
মনের খবর কি কেউ রাখে? সঙ্গী, বন্ধু বা পাশের লোকটির মনের গহীনে কী ভাবনা জমাট বাঁধছে, সে খবর নিয়ে আদৌ কেউ চিন্তিত হয়! শরীরের অসুস্থতা নিয়ে মানুষ যতটা উদ্বিগ্ন মনের অসুখ নিয়ে তার চেয়েও বেশি উদাসীন। একুশ শতকে দাঁড়িয়েও মনখারাপ, ‘ডিপ্রেশন’ নিয়ে খোলাখুলি কথা বলা হয় না। আজও রয়ে গিয়েছে বহু ‘ট্যাবু’। হাল আমলে দ্রুত গতিতে বাড়ছে মনের অসুখ। যার একটা বড়ো কারণ সম্পর্ক, সম্পর্কের জটিলতা এবং টানাপোড়েন। প্রেমের গোলকধাঁধায় অনেকেই ঠকে যান। তা জাঁকিয়ে বসে মনে। জন্ম দেয় মনের অসুখের। আজকের দিনের এমন এক জলন্ত সমস্যা নিয়ে বই লিখে ফেলেছেন ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট পারমিতা ভট্টাচার্য। তাঁর বইয়ের নাম, ‘স্কার্স বিনিথ দ্য সাইলেন্স’ (SCARS BENEATH THE SILENCE)। বইটির প্রকাশক এক্সসেলার বুকস। বইটির সম্পাদনা করেছেন সহেলী মিত্র।
প্রেমের গোলকধাঁধায় অনেকেই ঠকে যান। তা জাঁকিয়ে বসে মনে। জন্ম দেয় মনের অসুখের। আজকের দিনের এমন এক জলন্ত সমস্যা নিয়ে বই লিখে ফেলেছেন ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট পারমিতা ভট্টাচার্য। তাঁর বইয়ের নাম, ‘স্কার্স বিনিথ দ্য সাইলেন্স’ (SCARS BENEATH THE SILENCE)। বইটির প্রকাশক এক্সসেলার বুকস।
মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ পারমিতার পড়াশোনা লন্ডনে, বিদেশে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। প্রায় পঁচিশ বছর ধরে তিনি প্র্যাকটিস করছেন। এই মুহূর্তে বাংলার এক মেডিক্যাল কলেজ অ্যান্ড হসপিটালের সিইও পদে কর্মরত তিনি। তাঁর সদ্য প্রকাশিত বইতে উঠে এসেছে আন্তর্জাতিক স্তরের একটি ঘটনা। আর্থিকভাবে পিছিয়ে পড়া দেশের কিছু মানুষ (নারী, পুরুষ নির্বিশেষে) কীভাবে প্রেমের জালে জড়িয়ে ফেলেন অপরকে, তারপর চলে প্রতারণা। এমনই একটি ঘটনা বইতে তুলে ধরেছেন পারমিতা। তাঁর সদ্য প্রকাশিত বই সম্পর্কে তিনি বঙ্গদর্শন.কম-কে জানান, “বইটা অর্থাৎ ‘স্কার্স বিনিথ দ্য সাইলেন্স’ একজন নাইজেরিয়ান জেলবন্দিকে নিয়ে লেখা। আমি কলকাতায় থাকাকালীন কিছু সংশোধনাগারের আবাসিকদের নিয়ে কাজ করেছি। কাউন্সিলিংয়ের সময় আমার ওঁর সঙ্গে আলাপ। সেই সুবাদে ওঁর জীবন কাহিনি জানলাম। অনেক রিসার্চ করেছি। ওঁর ভালোবাসার কথা বলেছিল। তারপর কাজের সুবাদে বাংলাদেশ যাই। সেখানে এই কাহিনির আর এক প্রোটাগনিস্টের সঙ্গে আলাপ হয়। একজন মুসলিম মহিলা। তাঁর সঙ্গে গিয়ে দেখা করি। তখন আমি একটা প্রজেক্টে বাংলাদেশে ছিলাম। ওঁর সঙ্গে কথা বলে, রিসার্চ করে আমি লিখি। এটা ‘রিয়েল লাইফ স্টোরি’। এই ধরনের ক্রাইসিস বা এই ধরনের পরিস্থিতি… এখন আমাদের সমাজে দেখা যায়, ভীষণভাবে এই ধরনের জিনিস হচ্ছে। এটা তুলে ধরার জন্যেই বইটা লেখা। এটাকে ‘কেস স্টাডি’ বলতে পারেন। যাঁরা আইন পড়ছে, সোসিওলজি নিয়ে পড়েছে বা যাঁরা সাইকোলজি নিয়ে পড়ছে তাঁদের জন্য ‘কেস স্টাডি’ হতে পারে। লিঙ্গ, বয়স নির্বিশেষে বইটা মানুষের চোখ খুলে দিতে পারে।”

বই সম্পর্কে তিনি আরও বললেন, “কীভাবে ভালোবাসার মধ্যে জড়িয়ে একটা ছেলে বা একটা মেয়ে, আজকালকার দিনে লোককে অসহায় করে দেয়, এটা সেই গল্প। এটা ফিকশন হিসাবে লেখা। নাইজেরিয়ান ভদ্রলোকটি একজন আসামি, জেলবন্দি। জেনে শুনে একজন আসামির ভালোবাসায় কেউ কেন জড়াবে? এটা কেন? একটা শিক্ষিতা, ধনী পরিবারের মেয়ে এমন মানুষের প্রেমে কেন পড়বে? কী খামতি আছে? কোন মানসিক যন্ত্রণায় সে ভুগছে? কীসের অভাব তাঁর জীবনে? সেটা নিয়েই স্টোরি।”
মানসিক স্বাস্থ্যকে লঘু করে দেখা প্রসঙ্গে তিনি জানান, মানসিক অসুস্থতা যে পাগলামি নয়, এটা আগে বুঝতে হবে। মানসিক অসুস্থতা লোকে পাগলামি ভাবে, এটাই মূল কারণ। এই লজ্জায় লোকে মানসিক অসুস্থতার কথা বলতে চান না। অনেক উপসর্গ আছে, ঘুম না-হওয়া, খেতে না-ইচ্ছে করা, ভিড় থেকে, সামাজিক অনুষ্ঠান থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়া। মানসিক অসুস্থতার অনেক ভাগ আছে। কেউ নিজে না-ই বুঝতে পারে, যে সে মানসিক অসুস্থতায় ভুগছে। তার পরিবারকে বুঝিয়ে দিতে হবে। বলতে হবে, ‘তুমি ভালো নেই।’ মানুষের আচার আচরণে বদল আসে। সেটা চোখে পড়ে পরিবারের। তখন জিজ্ঞাসা করা উচিত, ‘সব ঠিক আছে তো?’ এই ‘সবকিছু ঠিক আছে তো?’ প্রশ্নটাই পরিবারের লোকজন জিজ্ঞাসা করে না। তখন সব অবহেলিত হয়ে যায়। ছোটো বাচ্চাও ডিপ্রেসড হতে পারে। সেটা বলতে কী সমস্যা। সবার আগে দরকার ঠিকঠাক প্যারেন্টিং।
কোন কারণে দিনে দিনে মানসিক অসুস্থতা বাড়ছে? পারমিতা জানাচ্ছেন, “সবাই বিভ্রান্ত। কনফিউসড পরিস্থিতি। জেন আলফা, মিলেনিয়াম থেকে জেন জি-র মধ্যে যে জেনারেশন গ্যাপটা! আমি দেখি সবাই বিভ্রান্ত। আমরা মিলেনিয়াম প্রজন্মের প্রতিনিধি হয়ে বিভ্রান্ত, কারণ আমরা পরবর্তী প্রজন্মকে বুঝতে পারি না। আর পরবর্তী জেনারেশন কেন বিভ্রান্ত? তাঁরা নিজেদেরকে বুঝতে পারে না। তাঁরা জানে না, জীবনে কী চাই। এতেই তো সমস্যা হয়। ডিপ্রেশন, স্ট্রেস, দুশ্চিন্তা আসে। এটা বাচ্চাদের মধ্যেও বাড়ছে। ইয়াং অ্যাডাল্টস, কিশোর-কিশোরীদের মধ্যেও বাড়ছে। সবচেয়ে বেশি মানুষ সম্পর্ক নিয়ে সমস্যায় আসে। কে যে কোন সম্পর্কে (রিলেশনশিপ) আছে, তাঁরা নিজেরাও জানে না।”
লজ্জায় লোকে মানসিক অসুস্থতার কথা বলতে চান না। অনেক উপসর্গ আছে, ঘুম না-হওয়া, খেতে না-ইচ্ছে করা, ভিড় থেকে-সামাজিক অনুষ্ঠান থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়া। মানসিক অসুস্থতার অনেক ভাগ আছে। কেউ নিজে না-ই বুঝতে পারে, যে সে মানসিক অসুস্থতায় ভুগছে। তার পরিবারকে বুঝিয়ে দিতে হবে। বলতে হবে, ‘তুমি ভালো নেই।’

পারমিতার একটি সংস্থা রয়েছে, নাম ‘মাইন্ড মিথ অ্যান্ড মোর’। সেখানে ‘প্রম্পট উইথ পারমিতা’ নামে একটি পডকাস্ট শো হয়। তিনি বলছিলেন, “মানসিক অসুস্থতার সঙ্গে আর্টের মেলবন্ধন ঘটানো হয় এতে। উদাহরণ হিসাবে বলতে পারি, মানসিকভাবে ভালো থাকতে রান্না করা কীভাবে সাহায্য করে, গান কীভাবে সাহায্য করে, পশুপ্রেমও মানসিকভাবে ভালো থাকতে সাহায্য করে। প্রতিটা জিনিসের সঙ্গে মানসিকভাবে ভালো থাকার একটা সংযোগ আছে। সেটাই আমি খোঁজার চেষ্টা করি। সেই জন্য এই উদ্যোগ নিয়েছি। আমরা যে স্ট্রেস, ডিপ্রেশন, দুশ্চিন্তায় ভুগছি, সেটা একটা সময় নিজেরাই বুঝতে পারি না। কীভাবে বুঝবো? সচেতনতা দরকার। জ্বর হলে বুঝতে পারি আমার জ্বর জ্বর লাগছে। মানসিক দুশ্চিন্তায় ভুগলে বুঝতে পারবো না। তারও কিছু উপসর্গ আছে। সেগুলি চিনবো কী করে, কী করে তা কাটিয়ে উঠবো। সেসব বিষয়ে আলোচনা করি। বিভিন্ন রকম মানসিক স্বাস্থ্যের বিভিন্ন অবস্থা নিয়ে আলোচনা করি।”
‘স্কার্স বিনিথ দ্য সাইলেন্স’ পারমিতার দ্বিতীয় বই। তাঁর প্রথম বই ‘মায়া মুক্তি’, একাধিক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছে বইটি। দ্বিতীয় বই সম্পর্কে তাঁর আশা, “পাঠকরা যাঁরা বইটা পড়ছেন এবং পড়বেন, তাঁদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ুক। জীবনে কোনও বয়সে যদি কোনও সম্পর্কের কারণে সমস্যা আসে, তার মানে এই নয়; যে আমার যোগ্য নয়, তার প্রেমে হাবুডুবু খেতে হবে। সর্বস্ব উজাড় করে দিয়ে জীবনের সর্বনাশ করার কোনও মানে হয় না। আমরা আবেগী হব না। আমাদের বাস্তববাদী হতে হবে। এটাই পাঠকদের কাছে আমার বার্তা, মেসেজ। জীবন যেভাবে তোমার কাছে আসবে, সেভাবেই তাকে গ্রহণ করো এবং বাঁচো।”
সমস্যাহীন জীবন তো অলীক কল্পনা। হাল আমলে সম্পর্কের জটিলতা জীবনের অন্যতম সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কী করে তা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে? হানি ট্র্যাপ কি জীবন শেষ করে দেবে? সম্পর্কের সমস্যাজনিত জটিলতা থেকে মুক্তির পথ বাতলে দেবে পারমিতা ভট্টাচার্যের বই ‘স্কার্স বিনিথ দ্য সাইলেন্স’।
__________________
বইটির অনলাইন লিংক: https://amzn.in/d/du7b6lX
