বাঙালি হিসেবে ‘পাগল’দের জন্য রয়েছে আলাদা গর্ববোধ-২

বেঁচে থাকুক পাগলরা

এর একটা সহজগ্রাহ্য কারণ হল, সাধারণ চিকিৎসা ব্যবস্থার পাশাপাশি জনস্বাস্থ্য বলে একটা বিষয় অনেকদিন ধরেই আমাদের রাজ্যে চালু আছে। অর্থাৎ, সাধারণ অসুখবিসুখকে আমরা কীভাবে বুঝব, কীভাবেই বা তার মোকাবিলা করব বা কোন পর্যায় পর্যন্ত নিজেরা বাড়িতে করব, না প্রশমন হলে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাব, এটার একটা সাধারণ ধারণা মানুষের মধ্যে থাকা দরকার , এটা আমাদের নীতিপ্রণেতারা বুঝেছিলেন। একথা ঠিক, এত বড়ো দেশে সব জায়গায় সকলের জন্য সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করা বড়ো একটা চ্যালেঞ্জ, তাছাড়া এটা নীতি-নিয়ন্ত্রকদের দৃষ্টিভঙ্গির ওপরও অনেক ক্ষেত্রে নির্ভর করে , সচরাচর এটা নিয়ে তাঁদের মাথায় তেমন ব্যথা করে না । সরকারি তথ্যই জানিয়ে দেয় দেশের প্রতিরক্ষাখাতের ব্যয়বরাদ্দের তুলনায় স্বাস্থ্যের বাজেটবরাদ্দ নিতান্তই খুদকুড়ো। ফলে সাধারণ রোগবালাই-এর কিছু সহজ লক্ষণ যদি সমস্ত স্তরের মানুষের জানা থাকে তবে কিছুটা সুবিধে।শুধু রোগ বালাইই বা বলি কেন, গ্রামে-গঞ্জে গর্ভবতী মায়েদের প্রসবের নিরাপত্তার জন্য একসময় কেন্দ্রীয় সরকার ‘প্রশিক্ষিত দাই’ নিয়োগ করেছিলেন। এইসব প্রশিক্ষিত মহিলারা প্রসূতি মায়েদের বাড়িতেই প্রসবে সাহায্য করতেন। প্রথমে ‘জননী সুরক্ষা যোজনা’ চালু হওয়া ও তারপরে ‘জাতীয় গ্রামীণ স্বাস্থ্য মিশন’ লাগু হওয়ার পর থেকে মা ও শিশুর স্বাস্থ্যের কথা মাথায় রেখে প্রাতিষ্ঠানিক প্রসবকেই উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে, দেওয়া হচ্ছে আর্থিক অনুদান। তাঁর সঙ্গে সংগতি রেখে গ্রামে ‘প্রশিক্ষিত দাই’ ব্যবস্থা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে । 

এইসব নানা ভাবনাচিন্তা নিয়ে আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থারও কিছু প্রকল্প চলে, তার জন্য বহু অর্থ ব্যয় হয়। তাঁদের করা সমীক্ষা বলে, অনেকসময় খুব সাধারণ কিছু স্বাস্থ্যবিধি মানলে বা সামান্য কিছু অভ্যাসের পরিবর্তন ঘটালে অনেক রোগের প্রতিরোধ করা সম্ভব। যেমন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একটা সমীক্ষা থেকে জানা গিয়েছিল, শুধুমাত্র খাবার খাওয়ার আগে ভালো করে হাত ধুয়ে নিলেই অনেক জীবাণুঘটিত রোগ সংক্রামিত হওয়ার আশঙ্কা কমে যায়। এইসব ধারনা ও নির্দেশগুলো কিন্তু খুব সুচিন্তিতভাবে নিচু ক্লাসের পাঠক্রমেও পড়ানোর ব্যবস্থা আছে, অর্থাৎ একজন শিশু বা কিশোরও এগুলি বিষয়ে সচেতন হতে পারে। জানিয়ে দেওয়া হয়, কোনও কোনও রোগের কিছু সাধারণ উপসর্গ, লক্ষণ, প্রাথমিক প্রতিরোধের শিক্ষা ও সচেতনতা। ম্যালেরিয়া হলে যে কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসে বা ডায়েরিয়া হলে যে ওআরএস খাওয়াতে হয় এটা এখন সাধারণ গ্রামের মানুষ, গড়পড়তা ছাত্র-ছাত্রীরাও জানে। বিশেষ কোনও রোগের প্রকোপে জনস্বাস্থ্য যদি বিপন্ন হয় তবে সরকারিভাবে বিশেষ কর্মসূচি নেওয়া হয় এটাও আমরা দেখেছি। হঠাৎ এসে পড়া ডেঙ্গি বা ফ্যালসিপেরাম ম্যালেরিয়া বা অধুনা জাপানি এনসেফেলাইটিস বা সোয়াইন ফ্লু এইসব নিয়ে সরকারি সচেতনতার প্রচার বিজ্ঞাপন আমরা দেখেছি। 

মানসিক স্বাস্থ্য নিয়েও আইন প্রণয়ন হয়েছে। মানসিক রোগের চিকিৎসার পরিসর বাড়ানোর দায়িত্ব নিয়েছে সরকার। আমাদের রাজ্যে জেলাস্তরের সরকারি হাসপাতালে সেই পরিষেবা দেওয়ার ব্যবস্থা হয়েছে। বেসরকারি হাসপাতাল এবং পলিক্লিনিকে নিয়মিত বসেন মানসিক রোগের বিশেষজ্ঞ ডাক্তার এবং মনোবিদরা। এবার সময় এসেছে জনস্বাস্থ্যের পরিসরে মানসিক রোগকে জায়গা করে দেওয়ার। 

মানসিক রোগের মধ্যে অবসাদ বা ডিপ্রেশন, স্কিতজফ্রেনিয়া, বাইপোলার ডিসঅর্ডার বা এডিএইচডি কিংবা অটিজম, অবসেসিভ কমপালসিভ ডিসঅর্ডার বহু রকমের রোগ রয়েছে যার নাম অনেকেই শোনেননি অথচ ভয়াবহতার বিচারে এগুলির প্রকোপ হৃদরোগ বা ক্যান্সারের থেকে কিছুমাত্র কম নয়। আবার পাশাপাশি এটাও ঠিক যে কিছু কিছু মানসিক রোগ সঠিক সময়ে চিহ্নিত হলে সম্পূর্ণ নিরাময় হয়ে যায়, কিছু রোগ ধারাবাহিক চিকিৎসা করালে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে থাকে বা সেরেও যায়। আর কেউ কিছু অসংলগ্ন আচরণ করলেই অনায়াসে ধরে নেওয়া হয়, তার মাথায় ‘ছিট আছে’ –  অসুস্থতার এমন সুতীব্র বিদ্রূপবহ প্রতিশব্দ বাংলাভাষায় খুব কমই আছে ! 

বাস্তব প্রয়োজন ও পরিবর্তিত আর্থসামাজিক পরিস্থিতির দিকে তাকিয়ে স্কুলস্তরের পাঠক্রমে আজকাল নানা বিষয়ের অন্তর্ভুক্তি ঘটেছে বলে শুনতে পাই। যেমন, পরিবেশবিদ্যা এখন সর্বস্তরেই পাঠ্য। কিছু মানসিক রোগের সচেতনতাভিত্তিক তথ্য পাঠক্রমে ঢুকিয়ে নিতে পারলে আদপে সেটা পড়ুয়াদের বাস্তব প্রয়োজনেই কাজে আসবে বলে মনে হয়। এই তথ্য একেবারে সুনির্দিষ্ট ভাবে প্রমাণিত যে ডায়াবেটিস, হৃদরোগ বা অস্থি সংক্রান্ত কিছু কিছু রোগের সঙ্গে রোগীর মানসিক অবস্থার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু এইসব তথ্য মেডিকাল জার্নালের পাতা থেকে সাধারণের নাগালে আসা দরকার। এমনকি এখানে গ্রাম-শহরের বিশেষ প্রভেদ করেও লাভ নেই, কেননা, বিশ্বায়িত অর্থব্যবস্থার ধারাবাহিক স্রোতে গ্রামীন ও নাগরিক জীবনের মধ্যে ব্যবধান কমে আসছে ক্রমশ। 

বাঙালি হিসেবে ‘পাগল’দের জন্য রয়েছে একটু আলাদা গর্ববোধ। কারণ, এই ভাষাতেই একজন মহত্তম কবি গেয়েছিলেন: “কোন আলোতে প্রাণের প্রদীপ জ্বালিয়ে তুমি ধরায় আসো / সাধক ওগো, প্রেমিক ওগো, পাগল ওগো ধরায় আসো”। সাধক, প্রেমিক আর পাগলকে এক পঙক্তিতে যিনি বসানোর কথা ভাবতে পেরেছিলেন তার জন্য আমাদের কোনও বিশেষণই যথার্থ নয়। ‘পাগল যে তুই, কণ্ঠ ভরে জানিয়ে দে তা’। বেঁচে থাকুক পাগলরা। না হয়, ফুটপাথে বসে সাপ লুডো খেলুক বিধাতার সঙ্গে।
 

Developed by DXDasia