প্রধানমন্ত্রীর ঢাকা সফর – যা যা দেখলাম, যা যা শুনলাম

প্রধানমন্ত্রী ভাষণে বলেছেন তিনি নাকি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সামিল হয়েছিলেন

মুক্তিযুদ্ধের অর্ধ শতবর্ষ উপলক্ষে বাংলাদেশ সরকার যে উদযাপন অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে, সেখানে বিশেষ অতিথি হিসেবে একমাত্র ভারতের প্রধানমন্ত্রীকেই আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। সেই আমন্ত্রণ ব্যক্তি নরেন্দ্র মোদিকে নয়, গোটা ভারত রাষ্ট্রকে। কারণ মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলিতে ভারতের সরকার এবং তার জনগণের সহমর্মিতার একটি বিশেষ দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছিল, যা গোটা পৃথিবীর মানুষ আজও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে থাকেন।

সেই আমন্ত্রণ গ্রহণ করে নরেন্দ্র মোদি অবশ্যই সঠিক কাজ করেছেন। কিন্তু কূটনৈতিক শিষ্টাচারের মাপকাঠিতে তার মধ্যে অনেকানেক ফাঁক রয়ে গেছে। প্রথম কথা, এইরকম একটি অনুষ্ঠানে তাঁর উচিত ছিল উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন ভারতীয় প্রতিনিধি দল নিয়ে হাজির হওয়া। তাতে শোভন হত যদি তিনি একটি সর্বদলীয় সংসদীয় প্রতিনিধি দল নিয়ে ঢাকা যেতেন। সেইসঙ্গে তাঁর উচিত ছিল অন্তত পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীকে প্রতিনিধি দলে অন্তর্ভুক্ত করা। নির্বাচনী প্রচারের কারণে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঢাকা যেতেন কিনা, সেটা পরের প্রশ্ন। কিন্তু সৌজন্যের খাতিরে বিদেশ দপ্তরের তরফে একটি আমন্ত্রণ লিপি অবশ্যই তাঁকে পাঠানো উচিত ছিল। 

কথাটা মনে পড়ল অন্য কারণে। ভিপি সিং যখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, সেই সময়ে ভিয়েতনামের সংগ্রামী নেতা হো-চি-মিনের জন্ম শতবর্ষ উদযাপিত হয়। সেখানে সর্বদলীয় সংসদীয় দল পাঠানো হয়েছিল এবং তার নেতৃত্ব করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুকে।

দৃষ্টান্ত আরও আছে। গঙ্গাজল বন্টন নিয়ে চুক্তি সম্পাদনের জন্য প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ী যখন ঢাকা গিয়েছিলেন, তখনও তাঁর সঙ্গী ছিলেন জ্যোতি বসু। মুক্তিযুদ্ধের অর্ধশতক উদযাপনে মোদি যখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সঙ্গী করতেন, তাতে তিস্তা জল বন্টনের বরফ গলাতেও তিনি একধাপ এগিয়ে থাকতেন। সেই আমন্ত্রণ তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নয়। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে। তাহলে সেটা শেখ হাসিনাকেও অনেকটা আশ্বস্ত করত। 

অনুষ্ঠানে হাসিনা তাঁর ভাষণে সেই খোঁচাটা দিতে ভোলেননি। তিনি আশা প্রকাশ করেছেন যে ভারতে ক্ষমতাসীন এবং বিরোধীপক্ষ বিভিন্ন বৃহৎ কূটনৈতিক প্রশ্নে বরাবরই সহমতের ভিত্তিতে এগিয়েছে। তিস্তা জলের প্রশ্নেও তেমনটাই হবে। খোঁচা মোদিকে আরও খেতে হয়েছে। অনুষ্ঠানের সূচনায় মোদিকে মঞ্চে বসেই দেখতে এবং শুনতে হয়েছে চারটি ধর্মগ্রন্থের সারাংশ। তার মধ্যে ছিল কোরাণ, গীতা, ত্রিপিটক এবং বাইবেল। এই আয়োজনের মধ্য দিয়ে আর কিছু না হোক শেখ হাসিনা মহামান্য নরেন্দ্র মোদিকে ধর্ম নিরপেক্ষতা এবং সহিষ্ণুতার বাল্য শিক্ষাটা দিয়ে ছেড়েছেন।

মোদি যে সেই শিক্ষা গ্রহণ করবেন তেমন বান্দা তিনি নন। তিনি হেঁটেছেন অন্য পথে এবং তাতে তিনি লোক হাসিয়েছেন। মোদি তাঁর ভাষণে বলেছেন তিনি নাকি বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে আন্দোলন করতে গিয়ে কারাবরণ করেছিলেন। কবে কখন কোথায় তিনি এমন কাজটি করেছেন, তার কোনো পরিষ্কার প্রমাণ রাখেননি। প্রথম কথা ১৯৭১ সালে বিজেপি দলের জন্ম হয়নি। তখন ছিল জনসংঘ। গুজরাটে জনসংঘ মুক্তিযুদ্ধ দিয়ে কোনো আন্দোলন করেছে বলে শোনা যায়নি৷ মোদির বয়স তখন কত ছিল সেটাও পরিষ্কার নয়। তবে ঢাকাই কুট্টিদের ঐতিহ্য অনুসরণ করে ওপার বাংলার মানুষ আজও তাঁদের রসবোধ হারায়নি। হয়তো সেই জন্যই সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে, “আগে বলবা তো!”

নরেন্দ্র মোদি ইজরায়েল সফরে গিয়ে নেতানিয়াহু-র সঙ্গে কেবল সাগর স্নান করেছিলেন তাই নয়, তিনি ইহুদি গির্জাতেও প্রার্থনায় যোগ দিয়েছিলেন। সেই সূত্রে ধরে নেওয়া গিয়েছিল নিকটতম প্রতিবেশী মুসলমান প্রধান বাংলাদেশে তিনি অন্তত একবার হলেও কোনও মসজিদে উঁকি দেবেন৷ ভাগ্যিস তিনি সেটা করেননি— তাহলে পরের দিন থেকে পশ্চিম দিকে সূর্য উঠত। 

তবে তিনি সবকিছু ছেড়ে হরিচাঁদ-গুরুচাঁদের মন্দিরে হাজিরা দিয়েছেন। তার জন্য শেখ হাসিনার প্রশাসন আয়োজনের ত্রুটি রাখেনি। পশ্চিমবঙ্গে এখন ভোটের হাওয়া বইছে। শয়নে স্বপনে সেই কথা মোদি ভুলতে পারেন না। এই রাজ্যে অন্তত পঞ্চাশটি আসনে মতুয়া সম্প্রদায় হল নির্ণায়ক শক্তি৷ ঢাকার রামকৃষ্ণ মিশন বা গুরুদ্বারায় হাজিরা দেবার কোনো দায় মোদির নেই। ভোট কাঙালির ভক্তিভাব একমাত্র ভোটের অঙ্কেই চালিত হয়।

Developed by DXDasia