ছবি দেখিয়ে গান শুনিয়ে বেড়ান গ্রাম বাংলার পটুয়ারা

বংশ পরম্পরায় পটুয়ারা গান শিখে নেন বাপ-ঠাকুর্দার থেকে

সে যুগে সিনেমা দেখানোর পদ্ধতি আবিষ্কার হয়নি। ছিল না ম্যাজিক লন্ঠনের কোনো ব্যবস্থাও। অথচ মানুষের ছবি দেখা আর গল্প শোনার অভ্যেস যেমন আদিম, দু’টোকে মেলানোর ইচ্ছেও যথেষ্ট পুরোনো। জীবনরস আস্বাদনের জন্য চোখ আর কান একসঙ্গে ব্যবহার করা গেলে মন্দ হয় না মোটেও। বাংলার গ্রামীন সংস্কৃতিতে তারও উপায় ছিল। সামনে মেলা থাকবে রঙিন ছবি, আর সেই ছবির গল্প বলা হবে গানের সুরে। কখনো কখনো নাচের আয়োজনও থাকবে। প্রাচীন কাল থেকে পটের ছবি আঁকা হয় আমাদের দেশে। আর তখন থেকেই পটুয়ারা সেই পট দেখিয়ে গান শুনিয়ে বেড়ান। বেশির ভাগ পটুয়াই যেমন একাধারে ছবি আঁকিয়ে, তেমনি অন্য দিকে গান বাঁধেন, সুর দেন, আবার নিজের গলায় সেটা পরিবেশন করেন। তাঁদের সব্যসাচী বললে তাই কম বলা হয়। তবে এমন পটুয়াও রয়েছেন, যাঁরা শুধু গানই গেয়ে থাকেন, ছবি আঁকতে পারেন না। আবার উল্টোটাও রয়েছে, পটুয়া শুধু ছবি এঁকে দিচ্ছেন, গান গাইছেন অন্য লোক।

একটা সময়ে পটুয়া গানের ঘাঁটি ছিল রাঢ় অঞ্চল। পূর্ববঙ্গ অর্থাৎ একালের বাংলাদেশেও একটা সময়ে পটের গান প্রচলিত ছিল। এখন বীরভূম, পশ্চিম মেদিনীপুর, বর্ধমান, মুর্শিদাবাদের গ্রামেগঞ্জে এই গানের চর্চা আছে। বিশেষভাবে উল্লেখ করা যায় পশ্চিম মেদিনীপুরের পিঙ্গলা ব্লকের নয়াগ্রামের কথা। সেখানে অনেকগুলো পরিবার এই পটুয়া গানের নিয়মিত চর্চা করে বাংলার প্রাচীন ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রেখেছে। পটুয়ারা তাঁদের পট নিয়ে গৃহস্থদের বাড়ি বাড়ি যান। পটের গান শোনাতে তারা গৃহস্থ বাড়ির এমন একটা জায়গা বেছে নেন, যেখান থেকে ছবি দেখালে আর গান শোনালে আশেপাশের বাড়ির লোকেরাও জড়ো হয়ে উপভোগ করতে পারবে। গানের সঙ্গে বাজে খোল, ডুগডুগি, করতাল। আজকাল পটের গান শুরুর আগে কোনো কোনো পটুয়া জনপ্রিয় কিছু সিনেমার গানও শুনিয়ে দেন।

পটের গানের ধর্মীয় নানা ধরনের নীতিকথাই গল্পের ছলে গাওয়া হয়। হিন্দু পুরাণের বিভিন্ন কাহিনির পাশাপাশি মুসলমানের মধ্যে খুব জনপ্রিয় গাজি পিরের গানও পটুয়ারা গেয়ে শোনান। তেমনি আবার থাকে বৌদ্ধ জাতকের গল্প। ইংরেজদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা সংগ্রাম, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, সমাজ সচেতনতার কথাও পটের গানে উঠে আসে। গানের কাহিনিকে অনুসরণ করেই পট আঁকা হয়। আগে সেই গান কেউ লিখে রাখত না। বাপ-ঠাকুর্দার থেকে বংশ পরম্পরায় সেই গান পটুয়ারা শিখে নিতেন। তবে আজকাল বেশ কিছু পটুয়ার কাছে গানের খাতা পাওয়া যায়। সেখানে পটুয়া নিজে বা অন্য কাউকে দিয়ে গানগুলি সংগ্রহ করে রাখেন। গানের মধ্যে রচয়িতার কোনো নাম থাকে না, তাই গান যে বেঁধেছে সেই লোককে খুঁজে বার করা খুব কঠিন। 

তথ্যসূত্র – পটচিত্র ব্লগ, সারাবাংলা। 

Developed by DXDasia