একমাত্র বই-ই ছিল শঙ্খ জেঠুর প্রথম পছন্দ : স্মৃতিচারণায় প্রকাশক অপু দে

দে’জ পাবলিশিং-এ পয়লা বৈশাখে ৮০ দশকে

বাবা ‘দাদা’ বলে সম্বোধন করতেন। সেই দাদার বাড়িতে সেই সময় আর যাঁরা উপস্থিত থাকতেন, তাঁরা ‘স্যার’ বলতেন। উল্টোডাঙ্গার ঈশ্বরনিবাস আবাসনের চারতলার ফ্ল্যাটটায় রোববারের আড্ডা বসে। তেমনই এক রবিবারের আড্ডার শেষে বাবাকে একজন জিজ্ঞাসা করেছিলেন,

— আমরা সবাই স্যার বলি আর আপনি দাদা বলেন কেন?

— আপনারা সকলেই হয়তো তাঁর ছাত্র। কেউ প্রত্যক্ষ আবার কেউ হয়তো পরোক্ষভাবে। আমি তো কোনোভাবেই তাঁর ছাত্র নই। তাই আমি দাদা বলি।

বাবার সেই দাদা ডাকের সুবাদে রোববারের আড্ডায় ঘর ভর্তি ছাত্রছাত্রীর মাঝে কবে থেকে যেন আমিও জেঠু ডাকের অধিকার পেয়ে যাই।

অভীক মজুমদার, শৈলস্বর ঘোষ, শঙ্খ ঘোষের সঙ্গে আমি

কোন ছোটোবেলায় কবে যে বাবার হাত ধরে শঙ্খ জেঠুর বাড়িতে গেছি মনে নেই। পরে কার্তিকদা (দে’জ-এর কর্মী ছিলেন কার্তিক জানা) নিয়ে গিয়েছিলেন কবির সঙ্গে দেখা করাতে। পরবর্তী সময়ে কখনো স্বপন (মজুমদার) জেঠু, প্রণব (বিশ্বাস) জেঠু, আবার কখনো পুলক (চন্দ) কাকুর সঙ্গে শঙ্খ জেঠুর বাড়ি যাওয়া। জেঠু-কাকুদের মাঝে আমি ছিলাম নির্বাক শ্রোতা। কখনো কথার শেষে ঘাড়ের ওপর মাথাটাকে একদিকে হেলিয়ে শব্দহীন ‘হ্যাঁ’ বলা। কথা বলতাম তখন, যখন রবিবারের আড্ডার আসরে তরুণদের দল ভারী থাকত। সেই দলে সন্দীপন চক্রবর্তী, রাহুল দাশগুপ্ত, মলয় আরও অনেকের মাঝে থাকতাম।

২০২০ সালে মার্চ মাসের পনেরো তারিখের পরে আর মনে হয় কোনো রবিবারের আড্ডা বসেনি। প্রথম লকডাউন একটু শিথিল হতেই আপনার কবিতা সংগ্রহের চতুর্থ খণ্ডের প্রুফ দেওয়া নেওয়া করতাম আপনার অজান্তেই।

‘আজকাল’ পত্রিকায় কুম্ভ নিয়ে একটা লেখা লিখেছিলাম। লেখাটি পড়ে তাঁর ত্রিবেনি ঘোরার একটি মজার গল্প শুনিয়েছিলেন,

— একবার আমি, আমার এক বন্ধু আর তোমার জেঠিমা বেড়াতে গেছি এলাহাবাদ। ত্রিবেনি সঙ্গমে যাবো বলে মাঝির সঙ্গে কথা বলছি। তিনজনকে ঘুরিয়ে নিয়ে আসতে সেই আটের দশকে কুড়ি টাকা চেয়েছিল। সেই সময় অনেকটা। বন্ধু সেই মাঝিকে বলেছিল দু’টাকা দেব। কুড়ির জায়গায় দু’টাকা শুনে আমি উল্টোদিকে ঘুরে হাঁটতে শুরু করে দিয়েছি। একটু পরে পিছন ফিরে দেখি কেউ নেই। বন্ধুটি তখনও মাঝির সঙ্গে কথা বলে যাচ্ছে, আর হাত নেড়ে ডাকছে। মাঝি রাজি হয়ে গেছে দু’টাকায় ঘুরিয়ে আনবে। হাল না ছাড়া বন্ধুর মাঝির নতি স্বীকারে আমরা সকলে মিলে ঘুরে এলাম। হোটেলে ফিরে ম্যানেজারকে বলেছিলাম,

— আপনাদের এখানে লোকে তো খুব ঠকায়।

— কেন কী হয়েছে?

— ত্রিবেনিতে ঘুরিয়ে আনতে কুড়ি টাকা চেয়েছিল। তারপরে দু’টাকায় ঘুরিয়ে নিয়ে এল।

হোটেলের ম্যানেজার একটু মৃদু হেসে বলেছিলেন,

— তাতেও ঠকেছেন আসলে ভাড়া আটানা।

২০১৯ সালে আমাদের বাড়িতে

শঙ্খ জেঠুর সঙ্গে আমার সম্পর্ক যে শুধু বইয়ের প্রকাশনা নিয়ে তা নয়। আমার বেড়ে ওঠার সময়ে জটিল মুহূর্তগুলোকে খুব সহজে বুঝিয়ে দিতেন কীভাবে গ্রহণ করবো। ২০০৮ সাল। পাবলিশার্স অ্যাণ্ড বুক সেলার্স গিল্ড উদ্যোগ নিয়েছিল কবি বিষ্ণু দে-র জন্মশতবর্ষ উপলক্ষ্যে একটি প্রদর্শনী করার। গগনেন্দ্র প্রদর্শশালায় অনুষ্ঠান হবে। শঙ্খ জেঠু সেই প্রদর্শন উদ্বোধন করবেন। সাজানোর দায়িত্ব পড়েছিল আমার ওপর। বিষ্ণু দে-র লেখা বই, আঁকা ছবি, বিভিন্ন ব্যক্তিদের লেখা চিঠি, পাণ্ডুলিপি দিয়ে সাজানো হবে। আমার আর্টিস্ট বন্ধু দেবাশিসকে সঙ্গে নিয়ে সকাল থেকে হল সাজাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম। যত সময় এগোয় ততই যেন অস্থির হতে থাকি, সময়ের আগে শেষ করতে পারবো! প্রদর্শন শুরুর প্রায় আধঘণ্টা আগে শঙ্খ জেঠু উপস্থিত। এসে দেখেন তখনও অনেকটা সাজানো বাকি। বেশ রেগেই বলেছিলেন, “তোমার যদি লোক ছিল না তাহলে আমায় আগে বলোনি কেন? আমার ছাত্রছাত্রীদের বলে দিতাম, তারা চলে আসত।”

— কাঁচুমাচু হয়ে বলেছিলাম, জেঠু বুঝতে পারিনি, ভেবেছিলাম করে ফেলবো। আসলে এমন কাজ করার অভিজ্ঞাতা আমার আগে ছিল না।

— সাহস জুগিয়ে বলেছিলেন তাড়াতাড়ি করে ফেল। উদ্বোধনের পরে পুরো প্রদর্শনীটি ঘুরে দেখে বলেছিলেন, “খুব ভালো হয়েছে”।

২০০৯ সাল। সুভাষ মুখোপাধ্যায়-এর নব্বইতম জন্মদিন। প্রণব জেঠু, সৌরীন জেঠু, অমিয় জেঠু, স্বপন জেঠু, বাবা সকলে মিলে আলোচনায় বসেছিলেন শঙ্খ জেঠুর বাড়িতে। সেই আলোচনায় আমি ছিলাম ছোটো সদস্য। কার্জন পার্কে ভাষা শহিদ মঞ্চে বিকেল থেকে অনুষ্ঠান হবে। স্মৃতিচারণ, কবিতায়, গানে স্মরণ করা হবে কবিকে। একটি অগ্রন্থিত কবিতার সংকলনও প্রকাশ করা হবে। সুভাষ মুখপাধ্যায়ের হাসপাতালে লেখা নোটবুকের খাতা ও বেশকিছু অগ্রন্থিত কবিতার পাণ্ডুলিপি শঙ্খ জেঠুর হাতে তুলে দিয়েছিলেন প্রণব জেঠু। খামের ওপরে সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের হাতে লেখা ছিল “নতুন কবিতার বই”। সেই নাম দিয়ে শঙ্খ জেঠু কবিতাগুলো নিজে হাতে লিখে সাজিয়ে দিয়েছিলেন। শীতের বিকেলে কার্জন পার্কে প্রণব জেঠুর সঙ্গে সেই অনুষ্ঠানের সূচি সাজিয়েছিলেন শঙ্খ জেঠু। সেই অনুষ্ঠান শেষের বেশ কিছুদিন পরে শঙ্খ জেঠুকে মজা করে বলেছিলাম, “জেঠু মনে করুন অনেক বছর পরে “নতুন কবিতার বই”-এর পাণ্ডুলিপি পাওয়া গেল, প্রথম পাতায় বইয়ের নাম লেখা, তার নিচে কবির নাম সুভাষ মুখোপাধ্যায় লেখা, কিন্তু হাতের লেখা মিলছে না। পরে হাতের লেখা মেলাতে গিয়ে দেখা গেল আপনার লেখা। কী হবে তখন?”

সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের জন্মশতবর্ষে

নবনীতা পিসির (দেবসেন) হঠাৎ চলে যাওয়ায় খুব কষ্ট পেয়েছিলাম। আপনি জানতেন। বাংলাদেশ থেকে তাড়াতাড়ি করে ফিরে এসেও শেষ দেখা হয়নি আমার। একটি স্মরণ গ্রন্থ প্রকাশ করব। আপনার একটা লেখা চেয়েছিলাম। আপনি বলেছিলেন, নবনীতাকে নিয়ে লেখা আমার পক্ষে খুব কষ্টের। আপনি আপনার লেখার টেবিলে রেখেছিলেন আপনাকে লেখা নবনীতা পিসির একগুচ্ছ চিঠি। সেই চিঠির একটা বড়ো অংশ ছিল আপনার অসুস্থতার সময়ের। আপনার অসুস্থতার মধ্যেও আপনাকে লেখা চিঠিতে পিসির খুনসুটি ও মজা ছিল চিঠি জুড়ে। নবনীতা পিসির মৃত্যুর পরে প্রথম জন্মদিনে অমর্ত্য সেনের স্মারক বক্তৃতায় আপনি ছিলেন প্রধান অতিথি। সেই অনুষ্ঠানে আপনি কোনো কথা বলবেন না বলেছিলেন, তাই আপনার কথা বলতে গিয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে আপনার সম্পর্কে পিসির বলা একটি কথার উল্লেখ করেছিলাম। পিসি বলেছিলেন, “…উনি হলেন আমার বোবা কবি, উনি সব অনুষ্ঠানে যান কিন্তু কিছু বলেন না।”

হাসান আজিজুল হকের সঙ্গে শঙ্খ ঘোষের বাড়িতে

২০২০ সালে মার্চ মাসের পনেরো তারিখের পরে আর মনে হয় কোনো রবিবারের আড্ডা বসেনি। প্রথম লকডাউন একটু শিথিল হতেই আপনার কবিতা সংগ্রহের চতুর্থ খণ্ডের প্রুফ দেওয়া নেওয়া করতাম আপনার অজান্তেই। ঈশ্বর নিবাসের বাইরে দাঁড়িয়ে ফোন করতাম স্নেহাশিসদা-কে। গেটের কাছে এসে প্রুফ নিয়ে চলে যেতেন। নিঝুম দুপুরবেলায় আপনি তখন বিশ্রামে। রাস্তায় দাঁড়িয়ে আপনার শারীরিক অবস্থার কথা জানতাম স্নেহাশিসদার থেকে। আপনি যখন প্রুফ হাতে পেতেন, তখনই স্নেহাশিসদাকে দিয়ে আমায় ফোন করতেন। অভিযোগ থাকত আপনার কথায়, কেন দেখা করিনি।

শেষ জন্মদিনে

পাঁচ ফেব্রুয়ারি আপনার বিরানব্বইতম জন্মদিন। আপনার জন্মদিনে প্রণাম করতে আমি আর বাবা দিনের শেষ অতিথি ছিলাম। আপনার প্রতিটি জন্মদিন বইমেলার মধ্যেই থাকে। আমরা সেই বইমেলা শেষ হওয়ার পরে উপস্থিত হতাম আপনার বাড়িতে। উপহারে থাকত নতুন প্রকাশিত বই। বই-ই ছিল আপনার প্রথম পছন্দ। প্রতিটা বই আপনি উল্টে-পাল্টে দেখেন। ২০২১ সালেও দিনের শেষে পৌঁছে গিয়েছিলাম আপনার বাড়ি। বইমেলা না হওয়ায় কিছুটা আগেই পৌঁছেছিলাম, সঙ্গে ছিল আপনার “কবিতা সংগ্রহ” চতুর্থ খণ্ড। আপনার নিজের ঘরে নিজস্ব চেয়ারে শাল গায়ে সুন্দর সাজুগুজু করে প্রতিবারের মতো এবারও বসেছিলেন। নতুন সংযোজন ছিল মুখে মাস্ক। আবদার করেছিলাম বইটি হাতে নিয়ে দেখুন, আমি ছবি তুলবো। আপনি সেই আবদারে সম্মত হয়েছিলেন। আর রাজি হয়েছিলেন বলেই আমার মুঠোফোনের মধ্যে ২০২১ সালের পাঁচ ফেব্রুয়ারি তোলা ছবিগুলো রয়ে গেছে।

২০২২-এ আপনার জন্মদিনে আমরা আপনার বাড়ি গেছি নতুন বই প্রকাশ করতে – “গদ্য সংগ্রহ” দ্বাদশ খণ্ড। আপনার চেয়ারের পাশে নতুন বইগুলো রাখা হয়েছিল, শুধু আপনার হাতে আর তুলে দেওয়া হয়নি।

________________________

ছবি সৌজন্যে : অপু দে

Written by