
ক্রিসমাস ক্যারল, রেস্তোরাঁর ভিড় – সবকিছুর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ডিসেম্বরের পার্কস্ট্রিট। তবে ডিসেম্বর আরও একটি কারণে পার্কস্ট্রিট ‘স্পেশাল’। ডিসেম্বরে শহরে প্রাইড ওয়াক। রবির বিকেলে পার্কস্ট্রিটে বিরাট প্রাইড ফ্ল্যাগ নিয়ে উৎসবে মেতেছিল এলজিবিটিকিউ+ সম্প্রদায়ের সংগঠন কলকাতা প্রাইড (Kolkata Pride)। চললো সেলিব্রেশন। রংধনু জামা, পতাকা ও মানুষের ভিড়ে ঢেকে গিয়েছিল পার্কসার্কাস থেকে পার্কস্ট্রিট চত্বর। কলকাতা প্রাইড ওয়াক-এর (Kolkata Pride Walk 2024) মাধ্যমে সমাজে সংখ্যাগুরুদের কাছে আত্মপ্রকাশ করেন সমাজ নির্ধারিত প্রান্তিক লিঙ্গের মানুষ। আওয়াজ তোলেন, গান গেয়ে ওঠেন, একে অপরকে জড়িয়ে ধরেন, সোচ্চার হন। পার্কসার্কাস থেকে পার্কস্ট্রিট – এই পথেই একদিন ইতিহাস রচনা করেছিল কলকাতা। দক্ষিণ এশিয়ায় প্রথম প্রাইড ওয়াক-এর (First Pride Walk in South Asia) সাক্ষী ছিল এ শহর। ১৯৯৯ সালের জুলাই মাসে।

প্রাইড ওয়াক বা গৌরব মিছিল কেবলমাত্র নিজেদের পরিচয়ের উদযাপনের জন্য নয়, বরং চাপিয়ে দেওয়া কিছু আইনের সপক্ষে বা বিপক্ষে এবং ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের মাধ্যম হয়ে উঠেছে। কলকাতা রেইনবো প্রাইড ওয়াক সর্বদাই নিজস্ব একটা স্বতন্ত্র ধারা বজায় রেখেছে।
১৯৯৯-এর কলকাতা, তখনও তাকে সারা পৃথিবী ‘ক্যালকাটা’ নামে ডাকে। ঘরের কোণায় স্বমহিমায় বাস করে ল্যান্ডফোন। ডকবাক্সে চিঠি আসে নিয়মিত। ইন্টারনেটের নাম শুনেছে হাতেগোনা কয়েকজন। সেবছরই আবার মে মাসে ভারতের কার্গিল সীমান্তে গর্জে উঠবে কামান। কেনিয়ার বিরুদ্ধে সেঞ্চুরি করে জীবনে প্রথমবার আকাশের দিকে শ্রদ্ধার ব্যাট উঁচু করবেন সচিন তেন্দুলকর। সেই ১৯৯৯-এর ফেব্রুয়ারি মাসে, মহাত্মা গান্ধির প্রখ্যাত ডান্ডি অভিযান থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে হায়দরাবাদ শহরের “ইয়ারিয়াঁ” সম্মেলনে ওয়াইস খান এক মিছিলের পরিকল্পনা করবেন। যার নাম দেওয়া হবে, ফ্রেন্ডশিপ ওয়াক (Friendship Walk, 99)। পৃথিবীর বিভিন্ন শহরে, বিশেষত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে, ১৯৬৯ সালের স্টোনওয়াল দাঙ্গাকে স্মরণ করে এরকম পদযাত্রা বা মার্চ প্রতিবছর আয়োজিত হয়েছে। কিন্তু ভারতে সেরকম কিছু তখনও কল্পনাতীত। সদ্যমুক্তিপ্রাপ্ত দীপা মেহেতার “ফায়ার” ছবিটি অধিকাংশ ভারতীয়কে ক্ষুব্ধ করেছে। যেখানে সমপ্রেমী মূল দুই চরিত্রের নাম ‘রাধা’ ও ‘সীতা’।

কিন্তু কলকাতা ব্যতিক্রম থেকেছে প্রতিবার। ‘ফায়ার’ ছবিকে সেকালের কলকাতার তরুণ-তরুণী সাদরে গ্রহণ করেছে আর স্বপ্ন দেখেছে ডানা মেলার। স্থির হল, শহরের রাস্তায় নেমে সবাইকে জানানো হবে, সমপ্রেম প্রকৃতিবিরুদ্ধ নয়। সমপ্রেমী মানুষ এই সমাজের বুক থেকেই জন্মায়। আর পাঁচটা প্রেমের মতো সমপ্রেমেও কোনো পাপ নেই। পরিকল্পনায় মেতে উঠলেন আদিত্য মোহনত, অপর্ণা ব্যানার্জি, ওয়াইস খান, রফিকুল হক দোজাহ, পবন ঢাল, রাজর্ষি চক্রবর্তী, শান্তনু গিরি, সুশান্ত প্রামাণিক ও অন্যান্যরা। ঠিক হল, ১৯৯৯ সালের ২ জুলাই, শহরের বুকে হেঁটে হেঁটে তাঁরা প্রেমের খবর ছড়িয়ে দেবেন চারদিকে। যে প্রেমে জন্মগত লিঙ্গপরিচয় কোনো বাধা হয়ে ওঠে না। যে প্রেম শুধুমাত্র বংশধারা বজায় রাখায় মগ্ন নয়। শহরের বুকে এসে পৌঁছলেন ব্যাঙ্গালোরের এলজিবিটি ইন্ডিয়ার আহ্বায়ক ওয়াইস খান, এছাড়া সতীশ, নিতিন। হামসফর ট্রাস্টের অশোকের সঙ্গে এলেন নবারুণ, জসমীর। দার্জিলিং থেকে এলেন প্রণয়, কার্শিয়ং থেকে এলেন প্রশান্ত, বাটানগর থেকে মানস। কলকাতায় তাঁদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন কাউন্সেল ক্লাবের রঞ্জন, ইন্টিগ্রেশন কলকাতার পবন, এছাড়া আদিত্য, চিত্রা ও প্রমুখ।

সেই শুরু। ফ্রেন্ডশিপ ওয়াক হয়ে উঠেছে আজকের প্রাইড ওয়াক। কলকাতা প্রাইডের পক্ষ থেকে ড. ভাস্কর দাস বঙ্গদর্শন.কম-কে বলেন, “ভারতের অন্যান্য শহরের তুলনায় কলকাতা অনেক বেশি কুইয়্যার ফ্রেন্ডলি। প্রতিবছর আমাদের প্রাইডে ওয়াকে সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ বাড়ছে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হল, সন্তানদের সঙ্গে তাঁদের বাবা-মায়েরাও আসছেন। আমরা চেষ্টা করি সমস্ত বয়সের মানুষ যাতে এইদিন চিন্তামুক্ত হয়ে হাঁটতে পারেন। যার জন্য আমাদের তরফ থেকে অ্যাম্বুলেন্স, হুইলচেয়ার, মেডিকেল টিম প্রস্তুত থাকে। বিশেষ ভাবে ধন্যবাদ জানাব কলকাতা পুলিশকে।” তিনি আরও বলেন যে, অনেক রাজ্যে এখনও প্রাইড ওয়াকের জন্য অনুমতি পাওয়া যায় না, সেখানে কলকাতা পুলিশ প্রতিবার এই ঐতিহাসিক প্রাইড ওয়াকে সবরকম ভাবে সহযোগিতা করে।

আজ যখন দেশের নানান জায়গায় গর্বের রামধনু যাত্রায় সামিল হন হাজার হাজার মানুষ, শুরুটা করেছিল তিলোত্তমা কলকাতা। কলকাতা শহরের কপালে কেবল মিছিল লেখা। মিছিল কখনও মোমবাতি হাতে, মিছিল কখনও মৌন, আবার মিছিল হয়তো স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত। মিছিল অর্জনের, বিসর্জনের। মিছিল কলরবের, গৌরবের। আজ থেকে দুই দশক আগে পনেরো জন মানুষ যে পথ চলা শুরু করেছিলেন, সেই পথেই সমানাধিকারের দাবিতে সমপ্রেমী বিবাহের রাষ্ট্রীয় মান্যতার জন্য হেঁটে চলেছে। সে জানে, কেবলমাত্র সামনে এগিয়ে গেলেই একদিন সমান আকাশের সেই পৃথিবীতে পৌঁছানো যাবে, যেখানে ভালোবাসা সত্যিই গোলাপে ফোটে। LOVE is LOVE! প্রাইড ওয়াকের গুরুত্ব কোথায়? এ প্রসঙ্গে লেখক-প্রাবন্ধিক ভাস্কর মজুমদার বলেন, “সমকামী-রূপান্তরকামী-সহ বিভিন্ন লিঙ্গ যৌনতার মানুষ যে সত্যিই বিরাজ করেন – রাস্তা দিয়ে মিছিল করে হেঁটে গেলে হেটেরোনর্ম্যাটিভ সমাজ ও রাষ্ট্রে অন্তত সেই দৃশ্যমানতা বৃদ্ধি পায়। আর হেটেরোনর্ম্যাটিভ সমাজ-রাষ্ট্র যে ঘৃণা এই প্রাইড-ওয়াকের দিকে কখনও কখনও ছুড়ে দেয় সেটাও মনে রাখতে হবে দামি। কারণ এই ঘৃণাই প্রাত্যহিক যুদ্ধপথে এগিয়ে যাবার একটা বড়ো পাথেয় হয়ে থাকে।”

একটা গোটা দিন লিঙ্গ পরিচয়ের উদযাপন ও রাজপথ দখল সমাজের কাছে আসলে কোন বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে? এ প্রসঙ্গে চিত্র সাংবাদিক শুভজিৎ নস্কর জানান, “নিজের সত্ত্বা নিয়ে গর্ববোধের অধিকার প্রতিটি মানুষের আছে, সে যে ধর্মেরই হোক, যে লিঙ্গেরই হোক। যখন সেই মানুষ বা সেই গোষ্ঠী সামাজিক বঞ্চনার শিকার হয়, প্রতিদিন প্রতি মুহূর্তে চোখে আঙুল দিয়ে বুঝিয়ে দেওয়া হয় তুমি আলাদা, তুমি ভিন্ন, তুমি আমাদের দলের লোক নও, তুমি আদতেই প্রান্তিক; তখন সেই মানুষেরও যথেষ্ট পরিমাণ অধিকার আছে তার নিজের পরিচয়ের অহংকার নিয়ে বুক ঠুকে রাস্তায় নামার। প্রাইড ওয়াক আমার কাছে এক শৈল্পিক বহিঃপ্রকাশও।”

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, কলকাতা প্রাইড গ্রুপের উদ্যোগে আয়োজিত এই এক মাসব্যাপী উদযাপনে ছিল জেন্ডারমেলা আর ডায়লগস নামক চলচ্চিত্র উৎসব। ১৫ ডিসেম্বর, রবিবারের সম্মিলিত পদযাত্রার মধ্য দিয়ে শেষ হল ভিন্নতার উদযাপনের। সমাজের প্রান্তে থাকা রূপান্তরিত, রূপান্তরকামী, সমকামী, উভকামী, কুইয়্যার মানুষদের নিত্যসঙ্গী যে আড়চোখের চাহনি ও কটাক্ষ, এই মিছিল তাঁদের সদর্প আত্মপ্রকাশের জায়গা। বর্তমানে প্রাইড ওয়াক বা গৌরব মিছিল কেবলমাত্র নিজেদের পরিচয়ের উদযাপনের জন্য নয়, বরং চাপিয়ে দেওয়া কিছু আইনের সপক্ষে বা বিপক্ষে এবং ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের মাধ্যম হয়ে উঠেছে। কলকাতা রেইনবো প্রাইড ওয়াক সর্বদাই নিজস্ব একটা স্বতন্ত্র ধারা বজায় রেখেছে। এবারেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। মুখরিত হল শীতের কলকাতা, “আমাদের একলা কারোর নয়, সবার।”

