
শিল্পীদের ক্ষোভ, কর্মকর্তাদের ক্ষোভ… মায়া আর্ট স্পেসে শিল্পীদের খোলামেলা আলোচনা
বাঙালির পুজো যেন শেষ হয় না। এই পুজো যখন উৎসবের আঙিনায় খেলা করে, তখন তা আর ধর্মীয় বেড়াজালে আটকে থাকে না। তার ভুবনখোলা উঠোন, উৎসবের ভাষায় পুজো-মাঠ। বারো মাসে তেরোপার্বণ প্রিয় বাঙালি স্বাদে-আহ্লাদে সবেতেই মেতে থাকতে চান প্রাণজুড়নো এই উৎসবে। তিনি হেসে ওঠেন, ভেসে ওঠেন। প্রতিটা ঋতু এলেই তিনি উড়ে বেড়ান স্বভাব-নিজস্ব ডানায় ভর করে। সে বর্ধমান হোক বা বাঁকুড়া, দুর্গাপুর হোক বা দুবরাজপুর, মেচেদা হোক কিংবা ময়নাগুড়ি; আর রাজধানী কলকাতা হলে তো কথাই নয়। সমস্ত উৎসবের ধ্যানবিন্দু যেন এই শহর। যেখানে বর্ণ জাত ভাষা সবকিছুর বাইরে গিয়ে মানুষ উড়ে বেড়ান।
কয়েকদিন আগেই শেষ হয়েছে দুর্গাপুজো। রাস্তায় এখনও ছড়ানো-ছেটানো প্ল্যাকার্ড, বড়ো বড়ো ব্যানার। বাঁশ দিয়ে ঘেরা লম্বা লম্বা গেটগুলোর দড়ির গিঁট এখনও সব খোলা হয়নি। কলকাতা শহরে পুজোর প্রস্তুতি শুরু হয় দুর্গাপুজোর ছয়-সাত মাস আগেই। আর প্রত্যেকটা পুজো কমিটির মূলে থাকেন একজন শিল্পী। পুজো মানেই প্রতিযোগিতা, পুরস্কারের বাহার। এক রাতে বিচারকরা পুজো-মাঠে গিয়ে একটি ব্যাচ লাগিয়ে চলে যান। রূপোলী পর্দা কিংবা টেলিভিশনের জনপ্রিয় মুখেদের ভিড় জমে সেখানে। তাঁদের হাতেই শ্রেষ্ঠত্ব বিচারের মানদণ্ড। তাঁরাই ঠিক করবেন ‘সেরা পুজো’ কোনগুলি। অতএব একটু তাড়াহুড়ো তো থাকবেই। যে শিল্পীরা ছয়-সাতমাস টানা রাত জেগে কাজ করছেন, পাড়ার এঁদো নর্দমাকে করে তুলছেন শিল্পের আবাসভূমি; তাঁদের কাজের বিচারের সময় তাহলে মাত্র একটি রাত! এমনই কয়েকটি প্রশ্নকে সামনে রেখে মায়া আর্ট স্পেসে গত ৩১ তারিখ হয়ে গেল গুরুত্বপূর্ণ একটি আড্ডা, যার পোশাকি নাম ছিল ‘পুজো-শিল্প’। এই আয়োজন নতুন নয়, গত চারবছর ধরে মায়া আর্ট স্পেস কর্তৃপক্ষ শিল্পীদের নিয়ে পুজো আড্ডার আয়োজন করে চলেছে। আড্ডায় এবছর উপস্থিত ছিলেন সাতজন শিল্পী (দেবাশিস বাড়ুই, অনির্বাণ দাস, প্রদীপ দাস, ভবতোষ সুতার, সুশান্ত পাল, পার্থ দাশগুপ্ত এবং সনাতন দিন্দা), একজন পুজো-বিশেষজ্ঞ (বিমল কুণ্ডু) এবং একজন পুজোর কর্মকর্তা (সঞ্জয় মজুমদার)। অনুষ্ঠানটিতে সঞ্চালনার দায়িত্বে ছিলেন বিশিষ্ট ইতিহাস ও শিল্পবিদ দেবদত্ত গুপ্ত।

শিল্পীদের পুজোর জার্নির থেকেও এদিন কথোপকথনের মূল বক্তব্য ছিল বিচারব্যবস্থা বা তার পদ্ধতি কী। ঠাকুরপুকুর এসবি পার্কের সভাপতি সঞ্জয় মজুমদার গুরুত্ব দেন শিল্পীর কাজকে। পুরস্কারের ইঁদুর দৌড়ে তারা সামিল না হয়ে একটা উৎসবকে কতটা প্রাঞ্জল করে তোলা যায়, সেই চেষ্টাই বারবার করেন। তিনি বলেন “ঠাকুরপুকুরে পুজো মানে কলকাতার শেষ দিক। বেহালা থেকে আমাদের দর্শক টানতে হয়। এখনও অবধি যে দর্শক আমরা পাই, তা শুধুমাত্র শিল্পীদের কাজ দেখার জন্যই আসেন। তাই পুরস্কার আমাদের কাছে কোনও মানদণ্ড নয়।” এসবি পার্ক আগামী পুজোতে গভর্মেন্ট আর্ট কলেজের ছাত্র এবং প্রবীণ কিছু শিল্পীকে নিয়ে একটি বিশেষ ওয়ার্কশপের আয়োজন কড়া হবে। যেখানে নবীন আর প্রবীণ শিল্পীর মেলবন্ধনে মুখরিত হবে উৎসব। অন্যদিকে শিল্পী সনাতন দিন্দা প্রায় দুইবছর পর পুজোয় ফিরেছেন। তাঁর কথায় কোনো পুজো কমিটির থেকে ডাক পাননি এই দুইবছর। এবছর কাশী বোস লেনে প্রদীপ দাসের সঙ্গে কাজ করেছেন। তবে শুধু প্রতিমা নির্মাণেই তাঁকে দেখা গেছে। শিল্পী পার্থ দাশগুপ্ত এবছর একটি বিস্ময়কর কাজ করেছেন ঠাকুরপুকুর এসবি পার্কে। থিম ছিল ‘অগ্নিশুদ্ধি’। দর্শক মোহিত হয়েছেন সেই কাজ দেখে। তিনি বললেন, “টেলিভিশনের জনপ্রিয় মুখেরা বিচার করতে আসছেন। ঘুরছেন। সেলফি তুলছেন। শিল্পীদের প্রশ্ন করছেন। এই কি তবে বিচারব্যবস্থার মানদণ্ড?” ভবতোষ সুতারও স্বীকার করে নেন এসবি পার্কের মনোরম পরিবেশের কথা। তাঁর পাড়ার পুজো। তাই কোন মণ্ডপ কোন পুরস্কারটি ছিনিয়ে নীল, সেটাই কি বিচারব্যবস্থার একমাত্র পথ? পুজো বিশেষজ্ঞ বিমল কুণ্ডু প্রায় পনেরো বছর যুক্ত আছেন বিচারক হিসাবে। তিনি বারবার বলেন, “চূড়ান্ত পর্যায়ে চার-পাঁচটি পুজোকে বাছাই করা হয়। তখন আমাদের হাতে আর কিছু থাকে না।”
এখানেই প্রশ্ন ওঠে বারবার। পুজোর বিচারক বা পুজো-শিল্পের বিচারক কারা? ‘এস্থেটিক্স’ প্রেমী সেলিব্রিটি? নাকি শিল্প-রুচি সম্মত ‘বোদ্ধা’? এই উত্তর হয়তো আমাদের অজানা। অথবা আমরা জানি। শিল্পীরাও জানেন। তাই বারবার তাঁদের ক্ষোভ উগড়ে দেন। আমরা গুরুত্ব দেব কীসে? পুরস্কারকে নাকি শিল্পকে? কারা বিচার করবেন? কীভাবে বিচার করবেন?

আসলে এই আড্ডা নিছক বিজয়া আড্ডা বা বৈঠকি আড্ডা নয়। কিছু প্রশ্ন তোলা, খোলামেলা কথা বলা আর নিজেদের অভিজ্ঞতাকে ভাগ করে নেওয়া- মায়া আর্ট স্পেসে এই আলোচনা তাই শিল্প-কাজেই সীমাবদ্ধ থাকে না। খুলে ফেলতে চায় সমস্ত দরজা। একজন রুচিসম্মত দর্শক যেভাবে শিল্পকে খুব কাছ থেকে দেখতে চান বা অনুভবের সমস্ত রাস্তা খুলে ফেলতে চান, তার জন্য এই শহর আপনাকে হাত বাড়িয়ে ডেকে নিয়েছে সেই কবেই। শিল্পী বা শিল্প এখানে সেই সাঁকো। যার একপাশে থাকে দর্শকের চোখ, আরেকপাশে থাকে শিল্পীর দর্শন।&
