে চলেছে । ছোট্ট নরম কণ্ঠে সুর তুলে ছেলেটি গাইছে, ‘বিকশিত প্রীতি কুসুম হে—’! ভুবনডাঙার মেঘলা আকাশ কি মনে রেখেছে এই ভাবুক শিশুটিকে? একদিন রবি ঠাকুর যার মধ্যে দেখেছিলেন নিজের ছায়া? আজকের কথকতায় তাহলে বলি রবীন্দ্রনাথের ছোটো ছেলে শমীন্দ্রনাথের কথা। রবীন্দ্রনাথ আদর করে যাকে বলতেন, ‘শমী ঠাকুর।’
১৮৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর শমীন্দ্রনাথের জন্ম হয়। মুখচ্ছবি, ভাবে, ভঙ্গিমায় ঠিক যেন রবীন্দ্রনাথ। সেই চারবছর বয়স থেকে শান্তিনিকেতন ব্রহ্মচর্যাশ্রমে দিদির সঙ্গে ছবি আঁকতে যেতো শমীন্দ্রনাথ। তবে নিশ্চিন্ত জীবনের আশ্বাস নিয়তি তাকে দেয়নি। সেই কারণে মাত্র সাত বছর বয়সে মাকে হারিয়ে বড়ো একলা হয়ে পড়েছিলো শমী। কয়েকমাসের মাথায় দিদি রেণুকাকে হারিয়ে ছোট্ট ছেলেটির ওইটুকু বুকের কোটরে কেমন কষ্ট হয়েছিলো, কেই বা তা জানে! এরপর মৃণালিনী দেবীর পিসিমা রাজলক্ষ্মীর কাছে শমীর একটু বড়ো হওয়া। ‘শিশু’ কাব্যগ্রন্থের ‘ছোটোবড়ো’ কবিতায় যে ছোট্ট ছেলেটা দাদার চেয়ে অনেক মস্ত হয়ে বাবার মতো বড়ো হতে চাইতো, তাকে মনে হয় শমীর ছাঁচেই গড়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। শমী সত্যি বাবার মতোই হতে চাইতো। বাবার মতো ভঙ্গিতে খাতায় লেখালিখি করতো। একটা খাতায় বাবার লেখা স্বদেশ পর্যায়ের এগারোটি গানগুলি লিখে রেখেছিলো শমীন্দ্রনাথ। আবার গানের তলায় তলায় বাবার মতো করে সই করে রাখতো সে। খাতার উপরে লেখা – ‘বন্দেমাতরম’। রবীন্দ্রনাথ এই মাতৃহীন বালককে বড়ো ভালোবাসতেন। সাধারণত ছেলেমেয়েদের পাশে শুয়ে ঘুমোতেন না রবীন্দ্রনাথ। কিন্তু ছোট্ট শমীর বিছানার পাশে একটি লাগোয়া খাটে শুয়ে নিজের হাতটা বাড়িয়ে দিতেন আর শমী পরম ভরসায় সেই হাত ছুঁয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়তো। মায়ের স্নেহ আর বাবার ভরসা, এই দুইই তার কাছে ছিলেন রবীন্দ্রনাথ।
রবীন্দ্রনাথের বড়ো ছেলে রথীন্দ্রনাথ তখন বিদেশে কৃষিবিদ্যা নিয়ে পড়তে গিয়েছেন। শান্তিনিকেতনের সব খবর জানিয়ে চিঠি তাঁকে চিঠি লিখতো ছোট্ট শমী। দাদাকে সে ভালোবাসতো। কিন্তু দাদার মতো পণ্ডিত হতে চাইতো না কখনো। জীবন যদি তাকে বড়ো হওয়ার সুযোগ দিতো, হয়তো সে হতো কবি অথবা দার্শনিক। মানুষকে খুব ভালোবাসতো শমী।হয়তো একাকিত্ব থেকেই সকলের সঙ্গে জড়িয়ে থাকার ইচ্ছা! পরে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘আমার ছোটছেলে শমী লোকজন এলে তাদের মোট ঘাড়ে করে আনতো। ’শারীরিক ভাবে রুগ্ন হওয়ায় খেলার মাঠ নয় , কণ্ঠে সুর ভরে শমীর বিচরণক্ষেত্র ছিল গাছপালা ঘেরা প্রকৃতি। ১৯০৭ সালের এপ্রিল মাসে একটি চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন , ‘শমী ঠাকুর সেদিন লাইব্রেরির বই গোছাতে অতিরিক্ত পরিশ্রম করে জ্বরে পড়েছে। জ্বরে পড়ে খুব গান ও কাব্য আলোচনা করছে। আজকাল হঠাৎ গানের উৎসাহ খুব বেড়ে উঠেছে। প্রায়ই ‘এ কি লাবণ্যে পূর্ণ প্রাণ ’ গেয়ে বেড়াচ্ছে।’
রবীন্দ্রনাথের নিয়তি অন্যরকম। মনে মনে যাকেই আঁকড়ে থাকতে চেয়েছেন, সেই-ই চলে গিয়েছে দূরে! এবার ডাক এলো ছোট্ট শমীর। ১৯০৭ সালে পুজোর সময় কলকাতা থেকে খবর এল, রবীন্দ্রনাথের ছোটো মেয়ে মীরা খুব অসুস্থ! রবীন্দ্রনাথ তড়িঘড়ি কলকাতা ছুটলেন। কিন্তু শমীকে কোথায় রেখে যাবেন? পুজোর ছুটিতে শান্তিনিকেতনে তার একলা লাগবে। কলকাতায় শমীর ভালোলাগে না। এইসব ভেবে শমীর বন্ধু ভোলার সঙ্গে তাকে পাঠিয়ে দেওয়া হলো মুঙ্গের, রবীন্দ্রনাথের সুহৃদ শ্রীশচন্দ্রের শ্বশুরবাড়ি! শ্রীশচন্দ্রকে চিঠিতে লিখলেন রবীন্দ্রনাথ, ‘শমী কোলকাতা পছন্দ করে না, সেখানে যেতেও চায় না অথচ ছুটিতে শান্তিনিকেতন তার একলা ঠেকে। শমী এত অল্প জায়গা জোড়ে এবং এত নিরুপদ্রব যে তার আগমনে তোমাদের মুঙ্গের সহরের শান্তিভঙ্গের আশঙ্কা নেই।’ শমী মুঙ্গের যাওয়ার একমাসের মধ্যেই চিঠি গেলো রবীন্দ্রনাথের কাছে। শমী কলেরায় আক্রান্ত ! সঙ্গে সঙ্গে ডাক্তার নিয়ে ছুটলেন রবীন্দ্রনাথ। ওখানেও চিকিৎসার কোনো ত্রুটি ছিল না। কিন্তু শেষরক্ষা হলো না। রবীন্দ্রনাথের জীবনে আবার ফিরে এলো অভিশপ্ত সাতই অঘ্রাণ। পাঁচবছর আগে একই দিনে চিরঘুমের দেশে চলে গিয়েছেন কবিপত্নী। এবার শমীন্দ্রনাথ! এইবার আর মৃত্যুপথযাত্রীর সামনে গিয়ে দাঁড়ানোর সাহস পেলেন না রবি ঠাকুর। পাশের ঘরে ধ্যানস্থ হয়ে রইলেন। ঠিক যেন সর্বত্যাগী সাধক! শমীর সৎকার করতেও গেলেন না। দায়িত্ব ভাগ করে দিয়ে সেই রাতেই রওনা দিলেন শান্তিনিকেতনের পথে। শান্ত, স্থিতধি। কেউ তাঁকে দেখে অনুমানও করতে পারে নি, কেমন ঝড় বইছে তাঁর বুকের ভিতর। দাদা দ্বিজেন্দ্রনাথ তাঁর পিঠে হাত বুলিয়ে শুধু ‘রবি’, ‘রবি’ বলছেন। রবীন্দ্রনাথ নিজেকে দিচ্ছেন আশ্বাসবাক্য — ‘ঈশ্বর আমাকে যাহা দিয়াছেন, তাহা গ্রহণ করিয়াছেন । তাহা শিরোধার্য করিয়া লইবো। আমি পরাভূত হইবো না।’ জগদীশচন্দ্র বসুকে লিখেছিলেন, চারিদিকের এত দুঃখ শোকের মধ্যে নিজেকে বিশেষরূপে দুর্ভাগা কল্পনা করে থাকতে তাঁর লজ্জাবোধ হয়। কিন্তু তাঁর শোক তো শব্দের ফুল ফুটিয়ে রেখেছে। তাই লিখেছিলেন, ‘যে রাত্রে শমী গিয়েছিল সে রাত্রে সমস্ত মন দিয়ে বলেছিলুম বিরাট বিশ্বসত্তার মধ্যে তার অবাধ গতি হোক, আমার শোক তাকে একটুও যেন পিছনে না টানে। –শমী যে রাত্রে গেল তার পরের রাত্রে রেলে আসতে আসতে দেখলুম জ্যোৎস্নায় আকাশ ভেসে যাচ্ছে, কোথাও কিছু কম পড়েছে তার লক্ষণ নেই। মন বললে কম পড়েনি— সমস্তর মধ্যে সবই রয়ে গেছে, আমিও তারই মধ্যে!সমস্তর জন্যে আমার কাজও বাকি রইল। যতদিন সেই কাজের ধারা চলতে থাকবে , সাহস যেন থাকে, অবসাদ যেন না আসে—– যা ঘটেছে তাকে যেন সহজভাবে স্বীকার করি—’! কিন্তু সত্যিই কি মনে নিতে পেরেছিলেন রবীন্দ্রনাথ? এই দাহ তাঁকে ছেড়ে হয়তো যায় নি। তাঁর সাহিত্যে শব্দের ক্যামোফ্লেজে রয়ে গিয়েছিলো সব!রয়ে গিয়েছিলো সবটুকু মনখারাপও। নোবেল প্রাপ্তির খবর পেয়ে কবিকে সম্বর্ধনা দিতে গিয়ে মনে অতৃপ্তি নিয়ে ফিরে গিয়েছিলো যে উত্তেজিত জনতা, তারা বোঝেইনি সেই দিনটাও ছিল সাতই অগ্রহায়ণ, কবির বড়ো বেদনার, স্ত্রী ও পুত্রকে হারানোর দিন! আবার ১৯১১ সালে প্রকাশিত ‘ডাকঘর’ নাটকের অমলের মধ্যে যেমন মিশে আছে রবিঠাকুরের ছোটোবেলা, তেমনি অবশ্যই রয়েছে শমীন্দ্রনাথ, যে ছিল বাবার প্রতিমূর্তি! শান্তিনিকেতনে শমীন্দ্রনাথের উদ্যোগেই প্রথম অনুষ্ঠিত হয়েছিলো ঋতু উৎসব! এখনকার বসন্তোৎসবের শুভ সূচনা করেছিলো ওই ছোট্ট ছেলেটি। নিজে সেজেছিলো বসন্ত আর তার দুই বন্ধু সেজেছিলো বর্ষা আর শরৎ। ‘ডাকঘর’ নাটকে বাদল হরকরা আর শরৎ হরকরাকে এঁকেছিলেন রবীন্দ্রনাথ শব্দের তুলিতে। তাহলে চিঠির অপেক্ষায় বসে থাকা ছোট্ট অমলের মধ্যেই হয়তো খুঁজলে পাওয়া যাবে রবি ঠাকুরের আত্মজ শমী ঠাকুরকে।
একসময় রবীন্দ্রনাথ প্ল্যানচেটে ডাক পাঠাতেন প্রিয়জনদের। কথা বলতে চাইতেন হারিয়ে যাওয়া অতীতের সঙ্গে। বন্ধুকন্যা বুলাকে মিডিয়াম করে শমীর আত্মাকেও ডেকেছিলেন। শমী নাকি এসে বলেছিলো, বাবার একটি কবিতা তার বিশ্রী লেগেছে। পরলোকে সে একটি ভুবন তৈরি করেছে, যার নাম দিয়েছে শমীর পৃথিবী। কোনো এক বৃক্ষলোকে শমীর বাস! প্ল্যানচেটের দুরূহ জালের সামনে অসহায় এক বাবা ফিরে ফিরে আসতেন তাঁর বাৎসল্য নিয়ে। কী বলি তাকে? কুসংস্কার না শোক? শমীর অভ্যাস ছিলো খাতায় লেখালিখির। আগে থেকে তারিখ দিয়ে রাখতো সে খাতায়। শমীর মৃত্যুর পর রবীন্দ্রনাথ সেই খাতাখানা হাতে নিয়ে দেখেন, আগে থেকে লিখবে বলে তারিখ লিখে রেখেছে শমী। তারিখ লেখা থেমে গিয়েছে , সেই দিনে যেদিন সে পৃথিবী ছেড়ে চলে যাবে। আশ্চর্য হলেও সত্যি! রবি ঠাকুরের মতোই হতে পারতো যে ছেলেটি সে মিশে রইলো সমগ্র প্রকৃতিতে আর এক দুঃখী পিতার অন্তরের কেন্দ্রে। সারাজীবন ধরে রবীন্দ্রনাথ মনে মনে বলে গেলেন, বিরাট বিশ্বসত্তায় তার গতি অবাধ হোক।
সহায়ক তথ্যঃ
রবিজীবনী, প্রশান্তকুমার পাল
রবীন্দ্রনাথের আত্মীয়স্বজন , সমীর সেনগুপ্ত
রবীন্দ্রনাথের পরলোকচর্চা, অমিতাভ চৌধুরী
ইন্টারনেটের থেকে পাওয়া সৌপ্তিক সেনগুপ্তের প্রতিবেদন।

