
পৃথিবীর বেশিরভাগ প্রাচীন সভ্যতার বাহক হিসেবে বিশ্বজুড়ে নানাবিধ পাথরের স্থাপত্য ও শিল্পকর্ম তৈরি হলেও বাংলার ক্ষেত্রে এমনটা সম্ভবপর হয়নি, কারণ এখানে প্রাচীনকাল থেকেই পাথরের বড়ো অভাব। তবে এই অভাব পূরণ করেছে ইট, যাকে অবলম্বন করে বাংলার সবথেকে পুরোনো সভ্যতা অর্থাৎ প্রাচীন পুণ্ড্র নগরী নিজের অস্তিত্ব রক্ষা করবার চেষ্টা করেছিল। আজও এখানে ইটের তৈরি স্থাপনার পাশাপাশি পোড়ামাটির কারুকাজ দেখতে পাওয়া যায়।
পঞ্চরত্ন গোবিন্দ মন্দির পুঠিয়া রাজশাহী
অনেকেই টেরাকোটা শিল্পের পীঠস্থান বলতে কেবলমাত্র পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া জেলার সোনামুখি ও পাঁচমুড়া গ্রামের কথাই ভেবে থাকেন। তবে উত্তর দিনাজপুরের রায়গঞ্জের অন্তর্গত কুনোর গ্রামের টেরাকোটা শিল্পও এই ক্ষেত্রে কোনো অংশে পিছিয়ে নেই।
‘টেরা’ (মাটি) আর ‘কোটা’ (পোড়ানো) শব্দ দুটির সমন্বয়ে ‘টেরাকোটা’ শব্দটি গঠিত হয়েছে, যার উৎস আদতে লাতিন ভাষা। বাংলায় ‘টেরাকোটা’ শব্দটির প্রচলন থাকলেও বাংলা ভাষায় একে পোড়ামাটির শিল্প-ও বলা হয়ে থাকে। নরম কাদামাটিকে হাত বা ছাঁচের সাহায্যে ইচ্ছেমতন আকার দেওয়ার পর, তা গনগনে আঁচে পুড়িয়ে নেন টেরাকোটা শিল্পীরা। এতে শিল্পকর্মটিতে অসামান্য লালচে কমলাটে রং ধরে, মজবুতও হয়। এককালে বাংলার মন্দির, মসজিদ, রাজবাড়ি – স্থাপত্যে টেরাকোটার কাজ শোভা পেত। পোড়ামাটির ছাঁচে গল্পের মতন ফুটে উঠত লতা-পাতা-ফুলের নকশা, আলপনা, পুরাণের গল্প, মানুষের রোজকার জীবন, আরও কত কী!
বাংলাদেশ টাঙ্গাইলের আতিয়া মসজিদ
পাথরের স্থাপত্যকীর্তি সহজে ভাঙে না, ক্ষয়ে মুছে যেতেও বহু সময় লেগে যায়। কালের নিয়মে টেরাকোটা সমৃদ্ধ বহু নিদর্শন হারিয়ে গেলেও, বাংলায় টেরাকোটার রাজত্ব যে প্রাক-মৌর্যযুগ থেকে শুরু হয়েছে, ইতিহাস তার সাক্ষ্য দেয়। পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে বাঁকুড়া জেলার পাঁচমুড়া, সোনামুখি, রাজগ্রাম, হামিরপুর প্রভৃতি ছোটো গ্রামগুলি ও বিষ্ণুপুর ছাড়াও উত্তর দিনাজপুরের রায়গঞ্জ টেরাকোটা স্থাপত্য ও ভাস্কর্যের জন্য বিখ্যাত। এছাড়াও, বাংলাদেশ টাঙ্গাইলের আতিয়া মসজিদ এবং রাজশাহীর গোবিন্দ মন্দির বাংলার টেরাকোটা ঐতিহ্য বহন করে।
অনেকেই টেরাকোটা শিল্পের পীঠস্থান বলতে কেবলমাত্র পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া জেলার সোনামুখি ও পাঁচমুড়া গ্রামের কথাই ভেবে থাকেন। তবে উত্তর দিনাজপুরের রায়গঞ্জের অন্তর্গত কুনোর গ্রামের টেরাকোটা শিল্পও এই ক্ষেত্রে কোনো অংশে পিছিয়ে নেই। একরত্তি গ্রাম কুনোর, যার পোড়ামাটির কাজের খ্যাতি বর্তমানে জগৎজোড়া। এখানকার কারিগরেরা টেরাকোটার মূর্তি ছাড়াও তৈরি করেন দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহারযোগ্য নানা ধরনের সামগ্রী। মাটির বোতল ও বিভিন্ন ধরনের পাত্র, ল্যাম্পশেড, ফুলদানি, ঝাড়বাতি, প্রদীপ প্রভৃতি সামগ্রীগুলি একাধারে ঘর সাজাতে ও নিত্যনৈমিত্তিক প্রয়োজনে কাজে লাগে।

রায়গঞ্জ সংলগ্ন সুভাষগঞ্জের বাসিন্দা মৃৎশিল্পী সুকুমার পাল বঙ্গদর্শন.কম-এর সঙ্গে আলাপচারিতায় জানান, “টেরাকোটা শিল্পের চর্চা শুরু করেছিলেন আমার দাদু। তাঁর কাছ থেকে বাবা শেখেন, বাবার থেকে শেখেন মা আর দাদা। ছোট থেকেই তাই টেরাকোটার কাজ দেখে বড় হয়েছি। ছোটবেলায় ওদের দেখাদেখি আমিও পুতুল বানাতাম, তারপর ওঁদের তৈরি পুতুলের পাশে বসিয়ে দেখতাম কতখানি নিখুঁত বানাতে পেরেছি। পছন্দসই না হলে তক্ষুনি তা ভেঙে আবার বানাতে বসতাম। আমাদের তৈরি পুতুলের মধ্যে রয়েছে টেপা পুতুল, লক্ষ্মী পুতুল, ষষ্ঠী পুতুল প্রভৃতি। টেপা পুতুল তৈরির জন্য আমরা কোনোরকম ছাঁচের ব্যবহার করি না। হাত দিয়ে নরম কাদামাটিকে টিপে পুতুলের আকার দেওয়া হয়।”
তিনি আরও বলেন, “এভাবেই টেপা পদ্ধতিতে মাটির ঘোড়াও তৈরি করে থাকি। সে ঘোড়ার পায়ে আবার চাকা লাগানো থাকে। মাটির চাকা লাগানো নৌকাও তৈরি করি আমরা। পুতুল ছাড়াও তৈরি করি পোড়ামাটির জলের বোতল, ফুলদানি, জল ঠান্ডা রাখার ট্যাঙ্ক, গাছ বসানোর টব, রুটি সেঁকার তাওয়া ইত্যাদি। বর্তমানে পুতুলের চাইতেও মাটির তৈরি দৈনন্দিন ব্যবহার্য জিনিস ও বাসন যেমন থালা, বাটি, গ্লাস প্রভৃতির চাহিদা অনেকখানি বেশি। আমরা কলকাতার হস্তশিল্প মেলাগুলিতে অংশগ্রহণ করি প্রতি বছর। সেখান থেকে বহু মানুষ আমাদের তৈরি টেরাকোটার সামগ্রী সংগ্রহ করে থাকেন।”

টেরাকোটার ঘোড়া বলতে আমরা যা বুঝি, সেই ঘোড়ার জন্মস্থান বাঁকুড়ার পাঁচমুড়া। দৃপ্ত গ্রীবার অধিকারী, কচি পাতার মতো কান ও লেজ-ওয়ালা এই ঘোড়ার অন্তরভাগ হয় সম্পূর্ণরূপে ফাঁপা। বর্তমানে ভারতীয় লোকশিল্পের নিদর্শন হিসেবে এই ঘোড়া বিশ্বমানের স্বীকৃতি লাভ করেছে, যদিও প্রাথমিকভাবে গ্রামের ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানে ব্যবহার করবার জন্য এর নির্মাণ হয়েছিল। পাঁচমুড়ার মৃৎশিল্পী মুরলী কুম্ভকার অবশ্য বঙ্গদর্শন ডট কম-কে জানান, “বহু প্রজন্ম ধরেই আমাদের পরিবার এই কাজের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। আমাদের তৈরি জিনিসগুলির মধ্যে আজও সবচাইতে বেশি চাহিদা টেরাকোটার এই ঘোড়ার, আর তা মূলত ধর্মীয় কারণেই। এছাড়াও আমরা বোঙ্গা হাতি, প্যাঁচা, বাইসন ও নানান দেবদেবীর মূর্তি নির্মাণ করি। তাছাড়া বর্তমানে অনেকেই মাটির বাসনপত্র নির্মাণের আবেদন করেন। আগে ভাগ্যমণি পুতুল তৈরি হত, এখন তার চাহিদা কিছুটা কমলেও কেউ অর্ডার দিলে আমরা তৈরি করে দিই।” ভাগ্যমণি পুতুলের মূল উৎস বাঁকুড়ার আর এক গ্রাম সোনামুখি। এই পুতুলের ক্ষেত্রে থাকে একটি বসা বা দাঁড়ানো ‘মা’ পুতুল, আর তার কোলে তার চার পুত্র সন্তান। পুত্র সন্তানের জন্ম দিতে সক্ষম হয়েছেন তাই মা ভাগ্যবতী, খানিক এমনধারা মধ্যযুগীয় ধারণা থেকেই এই পুতুলের জন্ম।
দ্য বেঙ্গল স্টোর-এ পাওয়া যায় নানা ধরনের অভিনব টেরাকোটা সামগ্রী
প্রসঙ্গত, বর্তমানে রায়গঞ্জের টেরাকোটার পুতুল, জলের বোতল ও অন্যান্য ধারক পাত্র, পাঁচমুড়ার ঘোড়া-হাতি ও দেবদেবীদের মূর্তি এবং সোনামুখির ভাগ্যমণি পুতুল – সকলকেই এক ছাদের তলায় নিয়ে এসেছে দ্য বেঙ্গল স্টোর। নয়নাভিরাম ও ঐতিহ্যবাহী এই টেরাকোটা শিল্পসৃষ্টিগুলির হাত ধরে যেন এক টুকরো বাংলা-ই উঠে এসেছে এই বিপণির চার দেওয়ালের ভিতর।
